ক্যাফে গল্পে অজন্তাপ্রবাহিতা (শেষ পর্ব)

নাড়ির টান
১৭ জুন রাত থেকেই কেমন শরীর খারাপ করছিলো তমশ্রীর । মাত্র আট মাস হয়েছে হিস্টেরেক্টমি অপারেশন হয়েছে। হটাৎই অল্প অল্প ব্লিডিং শুরু হওয়াতে কেমন দুর্বল লাগছিলো শরীরটা। ডক্টর শান্তলাকে একবার কল করতেই বললেন,আর দেরি না করে একটা ইন্টারনাল আল্ট্রা সাউন্ড করিয়ে যাও। রিস্ক নিও না। রাতে পুলককে কথাটা বলার পরেও খুব বেশি গুরুত্ব দেয় নি ও।
তপোবনকে বলতেই লাফিয়ে উঠে বলে,’মা ! আমি নিয়ে যাবো। ‘
সেদিন পুলকের বলাতেই উর্মিলাকে ছুটি দিয়েছিলো তমশ্রী। ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম করবে। যখন বাড়িতে মা, ছেলে থাকবেই না ,তাহলে হেল্পার কিসের জন্য। আর এমনিতেও এইসময় আউট সাইডার যত কম আসে, তত ভালো।
বিনা বাক্য ব্যয়ে তমশ্রীও মেনে নিয়েছিল সেই কথা।
সকাল নয়টা বাজতে না বাজতেই হাসপাতাল পৌঁছে গেছিলো। সব টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে চেকআপ করাতে গিয়ে পুরো দিনই লেগে গেলো।
অল্প কিছু শুকনো খাবার সাথে নিয়ে গেছিলো। সারা দিন প্রায় অনাহারেই গেছে। তপোবন চকলেট আর জল খাচ্ছিলো।ছেলের কান্ড দেখে তমশ্রী মনে মনে হাসছিলো, এতো বড় হয়েছে,এখনো চকোলেটের নেশা কাটে নি।
ডক্টর সব রিপোর্ট দেখে বললেন, স্ট্রেস নিও না। আর ভারী কাজ বেশি করো না। ল্যাপ্রোস্কোপিতে চামড়ার ওপরে মাত্র চারটে সেলাই থাকলেও ভেতরে কিন্তু অগুনতি সেলাই করা হয় । সেগুলো শুকোতে সময় লাগে। তাই মন ভালো রাখা খুব প্রয়োজন। মনের ওপর চাপ পড়লেই মাসলে স্ট্রেন পড়বে। ব্যাথা,বেদনা, ইন্টারনাল ব্লিডিং হবে। সো বি কেয়ারফুল। খুব মিনিমাম ওষুধ লিখলেন।
হাসপাতাল থেকে ওষুধ কিনে বাড়ি ফেরার পথে একটা ছোট্ট কেক আর কিছু মিষ্টি প্যাক করিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। কমপ্লেক্সের গেটে যখন পৌছালো তখন ঘড়ির কাঁটা চারটে থেকে নেবে সাড়ে চারটে ছুঁই ছুঁই করছে।
ওদের গাড়ি এন্ট্রি গেটে ঢুকতে যাবে,সিকিউরিটি গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললো, পার্সেল আছে,সই করে নিয়ে যান।
তমশ্রী গাড়ি থেকে নেবে সিকিউরিটি অফিসের দিকে পা বাড়ালো, আর তপোবন পার্কিঙের জন্য এগিয়ে গেলো।
হটাৎ পাশ দিয়ে একটা সুন্দর লাল Brio পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে তমশ্রী তাকালো । নতুন গাড়ি। কমপ্লেক্সে এই গাড়ি দেখিনিতো আগে। ড্রাইভার সিটে ছিলেন এক সুন্দরী মহিলা চোখে বড় সানগ্লাস থাকার দরুণ চেহারাটা ভালো বোঝা গেলো না।
ওর চোখে উঠে আসা প্রশ্ন সিকিউরিটি গার্ডের চোখে ধরা পরে।
