সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩২)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৩২ 

অগত্যা মত দিতে হয় অঞ্জলিকে। কিন্ত খুব কষ্ট হয় তার। এর আগে বাবা তাদের ছেড়ে কোথাও রাত্রিবাস করে নি। বাবারও যে খুব কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না অঞ্জলির। বাবা হঠাৎ করে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যায়।আসলে বাবার মধ্যেও দোটানা ভাব কাজ করছে। এইভাবে তাদেরকে ফেলে যেতে মন চাইছে না। আবার না গেলেও নয়। বাবার সব থেকে দুঃশ্চিন্তা বোধ হয় মাকে ঘিরে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। সালিশিসভার সেই ঘটনার পর থেকেই বাবাই হয়ে ওঠেছিল মায়ের অন্যতম অবলম্বন। সেই মা”কে সে এবার কেমনভাবে একা সামলাবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না অঞ্জলি। রান্নার চালা থেকে শুনেতে পায় বাবা-মা ‘কে তার বর্ধমান যাওয়ার কথা বলছে। শুনেই মা ছেলেমানুষের মতো কেঁদে ওঠে। সে দ্রুত ঘরে গিয়ে দেখে মায়ের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জলের ধারা। মা’কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বাবাও নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না। সে তখন এগিয়ে গিয়ে দুজনেই শান্ত করার চেষ্টা করে। মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে , মন খারাপ কোর না মা। তাহলে তোমার অসুখটা আবার বেড়ে যাবে। কয়েকটা দিনের তো ব্যাপার। তারপর আমরাও বাবার কাছে চলে যাব। বর্ধমানে ভালো ভালো ডাক্তার আছে। তোমাকে তাদের কাছে নিয়ে যাব। দেখবে তুমি ভালো হয়ে যাবে।বাবার দেওয়া সান্ত্বনা দিয়েই মা’কে কোন রকমে শান্ত করে অঞ্জলি।
ভোরের ট্রেন ধরবে বাবা। সে একটা ব্যাগে বাবার একটা জামা-কাপড় আর চাট্টি মুড়ি বেঁধে দেয়। তারপর দুঃসময়ে জন্য সরিয়ে রাখা ১০ টা ১০ টাকার নোট বাবার হাতে দিতে যায়। বাবা কিছুতেই নেবে না। হাত নেড়ে বলে, না — না আমার লাগবে না। তোদের ফেলে রেখে যাচ্ছি। আমারই টাকা পয়সা দিয়ে যাওয়া দরকার ছিল। সেটাই পারছি না , তোর কাছে টাকা আমি নেব কোন মুখে ?
—- তুমি বাইরে যাচ্ছ। কবে কাজ পাবে তার ঠিক নেই। তাছাড়া যাতায়াতের খরচ আছে।
বলে একরকম বাবার হাতে টাকা ক”টা আর একটা কাগজে অরুণস্যারের ফোন নং টা লিখে জোর করে ধরিয়ে দেয়।
বাবা বলে , মা রে মেয়ে হয়ে তুই আমার ছেলের সামিল। ছেলেটা তো আমাদের বিপদে কোন কাজেই লাগল না।
সে বলে , বাদ দাও তো ওসব কথা। ওখানে পৌঁছেই অরুণস্যারের বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দেবে। কাজ পেলে না পেলেও জানাবে।সম্মতি জানিয়ে বাবা টাকা আর ফোন নম্বরের কাগজটা মাথার বালিশের নীচে রেখে দেয়। সে রাতে আর বাবা — মেয়ে ঘুমোতে পারে না। মা কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ে। অঞ্জলি ভাবে এক হিসাবে ভালোই হয়েছে , নাহলে বাবার যাওয়ার সময় হয়তো ঠিক কেঁদে ভাসাত। সামাল দিতে বেগ পেতে হত তাকে। আর সেই কথা ভেবে সারা রাস্তা বাবার মন খারাপ করত।
দেখতে দেখতে ভোর হয়ে যায়। বাবা যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে কিছুক্ষণ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে বাবাকে জিজ্ঞেস করে , মাকে ডাকব ? বাবা হাতের ইশারায় বারণ করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরের দরজা খুলে দিয়ে সে বাবাকে প্রনাম করে।বাবা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, এইভাবে তোদের ফেলে যেতে কিছুতেই মন চাইছে না মা। কিন্তু কেন যেতে হচ্ছে তুই তো সবই বুঝতে পারছিস। খুব শীঘ্রই তোদের নিয়ে
যাব। ততদিন তোরা একটু সাবধানে থাকিস।
— আমদের নিয়ে চিন্তা কোর না। তুমি সাবধানে যেও। টাকা ক’টা নিয়েছো তো ? কাজ না পেলে দুঃশ্চিন্তা কোর না। ফিরে চলে এসো। দরকার হলে অন্য কোন গাঁয়ে চলে যাব।
হাত নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দরজার বাইরে পা রাখে বাবা। আস্তে আস্তে আধো অন্ধকারে অস্পষ্ট হয়ে যায় বাবা। সে দরজা দিয়ে বাড়ির ভিতের আসে। নানা চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে তার মন। বর্ধমান চলে গেলে তার পড়াশোনাই বা কি করে হবে , কি করেই বা হৃদয়দার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ হবে , সেটা ভেবে কিছুটা মুসড়ে পড়ে সে। হৃদয়দা কি বর্ধমানে চলে গেলে তাকে ভুলে যাবে ? সে শুনেছে চোখের আড়াল হলেই নাকি মনের মানুষও মনের আড়ালে চলে যায়। সে অবশ্য তা মনে করে না। বরং তার মনে হয় , চোখের আড়ালে থাকলেই তো টান আরও বেড়ে যায়। হৃদয়দাকে জিজ্ঞেস করতে হবে তার কি মত ?
