ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৪১)

দার্শনিক হেলাল ভাই

আমি বললাম: টিটু, কিছু বলতে চাও?
: রিনি আপা আর ঝিনি আপা হেলাল ভাইকে দুইটা চিঠি দিছে।
: তাই? দেখি দাও তো দাও……।
আমার হাতে চিঠি দু’টি দিয়ে টিটু চলে যাচ্ছিল। আমি বললাম: টিটু, চা খেয়ে যাও।
: না, চা খাবনা এখন। কোচিং-এ যাব। টিটু চলে গেল।
হেলাল ভাই বলল: আমাকে বলতো, পৃথিবীর আর কোন দেশে এরকম কোচিং স্টেন্টারে পড়াশোনা করতে হয়?
আমরা কেউ কিছু বললাম না। পৃথিবীর আর কোথাও কোচিং সেন্টার শিক্ষা পদ্ধতি আছে কি না সে খোঁজ-খবর আমাদের কাছে নাই।
হেলাল ভাই বলল: ছেলে-পেলে পড়াশোনা করবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাশ রুমে। কিন্তু পড়াশোনা করতে যায় কোচিং সেন্টারে। তাহলে ক্লাশ রুমে তারা কী করে? বসে বসে ললিপপ চোষে? শিক্ষকরা কী করে? ওদেরকে ললিপপ চোষা শেখায়? এই যে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলছি। আমি ১০০টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাব। ছেলে-মেয়েদের সাথে, শিক্ষকদের সাথে কথা বলব। সেখানে কীভাবে কী পড়ানো হয়, কেন শিক্ষার্থীদের কোচিং সেন্টারে যেতে হয় এসব ব্যাপারে বিস্তারিত একটা গবেষণা চালাব। গবেষণাকর্ম তুলে ধরবো পত্র-পত্রিকায়। কাজটা আমি করবোই।
আমরা জানি, হেলাল ভাই যা বলে তা করে। সে অবশ্যই এরকম কিছু করবে।
আমরা ভেবে পাচ্ছিলাম না যে, দ্’ুবোন একই সাথে একই বাহকের কাছে চিঠি পাঠাল কেন? জগতে কত অকল্পনীয় ঘটনা ঘটে। শেষ পর্যন্ত কী ঘটতে যাচ্ছে কে জানে।
হেলাল ভাই রীতিমতো কাঁপছিল। নার্ভাস মাইন্ডের মানুষ। বলল: মোজাফ্ফর, এক গ্লাস বরফ শীতল পানি দাও।
মোজাফ্ফর এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিল। হেলাল ভাই এক চুপুকে গ্লাস নিঃশেষ করে বলল: আরেক গ্লাস দাও।
গাব্বু ধমক দিয়ে উঠল: এত ঠান্ডা পানি খাওয়ার কী হল?
: বুক শুকিয়ে সাহারা, গোবি, কালাহারি মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে।
: মরুভূমি হবার মতো কী ঘটেছে? আমার তো মনে হচ্ছে, মনে বসন্ত বাতাস প্রবাহিত হবার মতো ঘটনা ঘটে গেছে।
: কী রকম?
: নিশ্চয় পথ খুলে গেছে। ছোট বোন বড় বোনকে স্যাকরিফাইজ করেছে। স্যাকরিফাইজ করে ছোট বোন সরে দাঁড়িয়েছে। তা না হলে দুই বোন এক সাথে চিঠি পাঠাতে পারে না।
আমাদেরও মনে হল, গাব্বু যা বলছে সেরকম কিছুই ঘটেছে। হেলাল ভাই বসে যাওয়া কন্ঠে আমাকে বলল: ঠিচি পড়তো দেখি…..।
: ঠিচি মানে?
: চিঠি পড়তো।
: কোনটা আগে পড়ব?
: রিনিরটা আগে পড়। আগে স্যাকরিফাইজটা দেখে মন শান্ত করি।
আমি চিঠি খুললাম। আমার বুকের মধ্যেও কেমন ঢিপঢিপ করছিল। হেলাল ভাইয়ের প্রেম নিয়েই এই অবস্থা, নিজে প্রেমে পড়লে কি যেন হবে। এই জন্যই গান গেয়েছে-লোকে বলে প্রেম আর আমি বলি জ্বালা/কন্টকও হার তারে, আমি বনোমালা।
আমি বললাম: মোজাফ্ফর ভাই, এক গ্লাস পানি দেন।
: ঠান্ডা পানি?
