ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৩৬)

দার্শনিক হেলাল ভাই

: হ্যাঁ, চিকনগুনিয়া। হাত-পা ব্যথা। প্রতি গিটে গিটে ব্যথা। মোজাফ্ফরের দোকানে প্রচুর মশা। ওরা কামড়িয়েছে, তারই ফল। এরপর থেকে কয়েল জ্বালিয়ে বসব।
: দোকানের ভেতরটা একটু অন্ধকারও। এরপর আরেকটা ভাল্ব জ্বালিয়ে দিব।
: মশাগুলা খুব বেহায়া। ওদের হাজব্যান্ডদের ফুলের মধু খাওয়ার জন্য রেখে এসে পর পরুষের গায়ে বসে….।
আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। অসুস্থ শরীরেও হেলাল ভাইয়ের মনের রস কমে না। হেলাল ভাই বলল: হাসিস কেন? পুরুষ মশা তো মানুষের রক্ত খায় না।
নান্দু বলল: ওদের হাজব্যান্ডরাও যদি মানুষের রক্ত খেত, তো স্বামী-স্ত্রী মিলে….। আমাদের আর রক্ষা ছিল না। চিকনগুনিয়া, মোটাগুনিয়া, মাঝারিগুনিয়া সবই হয়ে যেত।
তারপরই হেলাল ভাই আঙুল তুলে নদু আর নান্দুকে নির্দেশ করে বলল: তোদের দু’জনকে নিয়ে আমার খুব সমস্যা হয়।
: আমরা হাঁ হয়ে গেলাম। ওরা আবার সমস্যার কী করল?
নদু বলল: আমরা আবার কী করলাম?
: তোরা কিছু করিসনি। সমস্যা তোদের নাম নিয়ে। নদু আর নান্দু খুব কাছাকাছি উচ্চারণ। প্যাঁচ লেগে যায়।
: তাহলে পুরো নাম ধরে ডাকবেন। জহিরুল ইসলাম নদু আর আশরাফুল ইসলাম নান্দু।
: অতো বড় নাম ডাকা যায়?
: তাহলে শুধু জহির আর আশরাফ ডাকবেন।
: থাক, নদু আর নান্দুই সুন্দর।
নান্দু বলল: এখন আপনার শরীর কেমন তাই বলেন।
: এখন আর বিশেষ সমস্যা নেই। এন্টিবায়োটিক আর নানা রকম ওষুধ ভরে একুশটা স্যালাইন দিয়েছে। এখন জ্বর আসে না। তবে গিটের ব্যথা এখনও আছে। আশা করছি আগামি সপ্তাহেই তোদের সাথে যোগ দিব।
: আরও পরে যোগ দিলেও চলবে। আচ্ছা, আমরা এখন উঠি। বিকালে আবার আসব।
আমার মাথায় খালাম্মার সেই কথাটা ছিল যে, হেলাল ভাই চার বছর ধরে বই স্পর্শ করে না। আমি বললাম: আপনি দার্শনিক হতে চাচ্ছেন, অথচ দর্শনের বই পড়ছেন না। ভালো রেজাল্ট নিয়ে মাস্টার্স কমপ্লিট করে ডক্টরেট ডিগ্রী নিতে পারলে বড় দার্শনিক……।
: বোকা! দার্শনিকের সাথে বড় ডিগ্রীর কোনো সম্পর্ক নেই। বড় ডিগ্রীর সাথে সম্পর্ক ডাক্তারের, ইঞ্জিনিয়ারের। যে ডাক্তারের যত বড় ডিগ্রী, সে তত বড় ডাক্তার। দর্শন হল একটা সত্য। সে হিসেবে প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে দার্শনিক। তোর ভেতর যদি কোনো সত্য গড়ে ওঠে তুই একজন দার্শনিক।
: আপনার ভেতর কী সত্য গড়ে উঠেছে?
: এতদিন আমার সাথে থেকে বুঝতে পারিসনি কিছু?
