সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৫২)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৫২
তারই মধ্যে সুখবর আসে হোমে। একেবারে জোড়া সুখবর। সুখবর নিয়ে সকালেই হোমে আসেন আলাপনবাবু। অফিস ঘরে বসে সবার সামনে খবর দুটো দেন তিনি। অঞ্জলির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলেন , এতদিনে তোমার লড়াই সফল হলো। তোমার মামলায় অভিযুক্তদের সকলকেই যাবজ্জীবন সাজা দিয়েছে আদালত। সেই কথা শোনার পরই অঞ্জলির চোখের সামনে যেন এক লহমায় ভেসে ওঠে সেই বীভৎস রাতটার ছবি। চোখের সামনে সেই পশুগুলো আরতাদের আত্মীয় স্বজনদের মুখগুলো যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর মনটা যেন কেমন করে ওঠে তার। সেটা লক্ষ্য করেই আলাপনবাবু বলেন , কি হলো? তোমার তো এই খবর শুনে আনন্দে আটখানা হওয়ার কথা। তার বদলে মুখটা এমন বিমর্ষ হয়ে গেল কেন ?
—- না তা নয় , আসলে আমি ওদের বাড়ির লোকগুলোর কথা ভাবছি।
— মানে ?
—- ওদের মধ্যে একজনের স্ত্রী শয্যাশায়ী, ছোট ছোট দুটি ছেলে মেয়ে আছে। একজনের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা,বাবা অন্ধ। ওদের কি হবে তাই ভাবছি
।—- তোমাকে আমি যত দেখছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। যারা তোমার এতবড়ো সর্বনাশ করল তাদের বাড়ির লোকের কথা ভেবে কষ্ট পাচ্ছ তুমি ?
— ওদের বাড়ির লোকেরা তো কোন দোষের দোষী নয়। তবু ওদেরও তো এক রকম শাস্তিই ভোগ করতে হবে।হয়তো ওরা না খেয়ে মারাই পড়বে।
— তোমার মনটা সত্যিই খুব বড়ো। আদালত অবশ্য সাজা প্রাপ্তদের বাড়ির লোকেরা যাতে কোন সমস্যায় না পড়ে তা দেখার জন্য প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে। তুমিও যদি ওদের সাহার্য্য করতে চাও তাহলে তোমাকে দ্রুত নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গ্রামে ফিরে যেতে হবে।
— হ্যা, আমাকে সেই চেষ্টাই করতে হবে। আদালত নির্দেশ দিলেই যে প্রশাসন তা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে তার যে কোন মানে নেই তা আপনার তো অজানা নেই। বেশ বাদ দেন ওই প্রসঙ্গ । এবার আপনার দ্বিতীয় সুখবরটা বলুন দেখি শুনি।
—- দ্বিতীয় সুখবরটা হলো, আমার একটা লড়াইয়ে জয় হয়েছে।
—- আপনার লড়াই ?
—- হ্যা, ডি,এম সাহেবকে আমি বোঝাতে পেরেছি আপনাদের সমস্যার বিষয়টি।
উনি জরুরী ভিত্তিতে এই হোমের সবার জন্য ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড, ব্যাংকের পাশবই আর স্বনির্ভর গোষ্ঠী গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। আজই ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে আসবেন। প্রশাসনের লোক আসবেন ফর্মে আপনাদের সইসাবুদ করাতে। আলাপনবাবুর কথা শেষ হতেই সবাই উচ্ছাসে ফেটে পড়ে। সবাই বলে, এটা কিন্তু সত্যিই আমাদের কাছে খুব বড়ো সুখবর। আপনার জন্য এত সহজে এত বড়ো একটা কাজ হল।
— খুব সহজেই কিন্তু কাজটা হয় নি। প্রশাসনের অনেক কর্তাব্যক্তিই নানা রকম ফ্যাচাং তুলেছিলেন। কেউ বলেছিলেন ওদের বাড়িতে তো রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, হয়তো ব্যাংকের পাশ বইও আছে। একসময় তো ওরা বাড়িও ফিরে যাবে। তাহলে আবার এখানে ওসব করার কি দরকার ? এতে শুধু জটিলতাই বাড়বে।
সাবিত্রী , অতসীদিরা জানান — কিন্তু আমাদের তো আর কোথাও ফেরার পথ নেই। এই হোমই তো আমাদের বাড়ি।
—- ঠিক, আমি সেই কথাটাই ডি,এম সাহেবকে বলেছি। সে যেদিন যারা বাড়ি ফিরে যাবে সেদিন তাদের হোমের রেশনকার্ড, ভোটার কার্ড, পাশবই বাতিল করে দিলেই হবে। কিন্তু যারা বছরের পর বছর বিনা দোষে হোমে বন্দীজীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন তাদের প্রাপ্য রেশন , ভোটাধিকার সহ অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখাটা ঠিক নয়। সর্বোপরি তারাও মানুষ। মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করাই রাষ্টের কর্তব্য।
সাবিত্রীদিরা বলেন — ঠিক কথা। আপনি আমাদের মনের কথাটাই তুলে ধরেছেন। ওই কথা শুনে ডি,এম সাহেব কি বললেন ?
