T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় অনিন্দিতা মিত্র

ঝরা পলাশের মালা
আজ হসপিটালের কাজ তাড়াতাড়ি মিটে গেছে। দুপুরে কোয়ার্টারে এসে লাঞ্চ সেরে কখন যে ঘুমের জগতে তলিয়ে গেছি জানি না। ঘুম ভাঙিয়ে দিল একটা কুবো পাখির মন ব্যাকুল করা ডাক। ঘুম ভাঙতেই চশমা আর মোবাইলটা হাতে তুলে নিলাম, ঘড়ি বলছে বিকেল প্রায় পাঁচটা। অন্যান্য সময় নিঃশ্বাস ফেলার সময় থাকে না, দিন এসে কখন যে রাত নামে বুঝতেই পারি না। একটু অবসর পেয়েছি, ভাবলাম হেঁটে আসি। কলকাতার ঝাঁ চকচকে হসপিটাল থেকে বদলি নিয়ে বাঁকুড়ার এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে আসা মা বোনেরা কেউ মেনে নিতে পারেনি। মাঝে মাঝেই ফোনে তিনজনেই ঝগড়া জুড়ে দেয়। আমার নাম ডাক্তার নীলাভ চন্দ্র। আমি একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করি। কোয়ার্টারের ঘরের দরজা বন্ধ করে বাইরে এলাম। এখন বসন্ত চলছে। ফুরফুরে হাওয়া বইছে। সামনেই শুশুনিয়া পাহাড়, পাহাড়ের তলার সমস্ত বনতল আলো করে ফুটে আছে থোকা থোকা পলাশ। এ যেন এক অন্য পৃথিবী! অনেক দিন পর পলাশের বনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি। চারপাশ পুরোপুরিই নিস্তব্ধ। একদল সবুজ বনটিয়া লাল পলাশের মধু খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। শালের বনের মধ্যে পড়ে আছে অজস্র হলুদ শুকনো পাতা। শনিবার রবিবার এই অঞ্চলে ট্যুরিস্ট আসেন, চারপাশ গমগম করে। ভাবলাম সামনেই শিউলিবোনা গ্রাম, একটু যাই। চেনাশোনা মুখ দেখলে একটু কথা বলে আসি, আমার এখন চল্লিশ অতিক্রান্ত। বাবা যখন চলে যান আমি তখন ডাক্তারির প্রথম বর্ষের ছাত্র। অনেক সংগ্রাম করে পড়াশোনা শেষ করতে হয়েছে, বোনদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়েছি একা। তারপর একটা সময়ের পর ঘর বাঁধার ইচ্ছেটাই চলে গেছে। ভাবলাম কাজ আর রুটস্যাক নিয়ে বেড়িয়ে বেড়িয়ে জীবন ঠিক কেটে যাবে। এখানকার মানুষজন ভীষণ সরল। বিকেল প্রায় শেষের পথে, চাষের কাজ সেরে লোকজন ঘরমুখী হচ্ছে। ছোট ছোট কুঁড়েঘরের ছাদে পেখম মেলে বসে আছে কুমড়ো অথবা লাউফুল। সামনেই উপজাতি মানুষজনের উৎসব আসছে, চোখে পড়ছে বেশ কিছু ধামসা, মাদল, বাঁশি। খানিকটা এগোতেই দেখলাম একটা ল্যাংটা বাচ্চা সলাজ মুখে দাঁড়িয়ে আছে, এখনও কৃত্রিমতা, জটিলতার আবর্ত ছুঁতে পারেনি। যেকোনো পাহাড়ের কাছে দাঁড়ালেই নিজেকে ভীষণ তুচ্ছ মনে হয়, বিশালত্বের কাছে নিজের সব অনুভূতি যেন হারিয়ে যায়। সূর্য ঢলতে শুরু করেছে শুশুনিয়ার মাথায়, গোধূলির নানা রঙ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে। অনেকক্ষণ ফোন দেখিনি,কেউ করেনি তো! খুলতেই দেখি কলিগ সম্রাটের তিন তিনটে মিসড কল। কল