সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অসিত কর্মকার (পর্ব – ৮)

যুদ্ধ যুদ্ধ

আট

এদেশের মাটিতে প্রথম রাতটা ভাল কাটল না মানুষটার। সকাল সকাল স্নানটা সেরে নেওয়ার পরও দুচোখে ঘুম ঘুম ভাব। শরীরময় কেমন এক অবসাদ। ধোয়া ধুতি আর ফতুয়া  পরেছে। মাথার ওপরে এখন খড়ের চালা। তবে চারিদিক খোলা বলে ভিতরে রোদ আর ছায়ায় মাখামাখি। নিমগাছটার শিকড়ের খাঁজে আয়না বসিয়ে চুল আঁচড়ায় মানুষটা। মাঝখানে সিঁথি করে। দাড়ি গোঁফে চিরুনি চালায়। তারপর রসকলি করতে বসে। কপালে, কন্ঠায়, দুবাহুতে তিলক আঁকে। শরীরে একটা চাকচিক্যভাব ফুটে ওঠে। তাতে করে মন আর শরীরে খানিক আরাম বোধ করে। আয়নায় নিজেকে বার বার দেখে খুশিই হয়। এদেশের মাটিতে আজ তার এক বিশেষ দিন। নিজের বাঁচার রসদ নিজেই জোগাড়ে বেরুবে। জায়গা ভেদে মানুষের মনমানসিকতা নানারকম। তাই মানুষটার মনে সংশয়ও কম নয়। সাধুসন্তে ভক্তিশ্রদ্ধা আছে তো এই দেশের মানুষের মনে। লুকাসকে সে কথা জিজ্ঞেস করতে সে বড় করে মাথা নাড়িয়ে বলেছিল, আছে আছে, খুব আছে। ওতে করে আপনার একার জীবন চলে গিয়েও বেশি। আমি আপনার সঙ্গে যাব। দূর থেকে এক এক করে হিন্দু বাড়িগুলো দেখিয়ে দেব।
শুনে খানিকটা হলেও আশ্বস্ত হয়েছিল মানুষটা। তবে ওই একার জীবনের কথাটায় মনটায় বড় ঘা লেগেছিল। হ্যাঁ, একা। বড় একা সে। বউ থাকতেও নেই। ছেলেমেয়ে থাকতেও নেই। সব এখন ওই দেশে পড়ে আছে। চিরদিনের জন্য। বাপ তার মনে সন্দেহের বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে, নিজের ছেলেমেয়ে বলে যাদের জানে তারা নাকি আদৌ তার নাও হতে পারে। কারণ মালতিবউয়ের স্বভাবচরিত্তির ভাল ছিল না। সে কীরকম, না, বিয়ের আগে থেকে তার অন্য পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পরেও সে ওই সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তাহলে তার স্বভাবচরিত্তির ভাল হয় কী করে! সমাজ এমনটাই মনে করে।
ও গোঁসাই, সেজেছ তো বেশ। শুনলাম কাল রাতে তোমার গামছাটা চুরি গেছে?
চমকে উঠে পিছনে তাকিয়ে মানুষটা দেখল, পারু দাঁড়িয়ে। রহস্যময় মিটিমিটি হাসছে। নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেল যেন মানুষটা। এই গামছা চুরির ব্যাপারটা নিয়ে সে আর কথা বাড়াতে চায় না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। আর যা বলার দয়ালকে সে বলেছে।
গেছে গেছে, পুরানা গামছা, আর কয়দিনই বা ব্যবহার করতে পারতাম! নতুন একটা হইব। একরকম ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষটা বলল।
তা তো হবেই, আমার বাপটা যে তোমাকে বড্ড ভক্তি শ্রদ্ধা করে। এখন থেকে তোমার জন্য আরও কতকিছুই না হবে। হাসতে হাসতে পারু ফের বলল, আমার কী মনে হয় জানো গোঁসাই, গামছা কুকুরে নেয়নি, কোনও চোরেই নিয়েছে। কিন্তু সে চোর বড্ড বোকা, তোমার ওই পুঁটুলিটা নিলে না হয় কিছু পেত। হি হি হি…।
নিলে নিত, ঐতেই বা কোন সাত রাজার ধন আছে শুনি? মানুষটার কথায় অভিমান ঝরে পড়ে। ফের বলল, নিজের থাকন খাওনের ব্যবস্থা নিজেই করুম বইলাই না তৈরি হইছি।
সেই ভাল গোঁসাই। দেখছই তো আমাদের অবস্থা। কত কষ্টে আছি।
ঘোৎ ঘোৎ ঘোৎ।হঠাৎ সেই বিকট শব্দ আবার। যেন এদিকেই ছুটে আসছে জানোয়ারগুলো। লুকাস দেরি না করে একটা লাঠি হাতে ওদের দিকে ছুটে গেল। দুম দুম করে কয়েক ঘা বসিয়ে দিল কয়েকটার পিঠে। যন্ত্রণায় পরিত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিল ওগুলো।
এদেশের মাটিতে প্রথম মাধুকরী করতে বেরোবার মুখে সাতসকালে এ কী ঘৃণ্য ঘটনা, কী বিভৎস দৃশ্য, অনাচার অনাচার! মনটা বিষিয়ে উঠল মানুষটার।
কাছে এসে লুকাস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, মেরেই বেটাদের খিদে মেরে দিয়েছি গোঁসাই। বেশ একটা কৃতিত্বের ছাপ ফুটে ওঠে লুকাসের চোখেমুখে। বলল, আচ্ছা গোঁসাই, আপনি গননা করে বার করতে পারেন না, ওই গামছা কে চুরি করেছে?