— উনি আমার যুক্তিটা খতিয়ে দেখার পরই তো নির্দেশটা দিলেন। কই এবার একটু চা-টা হবে নাকি ?
আলাপনবাবুর কথা শুনে শশব্যস্ত হয়ে সাবিত্রীদি বলেন -- হবে না মানে , এখনই চায়ের জল বসাচ্ছি।আমাদের তো আপনাকে মিষ্টি মুখ করানো উচিৎ ছিল। কিন্তু ভগবান তো আমাদের সেই সুযোগ দেন নি।
—- সে হবে ক্ষণ। আপতত চা দিন তো। আর আপনারা সবাই তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। ফটোগ্রাফার আর প্রশাসনের লোকেরা এলো বলে।
সত্যিই তাই চা খেতে খেতেই ওরা এসে পৌঁছোয়। সাবিত্রীদি ওদেরও চা দেন। চা খাওয়ার পরই শুরু হয়ে যায় ছবি তোলা আর ফর্মে সই করানোর কাজ। তিনদিনের মধ্যে তাদের হাতে হাতে পৌঁছে যায় রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড আর ব্যাংকের পাশ বই। গঠন হয়ে যায় ‘অবলম্বন’ নামে একটি স্বসহায়ক গোষ্ঠীও। সাবিত্রীদি আর অতসীদিকে দলনেত্রী আর সহদলনেত্রী করা হয়। আলাপনবাবু চেয়েছিলেন অঞ্জলি দলনেত্রী হোক। কিন্তু অঞ্জলি সাবিত্রীদির নামটা প্রস্তাব করায় আর কেউ কোন উচ্চবাচ্য করে নি। অঞ্জলি বলে , হিসাব নিকাশ যা দেখার সেই দেখে দেবে। সাবিত্রীরা বয়স্ক মানুষ , তাই মাথার উপরে থাকুন। সবাই অঞ্জলিকে সমর্থন জানায়। গ্রুপের জন্য ব্যাংকেআলাদা পাশবই খোলাও হয়ে যায়।
আলাপনবাবু জানান, তারা এখন থেকে পুরসভা এলাকার ভোটার হিসাবে বিবেচিত হবে। সেই হিসাবে পুর এলাকার রেশন দোকান থেকে রেশন সামগ্রীও পাবে তারা। আর ৬ মাসের মধ্যে তাদের গ্রুপের নামে ঋণ বরাদ্দ হবে। ততদিন সবাইকে গ্রুপের পাশবইয়ে ঝুড়ি-ঝাঁটার ব্যবসা থেকে মাসে মাসে কিছু করে টাকা জমা করতে হবে।
অঞ্জলি মনে মনে ভাবে , প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকলে কি না হয়! এই কাজগুলো করতেই তাদের গ্রামের মেয়েদের বছর খানেক ধরে বিভিন্ন দফতরে হাঁটাহাঁটি করেজুতোর সুকতলা ক্ষয় হয়ে গিয়েছে। অবশ্য সবটাই আলাপনবাবুর তৎপরতার জন্যই সম্ভব হয়েছে। হোমের মেয়েরা মহা খুশী। তাদের চোখে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন। স্বপ্ন অঞ্জলির চোখেও। আলাপনবাবুই তাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন আলাপনবাবুর উৎসাহেই সে আজ নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মনোবল ফিরে পেয়েছে। দাঁড়াতেই হবে , আলাপন বাবুর জন্যই অঞ্জলি আজ নিজের পায়ে দাঁড়ানোরও স্বপ্ন দেখতে শিখেছেন।
কিছুদিনের মধ্যেই তাকে স্থানীয় একটি মুক্ত বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দিয়েছেন আলাপনবাবু। প্রতি রবিবার তাকে নিজের মোটর বাইকে চাপিয়ে ওই স্কুলে পৌঁছে দেন।আলাপনবাবুর সঙ্গে তার দুরত্বটা অনেকটা কমে আসে।মাঝে মাঝে কেমন যেন উদাস হয়ে যায় অঞ্জলি। নিজের মনকে সংযত করে। তার সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। আলাপনবাবুর মুখ জতাকে রাখতেই হবে। একদিন আচমকা আলাপনবাবু তার হাত দুটো ধরে বলেছিলেন , হোমের সব মেয়েই আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তারা এখন পড়াশোনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছে, তাই তাদের জন্য আমি সময় পাবো। কিন্তু তোমাকে এবছরই মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে হবে। তাই তোমাকেই প্রথম আমার মুখ রাখতে হবে। আমি যেন ডি,এম সাহেবের কাছে বড়ো মুখ করে তোমার কথা পারি সেটা তোমাকে দেখতেই হবে। সামনেই পরীক্ষা তাই আলাপনবাবু হোমের অন্য মেয়েদের পড়ানোর পর তাকে আলাদা করে কিছুটা সময় দেখিয়ে দেন। তাতেই নিজের প্রতি আস্থাটা অনেকখানিই বেড়ে যায়। পরীক্ষাতেও তার সুফল পায় অঞ্জলি। সব পরীক্ষায় মোটামুটি ভালোই হয়েছে। আর তারপরই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন আলাপনবাবু। পরীক্ষা অঞ্জলির নয় , যেন তারই হচ্ছিল। প্রতিদিন সময় মতো তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যেতেন, পরীক্ষা শেষে প্রশ্নপত্র নিয়ে সে কি উত্তর লিখেছে তা জেনে নিতেন। তারপরই তার মুখে ফুটে উঠত হাসি রেখা। শেষ পরীক্ষার দিন ফেরার পথে তাকে একটা খাবারের দোকানে নিয়ে গিয়ে মুখোমুখি বসে মোগলাই পরোটার অর্ডার দেন। খেতে খেতেই বলেন , জানো এই কয়েকদিন রাতে আমি ভাল করে ঘুমোতে পারি নি।কারণটা জেনেও না জানার ভান করে অঞ্জলি বলে , কেন, ঘুমোন নি কেন ? কি হয়েছিল ?