ব্যাক করতেই খুব রেগে উত্তর দিল,” নীলাভদা তুমি কোথায় বলো তো? কতবার ফোন করলাম! ” ” আমার তো ডিউটি শেষ হওয়ার পর কোয়ার্টারে এসেছি। কিছু হয়েছে রে?” ” আমাদের আবার ডিউটি আওয়ার! জানোই তো ! হুম গো, একজন মহিলাকে আনা হয়েছে, খুব ক্রিটিকাল অবস্থা, যাইহোক এত কথা ফোনে বলা যাবে না। প্লিজ এসো।” ফোন রেখেই ছুটলাম হসপিটালের দিকে। পলাশ গাছের ফাঁক দিয়ে অন্ধকার ক্রমশ নামছে পৃথিবীতে , মৃত পলাশের রঙে রেঙে লাল হয়ে আছে মাটি। পাখিরা ফিরছে ঘরে। হসপিটাল চত্বরে আজ ভিড় একটু কম, এখন ভিজিটিং আওয়ার চলছে। সিঁড়ির মুখে যেতেই ছুটে এলেন ডাঃ রায়। ” আপনি এসে গেছেন ডাক্তার চন্দ্র! একটা ক্রিটিকাল কেস এসেছে। পাহাড়ের খাঁজে ঝোরার তলায় একটা প্রেগন্যান্ট মেয়েকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে। দুজন ট্যুরিস্ট হসপিটালে এনেছেন। বেশ ব্লিডিং হচ্ছিল। ” সব শুনে বললাম, ” বাড়ির লোকজন কেউ নেই?” ” তেমন তো কাউকেই দেখিনি।” ” চলুন তো দেখি, কত নম্বরে আছেন?” ” সাত নম্বরে। চলুন যাই।” গিয়ে দেখলাম একজন মধ্য ত্রিশের মহিলা শুয়ে আছেন, গায়ে চাদর ঢাকা। মুখের ওপর চুল নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছে, তাই মুখ দেখা যাচ্ছে না। আমাকে রোগীর কাছে যেতে দেখেই নার্স সুজাতা মহিলার চুল সরিয়ে দিল। মুখটা দেখে কিছুটা থমকে গেলাম, স্মৃতির ধুলো সরিয়ে ঝেড়েঝুড়ে মনে মনে বিড়বিড় করলাম, ” সোফিয়া এখানে?” সোফিয়া নামটা মনে করলেই নস্টালজিয়ার মেশিন চড়ে যাই সেই কৈশোর আর প্রাক যৌবনের বেলায়। তখন আমরা হেঁদুয়ার কাছাকাছি একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। স্কটিশচার্চ স্কুলেই আমার পড়াশোনা, হেঁদুয়া পার্কের চার্চের আশেপাশেই সোফিয়ারা থাকতো। সোফিয়া আমার সেই বয়সের ভালোবাসার মুখ, সেই ছায়া আজকেও মনের মুকুরে দেখতে পাই। সোফিয়ারা ছিল বাঙালি খ্রিস্টান, লম্বা বিনুনি দুলিয়ে সোফিয়া যখন বেথুন স্কুলের ভেতরে ঢুকে যেত তখন আমার মনের অরণ্যে ভালোবাসার নুপূর ঝুমঝুম শব্দে বেজে যেত। আমরা শরৎকালে খুব ঘুড়ি ওড়াতাম। পাড়ার রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের রাস্তা ধরে ঘুড়ি নিয়ে ছুটতাম গলি ধরে। ঘুড়ি অনেক সময় গিয়ে পড়তো সোফিয়াদের ছাদে। যখন ঘুড়ি হাতে আমার সামনে দাঁড়াত চোখের পাতা না ফেলে সোফিয়ার চোখের দিকে চেয়ে থাকতাম। বন্ধুরা বলতো,” তুই একদিন সোফিয়ার বাবা জোসেফের হাতে মার খাবি।” কানেই তুলিনি। বড়দিনের সময় সারা পাড়ার মতো সোফিয়াদের বাড়িও আলোতে আলোতে ছেয়ে যেত। সেই আলোময় সন্ধেতে সোফিয়াদের বাড়ির সামনে দাঁড়াতাম। কখনও কখনও সোফিয়া এসে কাজলকালো চোখ মেলে বিস্ময়ে চেয়ে থাকতো। একটা দিনের কথা এই জন্মে