ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ২২)

কিশোর উপন্যাস

ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

: তুমি বললে তো হবে না। এই থানায় আমি মাস্টার রোলে চাকরি করি। আমি না আসলে আমার ডিউটি কে করবে? তুমি করবা?
ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখি চা-বিস্কুট এসে গেছে। চা-বিস্কুট খেলাম। চা খাওয়ার পর শরীরের ঝিমানো ভাব কেটে গেল। শরীর চাঙ্গা হলো।
লোকটা বলল: হেডস্যার আসতেছেন। তোমাদের সাথে কথা বলবেন।
গুল্লু বিস্ময় নিয়ে বলল: হেডস্যার! এখানে কি কোনো স্কুল আছে নাকি?
: আরে ধুর! দারোগা স্যারের কথা বলতেছি। অফিসার ইনচার্জ অব থানা।
: তিনি আমাদের সাথে কী কথা বলবেন?
: তিনি তোমাদের সাথে কী কথা বলবেন তা আগেই আমারে জানায়া দিলে তো তার আসার দরকারই পড়ে না।
ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ার পাতা হলো। চেয়ারের সামনে ছোট একটা টেবিল। টেবিলের ওপর ধবধবে সাদা একটা কাপড়। আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম অফিসার ইনচার্জ-এর জন্য।
একটু পর তিনি এলেন। আমরা উঠে দাঁড়াবো কি দাঁড়াবো না তা এরকম ভাবতে ভাবতে দাঁড়ানো হলো না। তবে আমরা বুক টান করে সোজা হয়ে বসলাম।
অফিসার ইনচার্জ বললেন: কেমন আছো তোমরা?
শিবলু বলল: ঐ লোক দু’জনকে যেতে বলেন, নাহলে আমরা কোনো প্রশ্নের জবাব দেব না।
: তাদেরকে?
: জি।
: কেন?
: তারা বাজে বকে। এক লাইনকে সাত লাইন বানিয়ে বলে।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটা বলল: মাই গড! সাংঘাতিক ছেলে তো তুমি! দিলা একটা বিচার। আমরা তো কোনো কথাই বলি নাই। তুমিই আমাদের কাছে জানতে চাইছিলা, প্যাঁদানী কী। আমি বলছি, প্যাঁদানী কী তা আমি কেমনে বলবো? আমি কি পুলিশ, না দারোগা। বলো, এর চাইতে এক লাইন বেশি কিছু বলছি?
অফিসার ইনচার্জ হাত ইশারায় লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন: ঠিক আছে, তোমরা যাও।
তারা চলে গেল। অফিসার ইনচার্জ বললেন: কেমন আছো তোমরা?
গুল্লু বলল: ভালো না।
: ভালো না কেন? তোমাদের সাথে কি কেউ খারাপ ব্যবহার করেছে?
: আমরা এসেছি পদ্মা নদীর রূপশোভা দেখতে। সেখান থেকে তুলে এনে থানায় বসিয়ে রাখলে ভালো থাকা যায়?
: পদ্মা নদীর রূপশোভা দেখতে! কোনো শিশু পাচারকারী তোমাদের ধরে আনেনি?
: এসব বাজে কথা শুনতে আর ভালো লাগছে না।
: তোমরা সবাই তো ঢাকার ছেলে?
: জি, সবাই এক পাড়ার। সবাই একই ক্লাশে, এবং প্রায় সবাই একই স্কুলে পড়ি।
: বলো কি!
: আমাদের পড়ার বড়ো ভাই, নাম মাহাবুবুর রহমান, আমরা ডাকি মাহাবুব ভাই। তিনি আমাদের খুব ভালোবাসেন। তিনি বিয়ে করবেন বলে কনে দেখতে এসেছিলাম মানিকগঞ্জ। মাইক্রোবাসের ড্রাইভার বেখেয়ালে আমাদের নিয়ে আসে আরিচা। আমরা রাতটা পদ্মা নদীতে কাটাতে সিদ্ধান্ত নেই। আজ মানিকগঞ্জ ফিরে কনে দেখার কথা ছিল। কিন্তু আমরা বসে আছি এখানে। মাহাবুব ভাই আর আকমল ভাইকে নাকি পাঠানো হয়েছে মানিকগঞ্জ জেল-হাজতে।
অফিসার ইনচার্জ চোখের ভেতর মণি ঘোরাতে লাগলেন। মুখের ভেতর জিহ্বাটাকে ঘোরাতে লাগলেন। তারপর বললেন: মনে হচ্ছে, কোনো মিসটেক হয়ে গেছে।
আমি বললাম: শুধু মিসটেক নয়। গ্রেট মিসটেক। আমাদের সাথে ছিলেন মাহাবুব ভাইয়ের বন্ধু আকমল ভাই। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক। দেশের নামকরা একজন চিত্রশিল্পী। তাকেও জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে। এই দেশে মানুষ মুক্তভাবে ঘুরে বেড়াতে পারবে না? ইচ্ছা মতো সুন্দর দেশটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে না?