উনি পার্সেলের প্যাকেটটা ধরাতে ধরাতে বলেন, ‘ম্যাডাম ! ইনি আপনাদের গেস্ট। সকালে এসেছিলেন, স্যার এর ক্লায়েন্ট বলে নাম লিখিয়েছিলেন। হাতে অনেক বড় ফুলের তোড়া ছিল।’
কি মনে হওয়াতে তমশ্রী একবার ভিসিটর্স এন্ট্রি খাতাটা দেখলো। নাম – শর্মিষ্ঠা দত্ত গুপ্ত। পারপাস – অফিসিয়াল।
ফোন নম্বরটা -নাইন এইট জিরো জিরো ফোর সেভেন টু থ্রী ফোর ফোর।
কি মনে করে নম্বরটা নিজের ফোন থেকে ডায়াল করতেই বলে উঠলো, দা নম্বর ইউ হ্যাভ ডাইলড ইস ইনকরেক্ট। প্লিজ চেক দা নম্বর।
রেজিস্টারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবার দেখলো ,নাহ ! একদম ঠিক নম্বর তুলেছি। তাহলে ইনকরেক্ট বলছে
কেন ? কেন এসব ভাবছি ? ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছে যখন,নিশ্চয়ই অফিসের কলিগ হবে।নতুন জয়েন করেছে হয়তো। তাই আগে দেখি নি।
আজ এসেছিলো আমাদের উইশ করতে ইশশশ ……..আমি ছিলাম না তাই দেখা হলো না।
এবাবা ! আজ তো ফ্রীজে তেমন কিছুই রেখে যাই নি। পুলকের জন্য দু পিস্ মাছের ঝোল আর রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে গেছিলো। একরকম আত্মগ্লানি নিয়েই লিফটে ঢুকে টপ ফ্লোর নয়তলার বোতাম টিপলো। এই টপ ফ্লোরে থাকাটা এক্কেবারেই পুলকের ইচ্ছে। ওর বরাবরের ইচ্ছে আকাশে ওড়ার।
একটা ফ্লোরে দুটো ফ্ল্যাট। সামনের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুম্বাই নিবাসী। তাই ওই ফ্ল্যাটের দরজা সর্বদাই বন্ধ থাকে। পুরো ফ্লোরে ওরাই সর্বেসর্বা।
নির্দিষ্ট ফ্লোরে এসে লিফটের দরজা খুলে গেলো। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। ঘরে ঢুকতেই ডাইনিং টেবিলে বড় গোলাপের তোড়া চোখে পড়লো। এতো ফুলের সমাহার দেখে মনটা ভালো হয় গেলো।
তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে গা ধুয়ে ভালো একটা নাইটি পড়লো। লাল রঙের। গলার কাছে সুন্দর এম্ব্রডাইরি করা। আজকের দিনটার জন্যই বিশেষ করে রাখা ছিল। সেই কবেই অনলাইন অর্ডার করে আনিয়েছিলো।
তপোবন, বাবা মায়ের জন্য কেক, ক্যান্ডল, মিষ্টি সব সাজিয়ে রাখলো টেবিলে।
মজা করে মা কে জিজ্ঞেস করলো,’ও নতুন বৌ, তোমার বর কোই ?’
‘শুধু ফাজলামো, না ! দাঁড়া ! তোর বাবাকে বলছি।’
এর মধ্যে চুল আঁচড়ে,একটু হালকা ফাউন্ডেশন লাগিয়ে, ছোট্ট লাল টিপ্ আর সিঁদুরে নিজেকে যত্ন করে সাজিয়ে নিয়েছে তমশ্রী।
লিপস্টিক একদম পছন্দ নয় পুলকের তাই ও সর্বদাই কালার্ড ভ্যাসেলিন ঠোঁটে লাগায়।
এক আকাশ আনন্দ নিয়ে পুলকের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই মনে হলো আচ্ছা, বোকেতে দেখি তো কোনো কার্ড আছে কি না ?
