T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় অমিত মজুমদার

লুটেরা

শরৎকাল মানেই দুর্গোৎসবের সূচনা। নীল রঙে নিজেকে সাজিয়ে নেয়ার জন্য আকাশ ভীষণ আগ্রহ নিয়ে এই সময়ের অপেক্ষায় থাকে। তুলোর মতো সাদা মেঘ ছাড়া যেমন শরতের আকাশ কল্পনা করা যায় না ঠিক তেমনই আর একটা জিনিস ছাড়া এই নীল আকাশ পূর্ণতা পায় না। সেই জিনিসটার নাম ঘুড়ি। অনুমান করা হয় ২৮০০ বছর আগে চীন দেশে এই ঘুড়ির আবির্ভাব হয়। পরবর্তীতে তা এশিয়া মহাদেশের ভারত, বাংলাদেশ, জাপান, কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। আরও অনেক পরে তা ছড়িয়ে যায় ইউরোপেও। আমাদের ছোটোবেলার একটা উল্লেখযোগ্য উপাদান ছিলো এই ঘুড়ি। সুতো বাঁধা ছোট্টো একটা কাগজের খণ্ডই জীবনের সঙ্গে ভীষণভাবে জড়িয়ে গেছিলো।
আমার ছোটোবেলা কেটেছে গত শতাব্দীর আটের দশকে। তখন হুগলি জেলার উত্তরপাড়াতে থাকতাম। সেই সময় আমাদের খেলা বলতে ফুটবল, ক্রিকেট। গাভাসকার, কপিল দেব, পেলে মারাদোনা তখন আমাদের আয়ডিয়াল হিরো। ক্রিকেট খেলা হতো শীতকালে আর ফুটবল খেলা হতো শীত বাদে বছরের বাকি সময়। কাবাডি খেলাটাও চালু ছিলো তবে খুব কমজনই কাবাডি খেলতো। অবসর সময় কাটানোর জন্য ছিলো ক্যারাম, দাবা। আর একটা সিজনাল খেলা ছিলো। সেটা ঘুড়ি ওড়ানোর খেলা। ঘুড়িতে ঘুড়িতে প্যাঁচ লাগানোর খেলা। ঘুড়ি বস্তুটাই আমার কাছে ছিলো ভীষণ আকর্ষণীয়। সাধারণ সুতো দিয়ে একটা ঘুড়িকে আকাশে উড়িয়ে ইচ্ছেমতো নাচানো যায়। ঘুড়ি কিনতেও খরচ খুব অল্প। সেটুকুও না জুটলে বানিয়ে নেবার ব্যবস্থা ছিলো। কাগজ ঝাঁটার কাটি জিউলির আঠা দিয়ে দিব্যি বানিয়ে নেয়া যায় ঘুড়ি। লাটাই কেনা সম্ভব না হলে সেটাও কেনার দরকার নেই। একটা মোটা কাঠিতে সুতো পেঁচিয়ে রাখলেই হলো। তবে সুতোটা কিনতে হতো। মাঞ্জা দেবার জন্য দরকার হতো এরারুট, সাবু, কাচগুঁড়ো। কাচগুঁড়ো যোগাড় করা কোনো ব্যাপার ছিলো না। বনে বাদারে ঘুরলেই লোকজনের ফেলে দেয়া কাটা বালব পাওয়া যেতো৷ সেগুলো কুড়িয়ে এনে সামান্য শ্রম দিলেই সুন্দর গুঁড়ো তৈরী। এরপর ঘুড়ি সুতো সবই প্যাঁচ খেলার জন্য তৈরী। মাঞ্জা আবার দুই রকম। টানা মাঞ্জা আর ছাড়া মাঞ্জা। টানা মাঞ্জা দিলে প্যাঁচ খেলার সময় সুতোটা বেশ কায়দা করে টানতে হবে। আর ছাড়া মাঞ্জা দিলে প্যাঁচ খেলার সময় বেশ খেলিয়ে খেলিয়ে লাটাই থেকে সুতো ছাড়তে হবে। বেশীরভাগ মাঞ্জাই হতো সাদা। কেউ কেউ আবার সামান্য রং মিশিয়ে দিতো। সুতোর রঙ হয়ে যেতো লাল, নীল। সেই সময় বর্তমান সুতোর খুব চাহিদা ছিলো। অনেকে চেন সুতোও ব্যবহার করতো। ঘুড়িরও ছিলো নানা রকম নাম। ময়ুরপঙখী, লাট্টু, মুখপোড়া, পেটকাট্টি, চাঁদিয়াল আরও কত সব নাম। সেই সময় ঘুড়ি ওড়ানোর ভয়াবহ উন্মাদনা ছিলো। ছোটোদের সঙ্গে বড়রাও ঘুড়ি ওড়াতেন। অনেকে তো নিজের বাড়ির ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়াতেন। তবে কেটে