সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অসিত কর্মকার ( পর্ব – ৪)

যুদ্ধ যুদ্ধ

চার

রান্নার জন্য আগুনের ব্যবস্থার কাছে এসে দাঁড়ায় মানুষটা। দেখে হতভম্ব হয়। মন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এমন চুলা বানাইলা দয়াল আগুন আর পাতিলে ঠেকব না। তিন ঢিলার মাঝখানটায় একটু গত্ত করন লাগে না? আগুন না আটকাইলে তাপ পাওন যায়! বাতাসের লগে ফুড়ুৎফাড়ুৎ উইড়া যায় না! বেজায় বিরক্তিভরা গলায় চেঁচিয়ে বলতে থাকে মানুষটা।
দয়াল আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছিল, সূর্যটা অকাতরে আগুন ঢালছে। তার মধ্যে বাপঠাকুদ্দার অভিসম্পাত ভরা আগ্নেয়চোখগুলো জ্বলছে। যেন আগুন নয় ওদের অভিশাপ তাদের জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়ার জন্য নেমে আসছে। ভয় আর আতঙ্কে কুঁকড়ে এতটুকু হয়ে যেতে থাকে দয়াল। আত্মধিক্কার জাগে তার মনে, পেটের দায়ে জাত ধর্ম খোয়ালাম! এরচেয়ে মৃত্যুও যে ভাল ছিল। পাপ পাপ, মহাপাপ করেছি গো আমরা, ও বাপঠাকুদ্দা! পরক্ষণেই দয়ালের মনে বিপরীত প্রশ্নও জাগে, কিন্তু, ও বাপঠাকুদ্দা, তোমরা এটাও তো মানবে, ক্ষুধার কোনও জাত ধর্ম নেই। যার প্রাণ আছে তারই ক্ষুধা পায়। বাঁচার উপায় জুটলে কে আর মরতে চায় বলো। তখন প্রাণটুকু ধরে রাখাটাই জাত, বেঁচে থাকাটাই ধর্ম।
কিন্তু দয়ালের এই ভাবনা চোদ্দপুরুষের রোষাণলের কাছে কতটুকু সময় আর প্রতিরোধ গড়ে রাখতে পারে। সময়ের সঙ্গে দয়াল এমন ভাবনা ভাবার জন্যই নিজেকে মনে মনে দোষারোপ করতে থাকে। হাহাকার করে ওঠে সে, হায় হায়, এ কী পাপ করছে সে, নরক নরক, নির্ঘাত নরকবাস হবে তার! ক্ষমা, ক্ষমা করো গো তোমরা!
তবুও আজকের দিনটা বড় সৌভাগ্যের মনে করে দয়াল। বাপঠাকুদ্দার গুরুদেব বড়গোঁসাইয়ের ছেলে হরগোঁসাই এসেছে তাদের দোরে। আজ তারা বিধর্মী হলেও ওই মানুষটার যত্ন আত্তিতে কোনও ত্রুটি রাখবে না। মানুষটার প্রতি কোনও অন্যায় অন্যায্য কাজ সে কিছুতেই হতে দেবে না। পাপের বোঝা আর যেন না বাড়ে।
মানুষটার চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে এল দয়ালের।সংকোচের সংগে বলল, মাত্র কটা দিনের তো ব্যাপার তাই…
বোঝলাম না আমি তোমার
কথাটা। কটা দিনের ব্যাপার না কী কইলা! তারপর থিকা আমি যাইম কোন চুলায়? তমরা জাত খুয়াইয়া বইছ, তাই আমার থাকনখাওনের ব্যবস্থার চিন্তা নাই তমাগ আর। আগে জানলে এই দেশে পাড়িই দিতাম না। নিজের ধম্ম নিয়ে ওই দেশেই পইড়া থাকতাম। বলতে বলতে আবেগতাড়িত হয়ে পড়ে মানুষটা। গলা ছোট হয়ে আসে। কন্ঠস্বরে হতাশা আর আশঙ্কা ধরা পড়ে।
আমাদের ভুল বুঝবেন না গোঁসাই। আপনাকে তাড়িয়ে দেওয়ার দুর্মতি যেন ভুলেও আমাদের না হয়। আপনার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা একটা আমরা ভেবে রেখেছি। শুধু আজকের রাতটা একটু কষ্ট করুন গোঁসাই। অনতিদূরের দিকে আঙুল তুলে বলল, ওই যে শ্মশানের কাছে ভাঙ্গা ঘরটা দেখছেন, ওটা আপনার জন্য সারাই করে দেব। আজ বিকেল থেকেই সারাইয়ের কাজে নেমে পড়ব সবাই।
