সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে অসিত কর্মকার (পর্ব – ৯)

যুদ্ধ যুদ্ধ

নয়

দুই নদীর সঙ্গমের জল, দুটো সজারুর কাঁটা আর কালীর থানের ধুলো। সবই জোগাড় করেছে লুকাস। মানুষটা ওগুলোতে মন্ত্র পড়ে দিল। কাঁটাদুটো লুকাসের হাতে তুলে দিয়ে বলল, রাইত গভীরের ভরা পূর্ণিমার জোয়ারের সময় নদীতে চইলা যাবি। গায়ে তখন তোর সুতাটুকাও থাকব না। কাঁটাদুইটারে জোয়ারের জলে খেলাইবি আর মনে মনে কামরূপ কামাখ্যারে স্মরণ কইরা মাইয়াটারে কামনা করবি। ঠিক তার পরের ভরা আমাবইস্যার রাইতে উলঙ্গ হইয়া কাঁটা দুইটারে ভাটাতে খেলাইবি সেইসঙ্গে কামরূপ কামাখ্যারে স্মরণ কইরা মাইয়াটারে ফের কামনা করবি। আরেক আমাবইস্যার রাইতে যেমন কইরাই হউক মাইটারে কাছে পাইতে হইব তরে। সুযোগ বুইঝা মাইয়াটার শরীলে এই জোড়া কাঁটা ফুটাইয়া দিতে হইব যাতে কইরা মাইয়াটা যন্তনায চিক্কর দিয়া ওঠে। আর ঠিক তক্ষুণি এই সঙ্গমের জল আর মন্ত্রপড়া ধুলা মাইয়াটার গায়ে ছিটাইয়া দিবি। ব্যস, তর কাম শ্যাষ, শত বাধা আইলেও ঐ মাইয়া তরই হইব।
কামরূপ কামাখ্যা কে গোঁসাই?কৌতূহলী হয় লুকাস।
কারূপের কামাখ্যাদেবী।সতীর একান্নপীঠের এক পীঠ। বড় জাগ্রতদেবী। মানুষের যত কামনা বাসনা পূরণ করে দেবী কামাখ্যা।
কিন্তু গোঁসাই ও তো আপনাদের ধর্মের দেবী, সে কি খিষ্টান ধর্মের একজনের কামনা বাসনা পূরণ করবে? বড় সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করল লুকাস।
করব করব! বড় এক বিজ্ঞভাব নিয়ে অহংকারের সঙ্গে মানুষটা বলল, তর হইয়া মন্ত্র পড়ল কে?
আজ্ঞে, আপনি।
আমি তো হিন্দু, নাকি? তারউপর সাধু মানুষ, তর মাধ্যম হইয়া আসল কামটা তো আমিই মনে মনে সাইরা দিছি। তর কাজটুকা তো নিমিত্তি মাত্র। এখন তুই যদি আমারে বিশ্বাস না যাইস তইলে আমার আর কিছু করনের নাই। যারে মানস, যার পদো বুকে ঝুলাইছস, তার কাছে মাঙ, দেখি তার কত্ত ক্ষমতা!
মানুষটার আরও নানা জটিল কথার আবর্তে পড়ে ছোকরা লুকাস একেবারে দিশেহারা এখন। একরকম সম্পূর্ণ সমর্পিত মন নিয়ে বলল, না না, গোঁসাই, আপনার কথা, নিয়মবিধি আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। আমার শুধু সয়েনিকে চাই।
পরম কৃতজ্ঞতাবোধে তাড়িত হয়ে লুকাস মানুষটাকে প্রণাম করতে গেলে মানুষটা মুহূর্তে তাকে ধমক দিয়ে উঠল, খবদ্দার খবদ্দার , আমারে ছোঁস বুঝি!