ভোলা সম্ভব নয়। একদিন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, সিক্ত সোফিয়াকে দেখেছিলাম স্কটিশচার্চ কলেজের সামনে। চোখের পাতা লম্বা চুল দিয়ে ঝরঝরিয়ে বৃষ্টির জল পড়ছিল। চেয়েছিলাম আপন মনে, এখনও বুকে কান পাতলে ফেলে আসা সময়ের বৃষ্টির শব্দ শুনতে পাই। হঠাৎই একবার শুনলাম সোফিয়ারা চলে গেছে, খুব কষ্ট হয়েছিল। দুদিন পড়াশোনা বন্ধ করে রেখেছিলাম। তারপর সময় আর জীবনযুদ্ধের চাপে সবটাই স্মৃতির তাকে তুলে রেখে দিই।” নীলাভ, কিছু হয়েছে? এখন এত ভাবার অবকাশ নেই। পেশেন্টের অবস্থা একেবারেই ভালো নয়। ” উত্তর দিলাম ” ওটি রেডি করুন, যাচ্ছি।” ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলাম সন্ধে প্রায় শেষ হতে চলেছে। বুকের ভেতর উথালপাথাল করছে অজস্র কথার স্রোত। জীবন বড়ই বিচিত্র! আজকের সকালেও যখন হসপিটালে কাজ করতে এসেছি তখনও এক মুহূর্তের জন্যও বুঝতেই পারিনি যে বিকেলে জীবনের চিত্রনাট্য পরিবর্তিত হতে চলেছে, এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হতে হবে। আমরা যেই মানুষকে ভালোবাসি জীবনযুদ্ধের যাঁতাকলে সবসময় সেই মানুষকে পাশে নিয়ে হাঁটতে পারি না। আমরা মনে মনে এটাই চাই যে ভালোবাসার মানুষটার ভালো হোক। আজ এ কোন অবস্থাতে সোফিয়াকে দেখতে হচ্ছে! স্বপ্নে জাগরণে কখনও ভাবতেই পারিনি জ্ঞানহীন অচেতন সোফিয়াকে দেখবো। ” নীলাভ, মনে হচ্ছে পেশেন্ট পড়ে গিয়েছিলেন, হাঁটুর কাছে কাটা দাগ দেখে আন্দাজ করছি। ” ” শুধু তাই নয় স্যার আমি ভাবছি অন্য কথা। পেশেন্ট দীর্ঘদিন ধরেই শারীরিক নির্যাতনের শিকার। এই দেখুন। ” কথার ফাঁকেই সুজাতা সোফিয়ার পিঠ বুক আর গলার নলির কাছে আঘাতের দাগ দেখালো। ” এ তো সদ্য আঘাত লাগার চিহ্ন নয়। তার মানে সুজাতাই হয়তো…যাইহোক হাতে টেস্টের যতটুকু রিপোর্ট এসেছে তাতে বুঝলাম উনি প্রায় পাঁচ ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। বাচ্চাটা বাঁচার আর সম্ভবনাই নেই, মাকে বাঁচাতে হবেই। ” ডাক্তার রায়ের কথাগুলো শুনে মনের ভেতর যন্ত্রণার তরল স্রোত বয়ে গেল। তবে এখন এসব ভাববার সময় নেই, যত দেরি হবে তত কেস ক্রিটিকাল হবে। ওটির আলো জ্বলে উঠলো। শুরু হলো ছুরি কাঁচির যুদ্ধ। চারপাশে শুধু রক্ত আর স্যালাইনের ড্রপের শব্দ। সোফিয়ার ফ্যাকাসে মুখটার দিকে তাকাতে পারছি না, বুকের ভেতরটা বারবার মোচড় দিয়ে উঠছে। খানিকটা সময়ের পর মৃত প্রাণটাকে বের করা গেল। মনে মনে বললাম, ” আজ যদি চিত্রটা অন্যরকম হত তাহলে একটা সজীব প্রাণ পৃথিবীর আলো দেখতো।” জীবন যে কোন মুহূর্তে কোন দিকে মোড় নেয় আমরা বুঝি না। সোফিয়া ক্রমশ সুস্থতার পথে এগোচ্ছে। ভেতর ভেতর একটা চরম অস্বস্তি লাগছে, কাউকেই বলতেই পারছি না। চরম অস্থিরতা