: না, গরম পানি। গলা পরিস্কার করতে হবে।
: সামান্য একটু প্রেমের ব্যাপারে আপনেগো এত গরম পানি-ঠান্ডা পানি শুরু হইছে। প্রেম তো আমরাও করছি, আমাগো ওরকম……।
মোজাফ্ফরও প্রেম করেছে। বিষয়টা আমাদের মধ্যে আগ্রহ জাগিয়ে তুললো। আমি বললাম: আপনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন?
: তয় কী বলতেছি?
: কে আগে প্রস্তাব করেছিল?
: আমি।
: কীভাবে?
: মাজেদা, আই লাভ ইউ।
: ইংরেজিতে?
: এই সামান্য কথা আবার বাংলায় বলতে যাব?
: তারপর কী হল?
: রাজি হয়া গেল।
: একবারেই?
: তয় কয়বার বলতে হবে? আমি দেখতে-শুনতে কম নাকি? ছোট হোক, বড় হোক একটা ব্যবসা আছে। এরকম পোলা ওর মতো মাজেদারে আই লাভ ইউ কইছে এইটা ওর ভাগ্য।
বোঝা গেল, হেলাল ভাইয়ের চেয়ে মোজাফ্ফরের আত্মবিশ্বাস ভাল-বিশেষ করে প্রেমের ক্ষেত্রে।
মোজাফ্ফর আধা গ্লাস পানি নিয়ে তাতে কেটলি থেকে গরম পানি ঢালল। গরম পানি খেয়ে আমি তিনবার গলা কাশলাম। তারপর পড়তে লাগলাম-
প্রিয়তম হেলাল,……..
হেলাল ভাই চমকে উঠে বলল: কী সম্বোধন করেছে?
আমি বললাম: প্রিয়তম হেলাল।
: তা করবে কেন? স্যাকরিফাইজের চিঠিতে এরকম সম্বোধন হতে পারে না।
: আচ্ছা, পড়ে দেখি।
: পড়।
জানি, তুমি আজ ভীষণ দ্বিধা-দ্বন্দ ও সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছ। সংকটের কারণ আমরা দুই বোন। আমরা কেউ কাউকে তিল পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি নই। বিনা যুদ্ধে না ছাড়িবো সূচাগ্র মেদিনী। হৃদয় ভালবাসার জন্য তৈরী বলে এই ভালবাসা কখনো হৃদয়ে বয়ে আনে সীমাহীন সুখ-আনন্দ, আবার দুঃখ-বিষাদও বয়ে আনে কখনো। আমরা একই বাবার ঔরষজাত, একই মায়ের পেটের দুই বোন তোমার প্রেমে সাড়া দিয়ে তোমাকে ভীষণ ঝামেলায় ফেলেছি। ঝামেলা ভাবলেই ঝামেলা। আমরা কিন্তু কোনো ঝামেলা মনে করছি না। আমরা কি কারো পাকা ধানে মই দিয়েছি বা দিচ্ছি? আমরা কি কারও ঘরে আগুন দিয়েছি বা দিচ্ছি? তাহলে ঝামেলা কিসের? ঝামেলা কেন? জানি, চিঠির এই পর্যন্ত পড়ে তুমি কিছু বুঝতে পারছো না। মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে। আমি কী বলতে চাচ্ছি তা অনুমানও করতে পারছ না। তাহলে তোমাকে আর ঝামেলায় রাখতে চাই না। সহজ করে বলি, আমরা দুইবোন একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কাউকে বঞ্চিত না করার। একই বাবার রক্ত আমাদের শরীরে প্রবহমান। একই মায়ের স্তন পান করে আমরা বেড়ে উঠেছি। আমরা কেমন করে একজন আরেকজনকে বঞ্চিত করে সুখ এবং আনন্দ পেতে পারি? তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমরা দু’বোনই তোমাকে বিয়ে করব। জানি, এখানে এসে তুমি চমকে উঠবে ভীষণভাবে। মাথায় বজ্রপাত হবার মত অবস্থা হবে তোমার। তোমার হৃদস্পন্ধন বেড়ে যাবে। তবে আমি সেরকম হবার মতো কিছু বলিনি। প্রচলিত সমাজব্যবস্থা আমাদের পায়ে শেকল