সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অসিত কর্মকার (পর্ব – ৩)

যুদ্ধ যুদ্ধ
তিন
মানুষটার গতি মন্থর। যত হাঁটে ক্লান্তিতে আরও মন্থর হয়ে আসে। আবার ঘামতে থাকে। তাতে নোনা হাওয়া লেগে শরীর কুটকুট করে। সবে মাঝপথ পর্যন্ত এসেছে ওরা, হঠাৎই বাতাসে, সূর্যের কিরণে, নদীর ঢেউয়ে, গাছেদের পাতায় পাতায় ডাক ওঠে, কুহু কুহু কুহু ।
মানুষটা ভাবে, সেই কোকিলটাই ডাকে, নাকি ওই মেয়েটা। দয়ালের ছোট মেয়ে, কী যেন নাম, মনে করার চেষ্টা করে মানুষটা। হ্যাঁ, মনে পড়ে তার, পারু। কোকিলটার মতো করে পারু ডেকে চলেছে, নাকি কোকিলের একটা ডাকের ঠিক পরের ডাকটা পারুর? পারু যেন কোকিলটাকে ভেঙাচ্ছে। নাকি কাছে ডাকছে। পরক্ষণেই মনে মনে মেয়েটাকে কপট ধমক দেয়, বয়স্থা মাইয়া অমন বেলাহাজ হইব কেন! আরে বলদি মাইয়া, জানস না, এমন কইরা ভেঙাইলে চোউখ ওঠে? তখন বুঝবি মজাটা।
একসময় লুকাস দেখে, মানুষটা আরও পিছিয়ে পড়েছে। একরকম দাঁড়িয়েই আছে। আর চলতে পারছে না সম্ভবত। কাছে এগিয়ে যায় লুকাস।
কি গোঁসাই, আর হাঁটতে পারছেন না, না? খুব খিদে পেয়েছে?
মানুষটা যেন লুকাসের ডাক শুনতেই পায়নি, পলকহীন দৃষ্টি মেলে অনতিদূরের গাছগাছালির দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে।
আরও কয়েকবার ডাকতে মানুষটার সম্বিৎ ফেরে। বলল, একটু জিরায়া নিতাছি। পাখিটার ডাকটাও ভারি মিঠা লাগতাছে।
শুনে লুকাস বেশ অবাকই হল, এ তো ভারি মজার মানুষ, এই প্রচন্ড খিদের মধ্যেও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাখির ডাক শুনছে! বলল, ওই ডাক শুনলেই কি আপনার পেট ভরবে?
লুকাস সামনে চলে, পিছনে মানুষটা। তার মনের কৌতূহল যেন সদ্য খাঁচায় পোরা বনের পাখি। বুকের দেয়ালে ঝাপ্টার পর ঝাপ্টা মারতে থাকে। জিজ্ঞেস করে, ক তো, ঐ ডাকটা কোকিলের না দয়ালের মাইয়া পারুর?
লুকাস মানুষটার কথায় এবার বিস্মিত হল যেন। সবে মাঝপথ, এতদূর থেকে পারুর গলার ডাক শোনা যাবে কেন? সে ডাকটা যাচাই না করেই বলল, ওটা আসল কোকিলই ডাকছে গোঁসাই।
তাই হইব। তয় মাইয়াটারে একটু পাগল পাগলই মনে হইল। কেমন বেহায়ার মতো কোকিলটারে ভেঙাইতেছিল না!
পাগল না গোঁসাই। পারুদি ওরকমই।ইদানিং তা আরও বেড়েছে।ওই অগস্টিন ছেলেটার সঙ্গে ভাবভালবাসা হয়েছে না!
অগস্টিনটা আবার কে?
