ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৪৩)

দার্শনিক হেলাল ভাই 

বিঃ দ্রঃ খুব গরম পড়েছে। রোদের মধ্যে সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে বেশি ঘোরাঘুরি করবে না। বেশি বেশি পানি পান করবে। তবে শরীরে ঘাম নিয়ে ঠান্ডা পানি পান করবে না। চা কম খাবে। অতিরিক্ত চা শরীরে পানি শূন্যতার সৃষ্টি করে। ক্ষুধা নষ্ট করে। ঘুম কেড়ে নেয়। তোমার সাঙ্গ-পাঙ্গগুলা বেশি ভাল হয় নাই।
ইতি,
তোমারই রিনি।
সেদিন কিন্তু বলেছিল, ওরা ভাল ছেলে। এখন আবার লিখেছে, সাঙ্গপাঙ্গগুলা ভাল হয় নাই। অদ্ভূত এক মেয়ে!
আমরা হতবাক। কিছুই বলতে পারছিলাম না। তাকাচ্ছিলাম এ-ওর মুখে। এরকম একটা বিষয় নিয়ে চিঠি লিখবে তা আমাদের কল্পনারও অতীত ছিল। আমরা যখন কথার খেই খুঁজছিলাম, তখন মোজাফ্ফর বলল: আমার বিবেচনায় মেয়েটা মন্দ কিছু বলে নাই।
আমরা একযোগে তাকালাম মোজাফ্ফরের মুখে। মন্দ কিছু বলে নাই! দুই বোন একই ছেলেকে বিয়ে করতে চাচ্ছে, এটা কি ভাল কথা? এই দেশ, এই সমাজ সম্পর্কে ওদের কি একটু ধারণাও নেই?
মোজাফ্ফর বলল: সতীনরা কিন্তু পরসস্পরকে বোন ডাকে, যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে সম্পর্ক ভাল থাকে না। সতীনরা যদি বোন হতে পারে, তো বোনরা সতীন হলে দোষ কী?
চায়ের দোকানদারও দেখছি সমাজ ও প্রচলিত দর্শনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাতে চায়। আমাদের মাথা তখনো কাজ করছে না। একটা ঘোরের মধ্যে আছি। মোজাফ্ফর বলল: মেয়েটা তো বলেছে যে, তারা আলাদা বাড়িতে যার যার মতো সংসার করবে।
হেলাল ভাই মোজাফ্ফরের কথার কোনো জবাব না দিয়ে আড়মোড় ভেঙে জেগে উঠে বলল: তুই বড়বোন ঝিনির চিঠিটা পড়তো। নিশ্চয় ভিন্ন কিছু পাওয়া যাবে।
আমি ঝিনি আপার চিঠি খুললাম। শব্দ করে পড়ার আগে একটু চোখ বুলিয়ে নিচ্ছিলাম। দেখি একই চিঠি, শুধু হাতের লেখা ভিন্ন। তার মানে দু’জনেই একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দু’জনই পরস্পর সতীন হতে ইচ্ছুক। দু’জনই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা আর দর্শনের বিরুদ্ধমত ধারণ করে।
ঝিনি আপার চিঠিটা আর পড়ার দরকার হল না। হেলাল ভাই বলল: আবেগ-প্রেমের ভেতর আশি ভাগ থাকে আবেগ, আর বিশ ভাগ থাকে বাস্তবতা।
গাব্বু বলল: আপনিও তো প্রেমের মধ্যে আছেন। আপনার ভেতর কি আবেগ নেই?
: ওরকম বাধভাঙা আবেগের বয়স পার হয়ে এসেছি। আচ্ছা, তোদের মত কী?
: আমরা রিনির সাথে একমত।
গাব্বু আমাদের মতামতের কোনো ধার না ধেরে সবার পক্ষ থেকে মতামত দিয়ে দিল। হেলাল ভাই বলল: রিনির সাথে একমত মানে?
: মানে, আমরা পুরনো সমাজ ব্যবস্থা আর প্রচলিত দর্শন ভেঙে প্রেমের জয় দেখতে চাই।
: এত সহজ না।
: দার্শনিক মানুষ হয়ে নতুন কোনো দর্শন দাঁড় করাতে পারেন না?