সম্বিত ফিরে এল লুকাসের। বাড়ানো হাতটা মুহূর্তে ঘুরিয়ে নিয়ে ঘাড়ের পিছনটা চুলকোতে চুলকোতে ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, একদম ভুলে গিয়েছিলাম গোঁসাই। এমনটা আর হবে না।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। শোন এখন, যেই কথাটা কওয়ার ছিল, ঐসবের পরে দুইজনে তিন রাত্র এক ঘরে কাটাইতে হইব। তবেই মা কামাখ্যাদেবীর আশীর্বাদ পাবি তোরা।
তিন রাত্রি দুজনে একঘরে একসঙ্গে থাকতে হবে! তা এখন কী করে সম্ভব গোঁসাই? এমন বিধান শুনে লুকাস হতাশ। যেন সে আকাশ থেকে পড়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ল। এ যে তার পক্ষে একেবারে অসম্ভব এক ব্যাপার।
মানুষটা বুঝতে পারছে, বড় কঠিন পরীক্ষায় লুকাসকে ফেলেছে সে।বলল,বেশি দেরি করলে কিন্তু ঐ মন্ত্রে আর কাম হইব না। এখানে ব্যবস্থা না করতে পারলে মাইয়াটারে নিয়া পলাইয়া যা! তিন রাত্র কাটাইয়া আয়। তারপর তগ ঘরে তোলার দায়িত্ব আমার।
লুকাস এখন কিছু বলে না। শুধু ভাবে, পালিয়ে গিয়ে লুকিয়ে থাকার উপযুক্ত জায়গা হল শহর। একবার মানুষের জঙ্গলে মিশে যেতে পারলে তাদের খুঁজে পেতে কঠিনই হবে। কিন্তু সে তো অনেক টাকাপয়সার ব্যাপার। পাবে কোথায়?
কি রে, পারবি না? মানুষটা কপট কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে।
লুকাস কোনওরকমে মাথাটা তুলে ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
চারিদিক এখন চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে। হঠাৎ হঠাৎ একটা দুটো পাখির ডাক শোনা যায়। হয়ত কোনও কারণে ওদের ঘুমের বিঘ্ন ঘটছে। কতগুলো মানুষ শ্মশানে ঘর সারাইয়ের কাজে ব্যস্ত।ওই দলে লুকাস নেই। সে মানুষটার ভালমন্দ দেখার দায়িত্ব নিয়ে আছে। লুকাসের এই ভূমিকায় দয়াল খুব খুশি। মানুষটার এতটুকু অযত্ন হোক তা সে চায় না। মানুষটার জন্য ঘরের ব্যবস্থা হচ্ছে, তাতে একার শান্তির জীবন কাটবে তার।
ও গোঁসাই, চুপচাপ বসে অত কী ভাবছেন, দেশের কথা মনে পড়ছে? লুকাসের কথায় নিজের মধ্যে ফিরে আসে মানুষটা।
না রে না, দেশের কথা ভাইবা আর লাভ কী। ভাবতাছি কয়ডা গান বান্দুম। তাতে সুর দিম। হাটবাজারে , গ্রামে গ্রামে গাইয়া বেড়াম।
আপনি গানও বাঁধতে পারেন গোঁসাই! বিস্ময়ভরা চোখে লুকাস জিজ্ঞেস  করলে মানুষটার মুখমণ্ডলে একটা কৃতিত্বের ছাপ খেলা করে ওঠে।
পারি রে পারি, একটু সবুর কর, তরে আমি এখনই একটা গান বাসিন্দা শোনাইয়া দেই।
কী বিষয় নিয়ে গান বাঁধবে তা ভাবতে গিয়ে চোখের উপর একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে মানুষটার, কলপাড়ের কুলগাছটার নীচে দাঁড়িয়ে অগস্টিন পারুর জন্য অপেক্ষা করছে। পারু দেরি করে এসেছে বলে তার বেজার মুখমণ্ডল। অগস্টিনের পরনে সাধারণ জামাপ্যান্ট। বেশ যত্ন করে আঁচড়ানো পরিপাটি চুল। পারু কলসি কাঁখে কলে জল নিতে এসেছে সেই সঙ্গে অভিসারপর্বও সেরে যাবে।
দৃশ্যটা ভাবতে ভাবতে মানুষটা গান বাঁধে,
যৌবনবতী কন্যা কলস কাঁখে জল ভরিতে যায়,
গাছের আড়াল থিকা
বাঘে লালচ চউক্ষে চায়,
কন্যারে চাইট্টাপুইট্টা খায়।
কন্যা না মানে শাষণ
না মানে বিচার,
নাই কন্যার ভালমন্দ বোধ,
বাঘেরে ভাবে মনেরই নাগর।
মানুষটা গান করা থামালে লুকাস জিজ্ঞেস করল, আপনি ঠাকুরের গান করেন, আবার এসব গানও করবেন গোঁসাই?