পরিয়ে দিয়েছে। কেউ না কেউ, কখনো না কখনো সে শেকল ভাঙে। কখনো কখনো ভাঙতে হয়। তা না হলে সামাজ বদলায় না। সমাজকে বদলাতে হয়। আমরা আমাদের হৃদয় ভাঙার চেয়ে শেকল ভাঙাটাকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছি। তোমাকে বিয়ে করে আমরা দুই বোন আলাদা দু’টি বাড়িতে থাকব। আলাদা সংসার করব। তুমি আমাদের দুই বোনকে তোমার যা দেবার তা সমানভাবে ভাগ করে দিবে। মনের সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেরে ফেলে ইতিবাচক সিদ্ধান্তটাই নেবে আশাকরি। পত্রপাঠ উত্তর দিবে।
বিঃ দ্রঃ খুব গরম পড়েছে। রোদের মধ্যে সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে বেশি ঘোরাঘুরি করবে না। বেশি বেশি পানি পান করবে। তবে শরীরে ঘাম নিয়ে ঠান্ডা পানি পান করবে না। চা কম খাবে। অতিরিক্ত চা শরীরে পানি শূন্যতার সৃষ্টি করে। ক্ষুধা নষ্ট করে। ঘুম কেড়ে নেয়। তোমার সাঙ্গ-পাঙ্গগুলা বেশি ভাল হয় নাই।
ইতি,
তোমারই রিনি।
সেদিন কিন্তু বলেছিল, ওরা ভাল ছেলে। এখন আবার লিখেছে, সাঙ্গপাঙ্গগুলা ভাল হয় নাই। অদ্ভূত এক মেয়ে!
আমরা হতবাক। কিছুই বলতে পারছিলাম না। তাকাচ্ছিলাম এ-ওর মুখে। এরকম একটা বিষয় নিয়ে চিঠি লিখবে তা আমাদের কল্পনারও অতীত ছিল। আমরা যখন কথার খেই খুঁজছিলাম, তখন মোজাফ্ফর বলল: আমার বিবেচনায় মেয়েটা মন্দ কিছু বলে নাই।
আমরা একযোগে তাকালাম মোজাফ্ফরের মুখে। মন্দ কিছু বলে নাই! দুই বোন একই ছেলেকে বিয়ে করতে চাচ্ছে, এটা কি ভাল কথা? এই দেশ, এই সমাজ সম্পর্কে ওদের কি একটু ধারণাও নেই?
মোজাফ্ফর বলল: সতীনরা কিন্তু পরসস্পরকে বোন ডাকে, যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল থাকে না। সতীনরা যদি বোন হতে পারে, তো বোনরা সতীন হলে দোষ কী?
চায়ের দোকানদারও দেখছি সমাজ ও প্রচলিত দর্শনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাতে চায়। আমাদের মাথা তখনো কাজ করছে না। একটা ঘোরের মধ্যে আছি। মোজাফ্ফর বলল: মেয়েটা তো বলেছে যে, তারা আলাদা বাড়িতে যার যার মতো সংসার করবে।
হেলাল ভাই মোজাফ্ফরের কথার কোনো জবাব না দিয়ে আড়মোড় ভেঙে জেগে উঠে বলল: তুই বড়বোন ঝিনির চিঠিটা পড়তো। নিশ্চয় ভিন্ন কিছু পাওয়া যাবে।
আমি ঝিনি আপার চিঠি খুললাম। শব্দ করে পড়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। দেখি একই চিঠি, শুধু হাতের লেখা ভিন্ন। তার মানে দু’জনেই একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দু’জনই পরস্পর সতীন হতে ইচ্ছুক। দু’জনই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা আর দর্শনের বিরুদ্ধমত ধারণ করে।
ঝিনি আপার চিঠিটা আর পড়ার দরকার হল না। হেলাল ভাই বলল: আবেগ-প্রেমের ভেতর আশি ভাগ থাকে আবেগ, আর বিশ ভাগ থাকে বাস্তবতা।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।