— আরে তোমার পরীক্ষাটা নিয়ে খুব টেনশনে ছিলাম।
—- ও, তাই বলুন। টেনশন কাটল ? আজ রাতে ঘুমোতে পারবেন তো ?
— তা কাটল বইকি। ফার্স্ট ডিভিশন তো পাবেই। স্টারও হতে পারে। সত্যিই আজ আমি খুব ঘুমোব।
অঞ্জলির ইচ্ছে হচ্ছিল জিজ্ঞাসা করে — আপনি কেন আমার জন্য এত ভাবেন ? কিন্তু সহজাত একটা লজ্জা বোধ তাকে কোন কথাই বলতে দেয় না।
তাকে ঘিরে আলাপনবাবুর এই উদ্বেগ তার ভালোই লাগে। সমস্ত নারী হৃদয়ই তো চায় তাকে নিয়ে একটু অন্যরকম ভাবুক বিশেষ কোন জন।তাতেই যেন লুকিয়ে আছে তার নারী জীবনের সার্থকতা। খাওয়া শেষে হোমের সবার জন্যই একটা করে মোগলাই পরোটা নিয়ে ফেরে তারা। আলাপনবাবুই সেগুলো সাবিত্রীর হাতে তুলে দিয়ে বলেন, অঞ্জলির পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। সেইজন্য আজ এই স্পেশাল আয়োজন। হোমের সবার চোখে মুখে ফুটে ওঠে খুশীর আভাস। তাদের জন্য তো ভালোবেসে কেউ কোনদিন কিছু আনে নি। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের গ্রুপের নামে দেড় লক্ষ টাকা ঋণ বরাদ্দ হয়ে আসে।তারপর থেকে হোমের মেয়েরা ঝাপিয়ে কাজে নেমে পড়ে।এখন কাঁথাস্টিচ , জ্যাম - জেলি , মশলা গুড়োর কাজ শুরু করেছে তারা। মশলা গুড়ো আর প্যাকেটিং করার জন্য ছোট্ট দুটো মেশিনও কেনা হয়েছে। মেলার পাশাপাশি দোকানে দোকানেও মাল সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। তাতে হয়তো লাভ কিছুটা কম হবে কিন্তু লোকসানের হাত থেকে বাঁচতে হলে এছাড়া কোন উপায় নেই। জ্যাম,জেলি, মশলার মতো জিনিস বেশিদিন আটকে রাখা যায় না। কারণ নষ্ট হয়ে গেলে ধনেপ্রাণে মারা পড়ার আশংকা রয়েছে। তাই আলাপনবাবুই সন্দীপ নামে একটা ছেলেকে ঠিক করে দিয়েছেন। সে প্রতিদিন হোমে এসে মালপত্র নিয়ে যায়। তারপর দোকানে দোকানে তা দিয়ে বেড়ায়। আবার দোকানে দোকানে টাকা তুলে নিজের কমিশন কেটে বাকিটা তাদের জমা দেয়। সে পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকায় ছেলেটির সংগে এখন লেনদেনের হিসাব রাখে শ্রাবণী। মাসের শেষে লভাংশের একটা অংশ সমানভাবে জমা করে দেওয়া সবার পাশ বইয়ে। বাকিটা জমা হয় গ্রুপের পাশ বইয়ে। নিজের নিজের পাশ বইয়ের টাকা ইচ্ছে মতো খরচ করতে পারে সবাই। কিন্তু সেটা খুব একটা প্রয়োজন হয় না। তাই সবার পাশ বইয়ে জমার পরিমাণ বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে আত্মবিশ্বাসও। সবার মধ্যেই কেমন একটা উৎফুল্ল ভাব ফুটে ওঠে। সব থেকে উৎফুল্ল দেখায় শ্রাবণীকে।
ক্রমশ...