যুদ্ধ যুদ্ধ
দুই
কলপাড় এখন শুকনো খটখটে। ভাঙ্গাচোরা চাতাল।যেন আর কোনওদিনই জল দেবে না কলটা। মাটিগর্ভের জলের উৎস থেকে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে ওটার। শুকনো পাতা ধুলো আর হাওয়ায় নাচানাচি করছে। থেকে থেকে দু একটা পাখি ডেকে উঠছে। পাশে ভাটার নদীর কোনও রাগ সাড় নেই। কলের হাতলটা দুহাতে ধরেই মুহূর্তে ছেড়ে দিল লুকাস।
বাপরে, এ যে সাংঘাতিক গরম। হাতে ফোস্কা পড়ে যাওয়ার জোগাড়। একটা কিছু হাতে জড়িয়ে না নিলেই নয়। এদিকওদিক তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজে। মানুষটার মাথায় জড়ানো গামছাটার দিকে নজর পড়ে। কিন্তু চাইলে দেবে তো! লুকাসের মনে সন্দেহ। পরক্ষণেই ভাবে, না দেওয়ারই বা কী আছে। এই রোদে পুড়ে সঙ্গে এলাম, কল পাম্প করে জল তুলে দেব, তারজন্য গামছাটা দরকার। চেয়ে একবার দেখাই যাক না।
চাইতেই একরকম খেঁকিয়ে ওঠে মানুষটা, এ্যা হে, নবাবের বেটার মাখনের হাত! তর সাহস তো কম না, আমার গামছা চাস তুই! আমারেও নরকবাস করাইবি নাকি? নে নে, পাম্প কর, তিষ্টায় আমার বুক ফাটে।
ঝুঁকে দাঁড়িয়ে হাতের বাটিটা কলের মুখে ধরে মানুষটা।
আমি পারব না, আপনি নিজে পাম্প করে জল তুলে খান। কাটা কাটা কঠিন গলায় বলল লুকাস। রাগে অপমানে শরীর তার কাঁপছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি নিজেই পারব। গামছাটা দিয়ে হাতলটাকে পেঁচিয়ে নেয় মানুষটা। বাঁহাত দিয়ে পাম্প করে ডানহাত দিয়ে বাটিতে জল সংগ্রহের উপক্রম করে। হাতলটা উঁচিয়ে নীচের দিকে চাপ দেয়, আর ঠিক তখনই কলটার ভিতর থেকে আওয়াজ ওঠে, ওয়া আ আ ক্যাঁ ক্যাঁ চ চ, ওয়া আ আ ক্যাঁ ক্যাঁ চ চ! যেন কলটার গর্ভ থেকে নয়, এই ধরিত্রীর শুকনো বুকের কান্না তৃষ্ণার আকুতি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। যেন এই মানুষটার জন্য এক ফোঁটাও জলের বরাদ্দ নেই। আবার পাম্প করে। আগের শব্দেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় যেন। মানুষটা আরও একবার চেষ্টা করে। আরেকবার, আরেকবার…। তবুও কলের মুখে জল ওঠে না। ধরিত্রীর মরুগর্ভ একইরকমভাবে কাঁদে। অক্ষম অসহায় কলটা শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। মানুষটা ততই তীব্র জেদ আর ক্রোধে মরিয়া হয়ে ওঠে। টসটস করে ঘামতে থাকে। তার দুই চোয়াল যেন এখন দুটো পাথরের টুকরো। দাঁতে দাঁত পেষণে চোয়ালের মাংস ঝিলিক দিয়ে ওঠে। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়।
