গল্পতে অজন্তাপ্রবাহিতা

ভালোবাসার আরেক নাম স্বাধীনতা

আজ ১১ ফেব্রুয়ারি। ঠিক দুমাস আগে মানবের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে । বিয়ের পনেরো দিন কাটতে না কাটতেই বুঝতে পারছিলাম, মানবের চিন্তাধারার সঙ্গে আমার চিন্তাধারার বিস্তর তফাৎ। আমি চেষ্টা করেও ওর মানসিকতার সঙ্গে ম্যাচ করে উঠতে পারছিলাম না ।

বিয়ের আগে দুবার ফোনে কথা বলে মনে হয়েছিল, আমার চেয়ে বছর দশেকের বড় হলেও ওর মানসিকতা বেশ প্রগতিশীল। ওর সঙ্গে আমার মানসিকতার বেশ মিল আছে ।
কিন্তু, বিয়ের পর একেকটা দিনের ব্যবহারে বুঝতে পারছিলাম যে, দুদিনের কথা বলায় যে মানুষটাকে আমি জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছেছি ,সেই মানুষটা আদৌ সেরকম নয় ।

নতুন বউ হিসেবে বরের কাছে প্রাধান্য পাওয়া তো দূরের কথা , সামান্য ভালো ব্যবহার টুকুও পেতাম না ।
কারণটা হি গিয়ে শুনলাম , ওর বন্ধুরা আগেই সাবধান করে দিয়েছিল, ফুলশয্যার রাতেই বেড়াল মেরে রাখবি , নইলে বউ মাথায় উঠে নাচবে ।
প্রতিদিন সেই জ্ঞান অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে । ফলে , সমাজে ওকে স্বামী হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও মন থেকে মানুষটাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না ।

রোজ রাতেই অভুক্ত সিংহের মত আমার দিকে এগিয়ে আসতো, কিন্তু , আমি সাড়া দিতে পারতাম না বলে রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বালিশ নিয়ে পাশের ঘরে শ্বশুর মশাইয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ত। কে কি বলবে ,এই ভেবে প্রথম কটা দিন আমার খুব অস্বস্তি হতো । পরে মনে হয়েছিল, আমিও তো মানুষ, আমারও ইচ্ছে অনিচ্ছার দাম আছে । সর্ব সম্মতিতে সামাজিক রীতি মেনে বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি এসেছি । প্রাপ্য সম্মান টুকু আমার চাই । সেটুকু পেলে তো আমি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে পারি ।

আমার শাশুড়িমা বরাবরই নীরব দর্শক । শ্বশুরের সামনে মুখ খুলতে এখন অব্দি দেখি নি । ঘড়ি ধরে
শ্বশুরের মুখের সামনে চা, জলখাবার , দুপুরের খাবার , বিকেলের চা, রাতের খাবার যুগিয়ে যেতে দেখেছি । কিন্তু , উনি সময়মতো খেলেন কিনা ,সেই দিকে ছেলে বা বাবার কোনো নজর ছিল না ।
আমাকে কখনো রান্নাঘরে ঢুকতে দেন নি । সময়মতো খাবার জন্য ডাক দিয়েছেন । পাশে বসে থেকে আমি ঠিক মত খেলাম কি না , তার নজর রেখেছেন।

যাকে আমি পাশে চাই ,এসে ছিল না ।
প্রতিদিন এমন পরিবেশে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম , পারছিলাম না , কেমন যেনো দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো আমার । একদিন রাতে মানবের সঙ্গে অশান্তি আর নিতে পারলাম না । পরদিন ভোরবেলা ব্যাগ গুছিয়ে কাউকে কিছু না বলে মায়ের কাছে চলে গেলাম ।

একই শহরে দুই বাড়ি । এপাড়া ওপাড়া ।
রিক্সা থেকে নামতেই বাবা দৌড়ে এলো, রীনা তুই ?
খবর না দিয়ে এলি। জামাই কোথায় ?
বাবার প্রশ্ন গুলো আমার ভালো লাগছিল না ,তাই ,কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি নিজের ঘরে চলে গেলাম । মা ঠাকুর ঘরে ছিল । আমার ঘরের দরজার আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে এলো ।
কি রে তুই ? সব ঠিক আছে তো ?

