তাই এঁটো হাতে থালার সামনে বসে বসে সে শুনতে থাকে হৃদয়দার বাইকের শব্দ। তাকে ওই অবস্থা বসে থাকতে দেখে দিদি টিপ্পনী কাটে — কি রে এঁটো হাতেই ধ্যানে বসে গেলি যে।উঠ, হাতটা ধুয়ে আয়।দিদির কথায় খুব লজ্জা পেয়ে যায় অঞ্জলি। সেটা চাপা দিতে সামনে পড়ে থাকা এঁটো-কাঁটা দ্রুত কুড়োতে কুড়োতে বলে — এই তো, সব গুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এক সময় বাইকের শব্দটা মিলিয়ে যায়। যতক্ষণ বাইকের শব্দটা পাচ্ছিল ততক্ষণ মনে হচ্ছিল হৃদয়দা যেন তার কাছাকাছি ই আছে। হৃদয়দার কথা মনে পড়তেই ফের তার হাত থেমে যায়। আর ফের দিদির চিৎকার — আবার কি হলো ? মায়ের স তোকেও তো দেখছি এবার মনের ডাক্তার দেখাতে হবে। বড়ো ভুলো মন হয়ে পড়েছিস তুই। ইঙ্গিতটা
আর বুঝতে বাকি থাকে না তার। দ্রুত বাসনগুলো নিয়ে উঠোনের একদিকে নামিয়ে রেখে হাত ধোয় সে। ঘরে আসতে আসতে ভাবে দিদি এক অর্থে ঠিকই বলেছে। সব সময় হৃদয়দার কথা ভাবতে ভাবতে সত্যিই কেমন ভুলো মন হয়ে গিয়েছে তার। কখনও ভাতের হাঁড়িতে জল ফুটতেই থাকে চাল দিতে ভুলে যায়।আবার কখনও তরকারিতে নুন দিতে ভুলে যায়, না হলে দুবার নুন দিয়ে দেয়।
তাই ঘরে ঢুকতেই তার বুক কেমন দুরু দুরু করছিল। হৃদয়দাকে নিয়ে দিদি কি বলবে ভেবে খুব ভয় হচ্ছিল তার। ঘরে যেতেই দেখে মা ঘুমিয়ে পড়েছে। দিদি এসেছে বলে মা আজ এ ঘরেই শুয়েছে। অন্যদিন সে আর ভাই শোয়। আজ ভাই বাবার কাছে ঘুমিয়েছে। সে আর দিদি পাশাপাশি শুয়ে সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করে কাটিয়েছিল। প্রথমদিকে মায়ের সালিশির সভার খবর না দেওয়ার জন্য দিদি খানিকটা রাগারাগি করে। সে দিদিকে বোঝায় , তার সবে বিয়ে হয়েছে। সেই অবস্থায় শ্বশুরবাড়িতে খবরটা দিলে তাকে খোঁটা শুনতে হত। তাছাড়া জামাইদার সামনে মায়ের হেনস্থা দেখতে তাদেরও খারাপ লাগত বলেই খবরটা দেয় নি।সবটা শোনার পর দিদি অবশ্য কিছুটা শান্ত হয়। কথায় কথায় আসে দাদার প্রসঙ্গও। দিদিকে পুরো বিষয়টি খুলে বলে অঞ্জলি। দিদি শুনে বলে , দাদাটা এত স্বার্থপর হয়ে গেল ? চুরির গল্প ফেঁদে শ্বশুরবাড়িতে বসে রইল। মায়ের বিপদের কথা একবারও মনে হল না ? ভাগ্যিস সেদিন হৃদয় সময় মতো পৌঁছেছিল।
অঞ্জলি বলে, আমি তো সব আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। হৃদয়দাকে দেখে ধড়ে প্রাণ আসে। হৃদয়দার প্রসঙ্গ এসে পড়ায় অস্বস্তি শুরু হয়ে যায় অঞ্জলির। দিদি কি তাকে চেপে ধরবে এবার ? প্রশ্নে প্রশ্নে তার পেটের কথা বের করে নেবে ? কি করবে সে দিদির কাছে সব স্বীকার করে নেবে , নাকি পুরোপুরি অস্বীকার করে যাবে ? খুব দোটনায় পড়ে অঞ্জলি। তখনই কথাটা তোলে দিদি। সরাসরি তার চোখে চোখ রেখে দিদি বলে, একটা সত্যি কথা বলত, হৃদয়ের সঙ্গে তোর কিসের সম্পর্ক ?