অনবরত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ” নীলাভ, তুমি একটু রেস্ট নাও, তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে। আমরা বাকিটুকু করছি।” ডাক্তার রায়ের কথা শুনে পাশের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। চারপাশ শুনশান, অন্ধকার। মহুল ফুলের গন্ধ পাচ্ছি। আকাশটা তারায় তারায় ছেয়ে আছে, কেউ যেন হীরের মালায় সাজিয়ে রেখেছে। মনের সাগরে আছড়ে পড়ছে অসংখ্য প্রশ্নের ঢেউ। সোফিয়া হেঁদুয়া থেকে চলে যাওয়ার পর ওর জীবন কেমন ছিল? কে মেরেছে? এখানে সোফিয়া কেন এসেছিল? ” স্যার, স্যার। ” পিছনে তাকাতেই দেখলাম সুজাতা ডাকছে। ” ম্যাডামের জ্ঞান এসেছে। বাচ্চাটার কথা শুনেই অসম্ভব কাঁদছেন। আপনি যাবেন?” ” তুমি যাও অন্য কাজে। দেখছি।” সিগারেটটা ফেলে খানিকক্ষণ ভাবতে লাগলাম যে যাওয়া ঠিক হবে কিনা। আমাকে দেখে যদি সোফিয়া আবার অসুস্থ হয়ে যায় তখন তো সব শেষ হয়ে যাবে? দ্বিধা কাটিয়ে ভাবলাম চলেই যাই। অর্ধ ঘুমন্ত সোফিয়ার মাথায় হাত রাখলাম। ” সোফিয়া, চিনতে পারলে? ” সোফিয়া ধড়ফড়িয়ে ওঠার চেষ্টা করলে বললাম, ” শুয়ে থেকেই বলো। একেবারেই উঠবে না।” আমার দিকে কয়েক পলক চেয়ে সোফিয়া উত্তর দিল ” তুমি আমাদের হেঁদুয়ার নীলাভ না? ” ” একবারেই ঠিক বললে।” ” ওই সময়টাকে আমি স্মৃতির আলমারির মধ্যে অতি যত্নে তুলে রেখেছি গো, তারপর থেকেই আমার জীবনে দুর্যোগ আর দুর্ভোগের অন্ত নেই। ” ” সোফিয়া, তুমি এখানে হঠাৎ ? তবে এখন তুমি খুব দুর্বল, না হয় পরে বলো।” ” আমি এখনই বলবো। আমার কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে না। ” ভাবলাম বাচ্চার কথাটা সোফিয়া না তুললে উত্থাপন করবো না, যন্ত্রণা বাড়িয়ে লাভ নেই। ” আস্তে আস্তে বলো। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। ” “হেঁদুয়া ছেড়ে আমরা কাঁকুড়গাছির দিকে চলে যাই। কিছুদিন ভালোই চলছিল। হঠাৎই বাবার ক্যান্সার ধরা পড়ে। একদিন শীতের রাতে বাবা চলে যায়। বাবা একটা বেকারি কোম্পানিতে খুব সামান্য কাজ করত। তেমন টাকাপয়সাও ছিল না। আমি তখন কলেজে পড়ি। ভাইটাও ছোট ছিল। মা সেলাইয়ের কাজ আর কেক তৈরি করে সংসার চালানোর চেষ্টা করত। আমি দেখলাম আমাকে দাঁড়াতেই হবে। কলেজের পড়া শেষ করে একটা মিশনারি স্কুলে জব নিলাম। দীর্ঘ বছর এভাবেই চললো। দুর্ঘটনা আমাদের পিছু ছাড়লো না। কলেজে থেকে ফেরার পথে এন্টালির কাছে বাসের ধাক্কায় ভাইয়ের প্রাণ গেল। মা শয্যাশায়ী হলো, শোকের ভার আর নিতে পারলো না। তখনই আমার সঙ্গে ডেভিডের আলাপ হয়। জীবনযুদ্ধে বিধ্বস্ত আমি তখন ডেভিডের হাতটা ধরে, তখন বুঝিনি কোন সর্বনাশ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা বিয়ে করি। কিছুদিন পর জানতে