এবারে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না ।
কেঁদে ফেললাম । আমার না বলা কথাগুলো যেনো মা সব বুঝতে পারলো । তাই, আর কোনো প্রশ্ন না করে সন্তোষী দিদিকে জলখাবার বানাতে বললো । কিন্তু, কেউ এলেই বলতো , কতদিন মেয়েকে দেখি নি , তাই , কটা দিন নিজের কাছে রাখবো বলে ডেকে আনলাম । শ্বশুর বাড়ি চলে গেলেই তো আবার আমার ঘর ফাঁকা হয়ে যাবে ।
বুঝতাম ,এভাবে হুট করে চলে আসা মায়ের কাছে অনেকটা ছুঁচো গেলার মত ।

পাশের বাড়ির কাকিমা এসে কয়েকবার খোঁজ নিয়ে গেছে , কবে ওই বাড়ি যাবো । কাকিমা যত বার এসেছে একই প্রশ্ন করেছে , মায়ের একটাই উত্তর , চলে যাবে দিদি , কটা দিন আমার কাছে থাকুক না ।

সব বুঝতাম , কিন্তু ,কি করবো ? তাই চুপ করে থাকতাম । বন্ধু বান্ধব কারো সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে হতো না । গল্পের বই খুলে বসতাম ঠিকই কিন্তু একটা লাইনও পড়তে পারতাম না । মনে হতো , বাইশ বছরেই কি জীবন শেষ হয়ে গেলো ? চারিদিক অন্ধকার ।

প্রায় দিন পনেরো কাটার পর একদিন বিকেলে , গেট খোলার শব্দ পেয়ে অবাক হয়ে গেলাম, আমার শাশুড়িমা , শ্রীমতী শ্যামা সেন ।

ওনাকে দেখে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম । আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন , রাগ কমেছে ? এবার বাড়ি চলো । তোমাকে না দেখে যে আমার দিন কাটছে না ।

অবাক হয়ে তাকালাম । এতো ভালোবাসো আমায় ?
“শুধু আমি কেনো , সবাই তোমায় ভালোবাসে ।”

“তুমি ভালোবাসো জানি , কিন্তু , মানব , বাবা ??”

“ওরাও ভালোবাসে । নিজের জায়গা কি এতো সহজে কেউ ছেড়ে দেয় ? তাই ,তোমার জায়গা তোমাকেই করে নিতে হবে । আমি তো আছি । ভয় কিসের ? সংসারে থাকতে গেলে কানে তুলো আর মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হয় । তাহলেই সংসার টেকে।”

“মা তুমি এলে আমায় নিতে কিন্তু মানব তো একবার খোঁজও করে নি । “

“প্রকাশ্যে হয়তো করে নি, মনে মনে নিশ্চয়ই তোমায় মিস করে । স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অনেক বাদ বিবাদ হয় , তাই বলে কি ঘর ছেড়ে চলে আসে কেউ ? বোকা মেয়ে ব্যাগ গোছাও , চলো আমার সঙ্গে । “

বাবা মাও যেনো এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করেছিল ।
অতিথি হিসেবে এতদিন আমার আদর যত্ন করছে, এবারে শ্বশুর বাড়ি পাঠাতে পারলেই যেনো শান্তি ।

নিজের বাড়িতে অতিথি হয়ে থাকা যে কতটা কষ্টের সেটা আমিও প্রতি মুহূর্তে টের পাচ্ছিলাম ।

সেদিন সন্ধেবেলা শাশুড়ির সঙ্গে শ্বশুর বাড়ি ঢুকলাম ।
শ্বশুর মশাই ড্রইং রুমে পেপার পড়ছিলেন । প্রণাম করতেই পেপার সরিয়ে বললেন, শেষ অব্দি ফিরে এলে তো । দিনকাল যতই পাল্টাক না কেনো বিয়ের পরে বাপের বাড়িতে মেয়েদের ঠাঁই হয় না । তাই , ভালো লাগুক বা না লাগুক ,এটাই তোমার বাড়ি , এখানেই থাকো।