যাওয়া ঘুড়ির পেছনে দৌড়াতো শুধু ছোটোরাই। আকাশে তাকালেই দেখা যেতো পরিযায়ী পাখিদের মতো শুধু ঘুড়ি আর ঘুড়ি৷ কখনও কখনও তো মনে হতো গোটা আকাশ ঢেকে গেছে ঘুড়িতে। এক আকাশের আনাচেকানাচে ঘুড়ির প্যাঁচ খেলা চলছে। প্যাঁচ খেলা দেখার মজাটা ক্রিকেট বা ফুটবল দেখার মজার চেয়ে কোনো অংশে কম না। পথ চলতি প্রচুর লোক তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘুড়ির লড়াই দেখতো। অনেক সময় তো দর্শক ভাগ হয়েও যেতো দুই দলে। ঘুড়ি উঠছে আবার নামছে আবার কখনও ডানদিক কখনও বামদিক ঘেঁষে সরে যাচ্ছে। যেনো কোনো বিখ্যাত ফুটবলার বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের ডজ করে বল পায়ে এগিয়ে চলেছে গোলের দিকে। কোথায় লাটাই আর কোথায় ঘুড়ি। লাটাই থেকে অনেক অনেক পথ পেরিয়ে গেছে ঘুড়ি৷ অথচ তার রিমোট কন্ট্রোল রয়েছে লাটাইম্যানের হাতে।
ঘুড়ি ওড়ানোর বিষয়ে এত কিছু জানলেও আমি কিন্তু ঘুড়ি কোনোদিনই ওড়াতে পারতাম না। তবে ঘুড়ির প্রতি আকর্ষণ ছোটোবেলা থেকে খুবই বেশী ছিলো। উত্তরপাড়া হিন্দমোটর এলাকায় বিশ্বকর্মা পুজোর সময় খুব ধুম হতো। পুজোর কিছুদিন আগে থেকেই আকাশে ঘুড়ি দেখা যেতো৷ আমার বন্ধুরা খুব সুন্দর ঘুড়ি ওড়াতে পারতো কিন্তু আমি একদমই পারতাম না। কিন্তু ঘুড়ির পেছনে খুব দৌড়াতাম। প্যাঁচ খেলে কেটে যাওয়া মানেই ভোকাট্টা। আর সেই ভোকাট্টা ঘুড়ির পেছনে দৌড়ানোর একটা প্রতিযোগিতা ছিলো। যে আগে ধরতে পারে সেই ঘুড়ি তার। অনেকেই বাঁশের লম্বা লম্বা লগা নিয়ে ঘুড়ির পেছনে দৌড়াতো। দৌড় দেখে মনে হতো সবাই ম্যারাথন রেসে নেমেছে। সেই সময় আমিও যে পরিমাণ দৌড়েছি সেটা স্কুলের স্পোর্টসে দৌড়াতে পারলে নির্ঘাত একটা প্রাইজ পেতাম৷ ঘুড়ি কেটে গেলে তার গুরুত্ব যেনো বেড়ে যেতো। কেটে যাওয়া ঘুড়ি ধরাকে পাতি বাংলায় লুট বলা হতো। ঘুড়ির লুঠ। আমরা ছিলাম সেই লুটেরা। আমি অবশ্য ঘুড়ি লুট করার ব্যাপারে খুব একটা পারদর্শী ছিলাম না। কিন্তু কোথাও দুই ঘুড়ির মধ্যে প্যাঁচ লাগছে দেখলেই তৈরী হয়ে যেতাম সেটা ধরার জন্য। ঘুড়ি কাটলেই বনবাদাড় মাঠঘাট পেরিয়ে শুধুই ছুট। ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কাটা ঘুড়ি আর নীচে চিৎকার করতে করতে ছুটে যাওয়া লুটেরাদের দল। একবার এমন এক কাটা ঘুড়ির পেছনে দৌড়ে বেশ খানিকটা যাবার পর আবিষ্কার করি দৌড়ানোর সময় আমার চোখ ছিলো আকাশের দিকে আর আমি দৌড়েছি বিছুটি পাতার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই পায়ে চাকা চাকা দাগ। কিন্তু ঘুড়ি লোটার দৌড় শেষ হয়নি। এই ঘুড়ি লুটের সময় প্রতিযোগী বেশি থাকলে সাধারণত ঘুড়ি কেউ হাতে পেতো না। লগার লড়াইয়ে ঘুড়ি ছিঁড়ে ফর্দাফাই হয়ে যেতো। আমি এই প্রতিযোগিতায় দৌড়ে কোনো দিন একটা ঘুড়ি লুটতে পারিনি। তবে মাঝে মধ্যে কাটা ঘুড়ির সঙ্গে লেগে থাকা সুতো কিছুটা ছিঁড়ে নিতে পারতাম। সেই সুতো