।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় অলোক মুখোপাধ্যায়

মনের কথা

সকাল থেকেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি। থামার কোন লক্ষণ নেই।ছ’টায় অফিস আওয়ার শেষ হলেও গুহ অ্যান্ড কোম্পানীর সর্বময় কর্তা সৌরাশিস গুহ নিজের চেম্বারে ব্যস্ত। ঘড়ির কাঁটা সাতটার দিকে যাচ্ছে। এবার উঠতেই হয়। বাইপাশে সাংঘাতিক জ্যাম, গাড়িতে বসেই মোবাইলে দেখে নেয় সৌরাশিস। ড্রাইভারকে সার্কুলার রোড ধরতে আদেশ করে।বোকারোর বিশাল ওয়াটার কুলিং টাওয়ারের অডিট নিয়ে কদিন খুব ধকল গিয়েছে শরীরের ওপর। কিছুটা হলেও সেকারণে খুব টায়ার্ড সৌরাশিস। মোবাইল অন করে লো্ ভ্যলুমে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিকাল শুনতে থাকে। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে এগিয়ে চলেছে গাড়ি। একটু যে রিল্যাক্সড হবে সে উপায় নেই। হঠাৎই বেজে ওঠে মোবাইল। রিঙ্কি কলিং……।
-হ্যাঁ মামনি বলো।
-বাপি তুমি কি অফিসে?
-নো মাই ডিয়ার আমি ফিরছি। কেন তো্মার স্পেশাল কিছু অর্ডার আছে?
-কাম শার্প বাপি। মাম্মা আন-কনসাস হয়ে বিছানায়। প্রবেবলি ওভার ডোজ।
-হোয়াট?
-ইয়েস বাপি। খালি স্ট্রিপটা পড়ে আছে। একসাথে কটা কনজিউম করেছে জানি না…..। গলা বুজে আসে রিঙ্কির। কথা বলতে পারে না।
এরকম ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না সৌরাশিস। কি করবে বুঝে উঠতে পা্রে না। কপালে জমে থাকা ঘাম রুমাল দিয়ে মুছে ড্রাইভারকে এসিটা বাড়িয়ে দিতে বলে। অহনা কেন এমন করে বসলো কে জানে! হাউজ ফিজিশিয়ান দেবাঞ্জন নন্দীকে কল করে সৌরাশিস।
সৌরাশিসের ফোনের অপেক্ষাতেই যেন ছিলেন ডক্টর নন্দী –বি রিল্যাক্সড মিস্টার গুহ। রিঙ্কি মামনি আমায় ফোনে খবর দিয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স এসে যাবে। ইট উইল বি বেটার ইফ ইউ কাম ডিরেক্টলি টু পার্ক-ভিউ নার্সিংহোম।
সৌরাশিসের দুচোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বুদ্ধি করে ভাগ্যিস রিঙ্কি ডক্টর নন্দীকে ফোনটা করেছিল! সৌরাশিস পৌঁছনোর আগেই অহনাকে নিয়ে নার্সিংহোমের এমারজেন্সী ওটিতে ঢুকে গিয়েছেন ডক্টর নন্দী। পার্ক-ভিউ নার্সিংহোমে সৌরাশিস ঢুকতেই বাবার বুকের ওপর কান্নায় ভেঙে পড়ে রিঙ্কি। ওর সব ক্ষোভ দুঃখ অভিমান যে শুধু বাপির কাছে। খবর পেয়ে অহনার দাদা কুনাল মিত্র চলে আসায় সৌরাশিস কিছুটা স্বস্তি পেল।
ঘন্টা দেড়েক পর ভিসিটিং সার্জেনের সাথে ওটি থেকে বেরিয়ে এলেন ডক্টর দেবাঞ্জন নন্দী -সি ইজ অউট অফ ডেঞ্জার নাও। বাট ইউ শ্যুড বি….