কথা গুলো কানে বাজলেও মনে বাজলো না । সত্যি কথাই তো বলেছেন ।
সেদিন মানব বাড়ি ছিল না , অফিসের কাজে বাইরে গেছিলো । রাতে শাশুড়িমা আমার সাথে শুলেন । সারারাত মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন । আমিও ওনার বুকে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করলাম ।
ধীরে ধীরে উনি বললেন , আমার মেয়ে নেই, একটাই ছেলে । বড়ো ইচ্ছে ছিল মেয়ের মা হওয়ার। তোকে দেখে বড্ডো নিজের বলে মনে হয়েছিল, তাই , ঠাকুরকে বলেছিলাম , একে আমার কাছে এনে দাও । দেখ , তুই আমার ছেলেবৌ হয়ে এলি । আমার মেয়ে হয়ে থাকিস এবাড়িতে । তোকে কি দিতে পারবো , কি দিতে পারবো না , আমি জানি না , তবে মায়ের ভালোবাসাটুকু দিতে পারবো । আমার চোখ ভিজে এলো ,আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম । একটা রাতের ব্যবধানে শাশুড়িমা আমার ‘ মা ‘ ও প্রিয় বন্ধু হয়ে গেলো । আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ।

সকালে ঘুম ভাঙতেই দেওয়ালের ঘড়ির দিকে চোখ পড়ল , ইসস ,সাড়ে আটটা বেজে গেছে !
রান্নাঘরে যেতেই মা আদর করে বললো , কি রে ঘুম হয়েছে ? যা ,ফ্রেশ হয়ে এসে জলখাবারটা খেয়ে নে । আমার রান্না প্রায় শেষ । দশটায় তোকে নিয়ে একটু বাজারে যাবো । একটা সুন্দর শাড়ি পরিস আর সুন্দর করে সেজে নিস।

এসব কেনো ? এই কথা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হলো না । বিশ্বাস ছিল, আমার ভালোর জন্যেই এসব করতে বলেছে ।

সেজেগুজে ঠিক দশটায় বেরিয়ে পড়লাম । বেরোনোর মুখে শ্বশুর মশাই জিজ্ঞেস করলেন , দুজনে কোথায় যাওয়া হচ্ছে ?

“একটু হাতে ধরে বাজার করা শিখিয়ে দি । ওকেই তো একদিন সব সামলাতে হবে । “

পেপার মুখে রেখেই তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন , বাপের বাড়িতে কিছুই শেখেনি দেখছি , এখন তুমি বাজার করাও শেখাবে ?

কথা না বাড়িয়ে মা হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন ।

রাস্তায় একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে একটু উচুঁ গলায় ডাক দিলেন, ও শান্তর মা। সঙ্গে সঙ্গে এক মাঝারি বয়সের মহিলা আঁচলে হাত মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো ।

হ্যা দিদি ।

শোনো , আজ দুপুরে বাড়ি এসো একবার , ছাদের চিলেকোঠাটা পরিষ্কার করে দিও ।

আচ্ছা । বৌমাকে নিয়ে কোথায় চললে দিদি ?

এই একটু বাজার ঘুরিয়ে আনি।

বাজারে গিয়ে সোজা ফোটো স্টুডিওতে ঢুকিয়ে দিয়ে বললো, নে বস্ এখানে ।

ও সুখু, বৌদির একটা পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলে দে দেখি ।

আমি তো অবাক । পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে কি হবে ?

ছবি তোলা হলে , হাত ধরে নিয়ে গেলেন , রদ্দি ওয়ালার দোকানে ।

ও মনু , তোমায় বলেছিলাম যে ব্যাঙ্কিং পরীক্ষার বই বেছে রাখতে , কই দাও ।

এই যে মাসিমা । আমি সবচেয়ে ভালো বইটা বেছে রেখেছি । বৌদি চাকরি পেলে দাম দেবেন ।

বেশ । তাই হবে ।

আমি জানতাম , মায়ের হাতে বাজার খরচ ছাড়া বাড়তি টাকা থাকে না । আমার হাতও খালি । বিয়েতে যা ক্যাশ পেয়েছিলাম সে সব তো শ্বশুর মশাইয়ের কাছে ।

এবারে মা নিয়ে গেলো পোস্ট অফিসে । পোস্ট অফিসের বারান্দায় একটা ছেলে কিছু পরীক্ষার ফর্ম বিক্রি করছিল । মা ডাক দিল , দিনু, কিরে দেখে রেখেছিস ?

