শিল্পকলা একাডেমিতে নাটক করেছে, এবং নাটকের প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয় করেছে এ কথা শুনে আমরা সবাই এক যোগে তার মুখে তাকালাম।
তার তখনই সে আমাদের বিপরীত দিকে মুখ করে দীর্ঘক্ষণ ধরে বসে থাকা যুবক দু’জনকে দেখিয়ে বলল: এই যে সেই ছিনতাইকারী দু’জন।
আমরা চমকে তাদের মুখে তাকিয়ে দেখি তারা আমাদের মাহাবুব ভাই আর আকমল ভাই। তাদের মুখ দেখতে পারিনি বলে আমরা তাদেরকে চিনতে পারিনি, কিন্তু তারা তো আমাদের সব কথা শুনেছেন এবং আমাদের চিনেছেন। এতক্ষণ কোনো আওয়াজ দিলেন না কেন?
ওসি বললেন: আপনার ওসব ছিনতাই হয়েছে কখন?
: এই মিনিট পনেরো হবে।
: আর তারা এখানে এইভাবে বসে আছেন ভোর থেকে। তাহলে তারা কীভাবে আপনার ওসব ছিনতাই করবেন। ডাউট করার আগে একটু বুঝেশুনে করতে হয়।
: সরি, মাথা ঠিক নাই। সেই ছিনতাইকারী দু’জনও দেখতে এরকমই ছিল। লাল চোখ, রুক্ষ-শুস্ক চেহারা।
আমি আর চুপ থাকতে পারলাম না। বললাম: কঙ্কনা আপু, তোমার এই বদঅভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। রেগে গেলে, নার্ভাস হয়ে গেলে, ইমোশনাল হয়ে গেলে তোমার মাথা ঠিক থাকে না। একবার আমার ওপর খুব রেগে গিয়ে মাঠে গিয়ে আমি ভেবে আমার এক বন্ধুকে মারতে শুরু করেছিলে।
এবার সবাই বিস্ময় নিয়ে তকালো আমার মুখে। ওসি বললেন: তুমি তাকে চেনো?
: জি। সে আমার মামাতো বোন। নাম কঙ্কনা। জাহাঙ্গরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলার ছাত্রী।
: কঙ্কনা আপু আমার হাত টেনে ধরে বলল, তুই থানায় কেন? চুরি-চামারি শুরু করেছিস নাকি?
: আজেবাজে কথা রাখো। এই হলো আমাদের মাহাবুব ভাই।
: এইটা! আমাদের কাছে এই লোকের তারিফ করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছিস। দেখতে কেমন ল্যাভেন্ডিস। ফুটপাতের হকারদেরও তো এর চেয়ে সুন্দর দেখায়। গোসল করে না কতদিন? তেল-সাবান কেনার পয়সা নেই?
: এভাবে কথা বলবে না। গত রাত কাটিয়েছে মানিকগঞ্জ জেলে।
: জেলে।
: আর সকাল থেকে এই থানায়।
: সমস্যা কী তোদের?
: আর এই হলেন আকমল ভাই। মাহাবুব ভাইয়ের ছোটবেলার বন্ধু। বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী। জাহাঙ্গঅরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক।
: স্লামালিকুম স্যার। আমি নাট্যকলার ছাত্রী, থার্ড ইয়ার।
আকমল ভাই মাথা নাড়লেন। ঘুম ঘুম চোখ তার।
ওসি কঙ্কনা আপুকে বললেন: আপনার অভিযোগ বিস্তারিত লিখে যান, আমরা দেখবো। আপনার সাথে যোগাযোগের ঠিকানা আর নাম্বার দিয়ে যান।
: দেখবেন, নাকি লেখাটা অমনি পড়ে থাকবে? থানা-পুলিশ তো ক্ষমতাবানদের জন্য যেভাবে কাজ করে, সাধারণের জন্য সেভাবে করে না। সাধারণের জন্য কর যদি ফেসবুকে কোনো ঘটনা ভাইরাল হয়।
: আপনার কথা ঠিক আছে। ক্ষমতাবানদের কাছে আমাদের অনেকেই বাঁধা গরু, বাট আমি না। আপনার ব্যপারটা আমি সিরিয়াসলি দেখবো।
আমাদের সবাইকে একসাথে ছেড়ে দেয়া হল। মাহাবুব ভাই, আকমল ভাই আর কঙ্কনা আপু থাকাতে আমাদের সাথে পুলিশ দিলো না। ওসি মাহাবুব ভাই আর আকমল ভাইয়ের কাছে খুব করে দুঃখ প্রকাশ করলেন। আকমল ভাই বললেন: আপনার দুঃখিত হবার কিছু নেই। আপনার তো কোনো দোষ নেই। সমস্যাটা তো বাঁধালো আরিচার থানার পুলিশরা।
: তবুও….। স্যার, আপনি একজন চিত্রশিল্পী এবং শিক্ষক। নিজগুণে সবাইকে ক্ষমা করে দিবেন। তাদের হয়ে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। দোষে-গুণে, ভুলে-ভ্রান্তিতে মানুষ। দয়াকরে তাদেরকে দোষি করে রাখবেন না।
: ঠিক আছে, ক্ষমা করে দিলাম।
তারপর ওসি ড্রায়ার টেনে দুইটা বই বের করলাম। আমরা আগ্রহ নিয়ে দেখলাম ‘জীবনাননন্দ কবিতা সমগ্র’। দু’টি বই মাহাবুব ভাই আর আকমল ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন: নিন, আপনাদের জন্য। তাদের সবাইকে কিছু দিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তাদেরকে দেবার মতো বিশেষ কিছু নাই।
গুল্লু বলল: আমরা কিছু চাই না। আমরা অনেক পেয়েছি, অনেক খুশি।
এতক্ষণে মাহাবুব ভাই কথা বললেন। বললেন: আমাদের এই দু’দিনের সব ক্লান্তি মুছে দিলেন আপনি।
পথে নেমে কঙ্কনা আপুকে বললাম: চলো, আমাদের বাসায় যাই।
: পরশু আমার একটা পরীক্ষা আছে। এখন যেতে পারবো না।
: তোমার কাছে না টাকা নাই। যাবে কেমন করে?
: গোপন পকেটে হাজার তিনেক আছে। সে টাকা খুজে পাওয়া ছিনতাকারীর বাপ-দাদার পক্ষে সম্ভব না।
: তোমাদের গোপন পকেট থাকে?
: তো……? গোপন পকেট শুধু ছেলেদেরই থাকবে? ছেলেমেয়ে ভেদাভেদ করে কথা বলবি তো থাপ্পর দিয়ে তেত্রিশটা দাঁত ফেলে দিবো। যাই, ফুপা-ফুপিকে আমার কদমবুচি দিস।
: কদমবুচি কী?
: বাসায় গিয়ে ডিকশনারি খুলে দেখে নিস।
: তুমি বাড়ি যাবে কবে?
: পরীক্ষা শেষ করে আগামি সপ্তাহে যাব।
: বাড়ি গেলে খবর দিও, আমরা যাবো।