: শোন, সমাজ পরে। প্রথম ধাক্কাটা আসবে পরিবার থেকে। কোনো বাবা-মা-ই তাদের ছেলেকে একসাথে একই মায়ের পেটের দুই বোনকে বিয়ে করাতে রাজি হবে না। কোনো বাবা-মা-ই তাদের দুই মেয়েকে এক ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি হবে না।
: রিনি আর ঝিনি আপা যদি তাদের বাবা-মা’কে মানাতে পারে তো আপনাকেও আপনার বাবা-মা’কে মানাতে হবে। সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা আয়োজনে নেমে পড়বো।
হেলাল ভাই হাসলো।
আর তখনই মোজাফ্ফরের দোকানের সামনে তিনটা মোটর বাইক এসে থামল। হেলাল ভাইয়ের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আমরাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
মোটর বাইক থেকে নেমে আফজাল ভাই ধীর পায়ে আমাদের দিকে এগিয়ে এল। আর অপর দু’টি মোটর বাইকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিসমত ভাই, আর আক্কাস ভাই।
আফজাল ভাই তো আমাদের পরিচিত। এলাকার গুন্ডা, রংবাজ, মাস্তান, নেতা ইত্যাদি পরিচয়ে সে পরিচিত। হুমকি-ধামকি যাই করুক এলাকার বলে সেরকম ভয় পাই না।
কিন্তু কিসমত ভাই আর আক্কাস ভাইকে আমরা ভয় পাই। তাদের একটা মাত্র পরিচয় ক্যাডার। ক্যাডার নামের সাথেই ভয় জড়িত। বিসিএস ক্যাডারকেও মানুষ ভয়। এই উভয় ধরনের ক্যাডারই ধরাকে সরা জ্ঞান করে। এরা কাওকে তোয়াক্কা করে না। নিজেদেরকে মহাশক্তিমান মনে করে। নিজেদের ছাড়া আর কারও কোনো শক্তি আছে বলে মনে করে না।
কিসমত ভাই আর আক্কাস ভাইয়ের জেল-হাজতে বসবাসের অভিজ্ঞতা আছে। ক্যাডারগিরির ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যার যত জেল-হাজতে বসবাসের অভিজ্ঞতা বেশি, যত পুলিশের মার খাওয়ার অভিজ্ঞতা বেশি ক্যাডারদের রাজ্যে তার দাম বেশি। আমরা তাকিয়ে দেখলাম কিসমত ভাই আর আক্কাস ভাইয়ের প্যান্টের পকেটে বের হয়ে আসে পিস্তলের বাট। কেমন চকচক করছে।
আফজাল ভাই ধীর পায়ে কাছে এসে বলল: এর আগে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলাম। তাই আজ বাইক দূরে রাখলাম।
মোজাফ্ফর বলল: খুব ভালো করেছেন আফজাল ভাই-বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। সাবধানের মাইর নাই। আমরা সব সময় আপনের বুদ্ধির তারিফ করি। এখনও আপনের বুদ্ধি নিয়াই কথা হইতেছিল।
মোজাফ্ফরের কথার ধরন দেখে বোঝা গেল: সে ভীষণ ভয় পেয়েছে।
আফজাল ভাই বলল: তুমি বেশি কথা বলো। অন্যসব চা-বিক্রেতা এত বেশি কথা বলে না। এটা এক খারাপ অভ্যাস।
: আপনে বললে এই খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করার চেষ্টা করব।
: পারবে না। কথা বলার অভ্যাস ত্যাগ করা সহজ কিছু না। পারবে যদি একটা কাজ করে দেই।
: কী কাজ আফজাল ভাই?
আফজাল ভাই পকেট থেকে চকচকে এক ছুড়ি বের করে বলল: যদি এটা দিয়ে তোমার জিহ্বা কেটে নেই তাহলে তোমার কথা বলার অভ্যাস দূর হবে। জিহ্বাও না, কথাও নাই।
আমরা ভয় পেয়ে গেলাম খুবই। কিসমত ভাই আর আক্কাস ভাইয়ের পকেটে পিস্তল বের হয়ে আছে। আফজাল ভাইয়ের কাছে চকচকে ছুড়ি। আজ কী ঘটবে কে জানে। হেলাল ভাই ঘামছিল আর একটু একটু কাঁপছিল।
আফজাল ভাই হেলাল ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল: এই পাড়ার একটা সুনাম আছে, তা কি মানেন?