পড়াশোনা চালোনো নিয়ে অবশ্য তার মনেই দ্বিমত তৈরি হয়েছে। মনে হয় পড়াশোনা করেই বা কি হবে ? যতই তাদের জন্য চাকরিতে সংরক্ষণের কথা বলা হোক না কেন ধরা-করার লোক কিম্বা টাকা পয়সা না থাকলে যে কিছু হয় না তা আজ সবাই জেনে গিয়েছে। টাকা পয়সা তো তাদের নেই ই , ধরা-করার লোক বলতে ছিলেন একমাত্র রামবাবু। সে’ও না থাকারই সামিল। রামবাবুই বাবাকে বলেছিলেন, সংরক্ষণের কোটায় তার একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেবেন। সেই রামবাবুদেরই এখন কে দেখে তার ঠিক নেই। অরুণস্যার ধরা-করা কিম্বা টাকা-পয়সা দিয়ে চাকরি নেওয়ার মতো সংরক্ষণের কোটায় চাকরির তীব্র বিরোধী। তার মতে , চাকরিতে সংরক্ষণ মানেই যোগ্যতার সঙ্গে আপোষ করা।কতবার অরুণস্যারকে বলতে শুনেছে , যেসব ছেলেমেয়েরা অবস্থাপন্ন পরিবারে জন্মেছে তারা এমন কিছু অপরাধ করে বসে নি। ভাল রেজাল্ট করেও সে চাকরি পাবে না আর তাদের চেয়ে অনেক খারাপ রেজাল্ট করা ছেলেমেয়েদের স্রেফ সংরক্ষণের সৌজন্যে চাকরি বাগিয়ে নেওয়াটা মেনে নেওয়া যায় না। বরং অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনার ব্যাপারে যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য সরকার সেইসব সুযোগ সুবিধার ঢালাও ব্যবস্থা করে দিক। নাহলে প্রকৃত মেধার বিকাশ ব্যহত হবে। অরুণস্যারের যুক্তি তারও ঠিক বলেই মনে হয়। তার ভাবনার মাঝেই কখন মা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে তা টের পায় নি অঞ্জলি।আচমকা মা জিজ্ঞেস করে বসে , হ্যা রে , তোর বাবা চলে গেল অথচ আমাকে কেউ ডাকলি না তোরা ?
সে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, ডেকেছিলাম তো মা। আমি -বাবা তোমাকে অনেকবার ডাকলাম। তুমি তখন ঘুমিয়ে কাদা। তাই বাবা বলল, থাক আর ডাকতে হবে না। কাঁচা ঘুম ভাঙলে ওর শরীর খারাপ করবে।
—- অঃ তা হবে। এখন ওষুধ খেলেই আমার খুব ঘুম পায়।
মিথ্যা কথাটা বলতে খুব খারাপ লাগছিল অঞ্জলির। কিন্তু মাকে শান্ত করতে এছাড়া তো উপায়ও ছিল না কিছু। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে , বাবার যাওয়ার সময় মাকে একবার ডাকলেই ভালো হত। কিন্তু এখন আর ভেবে তো লাভ নেই কিছু। বেলা বয়ে যাচ্ছে। বাড়ির কাজ সমস্ত পড়ে আছে। সেইসব কাজ সামলাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। কিন্তু বাবাদের বিছানাপত্র গোটাতে গিয়েই তার হাত থমকে যায়। বাবার বালিশ সরাতেই দেখে ৫ টা নোট পড়ে রয়েছে। আর চারপায়ের নীচে পড়ে রয়েছে অরুণস্যারের ফোন নং লেখার কাগজটা। অঞ্জলি বুঝতে পারে তাদের অসুবিধার কথা ভেবে বাবা অর্ধেক টাকা রেখে দিয়ে গিয়েছে , কিন্তু অজান্তে টাকার ভাঁজে রাখা ওই কাগজটা যে মাটিতে পড়ে গিয়েছে তা টের পায়নি বাবা। এখন তো বাবার কোন খবর পাওয়ার উপায়ই থাকল না। তার উপরে ওই ক’টা টাকায় কি হবে বাবার ? যদি তাড়াতাড়ি কোন কাজ না জোটে তাহলে তো না খেয়ে মরতে হবে। বাড়িও ফিরতে পারবে না। নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে তার। কেন সে তখন একরার বাবাদের ঘরে গিয়ে দেখে এলো না সেই আক্ষেপ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। সারাদিন মন খারাপেই কেটে যায় অঞ্জলির।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।