বলতে বলতে থেমে গেলেন দেবাঞ্জন নন্দী। আরও কিছু বলার ছিল ডক্টর নন্দীর কিন্তু সর্বসমক্ষে বলবেন না সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না সৌরাশিস গুহর। এই মুহূর্তে অহনার সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা ছাড়া ওর অন্য কিছু ভাবার অবকাশ নেই।
দুদিন নার্সিংহোমে থেকে দাদা কুনাল মিত্রের বাড়িতে ফিরে গেল অহনা। সৌরাশিস আপত্তি করেনি। দিন কয়েক থাক না যেখানে মন চায়। শহরের বাইরে তো যাচ্ছে না। রিঙ্কির ফোর্থ সেম চলছে। কোন অবস্থাতেই ক্লাস মিস করা যাবে না।মামার বাড়ি থেকে ক্যাম্পাস অনেকটাই দূরে। যাতায়াতে কিছুটা কষ্ট হয়তো হবে, তা হোক। এখন মায়ের কাছে থাকা দরকার। ল্যাপটপ, ব্যা্‌গ, বইপত্র গুছিয়ে রিঙ্কি চলে গেল মায়ের কাছে। সময় নষ্ট করে না সৌরাশিস। ডক্টর দেবাঞ্জন নন্দীর কাছ থেকে নার্সিংহোমে সেদিনের না বলা কথাগুলো জেনে নেওয়ার এই তো সুযোগ।
-এগেইন সী উইল টেক চান্স। মিসেস গুহ্’র ইমিডিয়েট কাউন্সেলিং প্র্য়োজন। কিন্তু ওর মেন্টালিটি আমি তো জানি। খুব ট্যাকটফুলি করতে না পারলে মুশকিল হয়ে যাবে।একজন লেডি সাইকোলোজিস্ট অ্যাপয়েণ্ট করলে ব্যাপারটা সহজ হবে বুঝলেন মিস্টার গুহ।
ডক্টর দেবাঞ্জন নন্দীর ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ভরসা সৌরাশিসের। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে ওঠে -আপনি দায়িত্ব নিলে আমি চিন্তামুক্ত থা্কতে পারি ডক্টর নন্দী। প্লিজ আপনি অ্যারেঞ্জ করুন।
তিন সপ্তাহ পর রিঙ্কিকে সাথে নিয়ে অহনা বাড়ি ফিরে এল।ইতোমধ্যে সাইকোলজিস্ট অরুনিমা সান্যাল অহনার দাদার বাড়িতে রিঙ্কির এক বান্ধবীর নিকট আত্মীয়া পরিচয় দিয়ে দু দিন সিটিং দিয়েছেন। পেশাগত দক্ষতায় খুব সহজেই অহনার সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়তে সক্ষম হন সাইকোলোজিস্ট অরুনিমা সান্যাল। দুজনের মধ্যে শর্ত যেটা হয়েছে অহনা বাড়ি ফিরলে অরুনিমা সান্যালের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করবে। খুব দরকার হলে অহনা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সুবিধা মতো কোথাও গিয়ে ওঁকে মিট করবে।কিন্তু কোন অবস্থাতেই অরুনিমা সান্যাল গুহ বাড়ির ত্রিসীমানায় ঢুকবে না।