টেবিলে রাখা বোকে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছুই চোখে পড়লো না। আবার ভালো করে দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো ফুলের মাঝে গোঁজা একটি ছোট্ট লাল চিরকুট। চিরকুটটা খুলে কেমন যেন চোখের সামনে আবছা হয়ে গেলো।
‘শুধু তোমার জন্য’
– শর্মী
কেমন যেন অসার হয়ে আসছিলো শরীরের ভেতরটা। দৌড়ে রান্না ঘরে গিয়ে দেখলো মাছের ঝোল, ভাত যেমন রেখে গিয়েছিলো তেমনি পরে আছে। ফ্রীজ খুলে দেখলো বেঁচে যাওয়া বিরিয়ানি ও চিকেন কষা দুটো ইউজ এন্ড থ্রো বাক্সে রাখা।ডাস্টবিনে গিয়ে দেখলো, চিকেনের হাড়।
কেমন যেন একটা ঘোর লেগে গেলো । ধীর পায়ে পুলকের ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে দরজাতে হাত রাখতেই দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে গেলো। পুলক বিছানার ওপর বসে আছে পা লম্বা করে। কানে ফোন। পরনে গ্রে কালারের শর্টস। আর গেঞ্জি। বিছানাটা কেমন অদ্ভুত ভাবে এলোমেলো হয়ে আছে। অথচ সকালে হাসপাতাল যাবার আগে ও নিজে হাতে পুলকের বিছানার চাদর চেঞ্জ করে টানটান করে গেছে।
চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসছিলো, মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিলো।
বহু যত্ন করে সাজানো ভালোবাসার প্রাসাদকে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যেতে দেখলো,তমশ্রী ।
কোনোদিন যে কাজ করে নি, ও আজ তাই করল। পুলকের কথা শোনার জন্য আড়ি পাতলো দরজায়।
আজ ওর গলার আওয়াজে অদ্ভুত সুখের সুর। মুখের প্রতিটা শব্দ পেলব।
অথচ এই পুলকই সকালে ওর কোনো কথার জবাব দিচ্ছিলো না ঠিক করে। যেন, ওর জীবনে তমশ্রীর কোনো গুরুত্বই নেই এমন ছিল ভাবে। ফোনের ওপাশের কথা শোনা সম্ভব নয়। শুধু ওর বলাই শুনতে পাচ্ছিলো।
মৃদু স্বরে পুলক বলছিলো ,
-‘পুরো তিনমাস অপেক্ষা করেছি আজকের দিনটার জন্য। আরে না ! না ! খাবার খুব ভালো ছিল। আর তুমিও। মনের মতো। কতদিন বাদে তোমায় কাছে পেলাম। তোমার মতো মহিলা,এতো নাম ডাক যার,সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত Councelor .
সে কি না আমার যত্ন করছে, আমার জন্য খাবার বানিয়ে এনেছে। আজ আমি ভীষণ স্যাটিসফায়েড ফীল করছি জানো। লাভ ইউ এ লট। তুমি না থাকলে আমার একাকিত্ব আমায় গ্রাস করে যেত। মানসিক ভাবে আমি স্ট্রং হতাম না।
না। না। একা থাকবো না।
দেখছি। রাতে ? তোমার নতুন ফ্ল্যাটে ?
ঠিক আছে। এড্রেস আর লোকেশন পাঠাও। আমি ঘন্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁচ্ছচ্ছি। আমার প্রিয় পিচ স্যাটিনের নাইট স্যুট খানা পরো। ওতে তোমায় যা দেখায় না। আমার সকল ইন্দ্রিয় সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমার পাঠানো কালার চেঞ্জ হওয়া ঝাড়বাতিটা ফিট করিয়েছিলে ? উফফ। নীল আলো। সেন্টেড ক্যান্ডল। ভালো স্কচ আর সাথে তুমি। আর ভাবতে পারছি না। বাকি দেখা হবার পরে।
কী রেড / হোয়াইট ? হোয়াইট ওয়াইন তো ? আচ্ছা ও দা ওয়ে পিক করে নেবো। আমার জন্য দেখছি, GLENFIDDICH
পাই কি না।
নইলে Johnnie Walker Black Label দিয়েই কাজ চালাতে হবে। করোনা কাল চলছে যে,আর কি করা যাবে। ওকে বেবি । সী ইউ দেয়ার।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তমশ্রী ঘামতে শুরু করলো, হাত পা কাঁপছে, কান গরম হয়ে যাচ্ছে । রাত্রি বেলা জন্মেছিলো তাই বাবা নাম রেখেছিলেন, তমশ্রী,বিউটি অফ নাইট ,রাতের সৌন্দর্য্য। সেই সৌন্দর্য্য যেন ধুলোয় মিশে গেলো এক লহমায় । পুলকের বলা এক একটা শব্দ যেন এক একটা বুলেট। সোজা হৃৎপিণ্ডে গিয়ে লাগছে এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাচ্ছে । অসহ্য যন্ত্রনা, ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে বুক। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে মাটিতে।
কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে দেয়াল ধরে ধরে নিঃশব্দে পা ফেলে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। পুলকের কথা গুলো কানে বেজে চলেছে।
বাইরে অন্ধকার নেবে আসছে। আজ ঘরের আলো জ্বালাবার একটু ইচ্ছে করলো না।
কিছুক্ষনের মধ্যেই পুলকের ডাক, ‘তমশ্রী ! আমার একটা জরুরি মিটিং কল এসেছে অফিস থেকে,আমি বেরোচ্ছি। রাতে অফিস গেস্ট হাউসে থেকে যাবো। সব প্রটেকশন নিয়ে নিয়েছি। আমার জন্য অপেক্ষা করো না। ‘
বাইরের দরজা বন্ধ হবার আওয়াজে বোঝা গেলো পুলক বেরিয়ে গেছে ।
তপোবন নিজের রুম থেকে দৌড়ে এলো,’মা ! বাবা কোথায় গেলো ?’