মানুষটার মনে ভয়ের ছায়া ছড়ায়। শেষপর্যন্ত কিনা তাকে শ্মশানবাসী হতে হবে! সে কি তান্ত্রিক না কাপালিক? একরকম গর্জে ওঠে মানুষটা।
এছাড়া আমাদের আর সাধ্যি কী গোঁসাই। যে জমিতে আমরা বাস করছি তা মিশনবাড়ির।মিশনের অনুমতি ছাড়া আর কেউ এখানে ঘর তুলতে পারে না। আপনি আমাদের মধ্যে থেকে কেন শুধু শুধু জাত ধর্ম খোয়বেন।
পারু এতক্ষণ ঘরের দাওয়ায় পা ঝুলিয়ে বসে সব ঘটনাগুলোই লক্ষ করছিল আর ভিতরে ভিতরে অসহ্য হয়ে উঠছিল। মানুষটাকে নিয়ে এত আদিখ্যেতা কেন! সে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, আপনি গোঁসাই মানুষ, আমাদের মধ্যে কেন থাকবেন। শ্মশানেই আপনার সাধন ভজন পুজোআর্চা করার সুবিধা। হঠাৎ চোখ দুটো বড় করে ফের মজা উপভোগ করার গলায় বলল, কি গোঁসাই, ভয় করে? সাধু মানুষের আবার মরাধরায় ভয়!
মানুষটা কিছু বলে না। পলকহীন চোখে পারুর দিকে তাকিয়ে থাকে। এ মেয়ে তো ভারি বজ্জাত! তবে হ্যাঁ, কথায়, হাস্যলাস্যে, শরীরের লীলায়িত ভাবভঙ্গিমায় পুরুষের মন কাড়ার ক্ষমতা রাখে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়েই থাকে।পারু ফের খিলখিল করে হেসে উঠে বলল, ও বুঝেছি, আপনার ভূতপেত্নিতে ভয় বুঝি! তবে ওই শ্মশানে ভূত নেই কোনও, দুচারটে পেত্নি আছে। কিন্তু তারা কারোর ক্ষতি করে না। যদিও তাদের পিছনে লাগলে আর রেহাই নেই, ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খায়। হি হি হি! শরীর দুলিয়ে হাসে পারু। হাসির দমকে তার বুকের আঁচল খসে পড়ে। সুডোল ভারি স্তনযুগল ছোট ব্লাউজে আটনি, উপচে উঠেছে কামনার কুসুম হয়ে। তার সদ্য পলি পড়া দুধেল মাটিরঙ। কী এক নেশায় পেয়ে বসে মানুষটাকে। খিদে ভুলে যায়। ফেলে আসা জীবনের কথা মনে পড়ে। মালতিবউয়ের না ছিল রূপ, না ছিল এমন মনকাড়া চলন বলন। যেন শুধু একতাল মাংসপিন্ড। সবসময় কী এক চিন্তায় ডুবে থাকত।ঘর সংসারে মন নেই। অসহায় প্রাণী যেন এক। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তার একটাই কথা শুধু, বাপে আমারে হাতেপায়ে বাইন্ধা জলে ফালাইছে। এই মইরা বাঁইচ্চা থাকনই আমার কপালের লিখন আছিল। বউয়ের এই জটিল কথার অর্থ মানুষটার বোধে আসত না। সংসারে ভাতকাপড়ের অভাব ছিল না, নাদুসনুদুস দুই সন্তানের মাও সে। গোঁসাইবাড়ির বউ বলে মানও পেত। তবুও সে ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার ছাড়ল একদিন। বাপের বাড়ি গিয়ে উঠল। মানুষটা বউকে ফিরিয়ে আনার মন করলেও তার বাপ বাধা হয়ে দাঁড়াল। তার কথায়, যে বউ পালিয়ে গিয়ে গোঁসাইবাড়ির মানসম্মান নষ্ট করেছে তার আর এ সংসারে ঠাঁই হবে না। দরকারে ছেলেকে সে ফের বিয়ে দেবে। একদিন খবর পাওয়া গেল, মালতিবউ ছেলেমেয়েদের রেখে কার হাত ধরে পালিয়েছে। বিয়ের আগে থেকেই নাকি দুজনের সম্পর্ক ছিল। তারপরও বাপ মা তাকে জোর করে গোঁসাইবাড়ি বিয়ে দিয়েছে। মানুষটা ঠিক করেছিল, এবার ছেলেমেয়ে দুটোকে নিজের কাছে এনে রাখবে। ক্রোধে ফেটে পড়েছিল তার বাপ, থাইকা থাইকা বউ খালি বাপের বাড়ি যাইত, ঐগুলার জম্মের ঠিক আছে!