সে আছে একজন। মিশনবাড়িতে ফাদারের সেবাযত্ন করে আর গির্জার ঘন্টা বাজায়।মা বাপ, চালচুলো বলতে কিচ্ছু নেই। কোনওরকমে নিজের একার পেট চালায়। এই নিয়েই তো দয়ালদাদুর ঘরে নিত্য অশান্তি। দাদু আর তার পরিবার কিছুতেই ওই ছেলের সঙ্গে পারুদির বিয়ে দিতে রাজি নয়। কিন্তু পারুদির এক গোঁ, বিয়ে সে অগস্টিনকেই করবে।
তারপর খানিক চুপ থেকে কী যেন ভাবছে লুকাস। একসময় বলল, আপনার তো অনেক ক্ষমতা গোঁসাই, অনেক তন্ত্রমন্ত্র জানেন। আপনি যদি পারুদির মন থেকে ওই অগস্টিনকে মুছে দিতে পারেন তাহলে দয়ালদাদু আপনাকে একেবারে মাথায় তুলে রাখবে। তবে একটা কথা, আমি যে ওদের এই সম্পর্কের কথা আপনাকে বলেছি তা যেন দয়ালদাদুকে বলবেন না।
তর কোনও চিন্তা নাই। এখন থিকা তর লগে আমার অন্য রিস্তা জানবি। দয়াল আমারে কউক একবার, ঐ মাইয়ার মন থিকা অগস্টিন না ফগস্টিনরে ভূত তাড়ানের মতো যদি না তাড়াইছি আমি!
এদিকে মানুষটাকে নিয়ে এখনও ওদের আলোচনা চলছে। দয়াল সবার মাঝখানে বসে। তাকে ঘিরে বসে বসতির অনেকে। তাদের অধিকাংশই মেয়েছেলে, কয়েকজন বৃদ্ধ বৃদ্ধা, কয়েকটা যুবক আর কিছু ছোট ছেলেমেয়েরা। পুরুষরা কাজ থেকে এখনও ঘরে ফেরেনি। ওদের ফেরার অপেক্ষায় থাকলে দেরি হয়ে যাবে। তাতে করে মানুষটাকে কষ্ট দেওয়া হবে। তাই দয়াল উপস্থিত সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসেছে। দয়াল বুঝতে পারছে, মানুষটা তাদের ধর্ম ত্যাগের ব্যাপারটা না জেনেই তাদের দোরে এসে উঠেছে। তাদেরকেই ভরসা ভেবেছে। এই দেশে তার অন্য কোথাও ঠাঁই নেই। এখন মানুষটার ধর্ম আচারবিচার রক্ষা করা, তার সেবাযত্ন করা ইত্যাদি সবই তাদের উপর। কীভাবে তা পালন হবে সেই আলোচনাই চলছে। সূর্যটা আরেকটু পশ্চিমে হেলে পড়ায় ঘরগুলোর ছায়া উঠোনের দিকে বাড়তে জমায়েতটার কিছুটা অংশ ছায়ার আরাম পাচ্ছে। মানুষটা কার কাছ থেকে ঠিকানা পেয়ে তাদের কাছে এল দয়াল তা জানে না। মানুষটা যদি বরাবরের জন্য এদেশে চলে এসে থাকে তাহলে এই দেশে তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা কী হবে। বেড়াতে এলেও কদিনের জন্য তাও তারা জানে না। তবে মানুষটার বরাবরের জন্য এদেশে চলে আসার ব্যাপারে দয়ালের মনে দ্বিধা আছে। কেননা মানুষটার সঙ্গে তার পরিবার নেই। ওই দেশে ফেলে এসেছে, নাকি সব হারিয়ে সে এখন একা! আরও অনেক প্রসঙ্গই একে একে আলোচনায় ওঠে। সেসব নিয়ে অনেক কথা চালাচালিও হয়। একসময় দয়াল বলল, এখন আসল কথায় আস সবাই, গোঁসাইয়ের সেবাযত্নের ব্যবস্থা কীভাবে হবে তাই বল।
লুকাসের ঠাকুমা দশমীবুড়ি বলল, আমাদের হাতের রান্না গোঁসাই খাবে না। এমনকী আমাদের ঘরের চাল ডাল, তরিতরকারি, হাড়িকড়া, উনুন তার রান্নাবান্নার কাজে লাগবে না। এসবের নতুন ব্যবস্থা করতে হবে। গোঁসাই নিজের হাতে রান্না করে খাবে। আমরা সব ঘর থেকে পয়সা তুলে দিই। গোঁসাই বাজার থেকে ওসব কিনে আনুক।
এছাড়া আর অন্য উপায় দেখল না কেউ। সবাই দশমীবুড়ির কথায় সায় দিল। দয়াল বলল, আগে মানুষটার খিদে মেটানোর ব্যবস্থা হোক তারপর থাকার ব্যবস্থা কী করা যায় তা দেখছি। এখন তোমরা বল, প্রত্যেক ঘর থেকে কত টাকা করে দিচ্ছ?
