১।।
এই শোন- ডাক শুনে আমি ডানে মোড় নিতে গিয়ে থেমে গেলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি মাহাবুব ভাই ডাকছেন।
মাহাবুব ভাই কাছে এসে বললেন: গুল্লুকে দেখেছিস?
মাহাবুব ভাইয়ের কন্ঠটা কেমন চড়া। চেহারায় মেজাজ খারাপ ভাব। গুল্লু নিশ্চয় কোনো সমস্যা করেছে। আমি বললাম: গুল্লুকে কেন মাহাবুব ভাই?
: ওর কানের নিচে দুইটা থাপ্পর দিব।
: সমস্যা কী করেছে?
: দেখেছিস কি না তাই বল। তোর এত কিছু জানার দরকার নাই।
: আমি তো মামাবাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম। আজই ফিরলাম।
: তুই এত ঘন ঘন মামাবাড়ি যাস কেন?
: মামাতো বোনের বিয়ে ছিল।
: এক বছরে কয়বার তোর মামাতো বোনের বিয়ে হয়?
: আমার চার মামা। প্রতি মামার তিনটা করে মেয়ে। মেয়েগুলাও হয়েছে ভয়াবহ রকমের সুন্দর। ছেলে আর ছেলের বাপরা ভিখেরীর মত আমার মামাদের পিছে পিছে ঘোরে। আপনি যদি দেখতেন…..।
: হয়েছে! ভাষা ঠিক করবি। ‘ভয়াবহ’ শব্দটা সুন্দরের সাথে যায় না। এইরকম উল্টাপাল্টা শব্দ ব্যবহারের জন্য সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতরা জীবন দিয়েছিল না।
: আমার মেজো মামার বড় মেয়ের নাম কঙ্কনা, আমর মেজোটার নাম অঙ্কনা।
: কঙ্কনা নাম শুনেছি। অঙ্কনা নাম কখনো শুনিনি। অর্থহীন একটা নাম।
: মিল রাখার জন্য এই নাম রাখা হয়েছে। তো কঙ্কনা আপার মত সুন্দর মেয়ে এই ঢাকা বিভাগে নাই।
: যাক, তবু বাংলাদেশ বা ওয়ার্ল্ড বলিস নাই। এ জন্য তোকে ধন্যবাদ।
: কিন্তু মেজোমামা তো মেয়ে দুইটাকে নিয়ে দিনরাত দুঃখের মধ্যে থাকেন।
: এত সুন্দর মেয়ে নিয়ে আবার দুঃখ কী? এদেশে সুন্দর মেয়েরা তো হীরার দামে বিক্রি হয়। দুঃখ যত সব কালো মেয়ে আর তাদের বাবা-মা’দের।
কালো মাইয়া কালো বইলা কইরো না কেউ হেলা
ওরে কালো মুখে আছে, সুন্দর মুখে নাইরে তাহা
কালো মাইয়ার দুঃখ কেউ বুঝতে না চায়।
মাহাবুব ভাই কালো মেয়ে নিয়ে একটু গান গেয়ে ফেললেন। তার মানে গুল্লুর প্রতি তার যে রাগ ছিল তা ভুলে গেছেন। এটা তার মহৎ এক গুণ। রাগ বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেন না। আমি বললাম: মেজোমামার মেয়েগুলো লেখাপড়ায় খুব ভালো। বড়টা আর মেজোটা জাহাঙ্গিরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কঙ্কনা আপু নাট্যকলায়, আর অঙ্কনা আপা বাংলায়। দু’জনেরই জীবনের লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবে। অঙ্কনা আপুর পাশাপাশি ইচ্ছা নাট্যব্যক্তিত্ব হবে। গান, আবৃত্তি, অভিনয়…….।
: তুই যে চাপাবাজিতে ডিগ্রীধারী তা জানি। রূপবতী মেয়েরা সাধারণত গুণবতী হয়না। এরকম দেখিও নাই, শুনিও নাই। রূপবতী মেয়েরা হয় আমড়া কাঠের ঢেঁকি। নেকামি, আহ্লাদ এসব ছাড়া আর কিছুই ওরা পারে না। রূপের অহংকার ওদের একমাত্র পুঁজি। যতবেশি রূপ ততবেশি বেগুণ।
: আল্লার কিরা! এই যে তাদের ছবি দেখাচ্ছি। তাদের গান, আবৃত্তিও রেকর্ড করা আছে……..।
আমি পকেট থেকে সেলফোন বের করতে গেলাম। মাহাবুব ভাই বললেন: থাক থাক, এখন দেখাতে হবে না। না হয় একদিন তোর মামাবাড়ি গিয়ে দেখে আসবো তোর কঙ্কনা আর অঙ্কনা আপুকে। চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হবে। নাকি গেলে কোনো সমস্যা আছে?
