T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় অর্ঘ্য রায় চৌধুরী

বড়কাকু আর একটা ঘুড়ির ঘটনা
রাজবাড়ির পাশেই ছিল নহবৎখানা, তার ঠিক পাশেই আমাদের ভলিবল খেলার মাঠ। রোজ বিকেলে ঝালবড়া বাজি রেখে ভলিবল খেলা হতো।মুকুন্দ বিকেল বেলায় ওখানে ঝালবড়া বানাতো।ভালো করে হাত ধুতো না বলে এলিট ক্লাস ও মহিলারা ওই ঝালবড়া এক কোটি টাকা দিলেও এবং গিলোটিনে শিরোচ্ছেদের ভয় দেখালেও খেতো না, তাই তার যে কী অমৃতপম স্বাদ তাও কোনোদিন তারা জানলো না। আমরা গোগ্রাসে গিলতাম ও এখন এই বয়েসে পৌঁছে স্মৃতিচারণ করার সময় মনে পড়ে ওই স্বাদ জীবনে আর কখনও পাইনি।
ওই মাঠের একপাশে ছিল বিরাট একটা অশ্বত্থ গাছ।গাছটা এতই বড় ছিলো যে তার মগডালে উঠলে বহরমপুর শহরটা ওব্দি চোখে পড়ত। ওইরকম বিশালকায় বৃক্ষও আজ ওব্দি আমার চোখে পড়েনি।
সে সময় আমরা ভয়ংকর ঘুড়ি ওড়াতাম। নানা ধরনের আর নানা রঙের ঘুড়ি ছিলো। কবরখানার পাশের মাঠে প্যাঁচ খেলা হতো। প্যাঁচ ও মাঞ্জার সেইসব টেকনিক এখন লুপ্ত হয়ে গেছে। বিপক্ষের ঘুড়ি কেটে শুধু আকাশে উড়িয়ে দেওয়াই না, সেই ঘুড়িকে নিজের ঘুড়ির সুতোয় জড়িয়ে মাটিতে নামিয়ে আনার কৌশল তখনকার গ্রামের ছেলেপুলেরা প্রায় সবাই জানত। এখন বোধহয় আর পারবো না। শহুরে জীবনে বহুকাল ঘুড়ি ওড়াইনি।
আমি তখন ক্লাস সেভেনে, বাড়িতে দোর্দণ্ডপ্রতাপ বড়কাকু এসে আছে। অতএব আমাদের ভাইবোনদের লেজটা গুটিয়েই আছে। সর্বপ্রকার স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। সকাল সন্ধে নিয়ম করে পড়তে বসা হচ্ছে। আর ওই পড়া শৌখিন মনে মনে পড়া না, জোরে জোরে পড়তে হবে যাতে বড়কাকু বাড়ির যেখানেই থাকুক না কেন তার কান ওবধি পৌঁছায়। পড়াশোনা শেষে বড়কাকুর কাছে পড়া মুখস্থ দিয়ে তারপর ছুটি। না হলে সারা রাত ব্যাপারটা চলবে। বড়কাকুও রাত জেগে বই পড়বে আর আমাদের মধ্যে যার মুখস্থ হয়নি তাকেও জেগে থেকে পড়াটা মুখস্থ বলে তারপর শুতে যেতে হবে। ছুটির দিন দুপুরে আমাদের ঘুমটাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যাতে সন্ধ্যায় পড়তে বসে ঘুমে ঢুলে না পরি। ফলশ্রুতিস্বরূপ দুপুরে রাজবাড়ি আর নবাববাড়ির আমবাগানে আমার রবীনহুড সাজা বন্ধ। সে এক ভয়ংকর প্রাণান্তকর অবস্হা। মনে মনে আমরা বিশেষ করে ভাইরা বড়কাকুর মুণ্ডপাত করছি। মেজদা এর মধ্যে কালীমন্দিরে বড়কাকুর মৃত্যুকামনা করে বেশ কবার পুজোও দিয়ে এসেছে।কিন্তু কোন লাভ হয়নি দেখে তীব্র অভিমানে পৈতে টৈতে খুলে ফেলে প্রায় নাস্তিক হবার যোগাড় হয়েছিল, সেটাও আবার জ্যাঠার চোখে পরে যাওয়াতে পিঠে একটা আস্ত লাঠি ভাঙ্গার পর, আবার গলায় পৈতে জড়িয়ে প্রবল অনিচ্ছাসহ ত্রিসন্ধ্যায় মন দিয়েছে।