হ্যা কাকিমা , এই যে PO পরীক্ষার ফর্ম। এখন কিন্তু কম্পিউটারে সব করতে হবে কাকিমা । তাই , ফর্ম ফিল আপ করে সব ডকুমেন্টস নিয়ে বৌদিকে সজলদার কম্পিউটার ক্যাফেতে পাঠিয়ে দেবেন । ওইখানে বসে সব করতে হবে । ২২ শে মার্চ ফর্ম ফিল আপ করার লাস্ট ডেট ।

থ্যাঙ্ক ইউ রে বাবা । কোনো দরকার হলে তোকে আবার জিজ্ঞেস করবো ।

আমি এতক্ষণ যেনো ঘোরে ছিলাম । কি হচ্ছে কিছুই মাথায় ঢুকছিলো না ।
ফিরতি পথে ,সামান্য কিছু সবজি কিনে ছাতা টাঙিয়ে বাড়ির পথ ধরলাম ।

বারোটার আগে বাড়ি ফিরতে হবে । বাবাকে ভাত দিতে হবে যে । ঘড়ির কাঁটা একটু ডান দিকে ঘুরলেই ভাতের থালা উড়ে যাবে মায়ের দিকে ।

আমার হাত খানা শক্ত করে ধরে হাঁটা লাগলো মা ।

মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে তেমন একটা গরম না হলেও ,আমরা দরদর করে ঘামতে ঘামতে বাড়ি পৌছালাম।
মা ছুটলো রান্নাঘরে ।
বাবাকে খাইয়ে রান্নাঘর গুছিয়ে চানে ঢুকলো ।আমি ততক্ষণে চান করে পুজোর জোগাড় করে ফেলেছি ।
মা এসে পুজো করে আমরা একসঙ্গে খেতে বসলাম ,তখন বাজে দুটো ।
শান্তর মা এসে গেছে । ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চিলেকোঠা পরিষ্কার করে চলে গেলো ।
মা আমায় নিয়ে চিলেকোঠায় গেলো । ছাদের ওপর ছোট্ট একটা ঘর । পুব দিকের ছোট্ট জানালা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া আসছে ।
একটা শতরঞ্চি পাতা আছে , পাশে একটা হাত পাখা ।

“বোস এখানে । ” বলে নিজেও বসে পড়লেন ।
আজ থেকে এই ঘরটা তোর তপস্যার ঘর ।
শাড়ির আঁচলে রাখা ব্যাংকিং পরীক্ষার বইখানা হতে দিয়ে বললো , সকালে মানব চলে গেলে এইখানে থাকবি । তোর একটাই কাজ পরীক্ষার জন্য তৈরি হওয়া । দুটো মাস একটু কষ্ট কর ।
খাবার দাবার সব এনে দেবো আমি । তোকে নিচে নামতে হবে না । তুই শুধু মন দিয়ে পড়বি ।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি , হাতে টাকা যদি না থাকে , স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যায় না । তুই শিক্ষিত । আমার মত ক্লাস এইট পাশ না । যা আমি করতে পারি নি, তা , তুই করার চেষ্টা কর । ফাঁকি মারলে কানমুলে দেবো ।

আমি থাকতে না পেরে , কান্না মেশানো হাসি হেসে মা কে জড়িয়ে ধরলাম । দুদিন আগে চোখের সামনে অন্ধকার ছিল আজ সেই অন্ধকার কেমন যেনো আবছা হয়ে যাচ্ছে, আশার আলো দেখতে পাচ্ছি । মন বলছে ,দিন বদলাবে।

” এবার আমি নিচে যাই । আজ থেকেই লেগে পর । বিকেলে মানব ফিরবে । তার আগে পড়তে শুরু কর । চিন্তা করিস না , সব ঠিক হয়ে যাবে । যা বুঝতে পারবি না , খাতায় লিখে রাখবি । ডক্টর চ্যাটার্জির মেয়ে বুঝিয়ে দেবে ।