: অনেক কিছুই বুঝেছি, আমার কিছুই বুঝিনি। আপনি একটা রহস্য। আপনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলে আমি একজন দার্শনিক হয়ে যাব।
: ধর্ম দর্শনের কথাই ধর। সেখানে নরকের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তা আমাকে ভীত করেনি। স্বর্গের সুখের কথা বলা হয়েছে। তা আমাকে প্রলুব্ধ করেনি। সত্য আর সুন্দরের কাছে যাওয়ার জন্য আমি ধর্মের কাছে যাওয়ার কোনো দরকার মনে করিনি। দরকার চেতনা তৈরীর। যাদের ভেতর সে চেতনা তৈরী হয় না, তাদের ধর্ম ছাড়া কোনো গতি নেই। আমি কর্মের দর্শনের কাছে যেতে চাই। সুন্দর সৃষ্টি আর সুকর্ম এ দু’টির কোনো সমালোচনা থাকতে পারে না।
হেলাল ভাইয়ের এইসব কথার কিছু আমাদের মাথায় ঢুকল, কিছু মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল।
হেলাল ভাইয়ের বাসা থেকে আমরা যখন বের হলাম, তখন বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে। কুকুর-বিড়াল বৃষ্টি না, এ যেন বাঘ-সিংহ বৃষ্টি।
দেখি বাসার সামনে দিয়ে এক ছাতার নিচে গলাগলি করে যাচ্ছে রিনি আর ঝিনি আপা। একটু আড়ালে লুকাতে চেয়েছিলাম। সে সুযোগ ছিল না। তাই অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে রইলাম। তাতে কি রক্ষা হয়?
ওরা থমকে দাঁড়াল। রিনি বলল: তোমরা? তোমরা সবাই দল বেধে এখানে কেন?
হেলাল ভাইয়ের প্রসঙ্গ আনতে চাইলাম না। আবার কি বলতে কী কলা শুরু করে দিবে। আমি বললাম: এই বৃষ্টির মধ্যে তোমরা……?
: চাপাতি আনতে গিয়েছিলাম।
: চাপাতি দিয়ে তো জঙ্গিরা কোপাকোপি করে। তোমরা কি জঙ্গি বাহিনীতে যোগ দিয়েছো?
: এই ছাগল কী বলে! আরে হাঁদারাম, চাপাতি না, চা-পাতি। এই বৃষ্টির মধ্যে চা ছাড়া চলে? টি-ব্যাগ এনেছি। স্পেশাল জিনজার মিক্সড। হারবাল ইনফিউশন। ঠান্ডা-কাশিতে দারুন উপকার। গলার কাছে যদি খুশখুশ……।
শুরু হয়ে যাচ্ছিল রিনির ডাক্তারি বিদ্যা জাহির। ঝিনি আপার ওকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল: এ বাড়িতেই তো হেলাল ভাই থাকে, তাই না?
: হু, চার তলায়।
: তাকে তো ইদানিং দেখছি না। তোমাদের সাথেও দেখি না।
: হেলাল ভাই অসুস্থ।
: হেলাল ভাই অসুস্থ! চিৎকার করে উঠলো রিনি। তারপর শুরু করলো-তোমারা কেউ তো একবারও বললা না? তোমরা এমন ফাজিল। কালও তোমার সাথে দেখা হয়েছে। ইচ্ছা হয়…..।
: আহ! আস্তে। রিনিকে থামালো ঝিনি আপা। তারপর শান্ত কন্ঠে বলল: হেলাল ভাই এখন কোথায়?
: হাসপাতালে ছিল কয়েকদিন। এখন বাসায় আছে।
রিনি ঝিনি আপাকে কুনুইয়ের এক গুঁতো দিয়ে বলল: চলো, দেখে আসি।
: অবশ্যই যাওয়া উচিত। কতদিন ধরে অসুস্থ। আহা বেচারা! এর আগে শরীরে আগুন ধরল।
রিনি আর ঝিনি আপা দু’জনই প্রায় পুরোপুরি ভিজে গেছে। ছোট এক লেডিস ছাতার নিচে দু’জন মানুষ এরকম বৃষ্টি থেকে রেহাই পেতে পারে না। তাদের হাতে টি-ব্যাগ, বড় একটা পাউরুটি, বারবিকিউ ফ্লেভারের এক প্যাকেট চানাচুর, আরও কি যেন।
কোনো খবর-বার্তা ছাড়া এভাবে বাসায় গেলে হেলাল ভাই আবার বিব্রত না হয়। এমনিতেই লাজুক টাইপের মানুষ। আমি বললাম: তোমরা তো প্রায় ভিজে গেছো। পারে না হয়…..।
ঝিনি আপা বলল: না না, এখনই যাব। তার অসুস্থতার কথা শুনে খুব খারাপ লাগতেছে।
: তাহলে যান, চার তলার বাম পাশের ফ্ল্যাট।
: তোমরা যাবে না আমাদের সাথে?
: আমরা এতগুলো পাবলিক আবার যাব? খালাম্মা অনেক কিছু দিয়ে আমাদের নাস্তা করিয়ে দিয়েছেন। আবার…।
: তাহলে সবার যাবার দরকার নাই। তুমি একা এসো আমাদের সাথে।
ফেকু আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল: ঠিক আছে, তুই যা। আমরা মোজাফ্ফরের দোকানে আছি।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।