গল্পেসল্পে অরবিন্দ মাজী

কাঁটাতারের বেড়া

নাসিমা নাসরিন বাংলাদেশের উঠতি সম্ববনাময় লেখিকা, বাড়ি দিনাজপুর জেলার সীমান্তবর্তী একটি গ্রামে। বালুরঘাটের খুব কাছাকাছি। এদিকে এই বাংলার একজন সম্ভবনাময় লেখক অরূপের বাড়ি বালুরঘাটের পাশের একটি গ্রামে। লেখালেখির সুত্রে দুজনেই দুজনের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানে, তবে সাক্ষাতে কথা বলার সুযোগ হয়নি ওদের, বাধা সীমান্তের কাঁটাতার। অথচ দুজনের বাড়ির দূরত্ব খুব বেশি হলেও তিন কিলোমিটারের বেশি নয়।
দুজনের প্রবল আগ্রহ দুজনের মধ্যে সাক্ষাৎ হোক কিন্তু দুজনেই নিরুপায়,বাধা ঐ কাঁটাতার,দুষ্কৃতীদের জন্য ওটার দরকার আছে ঠিকই, কিন্তু লেখক- লেখিকাদের জন্য কিংবা সাংস্কৃতিক জগতের মানূষজনদের জন্য ওটার দরকার কতখানি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলায় যেতে পাসপোর্ট ও ভিসার দরকার, সেটা করতে গেলে নাসরিনকে ঢাকায় এবং অরূপকে কলকাতা দৌড়াতে হবে এবং পাঁচ সাত দিন লাগতেও পারে, কাজেই টাকা পয়সা খরচের একটা ব্যাপারও রয়েছে। দুজনেই মাষ্টার ডিগ্রি অর্জন করার পরও সুদীর্ঘ দিন বেকারত্বের যন্তনার ভূগছে, কাজেই পাসপোর্ট ও ভিসার ব্যাবস্থা করা ওদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
দুদেশের বিভিন্ন সাহিত্য গোষ্ঠীতে দুজনেই তাদের লেখা পোস্ট করে , সনদও জুটে যায়, সেখানেই একে অপরের লেখায় কমেন্ট করার সুত্রে সম্পর্কেটা আরও গভীরতা লাভ করেছে। ইদানীং মোবাইলে দুজনের মধ্যে কথাবার্তাও হয়, তবে আই, এস, ডির খরচও খুব বেশি বলে বেশি কথাবার্তা বলা হয় না, একদিন মোবাইলে দুজনেই ঠিক করলো বালুরঘাটের পাশে ডাংগি বডার্রে এসে দূরে থেকেই দুজনেই দুজনকে দেখবে।
ঠিক সেইমতো একটি নির্দিষ্ট দিনে বিকেল চারটের সময় আগে থেকেই ঠিক করা জায়গায় গিয়ে দুজনেই দুজনকে হাত নাড়িয়ে স্বাগত জানাছিলো, ঠিক সেই সময়ে জনাদুয়েক বি, এস, এফ কর্মী এসে অরূপকে জিজ্ঞেস করলো – কি ব্যপার – এখানে থেকে হাত নাড়িয়ে কাকে কি বলতে চাইছো, কোন বদ মতলব আছে বুছি।
– না স্যার, কোন বদমতলব নেই।
– তাহলে এতো দূর থেকে হাত নাড়িয়ে কাকে কি বলতে চাইছো?
– অরূপ সব সত্যি কথা খুলে বললো ঐ অফিসারদের।
– সব শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ঐ আসিসারদের মধ্যে একজন বললো- ঠিক আছে, এককাজ কর, পরের সোমবার এখানে এলেই আমার সাথে দেখা হবে, তার আগেই আমি ওপারের বি, ডি আর দের সাথে কথা বলে তোমাদের কিছুক্ষণের জন্য সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেবার চেষ্টা করবো। তুমি সেই মতো ঐ মেয়েটিকে বলে রাখবে।
– ধন্যবাদ স্যার, আপনার মতো মানুষ হয়না।
– আরে ভাই একসময় আমিও একজনকে খুব ভালোবাসতাম, কিন্তু থাক সেকথা, শুনে তোমার লাভ নেই, আমার কথামতো ঐ দিন তুমি এসো, তোমাদের মধ্যে আমি সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করে দেবোই।
– নমস্কার স্যার, আপনি এটা করে দিলে সারা জীবন আমরা আপনাকে স্মরণে রাখবো এবং আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো।
– ঠিক আছে স্যার, ধন্যবাদ।
যথাসময়ে একদিন অরূপ ও নাসরিন ঐ বি, এস, এফ অফিসারের সাথে দেখা করতে এলো, উনি আগেই বি, ডি, আর এর এক অফিসারকে সব বলে রেখেছিলেন, তিনিও ঐ সময়ে ওখানে উপস্থিত ছিলেন।
ওনারা সবাই একসাথে পাশের একটি ক্যাম্পে ওদের নিয়ে গিয়ে একটি আলাদা ঘরে ঘন্টাখানেক কথা বলার সুযোগ করে দিলেন এবং তারপর দুজনের হাতেই দশহাজার করে টাকা দিয়ে বললেন- তোমরা এই টাকায় নিজের নিজের দেশের পাসপোর্ট করে নেবে এবং মেয়েটিকে আরও বললেন, তুমি ইন্ডিয়া আসার ভিসা করে নিয়ে, এখানে চলে আসবে, আমি তোমাদের ধুমধাম করে বিয়ের ব্যবস্থা করে দেবো, আসলে সারা দুনিয়াতে আমার কেউ নেই। বিয়েটাও করা হয়নি, এখন থেকে তোমরাই আমার ভাই বোনের মতো, আমি আছি, তোমাদের কোনো চিন্তা করতে হবে না।
মাসখানেক পরে নাসরিন যথারীতি পাসপোর্ট আর ভিসা নিয়ে হিলি বর্ডার দিয়ে সোজা এসে ঐ অফিসারের কাছে উঠলো, অরূপও রেডি ছিল, সেও এসে হাজির হলো, সবাই মিলে দিন দুয়েক পর কলকাতা গেলো ,যেখানে আগে থেকেই ঐ অফিসার ভদ্রলোক একটি রিসর্ট ভাড়া করে রেখেছিলেন, ওখানেই নাসরিন ও অরূপের মালাবদলের সাথে সাথে বিয়েটা সারা হয়ে গেলো। ঐ অফিসারটি ছিলেন একজন পাঞ্জাবি। খুব ভালো মানুষ, উনার কলকাতায় একটি ফ্লাট কেনা ছিল, দুজনকেই ওখানে সেটেলড করে দিলেন, অরূপের জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরির ব্যাবস্তাও করে দিলেন, এবং কিছুদিন পর চাকরি থেকে অবসর নেবার পর ওদের সাথেই থাকতে শুরু করে দিলেন, একদিন উনি ওনার ফ্লাটটা অরূপ ও নাসরিনের যৌথনামে লিখে দিয়ে পাকপাকিভাবে থাকার জন্য হরিদ্বারে চলে গলেন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।