   লুকাসের কথা শুনে পারু তো অবাক। মানুষটার এসব গুনও আছে! বলল, তুমি তো দেখছি মস্ত গুনের মানুষ, তা গুনে বার করই না দেখি, গামছাটা কে নিয়েছে!
লুকাস হাতের লাঠিটা বারকয়েক মাটিতে ঠুকে জোরের সঙ্গে বলল,
মস্ত গুনের মানুষই তো, আরও অনেক কিছু পারেন উনি!
আমার এখন ফালতু প্যাচালপিটার সময় নাই! লুকাসের উদ্দেশ্যে বলল, ল, আমার লগে যাবি তো?
লুকাস মুহূর্তে হাতের লাঠিটি দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, হ্যাঁ, চলেন।
     ঝোলা কাঁধে মানুষটা লুকাসের পিছনে পিছনে চলেছে। দৃশ্যটা দেখে পারু কটকটিয়ে হেসে উঠে বলল, শাগরেদটা কিন্তু তুমি জুটিয়েছ বেশ গোঁসাই!
মানুষটা নির্বিকার। কোনও কথা নেই তার মুখে। বরং তার চলার গতি বাড়ে।
লুকাস একটা একটা করে হিন্দুবাড়ি মানুষটাকে চিনিয়ে দেয়। সে বাড়ির সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষটা কর্তাল বাজাতে বাজাতে গৃহস্থের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। শ্রীকৃষ্ণের ভজনা করে গান গায়। কোনও কোনও গৃহস্থবউ তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়। ভাবে, এ মানুষ আবার কোত্থেকে এল। তবে কোনও গৃহস্থই তাকে খালি হাতে ফেরাল না। চাল, পয়সা, আনাজপাতি ঝোলায় উপুড় করে দিল। কিন্তু এদের ব্যবহারে মন ভরল না মানুষটার। বড় নির্দয় লাগল। কেউ তাকে সমাদর করে পিড়ি আর জল এগিয়ে দিল না। থাকাখাওয়ার জন্য পিড়াপিড়িও করল না। তাহলে কি সাধুসন্ত মানুষের জন্যও এ মাটি কঠিন ঠাঁই! নাকি সেই ল্যাংড়া সাধুর মোহে এখনও এরা আবিষ্ট হয়ে আছে। মানুষটা নিশ্চিত বুঝল, ওই সাধুর মোহ এদের মন থেকে ঘোচানো শুধু নয়, ঠাকুরদেবতার নামগান ছাড়া এদের মনজোগানো গানও তাকে গাইতে হবে। এই জীবনের চলার পথ যে এখনও অনেক বাকি। তারজন্য যেমন করেই হোক এই মাটিতে তাকে থিতু হতেই হবে।
গ্রামপরিক্রমা সেরে মানুষটা বাজারে ঢুকল। সেখানে বিচিত্ররকমের অভিজ্ঞতা হল তার। কিছু চ্যাংড়া ছেলে তার পিছনে লাগল। ভন্ড ভন্ড বলে চেঁচিয়ে উঠল কয়েকজন। কেউ কেউ আদি রসাত্মক গান পর্যন্ত দাবি করে বসল। মানুষটাও একরকম বাধ্য হয়ে শুনিয়ে দিল দুটো গান। ওরা আরেকটা আরেকটা বলে চেঁচাতে লাগল। কিন্তু পকেট থেকে পয়সা বার করার বেলায় নেই। অবস্থা বুঝে বলল, আইজ আর না বাবারা, বড় খুদা পাইছে।