অফিসার ইনচার্জ চেয়ার থেকে উঠে আমার কাছে এলেন। আমার লম্বা চুলের ভেতর আঙুল চালিয়ে আমাকে আদোর করলেন। বললেন: তোমরা প্রথমেই যদি এভাবে কথা বলতে তাহলে তো ঘটনা এত দূর এগোতো না।
: আমাদের তো মুখ খুলতেই দেয়া হয়নি।
: দুঃখিত, যা ঘটে গেছে তার জন্য আমি দুঃখিত। খুব শীঘ্রই তোমাদেরকে ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করছি। কোন থানায় পাঠালে তোমাদের বাবা-মা’র সাথে যোগাযোগ করা সহজ হবে?
: রমনা থানায়।
: ঠিক আছে, ঘন্টাখানেকে মধ্যেই তোমাদেরকে রমনা থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করিয়ে দিব।
আধাঘন্টা পরে এক লোক বড় বড় দুই প্যাকেট নিয়ে সেই ঘরে এল। এর আগে লোকটাকে আমরা দেখিনি। সে প্যাকেট দুটি টেবিলে নামিয়ে বলল: তোমরা নাকি বারেকের ওপর বিরক্ত?
আমরা যার ওপর বেশি বিরক্ত ছিলাম তার নাম বারেক তা বুঝতে পারলাম। আমি বললাম: লোকটা বেশি কথা বলে।
: এইটা ওর মারাত্মক এক বদ অভ্যাস। এই বদ অভ্যাসের জন্য ওর বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে। যাওয়ার সময় বলে গেছে, যেদিন তুমি ফাও কথা বলার অভ্যাস বাদ দিত পারবা সেইদিন খবর দিবে, আমি ভাপা পিঠা নিয়া ফিরা আসবো। ও বদ অভ্যাসটা বাদ দেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেছে, কিন্তু পারতেছে না। ওরে আমি অনেক বুঝানোর চেষ্টা করছি যে, অধিক কথায় হায়াত কাটা যায়। প্রতি শব্দে যদি দুই সেকেন্ড করে কাটা যায় বছরে কত মিনিট কাটা যায় হিসাব কইরা দেখো। আমার তো মনে হইতেছে, ওর হায়াত আর বেশি বাকি নাই।
শিবলু বলল: আপনার বউ এখনও বাপের বাড়ি যায় নাই?
: আরে না, আমার বউ বাপের বাড়ি যাইবো কোন দুঃখে? বিশেষ কোনো গুণ নিয়া দুনিয়ায় আসি নাই। একটা মাত্র গুণ হইল, কথা কম বলি। এই গুণটার জন্য বউ আমাকে খুব ভালোবাসে। আমদের হেডস্যারও আমাকে খুব ভালোবাসে। আমাকে ছাড়া তিনি অচল। বারেকের ওপর যারা বিরক্ত হয়, তাদের কাছে আমাকে পাঠায়। যেমন তোমরা…..।
ধপ করে লোকটা কথা থেমে গেল। আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। দেখলাম, দরজায় অফিসার ইনচার্জ দাঁড়িয়ে। সাথে তিনজন কনস্টেবল। অফিসার ইনচার্জ সেই লোকটাকে বললেন: তুমি এসব ওদের মধ্যে ভাগ করে দাও।
লোকটা আমাদের সবাইকে এক প্যাকেট চানাচুর, এক প্যাকেট বিস্কুট আর এক বোতল পানি দিল। অফিসার ইনচার্জ বললেন: যেতে যেতে যদি তোমাদের ক্ষুধা লাগে তো খাবে। পিপাসা লাগলে পানি পান করবে। এই তিনজন আমার স্টাফ। এই হলো ফোস্তফা, সে গাড়ি চালাবে। এই হলো ইউনুস আর লতিফ তোমাদের দেখাশোনা করবে। পুলিশের গাড়িতে নয়, তোমাদের পাঠাচ্ছি হাইয়াস মাইক্রোবাসে।
আমরা প্যাকেটগুলো আর পানির বোতল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। অফিসার ইনচার্জ বললেন: তোমরা চানাচুরের প্যাকেটটা দেখতে পারো। ঢাকায় তোমরা যেসব চানাচুর খাও, এটা সেগুলো না, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ব্রান্ডের। আমাদের দেশীয় ব্রান্ড।
চানাচুরের প্যাকেটে তাকিয়ে দেখি লেখা, জামাই-বউ চানাচুর। আমাদের খুব হাসি পেল।
