[ভূমিকা – প্রথমেই বলি আজকের গল্পের সব চরিত্র কাল্পনিক।
যদি কেউ নিজের সাথে কিছু মিল পান তাহলে সেটা সর্বথা কাকতালীয়। ]
শ্রাবন মাস । মাঝে মাঝেই অঝোরে ঝরছে আকাশ। দুদিন অক্লান্ত ভাবে ঝরার শেষে বিকেলের দিকে থামলো । মনে হচ্ছিলো, কত দুঃখ, কত বেদনা, সব জল ধারায় বয়ে যাবার পর শান্ত হলো আকাশ। গরমের ভাপ তেমন একটা গায়ে লাগছে না। এবছর দুর্গাপুরেও তেমন চাঁদি ফাটানো গরম বেশি দিনের জন্য পড়েছে বলে মনে পড়ছে না।
প্রায় দুদিন ধরে টানা ঝড় বৃষ্টি চলছিল ,থামবার নামই নেয় না। মেঘ ও আকাশ বহু দিনের মান অভিমানের হিসেব মিলিয়ে নিচ্ছিলো যেন।
হিসেব মিটলো কি না বোঝা গেলো না,কিন্তু কালো মেঘ যখন আকাশ থেকে একটু একটু করে সরে যাচ্ছে , তার ফাঁক দিয়ে বিদায় বেলার সূর্য্যের বিচ্ছুরিত রশ্মি যেন পৃথিবীকে বলছে , ‘এসেছিলেম, তোমার হয়তো মনে হবে, আসি নাই ,তাই জানায়ে গেলেম’। কাল ভোরে পৃথিবীর সাথে দেখা হবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিদায় নিচ্ছে সূর্য্য।
অনেক দিন বাদে আজ বিকেলের চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসে তমশ্রী রোদ মেঘের লুকোচুরি দেখছে। সূর্য্য ও পৃথিবীর পরস্পরের বলা, না-বলা কথা গুলো শুনবার চেষ্টা করছে। অনেক কথা মনের মাঝে উঁকি দিচ্ছে ,কিছু কষ্টের স্মৃতিতে চোখের কোলে জল আসছে ,আবার কখনো কোনো মধুর স্মৃতি ঠোঁটের কোন এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তুলছে।
টবের ফুল গাছ গুলো বৃষ্টিতে ভিজে তরতাজা হয় উঠেছে। পাতার শীষে বৃষ্টির শেষ বিন্দু জমা হয়ে আছে। একটু হাওয়ার দোলা লাগলেই টুপ্ করে পরে টবের মাটিতে মিশে যাবে। সপ্তাহের কারফিউ শেষে আজ ঊর্মিলাও কাজে আসছে । তাই একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবার সময় পাচ্ছে। নইলে, সেই মার্চ মাস থেকে শুরু হয়েছে বন্দি জীবন। এক মুঠো অক্সিজেনের অভাবে দম আটকে আসছে বারবার। এই একচিলতে বারান্দা টুকুই ভরসা। যেখানে বসে নিজের সাথে নিজের দেখা হয়।
হেল্পার না থাকায় বাড়ির যাবতীয় কাজ সামলাতে হিমশিম খেয়ে উঠছিলো তমশ্রী। পুলকের অফিস বাড়িতে উঠে এসেছে। সারাদিন মিটিং চলে। তাই ওর ঘরের দরজা বন্ধ। তপোবন মাত্র কলেজ সার্ভিস পাস্ করে চাকরি পেয়েছে। ও বাড়ি থেকেই ক্লাস নিচ্ছে। তোড়াও এই ক’মাসে একবারও বাপের বাড়ি আসতে পারে নি। শুধু ফোনে নালিশ করে গেছে, ‘মা ! আর পারছি না। সব ম্যানেজ করতে হচ্ছে একা হাতে, তার সাথে ওয়ার্ক ফ্রম হোম। হোম ডেলিভারিও বন্ধ। কি করে সামলাবো। সুদীপ্ত অনেক হেল্প করে দেয়, কিন্তু তাও, আমার তো সব দিকে নজর রাখতে হচ্ছে। ওমা ! কবে তোমার কাছে যাবো ? একটু বিশ্রাম দরকার আমার।
‘ভাগ্যে কোনো ছেলেপুলে নেই তোদের। নইলে আরো পাগল হতিস’ ,তমশ্রী বলে।
‘এখনতো ভুলেও ওই কথা উচ্চারণ করো না,মা।আগে নিজেদের মানুষ করি। তারপর নাহয় ভেবে দেখবো। ‘ তোড়ার উত্তর। আজকের যুগের মেয়ে। তাই খুব ভালো করে জানে,আগে নিজের ক্যারিয়ার,তারপর সব।
আজ থেকে বছর তিরিশ আগে যদি তমশ্রীও এইভাবে ভাবতো,তাহলে হয়তো জীবনের মধ্য গগনে এসে ছড়িয়ে যাওয়া খড়কুটো গুলো জড়ো করে নতুন করে নিজেকে নিয়ে ভাবতে হতো না। নদীর মতো জীবনের গতিপথও কেমন সময়ের সাথে অন্য বাঁক নেয়। আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।
আজ ২২ শে জুলাই। গতবছর এই দিনেই দিদিভাইয়ের সাথে দীঘা বেড়াতে গিয়েছিলো।
তমশ্রীর দিদি, বনশ্রী। ওর থেকে প্রায় নয় বছরের বড়। এখন পঞ্চান্নর উর্ধে বয়স। বোকারোতে থাকে। দিদি আর ও প্রায় একই রকম দেখতে। সাধারণ বাঙালি মেয়ের চেয়ে উচ্চতা একটু বেশি। ফর্সা গায়ের রং। বনশ্রীর এখনো কোমর ছাপানো চুল। আর তমশ্রীর ঘাড় অব্দি। বনশ্রী বরাবরই একটু স্লিম ট্রিম আর তমশ্রী ছোটবেলা থেকেই দুধেভাতে। বনশ্রীর কাছে ছোটবোন এক্কেবারে মেয়ের মতো।তাই মাঝে মাঝে দিদিকে ‘যশোদামা’ বলেও ডাকে। এখন দুজনেই জীবনের অনেকটা পার করে এগিয়ে গেছে,
তাই দিদি বোনের সম্পর্কটা এখন বন্ধুর মতো সহজ সরল হয়ে উঠেছে। বনশ্রী সর্বদাই বলে, ভাগ্যে বুনু ছিল আমার জীবনে। নইলে,জীবনের দুঃখ, কষ্ট ,ভালোলাগা,মন্দলাগা গুলো শেয়ার করার জন্য আরেকটা বন্ধু খুঁজতে হতো। আর তমশ্রীও ভাবে, দিদি না থাকলে জীবনটা না জানি কেমন হতো ?