-অফিসের কাজে। রাতে ফিরবে না।
-সেকী ? আমরা যে এতো কিছু নিয়ে এলাম, সেলেব্রেট করবো বলে।
-ফ্রীজে রেখে দিবি সোনা ! আগামী কাল বাবা ফিরলে কেক কাটবো। বড্ডো ক্লান্ত লাগছে।
আমি একটু শুই।
– ধুর ! কি যে করো। বেশ তুমি একটু রেস্ট নাও। গজগজ করতে করতে তপোবন বলে।
আজ থেকে তিরিশ বছর আগে ঠিক এই দিনটাতেই গাঁটছড়ায় বাঁধা পড়েছিল তমশ্রী ও পুলক। একই য়ুনিভার্সিটিতে পড়তো দুজন।
তমশ্রী কেমেস্ট্রি নিয়ে পড়তো আর পুলক ব্যাচেলর অফ সোশ্যাল ওয়ার্ক।
পুলক খুব ভালো ফুটবল খেলতো। ইউনিভার্সিটি ম্যাচ ওকে ছাড়া ভাবাই যেত না।
হালকা চাপা গায়ের রং। মায়া মাখা দুচোখ । সেদিকে তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না। প্রায় ছয় ফিটের কাছে হাইট। প্রশস্ত কপাল। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। টিকোলো নাক, মাদকতায় ভরা ঠোঁট , দাঁতের সেটিংও খুব সুন্দর । ভুবনভোলানো হাসি। আর ছিল থুতনিতে একটা ছোট্ট টোল।
সেই টোলের গভীরে যে কত মেয়ে ডুবে মরেছে, তার কোনো গণনা নেই। পুলকও জানতো ও অন্যান্য ছেলেদের তুলনায় বেশ এট্রাক্টিভ ও স্মার্ট। প্রাচীন শাস্ত্রে উল্লেখ করা ষোলো কলার প্রায় সব কলাতেই পারদর্শী ছিল, তাই সব ব্যাপারেই ওর ডাক পড়তো।
থিয়েটার, গান, নাচ, গিটার,মাউথ অর্গান,মাছ ধরা ,ছবি আঁকা সব বিষয়ে দক্ষ। বাড়ির আর্থিক অবস্থাও অসম্ভব ভালো থাকায় সেই সময়ই ওর হাতে দামি বাইক ছিল। ব্র্যান্ডেড কাপড়, জুতো,ঘড়ি,বিদেশী পারফিউম,আফটার সেভ লোশন, সবই ছিল ওর কাছে। সিনিয়রদের ইন্টারভিউ থাকলে ওর থেকে ভালো শার্ট ধার করতো । বন্ধুদের জন্য ‘দিল দরিয়া’ পুলক সর্বদাই দলের মধ্যমণি ছিল।
কলেজে অনেক স্মার্ট আধুনিক মেয়ে থাকা সত্বেও শান্ত, সাধারণ, তমশ্রীকে পুলকের চোখে লেগেছিলো।
না ! না ! করতে করতে তমশ্রীও কেমন নিজের অজান্তে ওকে মন দিয়ে ফেলেছিলো। এক দুপুরে লাইব্রেরিতে ওর চোখে চোখ রেখেছিলো। সেই যে চোখের সমুদ্রে ডুবেছে ,আজও উঠতে পারে নি।
পাঁচ বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর ওদের বিয়ে হয়ে।
দিদিভাই ছিল বিয়ের হর্তা কর্তা। বছর দুইয়ের মধ্যেই কোল আলো করে তোড়া ও তপোবন এলো। ওরা পিঠোপিঠি ভাইবোন। দুজনেই সিজার বেবি। ফলে তমশ্রীর শরীরের দফারফা হয়ে গেলো। বাচ্চাদের মানুষ করতে গিয়ে ও নিজের দিকে তাকাবার সময় পায় নি।