মানুষটাকে ফের বিয়ে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে তার মা বাপ। আর সে বছরই এমন বন্যা এল যে গোটা দেশ ভেসে যাওয়ার জোগাড়। মানুষটার মা বাপ ভেসে গেল। শিষ্যদের অধিকাংশই নদীর চর অঞ্চলের বাসিন্দা। বাবু
ঘরের লোকেরা যাদের অবজ্ঞা করে বলে, চউরা, লোক হিসেবে বলে, ছোটলোক। অভাব অনটনে মাটিমুখি জীবন তাদের। অধিকাংশের প্রাণ, ভিটি, জমিজিরাত, ঘরদোর রাক্ষসী নদীর গ্রাসে গেল। কয়েক ঘর মাত্র টিকে রইল। তাদের কয়েক ঘর পেটের দায়ে দেশের কোথায় কোথায় ছড়িয়ে পড়ল। কয়েক ঘর বরাবরের জন্য এদেশে চলে এল। শিষ্য ছাড়া গোঁসাইগিরি টেকে না, মূল্যও নেই। তবুও একার জীবন বলে মাত্র কয়েক ঘর শিষ্যের সেবাযত্নে মানুষটার জীবন একরকম চলে যাচ্ছিল। আর একা বলেই সে এখন বাধাবন্ধনহীন, ছন্নছাড়া এক মুক্তপুরুষ। এখনও শরীর মনে বয়সের জোস দেদার । বন্যা যেমন ধ্বংসের সাথে সাথে নতুন পলির প্রলেপে ভূমিকে উর্বর করে, শস্যের প্রাচুর্য আনে তেমনি মানুষটাও নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। আশা, এবার যাকে ঘরে তুলবে সে নিশ্চয়ই মালতিবউয়ের মতো হবে না। মনে অন্য পুরুষ পুষে রেখে তার সঙ্গে সংসার সংসার খেলেছে মালতিবউ। তার জীবনটাকে একেবারে মরুভূমি করে তোলে। কিন্তু শেষ কয় ঘর শিষ্যও এদেশে চলে এলে ওই দেশে আর একা পড়ে থাকতে চায়নি মানুষটা। যারা এপার ওপার যাতায়াতের মধো থাকে তাদেরই একজনের কাছ থেকে জেনেছিল, একাত্তরের যুদ্ধের সময় যে কয় ঘর শিষ্য এ দেশে পাড়ি দিয়েছিল তাদের কয়েক ঘর এদেশের সুন্দরবন অঞ্চলের বাসন্তী গ্রামে বসতি গড়ে আছে। খেয়ে পরে ভালই আছে তারা। শুধু এ খবরটুকু সম্বল করে মানুষটা এদেশে পাড়ি দেয়।
মানুষটার পাসপোর্ট নেই। সে ইন্ডিয়ায় চলে যাবে শুনে কত লোক তাকে জিজ্ঞেস করে, পাসপোড নাই, তয় যাইবা কেমনে গোঁসাই, বডারে আটকাইব তো।
মানুষটা হেসে বলে, সাধুসন্ন্যাসি, পীরদরবেশ গ ঐ হগল লাগে না। তাছাড়া হিন্দু হইয়া হিন্দু গ দেশে যামু তাতে অরা ব্যাগড়া দিব কিয়ের! বুঝাইয়া কইলে ঠিক পার কইরা দিব।
শুনে তারা অবিশ্বাসের হাসি
হাসে। অনেকে মানুষটার কথা মেনে বলে, ঠিকই তো, ঠিকই তো, আপনাগ মতন মাইনষেরে কি দেশের সীমাচিন্নত দিয়া বান্ধন যায়!
পারুর কথায় মেয়েদের মধ্যে এখনও হাসাহাসি, ঠাট্টামস্করা, রঙ্গরসিকতা চলছে। ওরা একে অপরের গায়ে ঢলে ঢলে পড়ে ব্যাপারটাকে বেশ উপভোগ করছে। যদিও তারা জানে গোঁসাই মানুষটাকে নিয়ে তাদের এমনটা করা উচিৎ না তবুও এই রুক্ষ, হতাশ জীবনের মাটিতে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জলের মতো আনন্দকে তারা আগুপিছু না ভেবে উপভোগ করে নেয়। পারুর কথায়, হাসিতে এখনও অবজ্ঞা।
মানুষটার প্রতি এমন ব্যবহারে দশমীবুড়ি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ভীষণ রাগও হয় তার। খনখনে গলায় ধমক দিয়ে বলল, তোর ঐ মুখে ঝাঁটার বাড়ি! চুপ কর মাগি, নইলে নরক, নরক, নিঘ্ঘাত নরকবাস তোর।আর সব মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলল, আর পাপের ভাগীদার হোস না মাগিরা। চুপ যা সব!
