গল্পেরা জোনাকি -তে অনন্যা রায় মুখার্জী

ফিরে ফিরে

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই সমুদ্রের আকর্ষণে বেলা বেরিয়ে পড়ে৷এই এক নেশা ওর৷ আলো ফোটার আগেই সমুদ্রের ছোঁয়া নেওয়া, বিশেষত আজকের দিনে৷ আজ দশ বছর এই নিয়মের কোন হেরফের হয় না৷ ওর এই সমুদ্রের প্রতি টানের জন্য ছেলের মনে বড্ড অভিমান।একসময় সমুদ্রের ধারে বসে বালি দিয়ে ঘর বানানো ছিল বিহানের নেশা৷ভাঙা ঢেউতে সে ঘর ভেঙে গেলে ছেলের কি দুঃখ৷ তখন বাবা বলতো “নে এবার তৈরি কর৷ আমি বাঁধ দিয়ে দিচ্ছি আর সমুদ্র ভাঙতে পারবে না তোর ঘর”৷চোখের জল মুছে আবার নতুন করে গড়তে বসতো বিহান৷কিন্তু সে বাঁধও বালির তৈরি ছিলো তা বিহান বোঝে নি।
দিলীপ আর বেলার মধ্যবিত্ত তেল ঝালের সংসারে সুখ কিছু কম ছিলো না৷ বিহান ওদের জীবনে ভোরের আলোর মতোই ছিলো৷ সীমিত ক্ষমতায় প্রতিদিনের চাহিদা পূরণের পর আর কিছু চাওয়াও বিলাসিতা ছিলো বেলার কাছে৷ তারমধ্যেও মুখের হাসিটুকুই ছিলো ওর সম্পদ৷ ছোটছোট খুশিতেই সুখ ভরে নিতো লক্ষীভাঁড়ে।

বিয়ের চার বছর পর যখন দিলীপ সমুদ্রের কাছে নিয়ে এলো তখন প্রথম দেখাতেই বেলা নীলের টানে হারিয়ে ফেলল নিজেকে৷ঝিনুক ভরে কোল আঁচলে – মুক্তো খোঁজে মুহূর্তে৷ সমুদ্রই যে ওর ভবিতব্য লিখবে বেলা বোঝে নি।
ঢেউ ছুঁয়ে ভোরের আলোর সাথে বেলা নিজেকে হারিয়ে ফেলে দশবছর আগে ফেলে আসা আজকের দিনে।সেদিন বেশ রোদ চঞ্চল দিন ছিলো৷ চারদিন সমুদ্রের কাছে কাটানোর পর ফিরে আসার দিন চলে এলো৷ সেদিন বিকেলের ট্রেনেই ফেরা৷ তিনজনেরই খুব মনখারাপ৷ ছুটি ফুরিয়েছে- ডাকছে আবার ঘরের কোণ— নিয়ম রুটিন। বিহানের বায়নায় সেদিন ভোর থেকেইওরা সমুদ্রের কাছে। শেষবারের মতো লুটোপুটি খাচ্ছে বালিতে৷ দিলীপের হাত ধরে নিবিড় হয়ে বসে বেলা ভাবছে এই চারদিনে যেন ও চারজন্ম কাটিয়ে ফেললো। প্রতিদিনের টানাপোড়েনে অনেক সূক্ষ্ম অনুভূতি হারিয়ে যায়৷ এই নিয়মবিহীন খোলা হাওয়ায় যেন ওদের সম্পর্ক নতুন হয়ে ধরা দিলো৷ ওর মনের ভাব যেন দিলীপের মনেও ছড়িয়ে গেলো৷ হাতের মুঠোয় বেলার হাত চেপে ফিসফিস করে বলল ” ভালবাসি —ঢেউএর মতোই আমি তোমার বুকে মিশিয়ে দেব আমায়, বারবার”।
কতক্ষণ ওভাবে বসেছিলো খেয়াল নেই। বিহানের বায়নায় ঘোর ভাঙলো দুজনের৷ “বাবা চান করবো ” – ওর আবদারে চান করতে নামলো সবাই। ওদের পাড়ের কাছে চান করতে বলে দিলীপ এগিয়ে গেলো আরও গভীরের দিকে৷ ঢেউএর সাথে ওঠাপড়া লুকোচুরি দেখে ছোট্ট বিহান হাততালি দিয়ে ওঠে৷ ওর মজা দেখে আরও গভীরে যাওয়ার নেশায় এগোতে থাকে দিলীপ বেলার ডাক অগ্রাহ্য করেও৷ একটা বড় ঢেউ তীরে ভাঙলে বেলা আর দিলীপকে দেখতে পায় না৷ ওর চিৎকারে কিছু স্থানীয় মানুষ ও নুলিয়া জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ কিন্তু সবার খোঁজা বৃথা৷
শুনেছিলো সমুদ্র না কি কিছুই নেয় না —ফিরিয়ে দেয়৷ সেই আশা বুকে বেলা বারবার সমুদ্রের কাছে ফিরে আসে, সমুদ্রের হাওয়ায় দিলীপের গন্ধ ভাসে৷আজও বেলা ঢেউএর শব্দে শোনে “ভালবাসি”।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।