মা চলে গেলে , আমি কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলাম । চার মাসের মধ্যে জীবন কেমন পাল্টে গেলো । যে কম্পিটিটিভ পরীক্ষা গুলো দেবার কথা আমি বাবাকে বলেছিলাম , মায়ের অনুমতি না থাকায় বাবাও সায় দেয় নি । পড়াশুনা শিখেছো , এবার সংসার করো । এই ছিল মায়ের শেষ কথা । গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেছে , আর পড়ে লাভ কি ? মেয়ে শিক্ষিত, বিয়ের বাজারে এর বেশি আর কিছু দরকার নেই । “

আর , শাশুড়িমা সব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থেকেও ছেলের বউকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে ।

দেরি না করে বইতে ডুবে গেলাম । বিকেলের চা , সন্ধ্যে বেলার মুড়ি সবই মা দিয়ে গেলেন ।

মানব ফিরলো রাত সাড়ে আটটা । আমায় দেখে কোনো প্রশ্ন করলো না । রাতে দুজনে দুদিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লাম ।

সকালে মায়ের হাতে হাতে একটু এগিয়ে দিয়ে জলখাবার পর্ব শেষ হলো । মানব বেরিয়ে যেতেই মা ইশারা করলো ,এবার যাও ।

এইভাবেই চললো একমাস । মাঝে , সজলদার কাছে গিয়ে আমি ফর্ম ফিল আপ করে এসেছি ।
যখন যা বুঝতে পারি নি , মায়ের সঙ্গে চ্যাটার্জি কাকুর মেয়ের কাছে গিয়ে বুঝে এসেছি ।
আমার শ্বশুর বা মানব কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি যে আমি ব্যাঙ্কিং পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছি।

দেখতে দেখতে সেই দিন চলে এলো । বাপের বাড়ি যাবার নাম করে পরীক্ষা দিতে গেলাম । পেপার সাবমিট করার সময় মনে হয়েছিল , রিটেনে উৎরে যাবো । হোলোও তাই । এবার ভাইভার পালা ।

সেদিনও এমনি ঢপ দিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলাম । জানতাম মা সবটা সামলে নেবে । পরীক্ষা শেষে ফুরফুরে মেজাজে বাড়ি ফিরলাম ।

বিয়ের পরে প্রথম পুজো । মা একটা সুন্দর শাড়ী কিনে দিয়েছিল । ও বাড়ি থেকেও পুজোর উপহার দিয়ে গেছে ।

এই কয়েকমাসে একবারও বাপের বাড়ি যাই নি । আসলে, যেতে মন চায় নি ।

দশমীর পরে মানবকে নিয়ে বিকেলে গেছিলাম । প্রণাম সেরে ,চা খেয়ে ফিরে এসেছি ।
বাবা মাও খুব খুশি ছিল, আমি শ্বশুর বাড়িতে মানিয়ে নিয়েছি দেখে ।
বিয়ের পর মেয়েরা কেমন নিজের বাড়িতে অতিথি হয়ে যায় । মনে মনে হাসলাম । এখন এসব নিয়ে আর ভাবতে ইচ্ছে করে না ।

লক্ষ্মী পুজোর পর দিন চিঠি এলো । আমি ব্যাঙ্কিং পরীক্ষা পাস করেছি ।

স্টেট ব্যাংকের PO ,একমাসের জন্য ট্রেনিংয়ে যেতে হবে ।
মানবকে বলতেই চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করলো ।
সেন বংশের বউরা বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করে না । তুমি মনতোষ সেনের পুত্রবধূ । বাড়ির বাইরে গিয়ে টাকা কামাবে ?