একথায় পারু ফের একবার হেসে উঠলে মানুষটার মুগ্ধভাব কাটে। একটা ভয় তার মনে ছায়া বিস্তার করতে থাকে। শ্মশানেটশানেই তো ভূতপেত্নির আস্তানা। আর সেখানেই কিনা তাকে একা বসবাস করতে হবে! এছাড়া আর উপায়ই বা কী। এই ম্লেচ্ছদের সঙ্গে থেকে জাত ধর্ম খোয়ানোর চেয়ে ওই শ্মশানই তার কাছে ঢের ভাল। মনে উষ্মা নিয়ে এমনই ভাবতে থাকে মানুষটা। কিন্তু পরক্ষণেই সে বুঝতে পারে, এই মনের জোর দিনেদুপুরে দেখানো যত সহজ রাতের অন্ধকারে ঢের বেশি কঠিন। তার কন্ঠস্বর সরু হয়ে আসে, বলল, ও দয়াল, কী সব কইতাছে তোমার মাইয়ায়। তাইলে তো আমার পক্ষে…।
দুর দুর, ওই পাগলি মেয়ে আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি করছে। আমরা এতদিন শ্মশানের কাছে বাস করছি কিন্তু কোনওদিন তো কেউ ওসবের টের পাইনি! বলে দয়ালও একটু হেসে ওঠে। ওদের রঙ্গরসিকতাকে উপভোগ করে। সেইসঙ্গে হাতের খুরপি চালায়। তিনটে ঢিলের মাঝের জায়গাটুকুতে গর্ত তৈরি করে। একসময় মেয়েকে ধমকে ওঠে, এই পারু, ঘরে গেলি তুই! আর সবাইয়ের উদ্দেশ্যে বলল, এভাবে সবাই সঙ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে হবে? গোঁসাইয়ের রান্নার কাঠকুটোর ব্যবস্থা করতে হবে না? আরও কত কাজ পড়ে আছে। ঘরটা মেরামতি করতে হবে। আজকেই হাত লাগানো চাই। এমন মান্যি মানুষটা কি গাছতলায় পড়ে থাকবে? কেউ একটু গোবরের ব্যবস্থা কর, রান্নার জায়গাটুকু মন্ডল পাড়ার ছেলেটাকে দিয়ে লিপিয়ে রাখতে হবে।
হঠাৎই বিশ্রী এক শব্দে চারিদিক কেঁপে উঠতে লাগল। ঘোৎ ঘোৎ চিঁ হিঁ হিঁ…। ঘোৎ ঘোৎ চিঁ হিঁ হিঁ…। শব্দটা বাড়তে থাকে। এখন আর একটা শব্দ না, যেন অনেকগুলো বিকট শব্দ একসঙ্গে মিলেমিশে যাচ্ছে। ততই অশ্রাব্য হয়ে উঠছে।
ওঃ অসইয্য, ওগুলা কোন জানোয়ারের ডাক দয়াল? মানুষটা একরকম হতভম্ব হয়ে বিরক্তিভরা গলায় জিজ্ঞেস করে। শব্দটা যেন বাতাসের সঙ্গে পাক খেতে খেতে তার পেটের ভিতরে ঢুকে খালি পেটকে গুলিয়ে তুলছে। ক্রোধে মানুষটার মাথায় রক্ত চড়ে। বলল, সুন্দরবন শুনছি জন্তুজানোয়ারের আস্তানা, তোমরাও দেখতাছি অগ লগেই বাস করতাছ দয়াল!
সংকোচে গুটিয়ে গেল দয়াল। খুরপি চালানো বন্ধ হয়ে গেছে তার। বলল, আজ্ঞে গোঁসাই, আমরা বসতির কয়েক ঘর শুয়োর পুষি। এই বসতির পিছনের এক খানার কাদাজলে ওগুলো থাকে। খাবার নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি বাধিয়েছে বোধহয়। আপনি কিছু চিন্তা করবেন না গোঁসাই, ওরা আপনা থেকেই একটু পরে থেমে যাবে।
শুনে মুখ খিঁচিয়ে ওঠে মানুষটা, কখন থামব তার ঠিক আছে! তুমি যাইয়া লাঠির বাড়ি মাইরা ঐগুলারে থামাইয়া দিয়া আসতে পারতাছ না?