: সমস্যা কী থাকবে? তারা অনেক খুশি হবে। আপনার কথা কত বলেছি।
: আমার কথা বলেছিস!
: হ্যাঁ, আমরা তো যেখানে যার কাছে যাই শুধু আপনার গল্পই করি। আপনি আমাদের আইডল।
: শোন, গুল্লুকে আমার কাছে নিয়ে আসবি। আগে ওর কানের নিচে দুইটা থাপ্পর মারবো, তারপর অন্যকিছু।
যা ভাবছিলাম তা নয়। গুল্লুর ওপর রাগ তো ঠিকই আছে। নিশ্চয় গুল্লু বড় কোনো অঘটন ঘটিয়েছে।
মাহাবুব ভাই বাঁ দিকে মোড় নিয়ে চলে গেলেন। আমি ডান দিকে কিছুটা এগোতেই দেখা হল ফেকু আর ফজলুর সাথে। ফজলু বলল: কিরে, মামাতো বোনের বিয়ে খাওয়া শেষ হল? আমাদের গন্ডায় গন্ডায় মামাতো বোনও নাই. বিয়াও খাওয়া হয়।
ফেকু বলল: বিয়া আবার কেমনে খায়? বল, বিয়ার দাওয়াত খাওয়া।
ফজলু বলল: এসব ভুল ধরা ঠিক না। বাংলা ভাষা অনেক সহজ।
আমি ওদের কথায় কান না দিয়ে বললাম: মাহাবুব ভাইয়ের সাথে গুল্লুর কী হয়েছে? মাহাবুব ভাই ওর ওপর ভীষণ ক্ষেপে আছেন দেখলাম।
এ কথা বলতেই ফেকু হাত-পা নেড়ে, সমস্থ শরীর দুলিয়ে হাসতে লাগল। ওর হাসির রোগ আছে। যে কথায় আমরা মুচকি হাসি দেই, সে কথায় ও অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে। যে কথায় আমরা অট্ট হাসি দেই, সে কথায় ওর হাসি থামতেই চায় না। কিন্তু মাহাবুব ভাই গুল্লুর ওপর ক্ষেপে আছে-এ কথার মধ্যে তো হাসির কিছু থাকতে পারে না।
ফেকু হাসতে হাসতে আমার গায়ের ওপর এসে পড়ল। আমি দিলাম এক ধাক্কা। ও দিয়ে পড়ল ফজলুর গায়ের ওপর। ফজলু দিল এক ধাক্কা। আবার এসে পড়ল আমার গায়ের ওপর। আমি দিলাম আরেক ধাক্কা। ও গিয়ে পড়ল এক পথচারীর গায়ের ওপর। পথচারী থমকে দাঁড়িালো। গরম চোখে তাকিয়ে বলল: সমস্যা কী তার? এভাবে হাসছে কেন? আবার অন্যের গায়ের ওপর এসে পড়ে!
ফজলু বলল: ওর হেডঅফিসে সমস্যা আছে।
: হেডঅফিস মানে?
: মানে ওর মাথায় একটু সমস্যা আছে। এমনিতে সব ঠিক। আচানক হেসে ওঠে। হাসলে সহজে থামাতে পারে না।
: রোগটা তো জটিল মনে হচ্ছে। বাপ-মা ওর চিকিৎসা করায় না?