কোনওরকমে ওদের হাত থেকে রেহাই পেয়ে বাজারের বাইরে বেরিয়ে এসে সে শুধু ভাবছে, এ ঠাঁই বড় কঠিন ঠাঁই! এখানে নিজের মতো করে চললে বাঁচা যাবে না। পাঁচজনের চাহিদা পূরণ করেই তাকে বাঁচতে হবে।
নিজের ডেরায় ফিরে এল মানুষটা। মাথার ওপর খটখটে আগুনে সূর্য। চালার নীচে ছায়ার লেশমাত্র নেই। গা থেকে ফতুয়াটা খুলে ফেলল। তারপর মাটির কলসিটা হাতে তুলে নিল।
নিজের হাতে জল ভরতে যাবে। খাওয়ার রসদপাতি যা জুটেছে তাতে দু তিনদিন চলে যাবে। তবে তাকে একেকদিন একেকদিকে মাধুকরী করতে বেরোতে হবে। একই দিকে বার বার গেলে গৃহস্থের হাত আর উপুড় হবে না। যেখানে বাজারহাট সেখানে মানুষের মেলা। তাদের আবার নানা রূপ। ভিন্ন মনের ভাও। নানা রসের কাঙাল। মানুষটাকে ওদের রসের জোগানদার হতে হবে। ওদের চাহিদামত জোগান দিয়ে যাবে। আর বাজারহাট জয় করা মানেই তো আশপাশের পাঁচটা গ্রামের মানুষের মন জয় করে নেওয়া। সেইসঙ্গে নাম ছড়িয়ে পড়া। মানুষটা তার আগামী দিনের কর্মকান্ড ছকে নেয়। কলসি হাতে ডেরা থেকে বেরিয়ে একবার ভাবে, এসময় তার জল আনতে যাওয়া ঠিক হবে কিনা। যদি পারু তার আগেই ওখানে গিয়ে থাকে! সেখানে অগস্টিন থাকবে। ভেরির দক্ষিণ পাড় ধরে দয়ালকে এদিকে এগিয়ে আসতে দেখে মানুষটা। তার দুকাঁধে দুটো বাঁশের টুকরো। কষ্টে ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে হাঁটছে।
এই বাঁশ নিয়া তুমি কই থিকা আইলা দয়াল? মানুষটা জিজ্ঞেস করল।
গেছিলাম গোঁসাই তিওর পাড়ায়। আপনার ঘরের জন্য চেয়েচিন্তে দুটো বাঁশ নিয়ে এলাম। এই দিয়ে ঘরের খুঁটি হবে। বিকেলে বেরোব কিছু খড়বিচালির খোঁজে।
কইতাছিলাম আমার পোটলাপাটলিগুলা পাহারা দেওনের একটা ব্যবস্থা করতে পার দয়াল? তাইলে আমি একটু জল আনতে যাইতে পারতাম।
তা লুকাস ছোড়াটা গেল কোথায়? দয়াল  জিজ্ঞেস করল।
কী জানি…। কথাটা শেষ করে না মানুষটা।
আসলে লুকাস মানুষটার কথামত বশীকরণের জন্য দরকারি জিনিসগুলো জোগাড় করতে গেছে। ওগুলো জোগাড় হলে এর পরের করণীয় কাজের কথা বলবে মানুষটা।
দয়াল বাঁশের টুকরো দুটো মাটিতে রেখে ঘরের দিকে যেতে যেতে বলল, দেখি কাউকে পাই কিনা।
একটু বাদে পারু বসতির বাইরে বেরিয়ে এল। পারুর কাঁখে কলসি।জল আনতে যাবে। গাছকোমর করে পরা শাড়ি। চুলটা পিছন দিকে টেনে আঁচড়ানো। প্রসাদনহীন হলেও ঝকঝকে মুখমণ্ডল। মানুষটার উদ্দেশ্যে বলল, আমারও যে এখন জল আনতে যাওয়ার সময় গোঁসাই, বাপ যতই বলুক, তোমার ওই বিষয়সম্পত্তি পাহারা দিতে এখন আমি পারব না!