ছোট থেকেই ছবি আঁকা ছাড়াও ছবির কোলাজ কিংবা রকমারী ডিজাইনের নকশা তৈরীর আগ্রহ ছিল অহনার। সেই সুত্রে বিয়ের আগেই অহনা একটি প্রাইভেট স্কুলে অ্যাটাচড ছিল। প্রাইমারী সেকশনের কচিকাঁচাদের নিয়ে কি আনন্দেই না কেটেছে সেই দিনগুলো। ক্লাস সেভেন থেকে এইটে প্রমোশন পেলেও রিঙ্কির রেজাল্ট আশানরূপ না হওয়ায় স্কুলের চাকরীটা ছেড়ে দিতে দুবার ভাবেনি অহনা। সৌরাশিস অডিট ফার্ম এবং ক্লায়েন্টদের নিয়ে ব্যস্ত। ওর ওপর ভরসা করার প্রশ্নই নেই। অনন্যোপায় হয়ে রিঙ্কির পড়াশুনা এবং দেখভালের দায়িত্ব অহনাকেই নিতে হ’ল। পাঁচটা বছর কি না করেছে অহনা! সংসার সামলে সারাটা দিন রিঙ্কির পিছনে ছুটতে ছুটতে কখনও ক্লান্ত হয়নি। কিন্তু বিগত দু বছরে যাপন চিত্র বদলে গিয়েছে অহনার। দিনের পর দিন বাড়িতে একা থাকার যন্ত্রণা অসহ্য হয়ে উঠেছে। কোন রিক্রিয়েশন নেই।অন্য কোথাও গিয়ে মন খুলে কথা বলার সুযোগও নেই।প্রিয়জন এবং পরিচিত বন্ধুরা সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত।ক্রমশ বিষন্নতার শিকার হতে থাকে অহনা। সাইকোলোজিস্ট অরুনিমা সান্যালের কাছে মনের জানালা খুলে দিয়ে অনেকটাই হালকা বোধ করে অহনা।
সৌরাশিসের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভি্যোগ আছে অহনার।ক্রশ চেক করার জন্য সৌরাশিসের ডাক এল। অরুনিমা সান্যালের চেম্বারে হাজির চার্টার্ড অ্যাকাউনটেন্ট এন্ড ফিনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট সৌরাশিস গুহ। প্রায় এক ঘন্টারও বেশি সময় নিয়ে চললো কথোপকথন। তবে সৌরাশিসের বিরুদ্ধে মারাত্মক যে অভি্যোগটির কারণে অহনা সুইসাইড করতে গিয়েছিল সেটি উহ্য রাখলেন অরুনিমা সান্যাল।অভি্যোগের প্রামাণ্য চিত্র অথবা কর্মকান্ড সম্পর্কে সুনিশ্চিত না হলে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়।
রোজ না হলেও মাঝেমাঝে অফিস থেকে ফেরার পথে টাউন ক্লাবে যায় সৌরাশিস। সেখানে অন্য মেম্বার এবং ক্লায়েন্টদের ফিনান্সিয়াল ই্নভেস্টমেন্ট সংক্রান্ত আলোচনা তারপর সামান্য পান ভোজন সেরে বাড়ি ফেরে। ক্লাবে সৌরাশিসের আসা-যাওয়া প্রায় দশ বছর হলেও বিগত কয়েক মাস টাউন ক্লাবে সৌরাশিসের যাতায়াত একটু বেড়েছে। টাউন ক্লাবের নাম করে অন্য কোথাও যাচ্ছে কি সৌরাশিস? এক থেকে দেড় মাস অন্তর তিন চারদিনের জন্য অডিটের কাজে বাইরে যাচ্ছে। অডিটের অছিলায় অন্য কিছু নয়তো! সন্দেহ বাসা বাঁধতে শুরু করে অহনার মনে। দিনের পর দিন একাকীত্বে বন্দী অহনার ধারণা সৌরাশিস অন্য কারোর প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছে। বদ্ধমূল সেই ধারণা পরিণত হয় বিশ্বাসে। তীব্র হতাশা থেকে নিজের ওপর ঘৃণা তারপর জীবনের মানে হারিয়ে আত্মহননের চেষ্টা।
অন্য কোনো নারীর প্রতি সৌরাশিসের আসক্তি না কি ব্যাপারটা নিছকই অহনার সন্দেহ সেটা প্রমাণ করার জন্য সুনির্দিষ্ট প্ল্যান সাজিয়ে নিলেন অরুনিমা সান্যাল। ইদানীং অহনার চালচলন আচার আচরণ কথাবার্তা শুনলে বোঝার উপায় নেই যে কিছুদিন আগে ঘুমের বড়ি খেয়ে সুইসাইড করতে গিয়েছিল। সৌরাশিস বাথরুম থেকে স্নান করে বেরিয়ে এলে আলমারি খুলে ওর পোশাক সাজিয়ে দিচ্ছে অহনা। এর আগে শেষ কবে অহনা এসব করেছে সৌরাশিস মনে করতে পারে না।