: অবশ্যই, প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, অঞ্চল ইত্যাদির নিজস্ব সুনাম এবং দুর্নাম আছে, যেটাকে বলা হয় ভাবমূর্তি। দোষে-গুণেই সব কিছু। কখনো দোষ একটু…….।
: এত লম্বা উত্তর দিবেন না। যে প্রশ্নের উত্তর ইয়েস/নো তে দেয়া যায় সেটা সেভাবেই দিবেন।
: আচ্ছা। বেশি কথা বলা ঠিক না, তারপরেও কেউ কেউ বেশি কথা বলে। কখনো কখনো বেশি কথা বলতে হয়। আসলে কথা হলো ঘামাচির মতো, একটা গাললে তিনটা ওঠে, তাই……।
: তাই গামাচি যাতে না ওঠে সেজন্য ঘামাচি পাউডার মাখতে হয়, আর কথা যাতে বেশি বের না হয় সেজন্য মুখে সুপার গ্লু লাগাতে হয়।
: জি জি। সুপার গ্লুর বদলে স্কচটেপ দিয়েও আটকানো যায়। সুপার গ্লু শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।
আমরা বুঝতে পারলাম, হেলাল ভাই খুব বেশি ভয় পেয়েছে এবং ঘাবড়ে গেছে। গুল্লু বলল: আফজাল ভাই, কী বলতে চাচ্ছেন সরাসরি সেটাই বলেন।
: আমি কী বলতে চাচ্ছি তা তোরা ভালো করেই জানিস।
: হয়তো জানি, তবু আরেকবার বলেন। জানাটা ক্লিয়ার করে নেই।
: পাড়ার সুনাম নষ্ট হতে আমি দিব না। এ পাড়ায় কোনো রকম নষ্টামি, নোংড়ামি বলবে না।
: এ পাড়ার সুনাম নষ্ট হবার মতো কিছু ঘটেনি, নষ্টামি-নোংড়ামির তো প্রশ্নই ওঠে না।
: একযোগে পাড়ার সব মেয়েকে প্রেম প্রস্তাব দেয়া কি নষ্টামি না? একই মায়ের পেটের দুই বোনের সাথে প্রেম করা কি নোংড়ামি না?
: প্রেমপত্র হাজার খানেক দিলেও সেটাকে খারাপ বলার অবকাশ নেই। আর দুই বোনের সাথে কেউ প্রেম করছে না।
: চোপ! একদম চোপ! তুই কি মনে করিস আমি কিছু না জেনেই এখানে এসেছি?
সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল মোকসেদ ভাই আর আক্কাস ভাই। তারা পকেটে পিস্তলের বাটে হাত রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
মোজাফ্ফর আফজাল ভাইয়ের সামনে গিয়ে হাত জোড় করে বলল: আফজাল ভাই, আমি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি, আপনি মাথা গরম করবেন না। তিনি একজন নিরীহ মানুষ, নিতান্তই ভাল মানুষ। এমন মানুষ বর্তমান দুনিয়ায়…….।
আফজাল ভাই মোজাফ্ফরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল: আমাকে ভাল মানুষ শেখাবি না।
তারপর আফজাল ভাই হেলাল ভাইয়ের মুখের কাছে আঙুল তুলে বলল: মি. হেলাল, আপনাকে এক মাস সময় দিলাম। এক মাসের মধ্যে আপনি এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন। যাবেন কি না বলুন?
: যাব, আমি এক মাসের মধ্যে এই এলাকা ছেড়ে চলে যাব।
: যদি লাগে তো আরও কিছু সময় দেয়া যেতে পারে। লাগবে?
: জি না, আর কোনো সময় লাগবে না। পঁচিশ লক্ষ বিরানব্বই হাজার সেকেন্ড একটা এলাকা ছেড়ে যাবার জন্য যথেষ্ট।
: শুনেছি আপনি দার্শনিক, এখন দেখছি অংকতেও অসাধারণ। বিশাল এক গুণফল বলে দিলেন কাগজ-কলম ছাড়া। তা দর্শন পড়া ছেড়ে দিলেন কেন?

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।