থতমত খেয়ে যায় সে। চেয়ে দেখে তখনও তার মুখের একদৃষ্টে চেয়ে আছে দিদি। ঘরের টিমটিমে লন্ঠনেও দিদির চোখ দুটো তীব্র সার্চলাইটের মতো লাগে। মনে হয় তার মনের ভিতরটাও যেন পড়ে ফেলবে।তবু দিদির মনোভাবটা বোঝার জন্য সে বলে, কেন তোর কি মনে হয় ?
—– আবার চালাকি, পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ধান্ধা ?
—– মানে ?
—- মানেটা হল এই যে , তোমাদের দুজনের মরন পাখা গজিয়ে তাই তো ?
সে মাথা নাড়িয়ে স্বীকার করে নেয় দিদির কথা। কিন্তু দিদি মরণ পাখা গজানোর কথা বলল কেন ? তার মনের ভাব লক্ষ্য করে দিদি বলে, দেখ কথাটা আমি কিছু ভেবে বলিনি। আসলে তোদের এই মেলামেশার পরিনতি তো ভাল হওয়ার কথা নয়। সেদিনও বলেছি আজও বলছি। প্রচুর বাধা বিপত্তি আসবে দুই পক্ষের সমাজ থেকে। তবে বাবা মোড়ল হলে অবশ্য আমাদের সমাজের বাধাটা অনেকটা আটকে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে হৃদয়কে তাদের সমাজের বাধাকে অগ্রাহ্য করে এগিয়ে আসতে হবে। ওর সংগে কথা বলে যতটা বুঝেছি ও তোকে ভালোবাসে। নাহলে দুর্দিনের সময় যেখানে নিজের দাদাই মুখ ঘুরিয়ে চলে গেল সেখানে তার বন্ধুরও পাশে দাঁড়ানোর কথা নয়।কিন্তু সেই ভালোবাসা সব বাঁধা অগ্রাহ্য করতে পারবে কি না সেটাই ভাবার বিষয়।
কথায় কথায় রাত বেড়ে চলে। দিদির মনের ভাব বুঝতে পেরে স্বস্তি পায় অঞ্জলি। কিছুটা হলেও দিদি যে হৃদয়দাকে ভরসা করার যোগ্য মনে করে সেটা বুঝতে আর তার বাকি থাকে না। তার প্রমাণ মেলে দিদির কথাতেই। দিদি বলে, কাল খুব সকালে হৃদয়কে বাইক নিয়ে আসতে বলেছি। মাকে একবার লাভপুরে বিশু ডাক্তারের কাছে দেখিয়ে আনব। কথা শুনেই আনন্দ নেচে ওঠে অঞ্জলির মন। সকালেই হৃদয়দার সঙ্গে দেখা হবে, মায়ের ডাক্তার দেখানো হবে ভেবে খুব ভালো লাগে।
রাত বাড়তে থাকে তবু দু’বোনের চোখে ঘুম নেই। বাবার মোড়ল হওয়া নিয়েও উত্তেজনায় তাদের ঘুম আসে না । মোড়ল হলেও বাবাকে তারা কিছুতেই কথায় কথায় সালিশি সভা ডেকে জরিমানা করতে দেবে না। তাতে প্রয়োজন হলে বাবাকে মোড়ল পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করবে তারা। নিজেদের অভিজ্ঞতাতে তো তারা দেখেছে , কি অমানবিক ওই প্রথা। কথায় কথায় রাত ভোর হয়ে যায়। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে দু’বোন। একটু পরেই হৃদয়দা চলে আসবে। তাড়াতাড়ি সবার জন্য কিছু জলখাবার তৈরি করে দিতে হবে। কাল দিদি কিছু ময়দা, চাল, ডাল আর তরিতরকারি এনেছে। তাই দিয়েই ডাল-রুটি করে নেবে। তারপরে আছে ভাতের ঝামেলা। ভাতটাও তাড়াতাড়ি রান্না করে নিতে হবে আজ। খাওয়া — দাওয়ার পর বাবাকে নিয়ে মোড়ল নির্বাচনের জন্য অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে যেতে হবে। মোড়ল নির্বাচন নিয়ে ভিতরে ভিতরে একটা উত্তেজনা অনুভর করে সে। কি হবে , না হবে তা নিয়ে চরম মানসিক টানাপোড়েন হয় তার। বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্বস্তি পাবে না।
জলখাবার হতে না হতেই বাইক নিয়ে এসে পড়ে হৃদয়দা। খাওয়া দাওয়ার পর হৃদয়দা আগে বাইরে গিয়ে বাইকে চেপে বসে। আর মা’কে নিয়ে সেদিকে এগিয়ে যায় দিদি। সেই সময় অঞ্জলি বলে , হৃদয়দা আজ কি দুপুরে এখানেই খাবে ? তাহলে সেই মতো চাল নিতে হবে।
—— ও , আবার এখানে খেয়ে কি করবে ? সঙ্গে তো বাইক আছে , দিব্যি ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি চলে যেতে পারবে।
— না , মানে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরতে কত দেরি হবে তার তো কোন ঠিক নেই , তাই বলছিলাম — -।
—- বুঝেছি বুঝেছি আর বলতে হবে না তোকে। একজন তেতে পুড়ে এসে না খেয়ে বাড়ি চলে গেলে আর একজনের যে গলা দিয়ে ভাত নামবে না।
— মানে ?
— মানে তার সোহাগের হৃদয়দা না খেলে আমার বোনটিরও আর খাওয়া হবে না , তা আমি ভালোই জানি। কিন্তু তোকে চিন্তা করতে হবে না। তোর দিদির সে বিবেচনা বোধটুকু আছে। যা বলার আমিই বলে দেব। অঞ্জলি বোঝে এতক্ষণ দিদি তার সঙ্গে মজা করছিল। লজ্জা পেয়ে সে বলে, তুই না।
—- আহা, আর রাগ দেখাতে হবে না তোকে। মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে মনে তো আর আনন্দ ধরছে না।
— কি যে বলিস না তুই !
—- আমি যা বলি ঠিকই বলি। প্রথমদিন তোমার মুখ দেখে যা বলেছিলাম তা মিলল তো ?
কথা বলতে বলতেই মাকে নিয়ে মোটরবাইকে উঠে বসে দিদি। ওরা বেড়িয়ে যেতেই রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। আজ একটু জমিয়ে রাঁধতে হবে। হৃদয়দাকে দেখিয়ে দিতে হবে তার রান্নার হাত। সেদিন তো হৃদয়দার খাওয়ার ঠিক ছিল না। তাই শুধু মাঝের ঝাল করেছিল। আজ ডিমের ঝোলের সঙ্গে আর একটা তরকারি অন্তত করতে হবে। মনটা কেমন ফুরফুরে লাগে। রান্না করতে করতে গুনগুন করে গান করে। দুপুরের মধ্যেই মাকে ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে আসে ওরা। দিদি বলে, সব পরে বলছি। আগে তুই হৃদয়কে খেতে দিয়ে দে। ওকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। যে বন্ধুর মোটরবাইক নিয়ে এসেছে সে শ্বশুরবাড়ি যাবে। তাই বাইক ফেরতে দিতে হবে। শুনেই মনটা খারাপ হয়ে যায় অঞ্জলির। সে ভেবেছিল বিকেলের মিটিং পর্যন্ত থাকবে হৃদয়দা। এত তাড়াতাড়ি তাকে ছেড়ে দিতে কিছুতেই তার মন চায় না। কিন্তু উপায় ও তো কিছু নেই। চ্যাটাই পেতে পরিপাটি করে হৃদয়দাকে খেতে দেয় সে। খেতে খেতে হৃদয়দার চোখ মুখে ফুটে ওঠে পরিতৃপ্তির ছাপ। তা দেখেই সে সাহস করে জিজ্ঞাসা করে — কেমন হয়েছে সব খেতে ?
হৃদয়দা টিভির নায়ক নায়িকাদের মতো এঁটো হাতেই আঙুলে রিঙ করে বলে , অসম , একদম ফাস্টো কেলাস।