নষ্ট নাকি শালার কল! শালা তুই জল দিবি না, জল দিবি না তুই! আর্তনাদ করে ওঠে মানুষটা। আবার পাম্প করতে শুরু করে। আর যেন পারছে না সে, বেজায় হাঁপাতে থাকে। বুকের ভিতরটায় যেন একটা আগুনের গোলার ঘূর্ণিপাক চলছে। ঢোঁক গিলতে গেলে কন্ঠায় যেন শুকনো পাতা খসখস করে উঠছে। বড় ক্লান্তি লাগছে তার। আর চেষ্টা করার ক্ষমতা নেই। নদীর দিকে তাকায় মানুষটা, আহা, নদীতে কত কত জল! কিন্তু ওই নোনা জল যে পান করা যাবে না। মনটাকে সে ফের শক্ত করার চেষ্টা করে, না, হাল ছাড়লে হবে না তাকে। ওই লুকাস না ফুকাস ছোকরাটাকে সে দেখিয়ে দেবে যে তার অসাধ্য কিছু নেই। আবার পাম্প করতে শুরু করে সে। একবার দুবার কঁ কঁ কান্নার শব্দের পর, হস হস হর হর র র র শব্দ শুধু। যেন গরম বাতাসে ভরে গেছে ভিতরটা আর তাতে অসহ্য হয়ে কলটা হাঁসফাঁস করে উঠছে। এদিকে মানুষটার বুকের ভিতরটা বেয়ড়ারকমভাবে ধকধক করছে। প্রাণপাখিটা যেন বুকের খাঁচার বন্ধন ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে যাবে। মাথাটা সহসা চক্কর দিয়ে ওঠে, দুচোখের সামনে শুধু চাপ চাপ অন্ধকার দেখে মানুষটা। হাত থেকে বাটিটা ঠক করে চাতালে পড়ে গিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে। হাতের মুঠি থেকে হাতলটা আল্গা হয়ে যায়। গামছাটা নীচে খসে পড়ে। শরীরটা পাক খেয়ে চাতালে এলিয়ে পড়তে গেলে লুকাস দ্রুত হাতে তাকে ধরে ফেলে। যতই তরুণ বয়সী হোক এতবড় শরীরটাকে সামলাতে কষ্ট হয় তার। মানুষটা কি অজ্ঞান হয়ে গেল! বুঝবার চেষ্টা করে লুকাস, চোখদুটো বোজা, নিঃসাড়ভাব দেখে সে নিশ্চিত হয়, হ্যাঁ, অজ্ঞানই হয়ে গেছে মানুষটা। তার দুহাত থেকে শরীরটা পিছলে গিয়ে চাতালের উপর আছড়ে পড়তে চায়, তাতে মানুষটার বড় চোট লাগতে পারে। লুকাস আপ্রাণ চেষ্টায় মানুষটাকে জাপ্টে ধরে দুবাহুর ভিতরে তার দুই হাত ঢুকিয়ে কাঁধ দুটো শক্ত করে পাকড়ে ধরতে মানুষটা তার দুহাতের নীচে ঝুলে পড়ে। একটু ছায়া দরকার। চোখেমুখে জল ছিটিয়ে মানুষটার জ্ঞান ফেরাতে হবে। মরে গেল না তো আবার! একরকম ভয়ই পায় লুকাস। পরক্ষণেই মনটাকে শক্ত করে, ভয় পেলে চলবে না। নাকের সামনে হাতের পাতা রেখে পরখ করে। হ্যাঁ, শ্বাসপাত অনুভব করছে লুকাস। স্বস্তি বোধ করে। দেহটা টেনে চাতাল থেকে নামায়। টানতে টানতে কুল গাছটার ছায়ার দিকে নিয়ে চলে। ফ্যাকাসে ছায়ায় শরীর জুরোয় না। কিন্তু কাছেপিঠে এছাড়া আর ছায়া কোথায়? একটু পরিষ্কার জায়গা দেখে মানুষটাকে শুইয়ে দেয়। জ্ঞান ফেরানোর জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। চোখেমুখে জলের ঝাপ্টার পর ঝাপ্টা মারতে হবে। তারজন্য ওই ডোবা পুকুরের জল ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। কিন্তু জ্ঞান ফিরলেই যে মানুষটা জল জল করে চেঁচাতে থাকবে, তখন সে তেষ্টার জল কোথায় পাবে। অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিল, আগে কল থেকে জল তুলতে হবে। ভাবে, মানুষটা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে যখন তখন থাক না আরও কিছুক্ষণ। এই ফাঁকে সে কল থেকে জল তুলবে। ওটায় জল ঢেলে পাম্প করে জল তুলতে হবে। আর জল তোলার জন্য ওই বাটিটা ছাড়া আর তো কিছু নেই।
