আমরা ঘুম থেকে জেগে গোসল সেরে একবারে দুপুরের খাবার খেলাম। এবার খাবার নিয়ে আসেনি কেউ। বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। রিকশা ডেকে প্রতি রিকশায় দু’জন করে জরোসরো হয়ে বসে পাশের একটা রেস্টুরেন্টে গেলাম। সেখানে গিয়ে মুরগির মাংস দিয়ে সাদা ভাত খেলাম। সাথে ডাল। রেস্টুরেন্টের ডাল বলতে সবাই বোঝে হলদে রঙের পানি। কিন্তু এ ডালটা তেমন ছিল না। যথেষ্ট ঘন। স্বাদও বেশ। আর লেবু, শশা, টমেটো, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজও ছিল। খেতে খেতে আকমল ভাই বললেন: পেঁয়াজের দাম নাকি খুব বেশি?
ওয়েটার বলল: তা বেশি। কিন্তু আমাদের মালিক মানের সাথে আপোষ করতে রাজি না।
: বেশ ভালো মানুষ।
: লোকে অবৈধ পথে ব্যবসা করে বড়লোক হয়। আমাদের মালিক সৎ পথে থেকেই বড়লোক। অসৎ পথে দুই টাকার জায়গায় দশ টাকা লাভ করলে কোন দিক দিয়া বারো টাকা বাইর হয়া যায় বোঝা যায় না। আর সৎ পথে দুই টাকা লাভ করলে পুরাটাই থকে।
: তুমি ঠিক বলেছো। সত্য কথা বলেছো। অনেকে এই সত্যটা বুঝতে চায় না।
: স্যার, আর দুইটা পেঁয়াজ দিবো। খাঁটি দেশি পেঁয়াজ, খুব ঝাঁজ, কামড় দিলে চোখে পানি চলে আসবে। একশ’ আশি টাকা কেজি।
: না, আর পেঁয়াজ লাগবে না।
খাওয়া শেষে আকমল ভাইয়ের ছোট্ট-সুন্দর-সুখের নীড়ে ফিরে আসতেই মাহাবুব ভাই তাড়া দিলেন: চল চল, এখনই বের হবো।
আকমল ভাই বললেন: কোথায় যাব?
: কোথায় যাব জানিস না? মানিকগঞ্জ যাব মেয়ে দেখতে। এমন মেয়ে ঢাকা ডিভিশনে একটাও নাই।
: সন্ধ্যায় রওয়ানা হলেও ঘন্টা খানেকের মধ্যে মানিকগঞ্জ পৌছে যাব। ওদেরকে জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়টা ঘুরিয়ে দেখাতে চাই। বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। ৬৯৭.৫৬ একর এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। এখানে দেখার আছে অনেক কিছু। ওরা আনন্দ পাবে, শিখতেও পারবে কিছু। শহর ছেড়ে এরকম অপরূপ নৈসর্গের কাছাকাছি সব সময়তো আসা হয় না।
আমরা আকমল ভাইয়ের সাথে একমত হলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখতে চাই। মানিকগঞ্জ রাতে পৌছুলেও হবে। তা ছাড়া কঙ্কনা আপু তো বড়িতে নেই। ঢাকায় গেছে। কবে ফিরবে তাও জানি না।
মাহাবুব ভাই আমাদের সাথে বের হলেন না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দেখার ইচ্ছা তার নাই। অনেক দেখেছেন। নতুন করে আর কী দেখবেন?