এদিকে, পুলক ইউনিভার্সিটি পাশ করার আগেই ক্যাম্পাস সিলেকশনে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছিলো। ওর দক্ষতা ও চেহারা দিনে দিনে ফুটে উঠছিলো। নিজের প্রতি যত্নের কোনো খামতি ছিল না ওর। নিয়ম করে জিম ও যোগা করে পঞ্চাশেও টানটান চেহারা ও মেদহীন শরীরের অধিকারী ছিল।জন্মের নথিপত্র সন্ধান না করলে বেশ পঁয়ত্রিশ বলেই চালিয়ে দেয়া যেত ওকে।
এদিকে বিনা যত্নে তমশ্রীর চেহারার লাবণ্য হ্রাস পাচ্ছিলো।
কোথাও যেন তমশ্রীও টের পাচ্ছিলো মনে মনে, পুলক ওর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
প্রথমে, রাতে অফিসের কাজের অজুহাতে পুলক নিজের ঘর আলাদা করে নিলো।
বাচ্চাদের নিয়ে তমশ্রী অন্য ঘরে শুতো। সময়ের সাথে শ্বশুর শাশুড়ি গত হলেন। তোড়ার বিয়ে হয়ে গেলো। ওরাও বড় ফ্ল্যাটে শিফট হয়ে গেলো। কিন্তু দুজনের ঘর আলাদাই রইলো।
কাজের চাপে পুলকের নাওয়া খাওয়ার সময়টুকুও থাকে না। তাই দুজনের নিজস্ব সময়ের ব্যাপারটা এক্কেবারেই জীবন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছিলো। তমশ্রী বরাবরই ইন্ট্রোভার্ট। তাই মুখফুটে কিছু জানাতো না ওকে।অপেক্ষায় থাকতো, কবে পুলকের একটু সময় হবে।
তমশ্রী কেমেস্ট্রিতে ফার্স্টক্লাস নিয়ে মাস্টার্স পাশ করা সত্বেও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কখনো ভাবে নি। বরাবরই, দিদিভাইয়ের মতো সংসার করবো, এই ভেবে গেছে।
আজ যখন সংসারের দায়িত্ব ভার কমের দিকে এসেছে, ছেলেমেয়ে দুজনেই সেটলড।
তখন ও নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে, ওর কাছে কিছুই নেই।
নাই আছে শরীরের সেই লাবণ্য, নাই সেই কর্মক্ষমতা, নাই আছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।
‘তমশ্রীপুলক চ্যাটার্জি’ এই ভাবে নিজের নাম লিখতে খুব ভালোবাসতো।
আজ এই নামের থেকে ‘তমশ্রী’ কোথাও হারিয়ে গেছে।
এক মুহূর্ত লাগলোনা পুলকের, আজকের বিশেষ দিনের বৈশিষ্ট্যকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে শর্মিষ্ঠার সাথে রাত কাটাতে।
আকারে ইঙ্গিতে অনেক বার পুলক বোঝাবার চেষ্টা করেছে, এখন আর তমশ্রীর প্রতি ওর কোনো আকর্ষণ নেই। মুখের ওপর কয়েকবার বলেওছে, ‘আমি কোনো সক্রিয়তা অনুভব করি না, তোমায় দেখে’।
তমশ্রী কোনো প্রতিবাদ করে নি,নীরবে অপমান সহ্য করে গেছে। কুঁকড়ে গিয়েছে ভেতরে ভেতরে। নিজের ভালোলাগা গুলো মনেই পরে না আর। মনের বা শরীরের কোনো অনুভূতিই আর ওকে নাড়ায় না। ওরও যে আকাঙ্খা থাকতে পারে সে কথা কবেই বিস্মৃত। শেষ কবে পুলকের সাথে নিবিড় হয়েছিল,মনে নেই।