: ডাক্তার-কবিরাজ, হোমিও কিছু বাদ নাই। কিছুতেই কিছু হয় না। ক’দিন ভালো থাকে তো আবার….।
: ডাক্তার-কবিরাজে এই চিকিৎসা করতে পারবে না। ওর ওপর জ্বিনের আছর হয়েছে। ওরে তাবিজ দিতে হবে। খাগড়াছড়ি গুইমারা থনায় এক হুজুর আছে। তার চার নম্বর বিবি এই তাবিজ দিতে পারবো।
: হুজুরের চার নম্বর বিবি তাবিজ দিবে? হুজুর দিতে পারবে না?
: আগে হুজুরই দিতো। এক সময় হুজুরের চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। মাদ্রাসার ছেলেদের বলাৎকার করতো। যার ফলে তার ক্ষমতা গিয়া ভর করে চার নম্বর বিবির ওপর।
: চারটা বিবি থাকতেও ছেলেদের বলাৎকা…..।
: চরিত্র নষ্ট হয়ে গেলে চারটা কেন, চল্লিশটা বিবি থাকলেও….।
মজা করতে গিয়ে আলোচনা বাজে দিকে মোড় নিচ্ছিল। আর ফজলু হলো ফটকার এক শেষ। কারও সাথে কথা পেলে চালিয়ে যাবেই। আমি বললাম: ঠিক আছে আঙ্কেল, আমরা ওকে খাগড়াছড়ির গুইমারা নিয়ে যাব। আপনি এখন আসুন। আপনার গায়ের ওপর পড়েছে বলে ওর পক্ষ থেকে আমি সরি বলছি।
লোকটা চলে গেল। এবার ফেকুর হাসি আরও বেগবান। ফজলুকে থাপড়ায় আর হাসে। বলে: লোকটাকে যা মফিজ বানালি।
আমি বললাম: তুই যদি হাসি না থামাস তো চায়ের দোকান থেকে মগ ভরে পানি এনে তোর মাথায় ঢালবো। তোর মাথা ঠান্ডা করা দরকার।
ফজলু পাশের দোকান থেকে একটা সেভেনআপ কিনে ফেকুর হাতে দিল। ঠান্ডা সেভেনআপ-এ চুমুক দিয়ে ফেকুর হাসির দমক থামল।
ফজলু বলল: গুল্লুটার মাথায় সমস্যা আছে।
: কী করেছে?
: খেলতে গিয়ে উইকেট পেলে কি করে দেখিস না।
: দেখিতো, এর-ওর ঘাড়ে লাফিয়ে উঠে আনন্দ করে। হাফ সেঞ্চুরি করলেও তাই। এখন পর্যন্ত কোনো ম্যাচে সেঞ্চুরি করতে পারে নাই। সেঞ্চুরি করলে যে কী করবে কে জানে।
: তুই তো ছিলি না। সেদিনের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছে।
: গুল্লু সেঞ্চুরি করেছে! বলিস কি! তারপর…..?
: বাধিয়ে দিয়েছে মহাঝামেলা।
: কী মহাঝামেলা? তখনই পাশ থেকে ফেকু খুকখুক করে উঠল। আমি বললাম: তুই দূরে যা প্লিজ….। ফেকু দূরে সরে গেল।
ফজলু বলল: সেঞ্চুরি করে গুল্লু এর-ওর ঘারে লাফিয়ে উঠছিল। আমরা তো এরকম অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকি। আম্পেয়ার তো ভাবেন না যে, কোনো প্লেয়ার তার ঘাড়ে লাফিয়ে উঠবে। গুল্লু যখন আচানক মাহাবুব ভাইয়ের ঘাড়ে ঝুলে পড়ল, মাহাবুব ভাই তখন ধরাতলে ধরাশায়ী।
: হাহাহাহা। আশ্চার্য ঘটনা! দৃশ্যটা মিস করলাম।
: মাহাবুব ভাই স্ট্যাম্প তুলে গুল্লুকে মারতে ছুটল, গুল্লু জানেপ্রাণে দৌড়। সে ম্যাচটা তো পন্ড হলোই, আর কোনো ম্যাচই হল না। তারপর থেকে গল্লু পালিয়ে বেড়াচ্ছে, আর মাহাবুব ভাই ওকে খুঁজছেন।