ডোবাটার চারদিকে ঢোলকলমির বেড়। তাপের চোটে পাতাগুলো ম্লান। গোড়ার ঘাস লতাপাতার আধমরা অবস্থা। একহাঁটু পরিমান জলে নেমে পরিষ্কার জল পায় লুকাস। বেশ কয়েক বাটি জল ঢেলে পাম্প করতে কলে জল পায়। আগে সে নিজের তৃষ্ণা মেটায়। তারপর বাটিভরা জল নিয়ে সে মানুষটার কাছে আসে। হাত পা টানটান করে একটা মরা মানুষ শুয়ে আছে যেন। লুকাস বাটি থেকে জল নিয়ে মানুষটার চোখেমুখে ঝাপ্টার পর ঝাপ্টা দিতে থাকে। খানিকটা জল নিয়ে মাথায় থাবড়ে দেয়। দুচোখে জলের প্রলেপ দিতে থাকে। কপালে জল বুলিয়ে দেয়। একসময় দেখে, মানুষটার শ্বাসপাত বাড়ছে। এতটুকু হাওয়া নেই। একটু বাতাস করতে পারলে ভাল হয়। কিন্তু কী দিয়ে বাতাস করবে তা ভাবতে গিয়ে ফের গামছাটার কথা মনে পড়ে তার। ওটা দিয়ে কলের হাতল ধরতেও সুবিধা হয়েছিল তার। খানিক হাওয়া করতেই মানুষটা একটু চোখ মেলে তাকায়।
চোখের ডিম দুটো ফিটকিরির মতো ঘোলাটে, মনি দুটো স্থির। একসময় শুকনো জিব বার করে ঠোঁট দুটো চাটতে থাকে। জিবের ডগায় জলের ছোঁয়া পেতে তার তৃষ্ণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। লুকাস নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে রেখে সব লক্ষ করছে। পাছে ছোঁয়াছানি দেখে মানুষটা যদি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে!
জল জল! হাহাকার করে ওঠে মানুষটা।
পাশেই বাটিতে বাকি জলটুকু রাখা আছে। কিন্তু উঠে বসে নিজের হাতে খাওয়ার ক্ষমতা নেই মানুষটার। সে ফের ক্ষীণ গলায় জলের জন্য আর্তনাদ করে ওঠে। দেখে ভারি কষ্ট হয় লুকাসের। চোখের সামনে একটা লোক এভাবে কষ্ট পেতে পারে না! মানুষটাকে জল সে খাওয়াবেই। তাতে যদি মানুষটার জাত যায় তো যাক! সে বসে পড়ে মানুষটার মাথাটা নিজের কোলের উপর তুলে নেয়। জলের বাটিটা হাতে নিয়ে ডাকে, হাঁ করুন গোঁসাই, জল খান।
মানুষটার এখনো সম্পূর্ণ চেতনা আসেনি। তারমধ্যেই সে বড় বড় ঢোঁকে পুরো জলটা কয়েক মুহূর্তে শেষ করে দিল।
আরও জল খাবেন গোঁসাই? লুকাস জানতে চায়।
মানুষটা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না, শুধু মাথা নেড়ে জানায়, হ্যাঁ, আরও জল খাবে সে।
চার বাটি জল খাওয়ার পর মানুষটা একটু সুস্থ বোধ করতে থাকে। উঠে বসে। খানিক থম ধরে থাকে। সম্ভবত মাথার ভিতরের স্নায়ুগুলো এখনো যথেষ্ট সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। কিসের থেকে যে কী হয়ে গেল তা এখনও সে বুঝে উঠতে পারছে না।
অদূরে বসে লুকাস মানুষটাকে খেয়াল রাখছে। মানুষটার চোখ দুটো এখন নরম, আদ্র, কৃতজ্ঞতা বোধে ভরে উঠছে যেন। মুখচোখের কাঠিন্যভাবটা তেমন আর নেই। বেশ প্রাণবন্ত লাগছে। লুকাস ভাবে, প্রভু যীশু কতবারই না এভাবে মানুষের সহায় হয়েছিলেন। আজ সেও একজনের সহায় হল। ভাবতে গিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করে সে।