পরের সপ্তাহেই চার দিনের জন্যে আসানসোল ধানবাদ লাইনের কুমারধুবি স্টেশনের কাছে ফরচুন সিলিকা কোম্পানীর অডিটে গিয়েছে সৌরাশিস। রাত্রিবাস মাইথনে ডি.ভি.সি গেস্ট হাউসে। সকালে ঘুম থেকে উঠে ড্যামের রাস্তায় হাঁটছে সৌরাশিস। পাশ দিয়ে দুরন্ত গতিতে একটা অটো ছুটে গেল।অ-খেয়াল হলেই গায়ে ধাক্কা লেগে যেত। জায়গা বিশেষে অডিট প্রোগ্রামে একটা দিন হাতে রাখতে হয়, এবারেও তাই ছিল। কাল সকালের ট্রেনে কলকাতা ফেরা। আজ সারাটা দিন বসে না থেকে বেলার দিকে কল্যাণেশ্বরী মন্দিরে ঘুরে আসবে বলে মনস্থির করে সৌরাশিস। মন্দিরে যাবার জন্য ফরচুন সিলিকা কোম্পানী গাড়ি দিতে চেয়েছিল কিন্তু সৌরাশিস রাজী হয়নি। ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে সুযোগ যত কম নেওয়া যায়। ব্রেকফাস্টের পর লোক্যাল মিনিবাসে ওঠে সৌরাশিস। মন্দিরে পুজো দিয়ে ফিরে আসে অবশ্য শেয়ার গাড়িতে। যাত্রাপথে আগাগোরা সকালের সেই অটোটা সারাক্ষণ ওকে ফলো করেছে সেটা বুঝতে পারে না সৌরাশিস। কলকাতায় ফেরার আগেই কুমারধুবির কোম্পনীতে অডিটে যাওয়া সৌরাশিসের প্রতিদিনের মুভমেন্টের ভিডিও ক্লিপিংস পৌঁছে যায় অরুনিমা সান্যালের হাত ঘুরে অহনার কাছে। এখানেই শেষ নয়।সৌরাশিস কলকাতায় ফিরে আসার পর টানা দু সপ্তাহ অহনাকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সৌরাশিসকে ফলো করেছেন অরুনিমা সান্যাল। সৌরাশিকে নিয়ে অহনার সন্দেহের কোন ভিত্তি যে নেই অভিজ্ঞ মনোবিজ্ঞানী অরুনিমা সান্যাল দক্ষতার সাথে অহনাকে বোঝাতে সমর্থ হলেন। ব্যাপারটা বোঝার পর অহনার মনে বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য এবং সেখান থেকেই অনভিপ্রেত কোন ঘটনা অসম্ভব নয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত অরুনিমা সান্যাল।অহনাকে নিয়ে নতুন করে কাউন্সেলিং শুরু করলেন। সুচতুর ভাবে অহনার মনে জাগিয়ে তুললেন ওর শিল্পী সত্তা।
-কি গুণ তোমার অহনা। এত সুন্দর হাতের কাজ থাকতে চুপ করে ঘরে বসেছিলে কেন?
-আপনার ভালো লেগেছে ডিজাইনটা!
-শুধু আমার নয় অহনা, সবার পছন্দ হবে। ইয়োলো বেসের ওপর ব্ল্যাক আর রেড। দারুণ কনট্রাস্ট।
-আরও অনেক আছে। দেখবেন?
-অবশ্যই দেখব। কিন্তু এভাবে নয়। সারা দিন বাড়িতে বসে না থেকে এবার তুমি নিজের একটা বুটিক খুলে ফেল অহনা।প্রমিজ, ফার্স্ট কাস্টমার হ’বো আমি।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।