সেই সুবর্ণবর্ণ রৌদ্রকিরণ সহ্যাদ্রীর প্রতিটি বৃক্ষ লতায় যেন নতুন প্রাণের স্পর্শ এনে দিল, প্রতিটি পত্রপুষ্পপল্লব যেন সেই নতুন সূর্যালোকে অবগাহন করে উঠল। গহন বনের ভিতর থেকে ভেসে এল হরিনের ডাক, সেই উল্লসিত আনন্দধ্বনি সমস্ত বনাঞ্চল জুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে হতে বৃষ্টিভেজা সহ্যাদ্রীর ঢাল বেয়ে গড়িয়ে গেল নিচের উপত্যকায়, বিঠঠল আমার দিকে ফিরে বলল “পাউস সাম্পলা।” বৃষ্টি শেষ হলো।আর ঠিক তখনই গ্রামের শেষ প্রান্তে তুলজা ভবানীর মন্দির থেকে ভেসে এলো ঘন্টাধ্বনি, বুঝলাম, পুজারী মন্দিরে পুজো দিতে এসেছেন।
পনেরো দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পর মেঘের পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসা সেই সূর্যের দিকে তাকালাম। মনে হল যেন সূদীর্ঘ তমসাচ্ছন্ন রাত্রি ভেদ করে সেই সূর্য পৃথিবীর সমস্ত সন্তাপ হরণ করতে উদিত হয়েছেন, সেই অযুগ্মবাহ আদিত্যের মতো অবিস্মরণীয় নয়নমনোহর রূপ এই পরিদৃশ্যমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোত্থাও নেই।
আমরা সামনের উন্মুক্ত অপেক্ষাকৃত উঁচু জমির উপর উঠে দাঁড়ালাম, নীরার ওপর সেই কাঠের ব্রীজ তখনও জলমগ্ন, ডান দিকে একটু দূরের পাহাড়ে চোখে পড়ল হরিনের দল। সুবিস্তৃত শৃঙ্গসমন্বীত এক বিরাটাকৃতি পুরুষ হরিন আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকানো মাত্র সমস্ত দলটা ঝড়ের বেগে উধাও হয়ে নেমে গেল পাহাড়ের অপর প্রান্তের ঢালে।বিঠঠল বলে উঠল, “হো সর্দার আহে।”
ততক্ষণে সমস্ত বনের অভ্যন্তরে যেন সাড়া পরে গেছে, প্রতিটা প্রানীই যেন পুরনো জীর্ণ বছরের শেষে মানুষ যেভাবে নববর্ষের আনন্দে মেতে ওঠে, সেইভাবে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে।সেই অরূনবর্ণ প্রভাত, পনেরো দিন ব্যাপী সেই ভয়ঙ্কর দূর্যোগের পর বৃষ্টিস্নাত সহ্যাদ্রীর দূর্গম উপত্যকা জুড়ে যেন বর্ষবরণের আনন্দকে আত্মসাৎ করে প্রতিভাত হয়ে উঠল।
আমরা টিলার ওপর থেকে নেমে এলাম, বিঠঠল ঘরে ঢুকে বলল, “পাউস সাম্পলা, পন হো পুল বর্তি পানী নাহি নিচে আইছে তো বড়ি মুশকিল আহে।” বৃষ্টি থেমে গেল, কিন্তু নীরার ওপর ওই ব্রীজ থেকে জল না নেমে গেলে সমূহ বিপদ। ওই ব্রীজের ওপর থেকে জল না নেমে গেলে এই দূর্গম বনের ভেতর মানুষকে শুধু শিকার আর বনের ফলমূলের ওপরেই নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হবে। কারন ওই ব্রীজ না পার না হলে এই গভীর বন থেকে বাইরে বেরোনোর আর কোন পথ নেই।”