আমি এখানে শুইয়া ছিলাম কেন রে লুকাস? ক্লান্ত গলায় মানুষটা জিজ্ঞেস করে।
আপনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন গোঁসাই।
লুকাস পুরো ঘটনাটা মানুষটাকে বলে। শুনে মানুষটা মনে মনে আত্মধিক্কার দিয়ে ওঠে, পাপ পাপ, শেষ পর্যন্ত আমারে কিনা ম্লেচ্ছর হাতে জল খাইতে হইল, জাতধম্ম আর কিছ্ছু থাকল না।
কিন্তু মানুষটা মুখ ফুটে তার মনের ঘৃণা বা আফসোসের কথা প্রকাশ করল না। মানুষটা বুঝতে পারছে, এখন তাকে সংযত ব্যবহার করতে হবে। আচরণে সতর্ক থাকতে হবে। এই ঘটনার কথা যাতে আর পাঁচ কান না হয় তার ব্যবস্থা নিতে হবে। আর তার জন্য লুকাসকে হাতে রাখতে হবে। নরম গলায় সে লুকাসকে কাছে ডাকে।
শোন বেটা, তুই আমার একটা বড় উপকার করছস, আমিও তর একটা বড় উপকার করুম। তয় একখান কথা, তরে আমি যে উপকার করুম তা কাউরে কওন যাইব না। কইলেই তার উল্টা ফল হইব। আসলে এইগুলা হইল গিয়া তন্ত্রমন্ত্রের ব্যাপার, গোপনীয়, কাউরে কইলে তার গুন হারায়। আর তুই যে আমার উপকার করছস সেই কথাও কাউরে কইবি না। আসলে উপকারের ধর্মই এইরকম জানবি বেটা, ডাইন হাতে করা উপকারের খবর যেন বাম হাত না জানতে পারে। বুঝলি?
কথাগুলো বলেই মানুষটা লুকাসের মনের গতিবিধি বুঝতে তার মুখের দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। একসময় জিজ্ঞেস করে, কি রে বেটা, কইবি?
মানুষটার কথাগুলো মনে ধরে লুকাসের। এই প্রসঙ্গে পরমপিতার উপদেশও তো একইরকম। মিশনের ফাদার গ্যাব্রিয়েল তা বুঝিয়ে বলেছিলেন। মানুষটার কথায় সে সায় দেয়। না, কাউকে বলবে না সে। কিন্তু সে কী উপকার চাইবে মানুষটার কাছ থেকে? কত বড় ক্ষমতার অধিকারী এই মানুষটা? এই প্রচন্ড তাপে পৃথিবী পুড়ে ছাইবর্ণ। দিক না মানুষটা আকাশ ফাটিয়ে জল নামিয়ে। তাতে করে পৃথিবীর বুক জুরোক। চাষবাস হোক। মানুষের অভাব অনটন ঘুচুক। এরচেয়ে বড় উপকার আর কী হতে পারে।
লুকাস মানুষটাকে এসবই বুঝিয়ে বলে।
কার পোলা তুই? কৌতুকভরা কন্ঠে জানতে চায় মানুষটা।
আজ্ঞে, বিন্দা রুইদাসের।
কয় বিঘা জমি আছে তর বাপের?
আজ্ঞে এক বিঘাও না, আমার বাপ মুচির কাজ করে।
তইলে তরা হইলি গিয়া আদার ব্যাপারি, পিথিবির ভালমন্দর চিন্তা কইরা লাভ কী তর? তুই বরং নিজের ভালর লেইগা কিছু চা বেটা।
লুকাস চুপ করে থাকে। কী যেন ভাবে। ভাবতেই থাকে।
আমার বড় ক্ষুধা পাইছে। আর বইসা থাকতে পারি না। কিন্তু তুই রা কাড়স না ক্যান?
আমি গোঁসাই একটা মেয়েকে…। সংকোচে কথাটা শেষ করতে পারে না লুকাস। লজ্জায় মুখমণ্ডল কেমন অন্য রঙ পেয়ে যায়।
কাউরে মনে ধরছে, তারে ভালবাসস? আরে, এই তো বয়স যায় ভালবাসনের। সরস গলায় জানতে চায় মানুষটা।
বাসি।
বাসসই তো! মুখ দেইখাই বোঝতে পারছি। তা কইতে দ্বিধা ক্যান? তারে চাই তর?
