আলব্রুশ ফ্রেম, কাঁচের উপর জমতে থাকে বিন্দু বিন্দু জল। একটু পরে গড়িয়ে গেলো শ্যামল বাবুর চশমার কার্ণিশ ঘেঁষে। ঝাপসা স্মৃতির মতোই দৃশ্যপট। বয়সের রেলগাড়ী ৬৮ তম স্টেশন পেরিয়ে গেছে কদিন আগেই। বৃষ্টিস্নাত জৈষ্ঠ্যের দুপুরে কাক ভেজা হয়ে হাঁটতে থাকে আনমনে। এমন আবহাওয়ায় এই অজ পাড়াগাঁয়ে দু’চরণই একমাত্র ভরসা। কিন্তু নির্জন পল্লীর কাদামাখা পথ। যেখানে প্রহরীর মতো পাহারা দিচ্ছে মস্ত সব গাছ। হঠাৎ পিছলে গিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন শ্যামল বাবু। বুক পকেট থেকে একটি চিঠি ব্যাগে চালান করে দিলেন সন্তর্পণে। ত্রিবক্র রাস্তার বাঁকে চেনা আশৈশবের পথ মাড়ালেন বছর পঞ্চাশেক পরে।
সেখানকার কাঠের পুল এখনো আছে তবে বয়সের ভারে জরাজীর্ণ।
আনমনে পুলের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকে সে। শৈশব- কৈশোরের কত স্মৃতি এসে ডানা মেলতে শুরু করে। ওপারেই তো মেধাবী,যোতিনদের বাড়ী ছিলো তাই না! হ্যা তাইতো সব ঠিকই আছে। যেন পুরানো ছবিতে একটু রঙ করা। মন্ত্র মুগ্ধের মতো পা চালিয়ে দেয় পুলের উপর।
– বাবু পোলের ওপর দে এখন যাবেন না। বিপদ হতি পারে কলাম। তীঘ্ন স্বরে নদী থেকে এক জন চেঁচিয়ে উঠলো।
চমকে গিয়ে চোখ গিয়ে পড়লো খালের মধ্য ছোট্টো ডিঙি নৌকার উপর। শীর্ণ দীর্ঘাকার শরীর, চোখ কোটরের ভিতরে ঢুকানো এক ব্যাক্তি জাল ফেলছে।
-নৌকায় উঠি আসেন। কোন বাড়ী যাবেন কন।আমি এগিয়ে দিচ্ছি।
-আচ্ছা এখানে যোতিন বাগচী থাকতো না?
চোখ চকচক করে ওঠে লোকটির।
-যোতিন দাদা আপনার কে হন?
-আমি যোতিনের বন্ধু। মেধাবীর মামাতো ভাই। আমার নাম…
-শ্যামলদাদা! এদ্দিন পর মনে পড়লো আমাগো কথা? মাধবীদিদিরা চলে যাবার পর আর তো তোমরা চরণ ধুলো দেউনি এদিকি।
– হ্যাঁ আর সময় হয়ে উঠিনি। কিন্তু তুমি কে?
– আমি সুবল গো দাদা(এক গাল হেসে জবাব দেয় সে)
– আরে তুই সুবল! ছিলিস তো এতটুকুনি। আর এখন দেখছি আমার থেকেও বুড়ো হয়ে গেছিস রে। যাক কদ্দিন পরে দেখা। তার পর বল বাড়ীতে সবাই কেমন আছেন?
ভালো সংক্ষিপ্ত জবাব দেয় সুবল। মাছ ধরার বিভিন্ন ফাঁদ তার নৌকায়। বর্ষার জলে এ অঞ্চলে মাছের ছড়াছড়ি। সব মাছ ডিম ছাড়ার জন্য বিলে, খালে উঠে যায়। তখন বিভিন্ন সনাতনী পদ্ধতিতে মাছধরা এখানকার ঐতিহ্য।
-তুমি নৌকা উঠে আসো। যাতি যতি কথা হবে।
নৌকায় উঠতে গিয়ে অনভ্যস্ত জনিত কারণে পড়েগিয়ে একটু ব্যাথা পেলেন শ্যামল বাবু। বৃষ্টি এবং বাতাসের বেগ বেড়ে চললো। খুব ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করলো । ব্যাগ থেকে এবার ছাতা আর শুকনো গামছা বের করে মুছে নিলেন শরীর। শার্টটাও পরিবর্তন করে নিলেন। এবার একটু আরাম বোধ হচ্ছে তার।
নদী পেরিয়ে নৌকা ছোট্টো খালটিতে প্রবেশ করলো। দুদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ জলে থৈ থৈ করছে। কতকগুলো কিশোর বর্শা দিয়ে মাছ ধরছে।
-তোমার মনে আছে দাদা এই ভাবে কত্তো মাছ ধরিছি।
-হ্যা রে সব মনে আছে। মনে হয় এইতো সেদিনের কথা। আমি আর যোতিন বিলের জলে নৌকা করে ঘুরে বেড়িয়েছি, মাছ ধরেছি সেসব কি ভোলা যায়? তুই ছোটো ছিলিস তাই আমরা তোকে নিতে চাইতাম না।
– হ্যাগো দাদা কান্নাকাটি কইরে যাতি হতো।
যোতিনের কথা উঠতেই ও কেমন অানমনা হয়ে পড়ছে। আরো বার দুই যোতিনের কথা উঠলেও ঠিক জবাব দিলো না। মনের ভীতরটা কেমন সাঁই করে উঠলো। বাইরের প্রচণ্ড সেই ঠাণ্ডা যেন হঠাৎ ভীতরে জমা হতে শুরু করেছে। যতই যোতিনদের তাল, নারকেল গাছগুলো স্পষ্ট হতে থাকলো ততোই মন অবসন্ন হতে থাকলো। একটা অজানা ভয় তাড়া করতে লাগলো। মনটা পালাতে চাইছে বোধ হয়। মনের উজানে প্রাণপণে আটকে দিতে চাইছে নৌকার গতি।