T3 || স্বাধীনতার খোঁজে || বিশেষ সংখ্যায় আলোক মন্ডল

স্বাধীনতার ৭৫ বছর- অকপট কিছু কথা

১৯৭২ স্বাধীনতার ‘রজতজয়ন্তী’ বছরে মানে আমার কৈশোরে একটা গান হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে গাইতাম সেটা হোল,”এই দেশ এই দেশ আমার এই দেশ / এই মাটিতে জন্মেছি মা / জীবন মরণ তোমার শরণ / তোমার চরণ ধূলি দাও মা..” সারা গান জুড়ে ছিল দেশের ঐতিহ্য আর দেশপ্রেমের কাহিনি যা আবেগে উদ্বেলিত করত কিশোর হৃদয়কে। আজ স্বাধীনতার প্লাটিনাম বর্ষে সেই আবেগ সেই উন্মাদনা বার্ধক্যের নিস্তরঙ্গে একেবারে নেই বললেই চলে। নেই, কিন্তু কেন নেই? এ কি শুধু বার্দ্ধক্যের অনুভব শিথিলতা, ভাবনার একঘেয়েমি থেকে দূরে সরে থাকা? না কি রাষ্ট্র পরিচালকদের কু-কর্মের ফলশ্রুতি? আমার তো মনে হয় দ্বিতীয়টাই এর মূল ও প্রধান কারণ।
সাতের দশক পর্যন্ত যা কিছু সবই ছিল আশা জাগানো। কৃষি সেচ শিল্প শিক্ষার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা-সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। রাজন্য ভাতা বিলোপ,ব্যাঙ্ক, এল আই সি,জলপথ ও বিমান পরিবহন,রেলপথ, কোলিয়ারি,খনিজ তেল ব্যক্তি পুঁজির হাত থেকে কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রীয় করণ। রাষ্ট্রের উদ্যোগে শিল্প কাঠামো গড়ে তোলা। নিম্নবিত্তদের আবাসিক পরিকল্পনা, কৃষি উন্নয়ন জলসেচ ও নদীবাঁধ নির্মান,জনস্বাস্থ্য, জনশিক্ষা।সব কিছুর মধ্যে ছিল দেশ ও দেশের জনতার কথা চিন্তা করে কর্মসূচি নির্মান,ছিল আশা, ছিল স্বপ্ন বাস্তবায়নের সদিচ্ছা। ছিল নতুন দেশ ও শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের উদ্দাম আন্দোলন। কৈশোর থেকে যৌবন ছিল এই স্বপ্ন ও উন্মাদনায় ভরা।
তারপর যতই জীবনের সূর্য পশ্চিম দিগন্তমুখী – প্রৌঢ় ও বার্ধক্যগামী ততই স্বপ্ন ভাঙার বেদনা , মনখারাপ আর বিতৃষ্ণার ঊর্ধ মুখী রেখাগ্রাফ! দেশ মা আজ ভাতৃঘাতী বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে ন্যুব্জ, এখন দেশের মানুষের চেয়ে আজ বড় পৌরাণিক কল্পিত চরিত্রের বাসভবনের বাস্তবায়ন! আশ্চর্য হয়ে যাই, রাষ্ট্র আজ সেচ-বাঁধ নির্মাণ করে না, নির্মাণ করে মন্দির! কল-কারখানা গড়ে তোলে না, কোটি-কোটি টাকা খরচ করে বিভেদী-মানসিকতায় তৈরী করে সর্বোচ্চ স্ট্যাচু! আর তা করতে গিয়ে আদিবাসী দলিত মানুষকে তাঁদের জমি থেকে নির্বিচারে উৎখাত করে। এর জন্য সর্বোচ্চ আদালতকেও কাজে লাগাতে দ্বিধা বোধ করে না। সেতু নির্মিত হয় না,বিদ্যালয় নির্মিত হয় না,নির্মিত হয় এক তথাকথিত লৌহ মানবের মূর্তি! বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে দেখি কোন রকম পরিকল্পনা না করেই লকডাউন ঘোষণা করা তার ফলশ্রুতিতে কর্মচ্যুত লক্ষ-লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের জীবন। হাজার জাজার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফেরা,নিরাশ্রয় পরিযায়ী শ্রমিকের রাতের ঘুমের জন্য নিরাপদ রেলপথ বেছে নেওয়া আর তার করুন পরিনতি! অবাক নয়নে দেখি, সরকার লাভজনক রাষ্ট্রীয় “পঞ্চরত্ন”কে জলের দরে বিকে দেয় দেশি-বিদেশি বেনিয়ার হাতে। কর্ম বিনিয়োগের কোন পরিকল্পনা নেই।বছর বছর কোটি-কোটি মানুষ বেকার কর্মহীন। গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো তার উপরে বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে কর্মী সংকোচন ও ছাঁটাই। শিক্ষা আজ আর সকলের জন্য নয়, বেনিয়ারা কিনে নিয়েছে পবিত্র এই অঙ্গনটিকে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ভরা শিক্ষার ব্যবস্থা করে শিক্ষাকে আজ ধনী ও অভিজাতদের জন্য সীমিত করে তুলেছে, সেখানেও ফেল কড়ি মাখো তেল! যাঁর কড়ি আছে সেই ফেলবে, গরীবেরাও সেই ফাঁদে কখনো বা পা ফেলছে জমি-জমা সব বিক্রি করে বা বন্ধক দিয়ে। শেষ পর্যন্ত টানতে না পেরে দীর্ঘ হতাশা কিংবা আত্মহত্যা। সরকারী শিক্ষা প্রায়ই উঠতে বসেছে। সরকারী হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকরী অসংখ্য সফিটিকেটেড