লুকাস মাটি থেকে চোখ তোলে না। মানুষটার কথার উত্তরও দেয় না। একটা কাঠি দিয়ে মাটিতে কীসব আঁকিবুকি করে।
নাম কী তার? ঘর কই?
লুকাস সংকোচের সঙ্গে মিটিমিটি হাসে। যেন সে ওই আঁকিবুকির মধ্যে তার ভালোবাসার মানুষটাকে দেখতে পাচ্ছে। কাঠিটা দিয়ে একসময় সে গভীর করে একটা নাম লেখে, সয়েনি।
সয়েনি, বাঃ, বেশ নাম। তা সয়েনি কী?
সয়েনি মন্ডল।
লুকাস হাত উঁচিয়ে দূরের পানে এক ধুধুর দিকে আঙুল তুলে দেখায়। বলে, ওই মন্ডল পাড়ায় ঘর, হিন্দু মেয়ে।
মনে মনে মানুষটা বিষোদ্গার করে, বেটা ম্লেচ্ছ, একটা হিন্দু মাইয়ার জাইত মারতে চাইস! এই বয়সে এ তোমার ভালবাসা না দেহের ক্ষুধা তা আমি ভালমতনই বুঝি!
কিন্তু মানুষটা তার মনের কথা মনেই রাখে। সে কথা দিয়েছে, লুকাসের একটা বড় উপকার করবেই। এখন যেমন করেই হোক লুকাসের সঙ্গে সয়েনির সম্পর্কটা ঘটিয়ে দিতে না পারলে তার ধর্ম, ইজ্জত, এমনকী অস্তিত্বের সংকট হতে পারে। এই দেশে কে তার সহায় কে তার সম্বল? যাদের ভরসায় সে ওই দেশ ছেড়ে এই দেশে চলে এল তারা সব ধর্ম খুইয়ে বসে আছে। তাদের ঘরে তার অন্নজল গ্রহণ করা ধর্মে নিষিদ্ধ। কিন্তু কোথায় তার খিদের অন্ন জুটবে, কোথায় তার থাকার ব্যবস্থা হবে এখনও সে তা জানে না। বিধর্মী হলেও ওদের সাহায্য পরামর্শই এখন তার বল ভরসা। এটুকু অবলম্বন হারিয়ে ফেললে খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে হবে তাকে। ওই খ্রীষ্টান ছেলেটার সেবায় তার জ্ঞান ফিরল, তৃষ্ণা মিটল। অজ্ঞান হয়ে পড়তে ও তো তাকে ফেলে রেখে চলেও যেতে পারত। আর হয়ত তার জ্ঞান নাও ফিরতে পারত। এখানেই মরে পড়ে থাকত। ওরা মরা মানুষটার পরিচয় অস্বীকার করলে কারা তাকে শ্মশানে নিয়ে যেত, কে তার মুখাগ্নি করত? কেউ হয়ত বড়জোর থানায় খবর দিত। কিন্তু এই গ্রামে কি থানা বা পুলিশ চৌকি আছে? সব গ্রামে তো ওসব থাকে না। কয়েকটা গ্রাম মিলে একটা থানা বা পুলিশ চৌকি হয়। সেখানে খবর করা, পুলিশ আসা পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের মধ্যে শিয়ালশকুন কি তার দেহটাকে আস্ত রাখত? বড় বাঁচা বেঁচে গেছে সে আজ ওই ছেলেটার দয়ায়। কৃতজ্ঞতাভরা দৃষ্টিতে সে লুকাসের দিকে খানিক সময়ের জন্য তাকায়। পরক্ষণেই মনটা নাড়া খায় তার, এসব দুর্বলতা ভাল নয়! একবার মাথায় ওঠালে ছোঁয়াছানি, আচারবিচারের পরোয়া আর করবে না ছেলেটা। সবকিছু একাকার করে দিলে তার নিজের ধর্ম রক্ষা হয় কী করে। তাতে করে তার বংশের মর্যাদাই বা থাকে কী করে। না না, যা ভুল হওয়ার ওই একবারই হয়ে গেছে। আর নয়। মনটাকে দৃঢ় করে মানুষটা। ছেলেটার উপকারটুকুই যা হোক একটু করে দেবে সে, ব্যস! বলল, সয়েনিকে তুই পাবি, কিন্তু তরে আমি যেমন যেমন কমু তেমন তেমন যদি পালন করতে পারস তাইলেই পাবি। সম্মোহনী বিদ্যা প্রয়োগ করুম। অনেক তন্ত্র মন্ত্র, নিয়ম নিষ্ঠা পালন দরকার। ঠিক ঠিক পালন যদি করতে পারস তাইলে জানবি ঐ মাইয়া একমাত্র তরে ছাড়া আর কাউরে পাত্তাই দিব না। আমার উপর ভরসা রাখ তুই।