ওর চেঁচামেচি শুনে পাশের ঘর থেকে শ্বশুর মশাই উঠে এলেন । বললেন , বুবুন , বৌমা নিজের চেষ্টায় সরকারি চাকরি পেয়েছে । তোর প্রাইভেট চাকরি। কখন কি হয়ে যায়, কে বলতে পারে । বৌমাকে চাকরি করতে দে । শ্বশুর মশাইয়ের এই পরিবর্তন দেখে আমি অবাক হলাম । পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মায়ের মুখের ভাব দেখে বুঝলাম ,
এই পরিবর্তন কিভাবে সম্ভব হয়েছে ।

ডিসেম্বরে ধর্মতলার ব্রাঞ্চে জয়েন করলাম ।
এক ডিসেম্বর থেকে আরেক ডিসেম্বরের মধ্যে আমার জীবন পুরোপুরি পাল্টে গেলো ।
এখন আমি কর্মরতা মহিলা ।

প্রথম মাসের মাইনে পেয়ে ,শাশুড়ির জন্য শাড়ি কিনিনি । কিনেছি একটা নতুন মডেলের গ্যাস স্টোভ, একটা সুন্দর কাপ সেট আর ডাইনিং সেট । অতিথি এলেই দেখতাম মা ভাড়াটে বাড়ির দিদির কাছ থেকে কাপ প্লেট ধার করে নিয়ে আসতো। আমার ভালো লাগতো না ।

“রীনা , টাকা খরচ করিস না । জমিয়ে রাখ । ”
মা তুমি আমায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখালে আর তোমার কর্মক্ষেত্রটা আমি গুছিয়ে দেবো না ,এটা কি হয় ! বলে মা – কে জড়িয়ে ধরলাম ।

– হ্যা রে তুই বাপের বাড়ি যাবি না ?

– এই রোববারে মিষ্টি নিয়ে এক্কেবারে চাকরি পাওয়ার খবরটা দিয়ে আসবো । এবারে পয়লা বৈশাখে মাকে শাড়ি আর বাবার জন্য একটা লুঙ্গি কিনবো ।

এই তো আমার সোনার মেয়ে । কিসুন্দর দুই বাড়ি ব্যালান্স করতে শিখে গেছে ।
মুচকি হেসে বললাম , চলো মা , আজ নতুন কাপে চা খাই । আমি বানাবো চা ।

আচ্ছা বেশ । তাই কর ।

ধীরে ধীরে মানবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ভালো হয়ে উঠছিল । ফিরতে দেরি হলে , বাবা যাদবপুর বাসস্টপে দাঁড়িয়ে থাকতেন । বাবার মেজাজ অনেক কমে গেছে ।

দুবছরের মাথায় মিমলি আমার কোলে এলো । ওকে নিয়ে আমাদের স্বপ্নের দুনিয়া সত্যি হয়ে গেলো । আনন্দে গা ভাসিয়ে দিন কাটাতে লাগলাম।

দুঃখ যেমন বেশি দিন থাকে না , সুখও ক্ষণস্থায়ী।
শাশুড়ি মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়লো । লম্বা দোহারা চেহারার মানুষটাকে চোখের সামনে ভেঙে যেতে দেখলাম । দেখে মনে হতো ছোট বাচ্চা মেয়ে ।
চিনতে পারতাম না । ঠোঁটের কোণে হাসিটুকু অটুট ছিল । দুটো কেমো নেয়ার পর আর সইতে পারলেন না । হার্ট ফেল করলেন ।
মায়ের চলে যাওয়ার পর শ্বশুর মশাইও কেমন চুপ করে গেলেন । শান্তর মা রান্নাঘর, বাড়ির কাজ সব সামলায়। শান্ত ব্যাঙ্গালোর চলে গেছে । ওখানেই বিয়ে করে সংসার পেতেছে । মা এখন ওর কাছে বাড়তি । তাই ,নিয়ে যায় নি ।

মানবের ফ্যাক্টরিতে ইউনিয়ন এর গন্ডগোল হওয়ায় ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলো । সারাদিন বাড়িতে বসে বসে মানব ডিপ্রেশনের রোগী হয়ে গেলো । ড্রিঙ্ক করতে শুরু করলো । হাতে পয়সা না থাকলে হাতের কাছে যা পায় ভাঙচুর করে ।

মীমলি তখন পাঁচ ।এমন পরিবেশে মিমলিকে রাখতে আমার খুব ভয় করতো । শ্বশুর মশাই সব দেখতেন , সব বুঝতেন , কিন্তু , কোনো কথা বলতেন না ।

