|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় অনন্যা রায় মুখার্জী

সাঁকো
জিয়া পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ায় ঠিক মাঝখানে। আর এক পা বাড়ালেই অতলের টান। কাজলি ভরা বেগে বয়ে চলেছে নিজের ছন্দে। তার তো কোন ঘাটে সাথেই মনোমালিন্য নেই, সব ঘাটে ছন্দই তার শরীরে সুর তোলে। এপার-ওপার দুপার এর গল্পই তার জানা। ঝুপসি ছায়ায় অভিমানী গল্পগুলো দোল খায় ঢেউয়ে৷
জিয়া চুপ করে চেয়ে থাকে ভাসতে থাকা ছায়ার দিকে। ও পাশের গাঁয়ের মন্দির থেকে ভেসে আসছে শাঁখের আওয়াজ, মনে পড়ে যায় এই সেদিনও শিবুর হাত ধরে একছুট্টে ওই মন্দিরের আরতিতে পৌঁছানোর কথা। তার মেলে দেওয়া হাতের পাতায় পুজোর শেষে ঠাকুরমশাই আলগোছে প্রসাদ দিলেও চোখে প্রশ্রয়ের হাসিটুকুই তার পাওনা। কোনদিন না গেলেও শুনতে হতো,”কিরে জিয়া কাল আসিস নিজে যে বড়ো?” জিয়াদের গ্রামটায় চাষী পরিবারই বেশি। আবার নিজের জমি ও নেই সবার। তুলনায় শিবুদের গ্রাম বর্ধিষ্ণু। বিঘের পর বিঘে জমির মালিকরা চাষ করায় এ গ্রামের ভাগচাষীদের দিয়ে। ও গ্রামে বড় হাট বসে —সপ্তাহান্তে, গৃহস্থালির জিনিস থেকে যাবতীয় সবকিছুর জমজমাট হাট৷ তখন সবাই ভুলে যায় তাদের বসতিকে আলাদা করেছে ওই চঞ্চল নদীটা। নদীটার চোখরাঙানিকে অগ্রাহ্য করতো সবাই কত সহজেই।
কিন্তু বলে না নদী যেমন অভিমান বয়ে নিয়ে যায়, যেমন দুঃখকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সমুদ্রের নোনা জলে মিশিয়ে দেওয়ার জন্য, তেমনি সুখের দিনগুলোও ভাসিয়ে নেয় অবলীলায়।
তেমনি একদিনে এপাড় ও পাড়ের গল্প যতি চিহ্নের মধ্যে থমকে যায়। যে দুটো গ্রাম কোনদিন নিজেদের বিচ্ছিন্ন বলে ভাবেনি, নদীর স্রোতে বয়ে আসা কচুরিপানার মত হিন্দু-মুসলিম বিভেদ কি করে যে মাথা চাড়া দিল জিয়া বোঝে না আজও। তার আকাশের মত সরল মনে এই বিভেদ বোঝার মতো মেঘও জমেনি, তবু সে দেখল কিভাবে নদী সীমানা ঠিক করে দেয়।
চৌধুরীজেঠু মানে শিবুর বাবা আদর করে ওকে ডাকতো “জিয়ারানি”। পালাপার্বণে শিবুর জন্য নতুন জামা যেমন আসতো তেমনি ওর জন্যও নতুন ফ্রক বরাদ্দ ছিল। কতদিন হয়েছে সত্যনারায়ণ পুজোর জন্য জিয়া নিজের হাতে মালা গেঁথেছে, প্রসাদের শিন্নি খেতে ভক্তি কিছুমাত্র কম পড়েনি। মুসলমানের মেয়ে বলে ওকে অচ্ছ্যুত করে রাখেনি কেউ। উল্টে জেঠিমা বলতো, “জিয়া সোনার গাঁথা মালা ছাড়া পুজো যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়।” আবার মহরমের শোভাযাত্রায় সবার আগে দেখা যেত শিবুকে। এ নিয়ে কেউ কোনোদিন প্রশ্ন তোলেনি বা বলা ভাল কারো মনেও আসেনি। দুটি গ্রামের যোগসূত্র যেন এ দুটি ফুলের মত জীবন। কিন্তু নীল আকাশের বুকেও মেঘ জমে ঈশানকোণে, ক্রমে ক্রমে ঢেকে দেয় গোটা আকাশ। কৈশোরে গণ্ডি পার করে যৌবনের পদধ্বনি এই দুটি প্রাণে যখন আহির ভৈরবের সুর তুলেছে, তখন কিছু ধর্মান্ধ মানুষের চোখে তা কাঁটার মতো বিঁধলো। সমাজে মনে হয় এই শ্রেণীর কিছু সুবিধাবাদী মানুষরা চিরকাল থাকে যারা বহতা ধারায় পাথর ছোঁড়ে, সবুজ বনের ঝরাপাতায় লাগায় দাবানলের ছোঁয়া। এখানেও তার ব্যতিক্রম হল না। ধিকিধিকি তুষের আগুন জ্বলে উঠলো যেদিন শিবু মানত বটতলার সুতো খুলে জিয়ার হাতে বেঁধে দিল। সাত গাঁয়ের মধ্যেই এই বটগাছ খুব জাগ্রত, এখানে সবাই ডালে সুতো বেঁধে মানত করে যায়, আবার মনস্কামনা পূর্ণ হলে সেখানে পুজো দেয়। তাই এই বটগাছ বিশ্বাস অবিশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে একটা জায়গায় যেন আছে। সেই বটতলার সুতো শিবু জিয়ার হাতে বেঁধে দিতে তথাকথিত ধর্মের ধ্বজাধারীরা রে-রে করে উঠল। তার রেশ লাগলো জিয়ার গ্রামেও। বেশকিছু গোঁড়া লোক নিদান দিলো এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে দুজনকে।
কিছু স্বার্থান্বেষী লোকের অঙ্গুলিহেলনে সেই আগুন হু-হু করে ছড়িয়ে পড়লো দু’টি গ্রামে।
আজও নদী বয়ে যায় সেই ভাবে। শুধু ভাঙা সাঁকোর শেষপ্রান্তে লেগে থাকে একটুকরো ঝুপসি অতীত। আজও আজানের সুর ভেসে শাঁখের আওয়াজ এর সাথে মিশে যায়। ঢেউ এপাড় ছুঁয়ে কথার প্রদীপ ভাসিয়ে নেয় ও পাড়ের জলে ডোবা সিঁড়ির শেষ ধাপে। শুধু সেই গল্পদের শোনার লোকগুলোই আজ হারিয়ে গেছে।