এই আমি যামু আর আসুম, কতক্ষণ আর লাগব পারু। একরকম মিনতিই করে মানুষটা।
তারচেয়ে চলো না গোঁসাই দুজনে একসঙ্গে জল আনতে যাই! পারুর আহ্লাদি গলা।
ধুর মাইয়া তা হয় নাকি! মানুষটা একরকম হতভম্ব হয়ে বলল। এমন প্রস্তাব সে একদমই আশা করেনি। বিশেষ করে এই সময়ে। যেখানে পারু জল আনতে গিয়ে তার মনের মানুষটার সঙ্গে দেখাও করবে, সেখানে তার উপস্থিতি দুজনের কাছে কাম্য হওয়ার কথা নয়।
কেন হবে না? তুমি গোঁসাইমানুষ, তোমার সঙ্গে গেলে কেউ কিছু মনে করবে না।তোমাদের ধর্মেই তো বলে সাধুসন্ন্যাসিদের সঙ্গ হল সৎসঙ্গ। চলোই না! একরকম জোরই করে পারু। পরক্ষণেই গলা খাদে নামিয়ে বলল, চলো, একজনের সঙ্গে তোমার পরিচয় করিয়ে দেব।
কার লগে?
কার সঙ্গে আবার গোঁসাই, যাকে তুমি কাল রাতে ভাল করে দেখতে পাওনি তার সঙ্গে গো! হি হি  হি।
হঠাৎ যেন মানুষটার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। ধরা পড়ে গেছে সে। নিজেকে আড়াল করতেই খানিক উত্তেজিত হয়ে বলল, মিথ্যা কথা, ডাহা মিথ্যা কথা কইতাছস তুই! আমি কখন কারে দেখনের চেষ্টা করলাম?
ঠিকই বলেছো গোঁসাই, তুমি কাউকে দেখার চেষ্টা করোনি। আমি তোমার সঙ্গে এতক্ষণ ইয়ার্কি করছিলাম। এখন চলো তো! তোমার বিষয়সম্পত্তি পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা আমি। করছি।
ছেলেদের দঙ্গল থেকে পারু দুজনকে ডাকল। বলল, লাঠি হাতে এখানে দাঁড়িয়ে থাক। শোরগুলো যেন এদিকে মোটে না আসতে পারে। আর কেউ যেন গোঁসাইয়ের চালার নীচে না ঢোকে। ঢুকলে তাকে প্রভু কঠিন শাস্তি দেবে। আমরা না ফেরা পর্যন্ত এখানে দাঁড়িয়ে থাকবি। তোদের আমি মেঠাই খাওয়াব।
ছেলে দুটো খুব খুশি হয়ে দুটো লাঠি হাতে নিয়ে টানটান হয়ে মানুষটার ডেরার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ভেড়িপথ সরু।দুজনে কোনওক্রমে পাশাপাশি হাঁটা যায়। কোথাও আবার আগুপিছু হয়ে চলতে হয়। জায়গায় জায়গায় দুপাশে ধস নেমে আরও সরু হয়ে গেছে। সেসব জায়গাগুলো মানুষটা আগে আগে পার হয়ে যায়।পাছে পাশাপাশি হাঁটতে গিয়ে পারুর ছোঁয়া লাগে! তা দেখে মানুষটার সঙ্গে একটু মজা করার মতলব করে পারু। মানুষটার গায়ের খুব কাছে চলে আসে। এই বুঝি মানুষটাকে ছুঁয়েই দিল সে! মানুষটা যতটা পারে সরে গিয়ে নিজেকে ছোঁয়াছানি থেকে বাঁচায়। একটু বেখেয়ালে পা ফেললে একদম নদীর চরে গড়িয়ে পড়বে মানুষটা। তাতে তার কলসিটা ভাঙ্গবে, নিজে জলকাদায় মাখামাখি হয়ে একেবারে বিশ্রী অবস্থা হবে। আরেকটু এগোলে আরেকটা ধসে ভাঙ্গা সরু পথ এল। পারু দেখল, এই সুযোগ মানুষটাকে জব্দ করার। মানুষটা আগে আগে ওই সরু পথটুকু পেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম করলে পারুও জোরে পা চালিয়ে নিজে আগে পেরোতে গেলে মানুষটার গায়ে ধাক্কা লাগে। পারুর কোমর মানুষটাকে ছোঁয়। টাল সামলাতে না পেরে মানুষটা নদীর দিকে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলে পারু একরকম হায় হায় করে ওঠে। চরার কাদাজলে না পড়লেও খাদের শেষ প্রান্তে এসে জড়ামুড়ি করে আটকে থাকে মানুষটা। কোনওরকমে কলসিটা অটুট রাখতে পারে।
ধুর মাইয়াডা, দিলি তো আমারে ছুঁইয়া। উ হু হু, পাওখান বুঝি ভাঙ্গাই গেল। মানুষটা রাগে ফেটে পড়ল। যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকে। বলল, দিলি, দিলি তো আমার জাত মাইরা!