এমন সময় আমাদের ভাইদের কাছে একটা সুখবর এল। রোববার বড়কাকু সকালে বহরমপুরে কী একটা কাজে যাবে। সেদিন আর ফিরবে না।খবরটা শুনে মেজদা খুশিতে আমাদের সবাইকে ধারদেনা করে তিনটে করে মুকুন্দর ঝালবড়া খাইয়ে দিয়েছিল। সবাই অনেকদিন পর রোববার একটা গোটা দিন কে কিভাবে স্বাধীনতা সেলিব্রেট করবে তার প্ল্যান করে ফেলেছে। আমিও প্ল্যান করেছি সকালবেলা ছোটকাকু বেরিয়ে গেলেই আমিও ঘুড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাব। তারপর সারাদিন মনের আনন্দে ঘুড়ি উড়িয়ে দুপুরে ভাগীরথীতে দাপাদাপি করে বাড়িতে ঢুকব। খেয়ে উঠে আবার বেরিয়ে যাবো। সেই বিশেষ দিনটার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে।
দেখতে দেখতে সেই বহু প্রতিক্ষিত রোববারটা এসেও গেল। বড়কাকু বেরিয়ে যেতেই আমরা সমস্বরে হুররে বলে চিৎকার করে উঠলাম। মেজদা খানিক নেচেও নিল। তারপর কে যে কোনদিকে ছিটকে গেল কেউ জানে না। আমি পূর্বপরিকল্পনা মত ঘুড়ি নিয়ে নহবৎখানার মাঠে এসে দেখি ওই বিরাট অশ্বত্থগাছটার প্রায় মগডালে একটা অপূর্ব চাঁদিয়াল কোনোভাবে এসে লটকে আছে। যেন আমার জন্যই এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল। ভাগ্যিস আর কেউ দেখেনি! নইলে আমার ভাগ্যে এটা আর জুটত না।পত্রপাঠ আমি জামা খুলে আমার ঘুড়ি লাটাই সবশুদ্ধু গাছের গুঁড়িতে একটা কোটরে রেখে গাছে উঠতে শুরু করলাম। গ্রামের ছেলে হওয়াতে গাছ বাইতে ভালোই পারতাম।
সে এক বিশাল গাছ, উঠছি তো উঠছিই, মগডালে আর পৌঁছাতে পারছি না, উঠেই চলেছি। অবশেষে একসময় মগডালে পৌঁছে গেলাম। একটু থেমে ভাল করে দম নিয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, ওই দূরে দেখা যাচ্ছে হাজারদুয়ারি, তারওপরে বহরমপুর শহর। এদিকে রাজবাড়ি, নবাববাড়ি, জগৎশেঠের বাড়ি সব পুতুলের ঘরের মত ছোট ছোট লাগছে।
এভাবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে একটু কসরৎ করে ঘুড়িটা হাতে পেয়ে গেলাম। সবসময়ই উঠতে যতটা সময় লাগে নামতে তার থেকে অনেক কম সময় লাগে। ঘুড়িটা হাতে পেয়ে তরতর করে নেমে এসেই যা দেখলাম, সেটা দেখে আবার গাছে উঠে পড়ছিলাম। দেখি বড়কাকু, হাতে একটা ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বড়কাকুই দৌড়ে এসে আমাকে আবার গাছ থেকে নামালো। তারপর ওখানেই গোটাকতক ছাতার বাড়ি! ঘুড়িটা বাজেয়াপ্ত হল। তারপর কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে বাড়ি। বাকি দাদাদেরও একই রকম অভ্যর্থনা জুটেছিল।
ব্যাপারটা পরে জানা গেছিল, বড়কাকু সেদিন মাঝপথ থেকে ফিরে এসেছিল। কারন যার সঙ্গে দেখা করতে বহরমপুর যাচ্ছিল তার সঙ্গে রাস্তাতেই দেখা হয়ে গেছিল। কিন্তু তারপর সেদিনই আমাদের বিপদ কেটে যায়, কারন দুপুরে একটা চিঠি আসাতে বড়কাকুকে রাতের ট্রেন ধরে সেদিনই তিনমাসের জন্যে কলকাতা চলে যেতে হয়েছিল। আর আমরাও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম।