সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ২৫)

সালিশির রায়

কিস্তি – ২৫
মুখে না বললেও প্রিয়জনের মনের কথা ভালোবাসার মানুষই তো উপলব্ধি করতে পারে। মনে মনে খুব খুশি হয় অঞ্জলি। কিন্তু সেটা গোপন করে কপট রাগ দেখিয়ে বলে — তুমি আমায় টিউব লাইট বললে কেন?
— তুমি টিউবলাইট তাই।
—- মানে ?
—- সুইচ দিলেই দেখবে অন্যান্য লাইট সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে কিন্তু টিউবলাইট বার কতক প্যাটাক–প্যাটাক করার পর তবেই জ্বলে। তুমিও তেমনি একটু দেরিতে বোঝ।
—- ও, তাই বুঝি ? তা তোমার ভালো লাইটের কাছে যাও না।
—- ভালো লাইটের কাছেই তো আছি। টিউবলাইট জ্বলতে একটু দেরী হয় বটে কিন্আলোটা কি মিষ্টি বলো তো। সারা ঘর ভরে যায়। অন্য আলো তো তার কাছে ম্যাড়মেড়ে।
— যাও যাও শাক দিয়ে আর মাছ ঢাকার চেষ্টা করতে হবে না। হাত – পা ধুয়ে খেতে এসো।
বাবা-মা আগেই খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছে। সে, ভাই আর হৃদয়দা একসঙ্গে খেতে বসে। খেতে খেতে টুকটাক কথা হয়। ভাইকে বনডাঙ্গার হোস্টেলে পৌঁচ্ছে দিয়ে আসার দায়িত্ব হৃদয়দাই নিজে থেকে কাঁধে তুলে নেয়।ঠিক হয় সে’ও সঙ্গে যাবে। হোস্টেলের পরিবেশটা নিজের চোখে একবার দেখে আসবে। রামবাবু বাবার হাতে চিঠি দিয়ে গিয়েছে। স্কুল থেকে ক্লাস ফাইভে পড়ার সার্টিফিকেট নিয়ে আসতে হবে। কাল স্কুল খুললেই সেটা নিয়ে আসবে অঞ্জলি। অরুণ স্যারকে বললেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। সেইমতো কথাবার্তা বলে হৃদয়দা বাড়ি ফিরে যায়। হৃদয়দার সঙ্গে একবার চোখাচোখি হয় তার।সে’ই একটু সংযত করে নিজেকে। একে সংগে ভাই আছে , তার উপরে রয়েছে বাবার মান–সম্মানের ব্যাপার।বাবা এখন পাড়ার মোড়ল। তার জন্য বাবাকে যাতে ছোট হতে না হয় সেই জন্যই তাকে হৃদয়দার সঙ্গে মেলামেশাটা যতটা সম্ভব গোপন রাখতে হবে ।ভালোবাসা তো দুজনের একান্ত অনুভূতির ব্যাপার। অন্যের কাছে বেয়াব্রু করে দেওয়ার জিনিস নয়। বরং গোপন করে রাখতে পারাটাই বেশ রোমাঞ্চের। হৃদয়দার সঙ্গে পরে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে। না হলে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। হৃদয়দা তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে সে সহ্য করতে পারবে না।
মাকে ওষুধ খাইয়ে সে আর ভাই বিছানা নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাই ঘুমিয়ে পড়লেও তার ঘুম আসে না। কত রকম চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। ভাই চলে যাওয়ার পর সে বাড়িতে একেবারে একা হয়ে যাবে। কি করেই বা সংসার সামলাবে , কি করেই বা পড়াশোনা বজায় রাখবে ভেবে পায় না সে। শেষ পর্যন্ত হয়তো তাকে পড়াশোনাটাই ছেড়ে দিতে হবে। খুব কষ্ট হবে তার। কিন্তু অন্য কোন রাস্তাও তো দেখছে না। হৃদয়দাকে নিয়েও তার মন রঙিন স্বপ্নের জ্বাল বোনে। কিন্তু ভাই ,বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার উপযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সে হৃদয়দার সঙ্গে ঘর বাঁধতেও পারবে না। হৃদয়দা খুব বিবেচক, বিষয়টা বুঝবে। তাকে সেই সময়টুকু নিশ্চয় দেবে। আরও নানা কথা ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে সে। সকালে দউঠেই বাড়ির কাজ সামলে তাকে ছুটতে হয় স্কুলে। সব কথা শুনে অরুণ স্যার বলেন, ভালোই হবে। ওখানে একটা সিস্টেমের মধ্যে থাকবে। পড়াশোনার খরচ লাগবে না। সব থেকে বড়ো কথা নিয়মানুবর্তিতা গড়ে উঠবে। অরুণ স্যারই তাড়াতাড়ি সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে দেন।
বাড়ি ফিরে সে আর ভাই স্নান করে খেয়ে তৈরি হয়ে নেয়। তারই মধ্যে এসে পৌঁছোয় হৃদয়দা। তারা বেরোনোর উদ্যোগ নিতেই বাবা–মা এসে দাঁড়ায় বাইরে। সে’ও ভাইকে রাখতে যাবে বলে বাবা দুপুরের মধ্যেই কাজ থেকে ফিরে এসেছে। যাওয়ার আগে ভাই বাবা–মায়ের কাছে যায় বিদায় নেওয়ার জন্য। বাবা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করে। মা প্রথমে কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন ভাবে চেয়ে থাকার পর ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। অঞ্জলির চোখও শুকনো থাকে না।মনে পড়ে যায় একবার ভাইয়ের খুব অসুখ করেছিল। হাসপাতালে কাঁচের ঘরে তিনদিন ভর্তি রাখতে হয়েছিল। সেখানে তো কাউকে যেতে দেয় নি। কিন্তু মা সেই তিন দিন হাসপাতাল থেকে নড়ে নি। সেই ছেলেই আজ দুরে চলে যাচ্ছে , মায়ের যে কি কষ্ট হচ্ছে সে বুঝতে পারছে। মায়ের গায়ে মাথায় বুলিয়ে স্বান্ত্বনা দেয় সে। তার পর মা কে একটু শান্ত করে হোস্টেলের উদ্দেশ্য রওনা হয় তারা। ভাইকে হোস্টেলে রেখে ফেরার সময় সে’ও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ভাইও তাকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এতদিন তো তারা বাড়ি ছেড়ে আলাদা ভাবে তেমন কোথাও থাকে নি বললেই চলে। তাই কেউ কাউকে ছেড়ে যেতে মন চায় না। শেষ পর্যন্ত অঞ্জলি নিজেকে শক্ত করে। ভাইকে হোস্টেলের ঘরে পৌঁচ্ছে দিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করিয়ে দেয়। খুব তাড়াতাড়ি আবার আসব বলে চোখের জল গোপন করে বেরিয়ে আসে।
ভাইয়ের জন্য মনটা ভারাক্রান্ত থাকায় আসার সময় সে কিছুটা চুপচাপ ছিল। হৃদয়দাই তার মন হালকা করার জন্য টুকটাক কথা বলে। তার মনে পড়ে, একদিন এই রকম ভাবেই হৃদয়দার সঙ্গে মোটরবাইকে অজানা দেশে হারিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল সে। তাদের বিয়ের পর হৃদয়দাকে নিজেদের একটা মোটরবাইক কিনতে বলবে। সেটাতে চেপে তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। প্রয়োজনে সে হৃদয়দার সঙ্গে রেজা খাটবে। ঘ্যাচ করে মোটর বাইকটা ব্রেক কষতেই ছিঁড়ে যায় তার চিন্তাজাল। চেয়ে দেখে একটা সিনেমা হলের সামনে বাইক থামিয়েছে হৃদয়দা। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে হৃদয়দার দিকে তাকায়। হৃদয়দা ইশারায় তাকে সিনেমা হলের গেটটা দেখায়। সে মনে মনে ভাবে হৃদয়দা কি তাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে চাইছে ? কিন্তু আজ তার সিনেমা দেখতে একটুও ইচ্ছে করছে না। একে ভাইয়ের জন্য মন খারাপ , তার উপরে এখন সিনেমা দেখতে গেলে বাড়ি ফিরতে রাত্রি হয়ে যাবে। আর রাতের বেলায় হৃদয়দার সঙ্গে ফেরাটা পাড়ার লোকেদের আলোচনার খোরাক হয়ে যাবে। বিষয়টি দৃষ্টিকটু ও বটে। তার মনের ভাব লক্ষ্য করে হৃদয়দা বলে, সাধে কি আর তোমাকে টিউব লাইট বলি। আরে আমি ও বুঝি আজ সিনেমা দেখার মতো মনের অবস্থা নেই তোমার। আমি তোমাকে গেটের দিকে তাকিয়ে দেখতে বলছিলাম।
তারপর আবার মোটরবাইকটা স্টার্ট করে সিনেমা হলের গেটের সামনে গিয়ে দাঁড় করায় হৃদয়দা। আর গেটের দিকে চাইতেই সে চমকে যায়। দেখে গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দাদা আর বৌদি। তাকে দেখে অস্বস্তিতে পড়ে যায় দাদা–বৌদি ও। বৌদিদের দিকে চাইতেই ভ্রু কুঁচকে যায় তার। দেখে বৌদি কানে নাকে তো সেই গয়নাগুলোই পড়ে রয়েছে। তার ওই চাউনি দেখে অস্বস্তি ঢাকতে বৌদি তাড়াতাড়ি বলে ওঠে , ওই গয়নাগুলো তো আমার খুব প্রিয় ছিল।তাই চুরি হয়ে যাওয়ার পর বাবা ফের —-।
বৌদিকে কথা শেষ করতে দেয় না সে। হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলে — থাক থাক, আর বলতে হবে না। কি হয়েছে , না হয়েছে তা আর বুঝতে বাকি নেই। তাই ওই নিয়ে কিছু বলতে চায়ও না। আমার দাদাকে একটা কথা বলার আছে।
দাদা বলে — কি কথা ?
—- দাদা তুই সে যে আমাদের ছেড়ে চলে এলি আর বাড়িমুখো হলি না। মা কেমন আছে একবারও খোঁজ নিতে পারলি না , অথচ দিব্যি সিনেমা দেখে বেড়াচ্ছিস। বড়োলোক শ্বশুরবাড়ি পেয়ে সব ভুলে গেলি ?
তার কথায় প্রচন্ড রেগে যায় দাদা। স্থান কাল ভুলে গলার স্বর চড়িয়ে বলে, বড়োলোক শ্বশুরবাড়ি পেয়েছি বলে তো তোরা হিংসায় জ্বলেপুড়ে মরছিস। আমি না হয় নিজের বিয়ে করা বৌকে নিয়ে সিনেমা দেখে বেড়াচ্ছি, তুই কি করছিস ? নাগরের সঙ্গে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছিস , সেটা বুঝি কিছু নয়? লজ্জা করে না তোর ?
দাদার কথা শুনে বেশ কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে যায় অঞ্জলি। কিছুটা সামলে ওঠার পর বলে, দাদা একদিন তোর ভুল ভাঙবে। বুঝবি বাবা-মায়ের থেকে আপন কেউ হয় না। সেদিন তোকে তাদের কাছেই ফিরতে হবে। এবারে দাঁত মুখ খিচিয়ে ওঠে দাদা — যা, যা তোর মতো ছেনাল মাগীকে আর জ্ঞান দিতে হবে না। কানের ভিতর দিয়ে দাদার কথাগুলো যেন গরম সিসার মতো ঢুকে যায়। হৃদয়দা দাদাকে কিছু বলতে যাচ্ছিল , সে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে বলে, চলো চলো আর এক মুহূর্তও এখানে নয়। আসার সময় পুরো রাস্তা সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে। হৃদয়দা তাকে নানা ভাবে স্বান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে কোন কথা বলতে পারে না। কান্নায় তার ঠোট তির তির করে কাঁপতে থাকে। বাড়ির দোরগোড়ায় নেমে সে কোন রকমে বলতে পারে — নিজের দাদা হয়ে এমন কথা বলতে পারল ? একবারও জানতে চাইল না তারা কি করতে ওখানে গিয়েছে।
হৃদয়দা বলে, মন খারাপ কোর না। একদিন দেখবে তোমার দাদার ভুল ভেঙে যাবে। অনেক ধকল গিয়েছে, আজ বরং রেষ্ট নাও। আমি আসি।বলে চলে যায় হৃদয়দা। অঞ্জলি বোঝে তাকে একটু একা থাকার সুযোগ করে দিয়ে গেল হৃদয়। নিজের মনের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে মাঝেমধ্যে একা থাকাটাও জীবনের জন্য জরুরী।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।