একদিন রাতে থানা থেকে ফোন এলো । শ্বশুর মশাইকে নিয়ে ছুটলাম , গিয়ে মানবের রক্তাক্ত দেহটা দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম । লরিতে ধাক্কা মেরেছে ।

পুত্র শোক সহ্য করতে না পেরে দিন পনেরোর মধ্যে
শ্বশুর মশাই এক রাতে ঘুমের দেশে চলে গেলেন ।
পুরো বাড়ি খা খা করতে লাগলো । মিমলীকে বুকে চেপে ধরলাম । কার অভিশাপে আমার সংসার এমন ভাবে শেষ হয়ে গেলো ? ভাগ্য না বিধাতার পরিহাস ?

মিমলিকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম কিছুদিনের জন্য । একসঙ্গে সব আপন জনের চলে যাওয়া ওর শিশুমনকে নাড়িয়ে দিয়েছিল । ওর সামনে আমি নিজেকে সামলে রাখতাম । কাঁদতাম না ।

একমাসের মধ্যে আমার ট্রান্সফার অর্ডার এলো ।
দিল্লি যেতে হবে । এতো দিন লোক্যাল ব্রাঞ্চেই ঘোরাফেরা করছিলাম , এই প্রথম কলকাতার বাইরে পোস্টিং অর্ডার এলো । আমার কলিগরা বললো , শাপে বর হয়েছে । নতুন পরিবেশে মিমলির মনও ভালো থাকবে ।

বাড়িটা ভাড়ায় চড়িয়ে মিমলি আর শান্তর মাকে সঙ্গী করে চলে এলাম দিল্লি ।

মিমলিকে DPS R.K.Puram এ ভর্তি করলাম । প্রিন্সিপালকে সব ঘটনা বলে রেখেছিলাম ,ফলে , ক্লাস টিচার ও কাউন্সেলর এর সাহায্যে মিমলি খুব তাড়াতাড়ি নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিল ।

বাড়িতে শান্তর মা থাকায় ঘরের কাজের চাপটাও রইলো না আমার ওপর । আমিও সব ভুলে নিজের কাজে ডুবে গেলাম । দেখতে দেখতে বারো বছর কেটে গেলো ।

আজ ২০২৩ এর women’s day . এবছর প্রাইম লিডার শিপের অ্যাওয়ার্ডের নমিনি আমি । সকালে
মিমলী আমায় সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,তুমি যদি অ্যাওয়ার্ড পাও , তাহলে কাকে ডেডিকেট করবে মা ?

আমার সেই ছোট্ট পুতুলটা এখন ১৭ + বছরের মেয়ে । এবারে হায়ার সেকেন্ডারি দেবে । খুব ইচ্ছে এরোনেটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ।

আমি যদি ব্যাঙ্কের চাকরিটা না পেতাম ,তাহলে মিমলীর ভবিষ্যত কি হতো ? ভাবলেই ,গা শিউরে ওঠে ।

ট্রফিটা হাতে নিতেই এঙ্কর এগিয়ে এসে মাইকটা ধরিয়ে দিল , কিছু বলতে হবে । অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে , অনেক কিছু বলার আছে ।

ভালোবাসা এমন এক বস্তু , যদি সত্যি হয়, তাহলে পাথরেও ফুল ফোটাতে পারে । শ্যামা সেন , আমার শাশুড়ি মা, সেটা প্রমাণ করে গেছেন । নিজে ক্লাস এইট পাশ হলেও , উনি বুঝেছিলেন , শিক্ষা মেয়েদের জন্য খুব জরুরী । শুধু শিক্ষিত হলেই হবে না , অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে , তাহলেই জীবনের অনেক প্রতিকূল পরিবেশে নির্ভয়ে মোকাবিলা করতে পারবে । আমার শাশুড়িমা একটা জিনিষ আমায় শিখিয়ে গেছেন , কাউকে ভালোবাসলে তাকে বেধে রেখো না , স্বাধীন হতে শেখাও। আমাদের সবার কাঁধে একজোড়া ডানা লুকোনো আছে । ভালোবেসে সেই ডানা মেলার জন্য একটা আকাশ তৈরি করে দাও । দেখবে , তোমার প্রিয় মানুষটা উড়তে শিখেছে ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।