পারু শরীর কাঁপিয়ে খিল খিল হেসে খাদটার দিকে দুপা নেমে মানুষটার দিকে তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়।
হাতটা ধর গোঁসাই। তোমার পাও ভাঙ্গেনি, জাতও যায়নি। কেউ না দেখলে জাত যায় না গোঁসাই। এই সুনসান দুপুরে ধারেকাছে আর কোন মানুষটা আছে যে তোমার জাত যাওয়া দেখছে? আমিও কথা দিচ্ছি এ ঘটনার কথা আমি কাউকে বলব না।
সত্য কইতাছস? কাতর কন্ঠে জানতে চায় মানুষটা। তার মনে আশঙ্কা, পারু যে ধারার মেয়ে পাঁচজনের সামনে তাকে বেইজ্জতি করতে কোনও আগুপিছু ভাববেই না। তাই এই ছোঁয়ায় বড় মুশকিলে পড়েছে সে।
হ্যাঁ গো, হ্যাঁ, এই প্রভু যীশুর নামে শপথ করে বলছি, আমি কাউকে বলব না, বিশ্বাস কর। গলার ক্রুশ ছুঁয়ে পারু বলল।
আবার ওই নাম! অন্য সময় হলে পারুকে দুকথা শুনিয়ে দিত মানুষটা। কিন্তু এখন  তাকে রাগ করা ঠিক হবে না। ডান হাঁটুটা ফের ছড়ে গিয়ে রক্ত ঝরছে। ধুতি ভিজে লাল। নোনা ঘাম আর মাটি লেগে অসহ্য জ্বালা করছে। এভাবে পড়েই বা থাকবে কতক্ষণ। খিদেতৃষ্ণাও যে পেয়েছে খুব।
হাতটা বাড়ায়। হাতে হাত বাঁধা পড়তে এক আশ্চর্য শিহরণ সারা শরীরে খেলে গেল মানুষটার। কেমন এক থরথর বিবশভাব।
রক্তে যে ভেসে যাচ্ছ গোঁসাই। তাড়াতাড়ি উঠে আসো। কটা মরিচপাতা তুলে আনি। ডলে রস লাগিয়ে দিই। রক্ত পড়া বন্ধ হবে।
থো ফালাইয়া তোর রক্ত, এইটুকা কাঁটাছিঁড়ায় কিচ্ছু হইব না। গেল দিনের ক্ষত লুকানোর চেষ্টা করে মানুষটা।
তা বললে হয় গোঁসাই? তোমার ভালমন্দ দেখা এখন আমাদের উপর। বলতে বলতে পারু মৃদুমৃদু হাসে।
ভেড়িপথের উপর উঠে দাঁড়াল দুজনে। পারু দৌড়ে গিয়ে কটা মরিচপাতা তুলে এনে হাতের তালুতে ডলে রস বার করে। বলল, দেখি গোঁসাই তোমার পাটা।
মানুষটা বড় সংকোচের সঙ্গে হাঁটুর কাপড়টা সরিয়ে দিলে পারু ক্ষতস্থানে রস লাগিয়ে দিল। সেইসঙ্গে অবাক চোখে বলল, হাঁটুতে যে তোমার আগের চোটও  আছে দেখছি গোঁসাই। কী করে হল?
ক্ষতস্থানটা ফের একবার জ্বালা করে ওঠে। পরক্ষণেই আরাম বোধ করতে থাকে মানুষটা। সেইসঙ্গে পারুর প্রতি এক কৃতজ্ঞতাবোধ জন্ম নিতে থাকে তার মধ্যে। কিন্তু মুখ ফুটে তা প্রকাশ করে না। পুরানো ক্ষতটার কথাও উত্থাপন না করে কেমন এক বেখেয়ালি ভাব নিয়ে দূরের পানে তাকিয়েই থাকে। নদীর ওপারটা দিয়ে মরীচিকাময় আলোর ধুধু আর ধুধু।ওখানেই যেন উত্তরটা হারিয়ে গেছে মানুষটার।

ক্রমশ… 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।