দিয়ে আমরা ঢিলপ্যাঁচ খেলতাম। ঘুড়ির প্যাঁচের সঙ্গে ঢিলপ্যাঁচ খেলাটাও সেই সময়ে জনপ্রিয় ছিলো। সামান্য সুতোয় ডগায় ছোট্টো ঢিল বাঁধা হতো। তারপর একজনের সুতোয় বাঁধা ঢিলের সঙ্গে অন্যজনের সুতোয় বাঁধা ঢিলের প্যাঁচ লাগানো হতো। তারপর দুই তরফ থেকে হ্যাঁচকা টান। যার ঢিল সুতো থেকে ছিঁড়ে যেতো সে পরাজিত হতো। খুব জানতে ইচ্ছে করতো বিশ্বকর্মা পুজোর সময়েই এত ঘুড়ি ওড়ানো হয় কেনো। শুনেছিলাম বিশ্বকর্মা নিজেও নাকি ঘুড়ি ওড়ান। কোনো কোনো বিশ্বকর্মার হাতেও ঘুড়ি আর সুতোও দিতে দেখেছি।
আমাদের অনেকেরই যখন তখন ঘুড়ি কেনার পয়সা থাকতো না। আমরা কাগজ কেটে ঘুড়ি তৈরী করতাম। বেশীরভাগ সময়ে খবরের কাগজই কাটা হতো। কখনো বা একটা লম্বা লেজও লাগিয়ে দেয়া হতো। ঘুড়িতে একটু আধটু ছিঁড়ে গেলেও আঠা দিয়ে তাপ্পি মারা হতো। কখনও ঘুড়ির ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য কাটির মধ্যে ছোটো করে পাকানো কাগজ পেঁচিয়ে দেয়া হতো। কাগজ ছাড়াও অনেক সময় পলিথিন প্যাকেট কেটেও ঘুড়ি বানাতাম। এই বিষয়ে ঘুড়ি কেনার একটা স্মৃতি মনে পড়ে। তখন ঘুড়ির দাম ছিলো তিরিশ পয়সা। আমি তিরিশ পয়সা যোগাড় করে ঘুড়ি কিনতে গিয়ে দেখি সেদিনই দাম বেড়ে পঁয়ত্রিশ পয়সা হয়েছে। এই পাঁচ পয়সাও সেই সময় কিন্তু অনেকটাই। সেদিন ফিরে এসে পরের দিন পঁয়ত্রিশ পয়সা যোগাড় করে ঘুড়ি কিনতে গিয়ে দেখি সেদিন সব ঘুড়ির দাম চল্লিশ পয়সা। সেদিনও ফিরে আসি। তারও পরের দিন চল্লিশ পয়সা যোগাড় করে ঘুড়ি কিনতে গিয়ে দেখি দাম আরও বেড়ে পঞ্চাশ পয়সা হয়েছে৷ সেদিনও ফিরে আসছিলাম। কিন্তু আমাকে দেখে দোকানদারের বোধহয় মায়া হলো। তিনি চল্লিশ পয়সা নিয়েই আমাকে একটা ঘুড়ি দিয়েছিলেন। পরে আবিস্কার করি ঘুড়ির ফিটিংস ঠিক নেই। সম্ভবত কম দামের অবিক্রীত ঘুড়ি। কিন্তু তাতে কি ? আমি তো ঘুড়ি ওড়তেই পারি না। আমার কাছে তো সব ঘুড়িই সমান। সেই ঘুড়িই সুতোয় বেঁধে জোরে দৌড়াতাম। পেছনে কয়েক ফুট দূরত্বে এক মানুষ উচ্চতায় উড়তো আমার ঘুড়ি। বন্ধুরা দেখে হাসতো। অনেকেই খ্যাপাতো। কিন্তু কি করবো। ঘুড়ি ওড়ানোর দৌড় তো আমার ওই পর্যন্তই ছিলো। ওইটুকু উড়িয়েই যা আনন্দ পেয়েছি তা আজ অনেক কিছুর মধ্যেই পাই না। বিশেষ করে বর্তমান প্রজন্মের বেশীরভাগ ছেলেই মাঠেঘাটে ঘুরে ঘুড়ি ওড়ানো আর ঘুড়ি লোটার আনন্দ কোনোটাই অনুভব করতে পারে না। আমি নদিয়াতে থাকি। আমাদের এলাকার মধ্যে অন্তত দশ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে আমি এখনও একটা ঘুড়িও উড়তে দেখিনি। এমনকি গ্রামের ছেলেরাও বোধহয় ঘুড়ি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এটা ভীষণই দুঃখজনক। আমাদের ছেলেবেলার ঘুড়ি যেনো ভোকাট্টা হয়ে উড়ে যাচ্ছে সাত সমুদ্র পেরিয়ে অথচ তাকে ধরার জন্য একজন লুটেরা আর অবশিষ্ট নেই।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।