আমরা সবাই একটা করে রেইনকোট গায়ে চেপে বের হলাম। রেইনকোটগুলো কিনে এনেছিলেন আকমল ভাই। তিনি আমাদের যেরকম যত্ন-আত্মি করছেন তা আমরা কোনোদিন ভুলতে পারবো না।
প্রথমেই গেলাম শহীদ মিনারে। শহীদ মিনার সম্পর্কে আকমল ভাই জানালেন-
স্থপতি রবিউল হুসাইনের তত্ত্বাবধানে নির্মিত ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক হিসাবে ৫২ ফুট ব্যাস ও ৭১ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনার এটি। এর আছে আটটি সিঁড়ি ও তিনটি স্তম্ভ। দৃঢ়তার প্রতীক ত্রিভূজ আকৃতির ঋজু কাঠামোটিকে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের জন্য মহান বীর শহীদগণের আত্মত্যাগের মহিমা প্রকাশিত। ৮টি সিঁড়ি বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ৮টি তাৎপর্য বছর ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৯, ১৯৭০ ও ১৯৭১ সালগুলোর প্রতীক। আর তিনটি স্তম্ভের একটি হলো, বাংলা ভাষা-সহিত্য-সংস্কৃতি, অপর দুটি হলো মাটি ও মানুষ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক।
তারপর দেখতে গেলাম মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘সংশপ্তক’। একটা পা ও একটা হাত হারিয়েও এ সংশপ্তক মুক্তিযোদ্ধা বিজয়ের হাতিয়ার উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। সেটাই দেখানো হয়েছে এই ভাস্কর্যে। এর স্থপতি হামিদুজ্জামান খান। আর এটি অবস্থিত বিশ্ববিদ্যলয় গ্রন্থাগারের সামনে।
আর সমাজবিজ্ঞান ভবনের সামনে এবং ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সাথেই রয়েছে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য ‘অমর একুশ’। এ স্থপতি শিল্পী জাহানারা পরভীন। মুগ্ধত নিয়ে আমরা এটি দেখলাম।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যে প্রাকৃতিক সৌন্দের্যের আধার তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সবুজ আর সবুজ। অনেক জলাশয়। বিশুদ্ধ সুশীতল বাতাস। বিচ্ছিন্নভাবে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে লেক, মাঠ, গাছগাছালিতে পরিপূর্ণ। ছোট-বড় সব মিলিয়ে লেক আছে প্রায় দশটার মত। সেগুলো শাপলা, পদ্ম ও নানারকম জলজ উদ্ভিদে পরিপূর্ণ। শীতকালে অতিথী পাখির মেলা বসে তা আমরা আগেই জানতাম। আকমল ভাই বললেন: আগামি শীতে আসিস।
গুল্লু বলল: আপনি যখন আছেন তো আসবো অবশ্যই।
আমরা হাঁটছি। দৃষ্টিতে মুগ্ধতা। নানা রকমের পাখির সমাহার। কিচিরমিচির। আমরা সেলফোনে ছবিও তুলছি।
বিশাল খেলার মাঠ। চারিদিকে ছায়াসুশীতল মায়াবী গাছ-গাছালির বেস্টনী। মাঠে যেন সবুজ পুরু চাদর বিছানো। মাঠের পাশেই মুক্ত মঞ্চ। আকমল ভাই বললেন: এই মুক্তমঞ্চে সারা বছরই কোন না কোন উৎসব লেগে থাকে। একাধারে মাসব্যাপী নাট্য উৎসব চলে, যাত্রা, বাউল সঙ্গীত, পালা গানের আয়োজন হয়। অনেকটা গ্রীক নাট্যমঞ্চগুলোর স্থাপত্যকলার আদলে গড়া মুক্তমঞ্চটির সাথে দেশের প্রয়াত নাট্যব্যক্তিত্ব শ্রদ্ধেয় সেলিম আল দীনের স্মৃতি জড়িত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে দুর্দান্ত এক স্মৃতি নিয়ে আমরা ফিরলাম।
আমরা যাত্রী ছাউনীতে দাঁড়িয়ে। মানকিগঞ্জগামী বাস ধরবো। কিন্তু বাস নেই। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির কারণে যাত্রী কম। সন্ধ্যা বা রাতে আরও কম।
আমরা হাত ইশারা করি। কিন্তু কোনো বাস থামে না। দু/একটা যা থামায় মানিকগঞ্জের কথা শুনলে বাসে উঠায় না। এতটুকু পথে তারা যাত্রী তুলবে না। আরিচা হলে তুলতে পারে। আকমল ভাই বলেন: কন্ডাকটারগুলা পাগল। আমরা আরিচা যাব কোন দুঃখে?