হাসপাতাল,সেখানেও ফেল কড়ি! সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুলির উন্নতি না ঘটিয়ে স্বাস্থ্যবীমা কার্ড চালু করে বেসরকারী পুঁজির মেদ বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে রাষ্ট্র। প্রমোটার সিন্ডিকেটের হাতে রাষ্ট্রের সব কর্মসূচি। সব দায় ঝেড়ে ফেলে আজ শুধু দেশটাকে একভাষা, এক ধর্মের, এক সংস্কৃতির দেশে পরিণত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। নানা ভাষা, নানা মত, বিবিধের মাঝে মিলনের ঐক্যের আজ বড় অভাব। স্বাধীনতার স্বপ্ন ভেঙ্গে চৌচির- দেশাত্মবোধ আজ কোন অতলে তলিয়ে গেছে! প্রাদেশিকতা কী গভীরে শিকড় গেড়েছে তার প্রমান পাই সম্প্রতি আসাম-মেঘালয় দুই রাজ্যের সীমান্ত সংঘর্ষের কথা ভাবলে। মুক্ত বাণিজ্যের অবাধ বিস্তারের ফলে ও প্রযুক্তির অবাধ নিয়োগের ফলে মানুষের মূল্যবোধ আজ ন্যায়নীতির উপর দাঁড়িয়ে নেই,আছে ভোগবাদী আত্মমগ্নতায় আচ্ছন্ন।
স্বাধীনতার ৭৫ বছরে এসে অবাক ও অসহায় হয়ে দেখতে হোল কেমন করে দেশের পার্লামেন্টকে এড়িয়ে এবং অগ্রাহ্য করে স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে রাতের অন্ধকারে সৈন্য বাহিনী দিয়ে একটা রাজ্যের গণতান্ত্রিক সরকারকে ফেলে তার স্বাধীনতাকে দু’পায়ে দলিত করে,রাজ্যের নেতাদের জামিন অযোগ্য ধারায় বন্দি করে কেন্দ্র শাসিত রাজ্যে পরিণত করল! গণতন্ত্র আজ পূর্ণতই বিপন্ন,সরকারী কাজের সমালোচনা করলে,শোষণের বিরুদ্ধে লিখলে বন্ধি হতে হয়,অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললে প্রাণ দিতে হয়। মুক্ত চিন্তার পরিসর বড়ই সংক্ষিপ্ত। বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে আজ সরকারী দলের এক সম্প্রদায়ের শিক্ষাচিন্তা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ও ইতিহাস বিকৃত করার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন হলে তাকে দেশদ্রোহী চিহ্নিত করে জামিন অযোগ্য ধারায় বন্দি করা,গুপ্ত খুন,বিনা বিচারে নির্বিচারে আটকে রাখা, জেলখানায় জামিনের সুযোগ না দিয়ে, চিকিৎসার সুযোগ কেড়ে নিয়ে হত্যা আজ রাষ্ট্রের একটি সাবলীল অভ্যেস পরিণত হয়েছে।ফলতঃ স্বাধীনতা দিবস আজ অর্থহীন স্বাদহীন একটি দিবস মাত্র! এখানে প্রশ্ন করা যাবে না প্রধানমন্ত্রীর ‘ ত্রাণ তহবিল’ থাকা সত্ত্বেও কেন ‘পি.এম কেয়ার্স ফান্ড’? কেন তা অডিটের বাইরে রাখা হোল?প্রশ্ন করা যাবে না এই ফান্ডে কত টাকা এল, কে কত টাকা দিল, কত খরচ হোল,কোথায় খরচ হোল? তা হলে কিসের স্বাধীনতা!কেন প্রশ্ন করা যাবে না বিদেশী শক্তি আমাদের দেশের কতটা জমি দখল করে রেখেছে? কেন প্রশ্ন করা যাবে না একই দেশে থেকে অন্য রাজ্যে যেতে হলে কেন সরকারী অনুমতি লাগবে? কেন প্রশ্ন তোলা যাবে না,সংবিধানে রাষ্ট্র একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষিত থাকলেও প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠ থেকে এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ধর্মাচরণ করবেন? কেন ধর্মীয় উন্মাদনা জাগিয়ে শাহি-গঙ্গাস্নান করবেন এবং তা ফলাও করে সমস্ত মিডিয়ায় প্রচার করা হবে বা ভুল মন্ত্র উচ্চারণ করে দুগ্গাপুজা করবেন? কেন গো-মাংস খাওয়ার অপরাধে বা গো-মাংস বিক্রির অপরাধে গণ-প্রহারে মৃত্যুকে মেনে নিতে হয়? কেন ক্রিশ্চান যাযক কে পুড়িয়ে মারা হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর যখন আসে না তখন মনে হয় ৭৫ বছরের বৃদ্ধ স্বাধীনতা শুধু বয়সের ভারেই ভারাক্রান্ত নয়,মনের দিক থেকেও অনুর্বর- নিস্তেজ হয়ে গেছে অনেকটাই!
স্বাধীনতার ৭৫ বছরে তাই সোচ্চারে বলতে চাই, সবার জন্য কাজ চাই! দয়া নয় ভাতা নয়, মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই!
ধর্ম নয়- রুটি চাই! বাজার অর্থনীতি নয়- রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাজার চাই! শিল্প চাই- কৃষি চাই! চাই বল, চাই স্বাস্থ্য – চাই শিক্ষা আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।