COVID 19 এর কবলে পরে পৃথিবীর পুরো চেনা চিত্র গুলো হটাৎ করেই কেমন পাল্টে গেছে । কেমন যেন অচেনা মনে হয় সব কিছু। চেনা মানুষ গুলোও আজ অচেনা হয় পড়ছে। এই সব ভাবতে ভাবতে আকাশের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়েছিলো তমশ্রী। উর্মিলার ডাক শুনে ধাতস্থ হলো ,’
‘মাসি মোবাইল বাজে।’
-হ্যা। দে তো। দেখছি কার কল।
ও দিদিভাইয়ের ফোন।
ফোনটা তুলতেই সেই চেনা আদরের স্বরে শরীর ও মন ভালোলাগার চাদরে মুড়ে গেলো যেন।
-বুনু, আজ ২২শে জুলাই।
– হ্যা ! দিদিভাই।
-জানিস,সকাল থেকে মনে পড়ছিলো এই দিনটা। আমরা দুই বোনে দীঘা বেড়াতে গেছিলাম। কি সুন্দর ছিল বল, সেই দুটো দিন।
তুই দুর্গাপুর থেকে এলি, আমি এখান থেকে গেলাম। কত দিন বাদে তোকে কাছে পেয়েছিলাম।
তুই যখন বারোতে পা দিলি, আমার বিয়ে হয়ে গেলো। তারপর সময়ের জল গড়িয়ে গেলো। আমরা একসাথে সময় কাটাবার সময় টুকু পেলাম না। বাদশা যদি জোর করে আমায় এই দীঘা ট্রিপে না পাঠাতো, তাহলে হয়ে গেছিলো। সারাদিন প্যারালিটিক্যাল পেশেন্ট সামলে আমিও কেমন যেন অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম। আমার মানসিক ও শারীরিক অবস্থা দেখেই ও পুলককে রাজি করিয়ে তোর ছুটি মঞ্জুর করিয়েছিলো।
– সত্যি রে দিভাই, তোর ছেলেটি রত্ন। কি সুন্দর মা মাসির মনটাও বুঝতে পারে। মালা এই জন্য খুব সুখে আছে। তুই কি ভালো করে মানুষ করেছিস,ওকে। না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না।
– আবার কবে দেখা হবে, বুনু। খুব মিস করি তোকে। সেই দুদিন দু রাত আমরা জীবনের সব গল্প করে ফেলেছিলাম,বল।
-হ্যা রে দিদি। নইলে আর আমরা কোথায় সে সুযোগ পাই একটু মন খুলে কথা বলার।
-প্রার্থনা কর বুনু। যেন সব ঠিক হয়ে যায় আগের মতো। আবার আমরা নতুন জায়গায় যাবো।
– দিভাই, শান্তিনিকেতন গেছিস ?
– গেছিলাম একবার, তুই তখন মায়ের কোলে আর আমি বোধ হয় থ্ৰী কি ফোরে পড়ি। তাই কিচ্ছু মনে নেই। শুধু মনে আছে, গাছের তলায় বসে সবাই ক্লাস করছে। ব্যাস এইটুকুই।
– যাবি একবার ?আমার খুব ইচ্ছে হয় একবার ওখানে যাই। নিজের মতো থাকি।
– বেশ তাহলে এটাই ভাবি, ‘আমাদের দেখা হবে মহামারী শেষে, শান্তিকেতনের সুন্দর সমাবেশে।’
‘আচ্ছা শোন’, বনশ্রী আবার বলে ওঠে,
– গতমাসে, মানে ১৯শে জুন তোর বিবাহবার্ষিকী ছিল। সেদিন সব কেমন একটা হলো । এবার তোর জন্য কোনো উপহার কেনা হয়ে ওঠে নি। মনটা তাই খুব খচখচ করছিলো। মালাকে বলতেই আমার ‘মুশকিল আসান’ হয়ে গেলো। আমাজন থেকে একটা পার্ল সেট পছন্দ করে পাঠিয়েছি তোর এড্রেসে। পেলে ওটা গলায় পরে আমায় ভিডিও কল করিস। রাখি এখন,তোর জামাইবাবুর ওষুধের সময় হয়ে গেলো। রাখছি।
দিদির বিবাহ বার্ষিকী কথাটা শুনেই তমশ্রীর মনটা কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেলো। দিদিভাইকে আস্তে করে ‘বাই’ বলে ফোনটা কেটে চোখ বন্ধ করলো।