করুম রে বেটা, তাই করুম। মাইনষে যেমন যেমন চাইব তেমন তেমনই গান গামু আমি এখন থিকা। এই গানটা কেমন হইছে তা ক দেখি?
লুকাস মাথা নাড়িয়ে বলল, খুব ভাল গোঁসাই। এমন কয়েকটা গান বেঁধে হাটবাজারে যদি গাইতে পারেন তাহলে দেখবেন কেমন পয়সা রোজগার হয় আপনার!
রোজগারের উপায়ের কথা শুনে মানুষটার মন চনমনে হয়ে ওঠে। হ্যাঁ, অনেক টাকা রোজগার করতে হবে তাকে এখন। বলল, টাকা থাকলে পোজার পত্তনি মিলে, বুঝলি?
প্রজার পত্তনি, সে আবার কী গোঁসাই?
পোজা হইল গিয়া রাজার রাজইত্তে যারা বসবাস করে তাগ কয়। রাজা হইল তাগ পালনকত্তা। রাজা অনেকসময় কী করে জানস, অন্য রাজত্তের মানুষজন গ নিজের রাজত্তে ঘরবসতি, জমিজিরাত দিয়া পোজা বিদ্ধি করে। এরেই কয় পোজাপত্তনি।
বলতে বলতে মানুষটা শ্মশানের দিকে তাকায়।
ওটার দক্ষিণ প্রান্তে অনেকটা জায়গা একরকম পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে ঢোলকলমী আর কাঁটাঝোপের দঙ্গল। সাপখোপও কিছু থাকতে পারে। মানুষটা স্বপ্ন দেখে, ওই জায়গাটায় নতুন একটা বসতি গড়ে তোলার। নদীর পাড় ধরে হেঁটে আসার সময় সে তো দেখছে, ভেড়িবাঁধের কোল ধরে ছোট ছোট কুঁড়েঘর তুলে অনেক পরিবার বসবাস করছে। তারজন্য নিশ্চয়ই সরকারের কাছ থেকে ওদের অনুমতি নিতে হয়নি। আর অনুমতি না পেলেও কি মানুষ বসতি না গড়ে পরিবার নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়? নিশ্চয়ই না,সে যে করেই হোক বসতি গড়ার মদত কারোর না কারোর কাছ থেকে পেয়ে যায়ই।
মানুষটা একসময় জিজ্ঞেস করল, ঐ শ্মশানের দেখভালের দায়িত্ত কার উপর কইতে পারস লুকাস?
বাজার কমিটির হাতে।
বাজারকমিটির মাথা কে?
মুকুন্দ পোদ্দার। বাজারে তার বড় চালের কারবার, কাঠের গোলা।
আমার লগে তুই সেই মাইনষের পরিচয় করাইয়া দিতে পারস?
খুব পারব। কিন্তু তার সঙ্গে আপনার কী দরকার গোঁসাই? লুকাস কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলে মানুষটা শুধু রহস্যভরা মিটিমিটি হাসে। শেষে বলল, কাম আছে, কাম আছ। পোজাপত্তনি বসামু রে আমি!