অফিসার ইনচার্জ বললেন: এই চানাচুরের সাথে আছে ভালোবাসা আর পরিশ্রমের ছোঁয়া।
আমরা কিছু বঝলাম না। অফিসার ইনচার্জ-এর মুখে চেয়ে রইলাম। তিনি বললেন: দু’জন নারী-পুরুষ পরস্পরকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। সংসার পেতেছিল। তাদের সংসারে ভালোবাসা থাকলেও ছিল অভাব-অনটন। কথায় আছে, অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায়, ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। তারা চানাচুর তৈরীর পদ্ধতি শেখে। তারপর চানাচুর বানাতে শুরু করে। চানাচুরের নাম রাখে, জামাই-বউ চানাচুর। সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের ফলে তাদের অভাব দূর হয়ে যায়। এখন বেশ কয়েকটা ভ্যানে তাদের চানাচুর বিক্রি হয়। প্রতি বিকালে একটা ভ্যান আসে আমাদের থানার সামনে। এই চানাচুর খাওয়ার পর, অন্য কোনো ব্রান্ডের চানাচুর আমার মুখে রচেনি। আশাকরি, তোমাদেরও ভালো লাগবে। এই চানাচুরের সাথে মিশে আছে পরিশ্রম ও সততার আদর্শ।
একটা চানাচুর কোম্পানী গড়ে ওঠার ইতিহাস আমরা জানলাম। ইতিহাসটা মন্দ লাগেনি। মোটামোটি ইন্টারেস্টিং। তবে অফিসার ইনচার্জ ভদ্রলোককে আমাদের খুবই ভালো লেগেছে। তিনি সততা ও পরিশ্রমকে খুব মূল্যায়ন করেন বোঝা গেল। সততা ও পরিশমের আদর্শ নিশ্চয় তার ভেতরও আছে। তা না হলে তিনি সততা ও পরিশ্রমকে এতটা মূল্যায়ন করতে পারতেন না। এরকম লোক আজকাল কমই পাওয়া যায়।
আমরা ঢাকায় ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। হুরমুর করে থানার বাইরে চলে এলাম। বাইরে এসে খুব অবাক হলাম। বৃষ্টির লেশমাত্র নেই। ঝিকিমিকি রোদের খেলা। কি উজ্জ্বল দিন! মনে হল, কত বছর পর এমন উজ্জ্বল রোদ দেখলাম।
রমনা থানায় এলে আমাদের সবাইকে দুপুরের খাবার খেতে দেয়া হল। মুরগির মাংস আর ঘন ডাল। ব্রয়লার মুরগি না। দেশি মুরগি। রান্নাটা হয়েছে খুব ভালো। সাথে লেবু, পেঁয়াজ, মরিচ, আর শশা। খাবার পরিবেশনকারী লোকটা বলল: কাঁচা পেঁয়াজ দেয়া কঠিন, তাও তোমাদের দিলাম। শিশুদের সাথে কার্পণ্য করা ঠিক না। গুল্লু বলল: কাঁচা পেয়াজ দেয়া কঠিন কেন?
: দেশের খবর কিছু রাখো? পেঁয়াজের দাম কেমন ধাঁই ধাঁই করে বেড়ে যাচ্ছে তা জানো না? দুই দিন আগে ছিল ১৫০ টাকা কেজি, আজ সকালে ২০০ টাকা, আর এই দুপুরে হইছে ২২০টাকা কেজি। এই জীবনে ২২০ টাকা পেঁয়াজের কেজি দেখবো তা কখনো ভাবি নাই।
: আপনি পেঁয়াজগুলো তুলে নেন। আমাদের পেঁয়াজ লাগবে না। লেবু আর শশা হলেই চলবে।
: তুলে নিতে হবে না। তোমরা না খেলে তো বাটিতেই থাকবে। পরে সেগুলো অন্য কিছু রান্নার কাজে ব্যবহার করবো।
খাওয়ার পর আমাদেকে ওসির কক্ষে নেয়া হল। সেখানে আগে থেকেই যুবক ধরনের দু’জন লোক বসে ছিল। আমরা ঢুকতেই তারা চেয়ার টেনে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসলো। অনেকগুলো প্লাস্টিকের চেয়ার নামানো ছিল। আমরা সেগুলোতে বসলাম।
ওসি সাহেব বললেন: তোমাদের খাওয়া-দাওয়া কেমন হয়েছে?
আমি বললাম: ভালো হয়েছে।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।