জমায়েতটা এ কথায় ইতস্ততবোধে বাঁধা পড়ে যেন। সবারই অভাবের সংসার। বেশি ধার্য হলে দিতে পারবে কেন।
একজন বলল, আপনিই বলুন জ্যাঠা।
আরেকজন তাকে একরকম বাধা দিয়ে বলল, জ্যাঠা যা ধার্য করবে তা তার ক্ষমতা অনুযায়ী, আমরা সবাই তা দিতে পারব কী করে। আমরা যে যা পারব দেব।
দয়াল বুঝল, মাথাপিছু সমান ধার্য করলে হবে না। যে যার ক্ষমতা অনুযায়ীই দিক। বাকিটা তাকে পুষিয়ে দিতে হবে। সবাই তার কাছ থেকে বেশিই আশা করে। কিন্তু মানুষটা এখানে কতদিন থাকবে তা জানে না দয়াল। বেশিদিন থাকলে অন্ন জোগানোর দায় তারা নেবে কী করে। আর যদি পাকাপাকি ভাবে এদেশে থেকে যাওয়ার জন্য এসে থাকে তাহলে সেইমতো থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাই বা কী করে করবে তারা। গোঁসাইয়ের ছেলে গোঁসাই যে, তার সেবাযত্নের ব্যবস্থাই আলাদা। ভেবে কুল পায় না দয়াল।
ও ঠাকুদ্দা, কী অত ভাবছ? বল একটা কিছু। রোদে যে আর বসা যায় না গো। মেয়েদের ভিড় থেকে মঙ্গলা বলল।
দয়াল বলল, তাই হোক, তোমরা যে যা পারো দাও। গোঁসাইয়ের ফেরার সময় হল।
এতক্ষণ পারু দাওয়ায় বসে জমায়েতটার আলোচনা, কথাবার্তা শুনছিল। এবার সে তার খোলা চুলগুলো শক্ত করে খোঁপা করে নিয়ে উঠোনে নেমে এল। জমায়েতটার কাছে এসে টানটান হয়ে দাঁড়াল। সে ভঙ্গিমায় কৈফিয়ত চাওয়ার ইঙ্গিত। মুখ বাজিয়ে বলল, ওই মানুষটার চোখে আমরা ম্লেচ্ছ। আমাদের হাতের ছোঁয়া খাওয়া, আমাদের ছায়া মাড়ানো মানুষটার কাছে পাপ। এমন মানুষের জন্য আমরা আমাদের কষ্টের পয়সা বিলোতে যাব কেন শুনি!
চুপ থাক, চুপ থাক! দয়াল মেয়েকে থামাবার চেষ্টা করে।
পারু তার গলা সপ্তমে চড়ায়, কেন চুপ থাকব শুনি, আমরা বিধর্মী হয়ে পাপ করেছি যখন তখন আমাদের সঙ্গে মানুষটার কোনও সম্পর্ক নেই। গোঁসাই মানুষ, কর্তাল বাজিয়ে দশ বাড়িতে ঠাকুরের নাম গেয়ে বেড়ালে একার পেট ঠিক চলে যাবে। হয়ত কোনও না কোনও নিজের জাতের ঘরে ঠাঁইও জুটে যেতে পারে।
দয়াল ভাল করেই জানে, মেয়ের কথার বিরোধীতা করা মানেই সাপের লেজে পা দেওয়া। গলা বাজিয়ে আরও দশ কথা শুনিয়ে দেবে। এদিকে মানুষটার ফেরার সময় হয়েছে। তাকে নিয়ে অশান্তি হচ্ছে দেখলে মনে বড় আঘাত পাবে। মেয়েকে সে ফের বোঝাবার চেষ্টা করে, আমরা মানুষটাকে এখন আর গোঁসাই মানি আর না মানি আমাদের বাপ পিতামহরা তো মেনে এসেছে। ভক্তি শ্রদ্ধা করেছে। আমরা বিধর্মী হয়েছি নিজেদের কপালদোষে, তাতে ওই মানুষটার কী দোষ। মানুষটাকে অবজ্ঞা অবহেলা করলে আমাদের বাপ পিতামহর আত্মা যে কষ্ট পাবে। সে তো মহাপাপ হবে পারু। তারপর দয়াল জমায়েতটার উদ্দেশ্যে বলল, নাও, এখন যে যা পারছ দাও।