যেন মানুষটা লাঠির বাড়ির চোটে জানোয়ারগুলোর মৃত্যু কামনাই করল।
খিকখিক করে বিজ্ঞের হাসি হেসে ওঠে দয়াল। বলল, গাধা আর শুয়োরের বেলায় এ নিয়ম খাটবে না গোঁসাই। যত লাঠির বাড়ি পড়বে ততই ওরা বেশি জোরে চেঁচাবে। তখন টেকাই দায় হবে। একটু ধৈর্য ধরুন, ওরা এক্ষুনি থেমে যাবে।
মানুষটাকে ঘিরে এখন শুধু বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো। বড়রা রান্নার কাঠকুটো জোগাড়ে ব্যস্ত ।

দুই হাঁটুর মাঝে মাথা গুঁজে বসে মানুষটা কত কথাই না ভাবে। এ সে কোথায় এসে পড়ল। মাত্র দুটো দিনের ব্যবধানে সে যেন এক নতুন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গেছে। এখানকার মাটি জল গাছপালার সঙ্গে ফেলে আসা জন্মভূমির কোনও মিল খুঁজে পায় না। এখানকার নদীর জল নোনা, তার দুপারে হাঁটু পরিমাপ গভীর আঠালো কাদা। কোথায় সেই মিষ্টি নদীর চিকচিক বালুচর। এখানে অচেনা, অজানা, নাম না জানা গাছপালা সব। অনুর্ব্বর, রুক্ষ নোনামাটির দেশ।
আকাশটাও যেন ওদেশের আকাশের মতো ঘন নীল নয়। এমনকী এই বসতির মানুষগুলোর জীবনযাপনও কেমন আশ্চর্যরকমভাবে পাল্টে গেছে। জাত ধর্ম খোয়ানো মানুষগুলো শুয়োর পোষে, ঘরদোরে হাঁসমুরগি চরে বেড়ায়। মলমূত্র ত্যাগ করে। অধঃপাতে যাওয়ার আর বাকি রাখেনি কিছু এরা। একসময় মানুষটা ঘিনঘিনে মুখ করে দয়ালের উদ্দেশ্যে বলল, তোমরা শুয়ার পোষ কেন দয়াল?
পুষি মানে গোঁসাই, বড় করে বিক্রি করলে ভাল দাম পাওয়া যায়। অভাবের সংসারে বাড়তি কিছু পয়সা রোজগার হয়। ওদের পালপোষে কোনও ঝামেলা নেই। নোংরা আবর্জনা, গাছের মূল শিকড় যা পায় তাই খায়। সব চীনা শুয়োর। মিশনবাড়ি থেকে ছোট বাচ্চা বিনা পয়সায় দেয়। খুব তাড়াতাড়ি বাড়ে।
শুধু পালপোষ করে বিক্রি কর, মাংস খাও না?
মাংস খাই মানে, মানে গোঁসাই…! মুখের কথা জড়িয়ে যায় দয়ালের। কোনওরকমে বলল, আজ্ঞে গোঁসাই, খায়, এখন সকলেই খায়…।
সবার কথা ছাড়ান দাও। তোমার কথা বল, তুমি খাও না? কঠিন গলা মানুষটার।
না গোঁসাই, প্রভু যীশুর নামে শপথ করে বলছি, আজ পর্যন্ত ও জিনিস আমি মুখে তুলিনি। অভাবে জাত ধর্ম খুইয়েছি ঠিকই কিন্তু তাই বলে ওই গু, গোবরঘাটা জানোয়ারের মাংস খাব আমি! দয়াল রুইদাস এখনও এত সস্তা হয়ে যায়নি গোঁসাই, এটা জেনে রাখবেন!
বলতে বলতে দয়ালের কন্ঠস্বর আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। সেইসঙ্গে তার শরীরজুড়ে ফুটে ওঠে আত্মসংযমের অহংকার।
শুনে মানুষটা মনে মনে হাসে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, জাত ধর্ম খুয়াইছই যখন তখন আর এইটা খাওন আর বাদ রাখ কেন দয়াল। খাইয়া পাপের ষোল কলা পূণ্ণ কইরা ফালাও! পরক্ষণেই মানুষটা একরকম আর্তনাদ করে ওঠে, ঠাকুর ঠাকুর, এ তুমি আমারে কাদের ম্যালে আইন্যা ফালাইলা!
আরও অনেক বিলাপকথায় মানুষটার কন্ঠস্বর করুণ হয়ে উঠতে থাকে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।