লুকাসকে অভয় দেয় মানুষটা। লুকাস বড় করে মাথা কাৎ করে মানুষটার কথায় সম্মতি জানিয়ে বলে, আপনার নির্দেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। আর এই ঘটনা আপনি আর আমি ছাড়া তৃতীয় কেউ আর কোনও দিন জানবে না। এই আমি প্রভুর পদক ছুঁয়ে বলছি।
বলেই লুকাস পদকটাকে বারকয়েক বুকে আর মাথায় ঠেকায়। দেখে মানুষটা শুধু আশ্বস্ত না প্রীতও হয় লুকাসের প্রতি। নিশ্চিত হয়, ওদের ধর্মের পরম পুরুষটির নামে শপথ করে কথা দিয়েছে যখন তখন এর অন্যথা নিশ্চয়ই ছেলেটা করবে না। তবুও কী ভেবে বলল, তুই কথার অন্যথা করলে শুধু তগ প্রভু না আমার অভিসম্পাত থিকাও তর রেহাই হইব না জাইনা রাখিস!
সহসা ভয়ে যেন কুঁকড়ে গেল লুকাস। আনত মাথা, হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে সে শান্ত হয়ে বসে থাকে। দেখে বেশ লাগে মানুষটার। ঠোঁটের বাঁকে স্মিত হাসি খেলা করে ওঠে।
আর কথা বলতে পারছে না মানুষটা। একটা বমি বমি ভাব। শরীরটা গুলিয়ে উঠছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। কানের ভিতর যেন কাঠপিঁপড়েরা অনবরত কামড়ে চলেছে। মানুষটা জানে, একমাত্র ভরপেট খাদ্যই পারে তাকে এসব যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে। কিন্তু কোথায় খাদ্য পাবে সে। তার কাছে যে একটা কানাকড়িও নেই। যা ছিল তা দিয়ে খেয়া পার হওয়ার মূল্য চুকিয়েছে। বাসভাড়া দিয়েছে। ফের নদী পেরোতে গিয়ে মানুষটা একেবারে কপর্দকশূণ্য। ঘাটের কড়ি আদায় করছিল যে ছোকরাটা, সে ঘৃণার চোখে দাবড়িয়ে উঠে বলেছিল, যত্তসব ভন্ডের দল, পারের কড়ি ফাঁকি দিতেও এদের বুক কাঁপে না।
দুজনে বসতিতে ফেরার জন্য উঠে দাঁড়ায়। লুকাস আগে আগে চলতে শুরু করলে মানুষটা বলল, দাঁড়া বেটা, আরেকটু জল খাই। পেটে রাক্ষুইসা ক্ষুধা নিয়া এতগুলা পথ হাঁটতে আমি পারুম না। অন্তত জলটুকা পেটে থাউক।
মানুষটা নিজের হাতে কল পাম্প করে বাটি ভরা জল ঢকঢক করে খায়। খানিকটা দিয়ে চোখেমুখে ঝাপ্টা দেয়। বাকিটা মাথায় ঢালে। বেশ একটু আরাম বোধ করে। ফের একবার জল তুলে বাটি ভরে নিল। বড় করে শ্বাস ছেড়ে বলল, বেটা, এবার ল যাই।
বসতির দিকে পা বাড়ায় মানুষটা। সাবধানও খুব, জল ছলকে পড়ে নষ্ট না হয়।
পিছনে পিছনে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে লুকাস।
ক্রমশ…