পারুর মুখে এখনও অবজ্ঞার হাসি। জমায়েতটা ভেঙ্গে গেল।
দয়াল এখন তার ঘরের বারান্দায় বসে। তাকে ঘিরে বসতির মানুষগুলো। যে যার সাধ্যমত পয়সা দয়ালের হাতে তুলে দিচ্ছে এক এক করে। সব ঘর থেকে দেওয়া শেষ হলে দয়াল পয়সাগুলো গুনতে থাকে। অল্প বয়সী ছেলেরা তাকে গোনায় সাহায্য করে।
দয়াল ভাবে, এই সামান্য কটা টাকায় কী আর হবে। জিনিসপত্রের যা আগুন দাম। অন্তত চার পাঁচ দিনের খোরাকির ব্যবস্থা তো করে রাখা দরকার। প্রতিদিন পয়সা তুলে প্রতিদিন বাজারহাট করাটা ভাল দেখায় না। তাই নিজের থেকে বেশি অর্থ তাকে দিতেই হল।
মানুষটা বসতিতে ফিরে এসে দেখল, তার জন্য বসতির বাইরের নিমগাছটার নীচের জায়গাটুকু রান্নাবান্না করার জন্য পরিস্কার করা হয়েছে। তিনটে বড় ঢিল জোগাড় করা হয়েছে। ওগুলোর ওপর হাড়ি বসিয়ে রান্না হবে।
সব কেনাকাটা মানুষটাকে নিজের হাতে করতে হবে। তারপর নিজের হাতে রান্নাবান্না।
দয়াল পুরো টাকাটা মানুষটার পায়ের কাছে রেখে উঠে দাঁড়াল। বলল, গোঁসাই, আমাদের আর অধিকার নেই নিজের হাতে আপনার সেবাযত্ন করার। আপনাকেই কষ্ট করে বাজারহাটটুকু করতে হবে। হাড়ি বাটি কড়াই কলসিও কিনবেন। আমি এদিকে কাঠকুটো জোগাড় করি। যান গোঁসাই, আর দেরি করবেন না, খিদের পেটে বেশিক্ষণ থাকলে শরীরের ক্ষতি।
কিন্তু মানুষটার মধ্যে বাজারে যাওয়ার কোনও উদ্যোগ নেই। বসেই পড়ে সে। কষ্টতাড়িত হতাশগলায় বলল, আর পারি না, আর পারি না! কী কুক্ষণে যে এই দেশে পাড়ি দিছিলাম! তমাগ ভরসায় দেশছাড়া হইলাম আর তমরাই কিনা জাত ধর্ম খুয়াইয়া বইলা!
মনের ক্ষোভ উগরে দেয় মানুষটা।
দয়ালের মুখে কোনও কথা সরে না। ভাবে, পুরনো ঘা খুঁচিয়ে ব্যথা বাড়িয়ে কী আর লাভ। শুধু বলল, এটুকু কষ্ট যে আপনাকে করতেই হবে গোঁসাই।
মানুষটা অসহায় দৃষ্টিতে দয়ালের দিকে তাকিয়ে নেতিবাচক মাথা নাড়ে। না, সে আর এক পাও হাঁটতে পারবে না। অস্ফুটে বলল, একটা জাতের পোলা জোগাড় করতে পার না দয়াল? রান্নাবান্নার আয়োজন এখন বাদ রাখ। তারে দিয়া একটু চিড়া মুড়ি গুরের ব্যবস্থা করতে পার কিনা দেখ। পাইবা না একটা জাতের পোলা?
দয়ালের মনে হল, মানুষটা কথাটা খারাপ বলেনি। আপাতত মানুষটা একটু চিড়ে মুড়ি খেয়ে পেটকে বুঝ দিক। কিন্তু সমস্যা হল, এই দুপুরে জাতের ছেলে সে কোথায় পাবে।
লুকাস যেন এতক্ষণ ধরে এমনই একটা সুযোগ খুঁজছিল। সয়নিকে মানুষটার কথা বলবে। সেইসঙ্গে সয়েনি যে এ জন্মে শুধু তার ছাড়া আর কারোর হবে না, সে কথাও বুক ঠুকে বলে আসবে।
সে অতি উৎসাহী হয়ে দয়ালের উদ্দেশ্যে বলল, মন্ডলপাড়া থেকে কাউকে ডেকে আনি ঠাকুদ্দা?
দয়াল বলল, তাই কর। যা, দৌড়ে যা।
ক্রমশ…