প্রজাপত্তনি, আপনি বসাবেন গোঁসাই!লুকাস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
মনে কর তাই। তবে সবুর, এখনই মুকুন্দ পোদ্দারের কাছে যামু না আমি। আগে আমার মাথা গোঁজার ঠাঁইটা হোক। একটু চুপ থেকে  জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, দয়াল আমার জইন্য যে ঘর সারাই করাইতাছে তাতে মুকুন্দ পোদ্দারের সায় আছে তো? তার অনুমতি নিছে কিনা তা জানস কিছু?
নিয়েছে নিশ্চয়ই। আর না নিলেই বা কী, মুকুন্দ পোদ্দারের সঙ্গে দয়ালদাদুর খুব ভাব।
তাইলে ঐ লোকের লগে দেখা করতে দয়ালরেই সঙ্গে লইয়া যাম। সুবিধা হইব।
ফের মনে মনে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে মানুষটা। এদেশের মাটিতে গুছিয়ে পাকাপোক্তভাবে বাঁচার স্বপ্ন। সে স্বপ্ন পূরণ হওয়া মানে এমাটিতে তার একান্তই নিজস্ব এক রাজত্বের প্রতিষ্ঠা হওয়া। যেখানে তার অধীনে থাকবে বসতির এই মানুষগুলো।তার গুরুগিরি আর গানের মাহাত্ম্য চারপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে আর চিন্তা ভাবনা কিসের। তার রাজত্বের বিস্তৃতি ঘটবে। দিন দিন শিষ্যঘর বাড়বে। বাড়বে রোজগার। আরাম আয়াসে সংসারসুখভোগ হবে।
যেন বা ওই স্বপ্নের মধ্যেই বাধা হয়ে ছোটবড় ছায়ার মিছিল চলেছে নদী মাঠ গ্রাম ছুঁয়ে ছুঁয়ে। প্রথম দিকের ছায়াগুলো  হাল্কা, পৃথিবীর বুকে তেমন একটা দাগ ফেলছে না। সময় গড়াতে ওগুলো গাঢ় হতে থাকে। পাগল বাতাস ওদের দূরে নিয়ে চলে। চাঁদের মুখ মেঘে ঢাকা  পড়তে কেমন এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসে পৃথিবীতে। মানুষটার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
কী রে লুকাস, ঝড় বৃষ্টি হইব নাকি রাত্র কইরা? আকাশে কালা মেঘ, বাতাসের মতিগতিও ভাল ঠেকতাছে না।
লুকাস আকাশের দিকে তাকিয়ে খানিক পরখ করে বলল, ঝড় বৃষ্টি  হবে বলে মনে হয় না গোঁসাই। দেখছেন না, কী জোরে জোরে বাতাস বইছে, মেঘগুলোকে মোটে তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না। দূরে দূরে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সব।
উড়াইয়া নিলেই বাঁচি! অনেক আশা নিয়ে বলল মানুষটা। ঝড়জলে অসহায় অবস্থা বড় কষ্টের। আর যদি বন্যা দেখা দেয় তাহলে তার এই ঠুনকো বসবাসের ব্যবস্থা যে মুহূর্তে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে! বড় ভয় জাগে মানুষটার মনে। মা বাপ ভেসে গিয়ে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল! একটা দিনের মধ্যে সে বড় একা হয়ে গেল! বুকের ভিতরটা কেমন হাহাকার করে ওঠে মানুষটার।
দুজনেই এখন চুপচাপ বসে আকাশের মেঘ চলাচল দেখছে। ওদিক থেকে ঘর বাঁধার খুটখাট শব্দ আর ওদের কথাবার্তা ভেসে আসছে। বাতাসে জোনাকিরা লাফালাফি খেলছে বেপরোয়া বাতাসের সঙ্গে। নদীর বুক ছুঁয়ে আসা নোনা বাতাসে ঠান্ডা পরশ লাগছে।বৃষ্টি হওয়ার লক্ষণ।
 রাত গড়ায়। বসেই থাকে দুজনে। ভিন্ন স্বপ্ন নিয়ে।

 ক্রমশ… 

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।