পারি জুয়া ছাড়াও এমন কোনো নেশা নেই যে ডেভিড করে না। জুয়া খেলে যাবতীয় টাকাপয়সা সব যায়। আমার প্রথম বাচ্চাটাও নষ্ট হয়ে যায়। তারপর আমার কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য ডেভিড মারধোর শুরু করে। একে একে সব গয়না শেষ সম্বলটুকুও চলে যায়। মা যতদিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল শুয়ে থাকলেও কানে শুনতে না পারলেও জানতাম পৃথিবীতে একটা আশ্রয় আছে। কিছু মাস আগে মাও চলে গেল, সব হারালাম। এদিকে ক্রমশ ডেভিডের সঙ্গে একই ছাদের তলায় থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল, অত্যাচার মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। কিছুদিন আগে জানতে পারি আমি আবার প্রেগন্যান্ট হয়েছি। ডেভিড টাকা আদায়ের জন্য আরো হিংস্র হয়ে একদিন আমার গলা টিপে ধরে। তখন আমি বুঝি যে ওখান থেকে না বেরোতে পারলে সন্তানটা বাঁচবে না। এখানে একটা স্কুলের খোঁজ আমার এক বন্ধু এলিজাবেথ দেয়। স্কুল আর আশ্রমের খোঁজ করতে গিয়ে জঙ্গল আর পাহাড়ের মধ্যে রাস্তা হারিয়ে ফেলি। তারপর পড়ে যাই….” কথাগুলো শেষ করতে না করতেই সোফিয়া ঘুমের ঘোরে চলে গেল।
অবসন্ন শরীর আর মন নিয়ে কোয়ার্টারে যখন ঢুকলাম তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ঘরের জাফরি দিয়ে ঢুকতে শুরু করেছে ভোরের আলো। হঠাৎই সুজাতার ফোন, ” স্যার সাত নাম্বারের পেশেন্ট বেডে নেই। আমরা সারা হসপিটাল খুঁজলাম, পাওয়া যায়নি।” ” মানে!” ফোন কেটে উদভ্রান্তের মতো ছুটলাম, মনে হচ্ছে পায়ের তলার মাটি, অন্তরীক্ষ, পাহাড়, জঙ্গল সবটাই দুলছে। বুকের ভেতর দপদপ করছে হাজারো অনুচ্চারিত অনুভূতি। হঠাৎই দেখলাম পলাশের বনের মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে কেউ হাঁটছে, মুখের একপাশ দেখে বুঝলাম সোফিয়া। চিৎকার করলাম “সোফিয়া”। দৌড়ে গেলাম সোফিয়ার কাছে। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে সোফিয়া বললো, ” আমার সব সব গেল নীলাভ, মা, সন্তান সব সব। চারপাশ শূন্য….” চুম্বক যেমন লোহাকে টানে তেমনই চিরন্তন টানে জড়িয়ে ধরলাম সোফিয়াকে। আমার ঠোঁট অজান্তেই ছুঁলো সোফিয়ার কপাল। সূর্যের আলো গলে পড়ছে পলাশের রেণুতে। নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর হচ্ছে পৃথিবী।
“এই জন্মে এমন একদিন নিশ্চয়ই আসবে যেদিন পলাশ বনের ছায়ায় হাতে হাত ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বসবো দুজনে, পৃথিবীর সব কথা আমাদের মধ্যিখানে এসে থেমে যাবে। আমাদের ভালোবাসার সঙ্গী থাকবে আকাশ, ঝরনা ,পাহাড় আর নীল নক্ষত্ররা। পলাশের আবীর রঙ ধুয়ে দেবে আমাদের হৃদয়, তোমার দেওয়া চুম্বনের নির্যাসটুকু নিয়ে কাটিয়ে দেবো জীবন।”