মুড়িমুড়কি -তে অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়

অনুবাদ সংস্কৃতি ১ 

আমাদের কৃষিপ্রধান জেলার ছিমছাম সদর শহরটি কলকাতা থেকে মাত্রই ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত ছিল। সে শহরে  নামী-অনামী অনেকগুলি বিদ্যালয় ছিল যেখানে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত্য পড়াশুনা হয়, কলেজ ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, একটা মেডিকাল কলেজ পর্যন্ত্য ছিল।
সঙ্গীত মহাবিদ্যালয় ছিল, শীতকালে ডালিয়ার প্রদর্শনী ছিল, ছিল সারা রাতের সঙ্গীতানুষ্ঠান, চিত্রপ্রদর্শনী। ছিলেন কিছু প্রবাদপ্রতিম শিক্ষক, যাঁরা ইস্কুল কলেজের প্রথাবদ্ধ পড়াশুনোর বাইরের জগৎটাকে স্পর্শ করবার স্বপ্ন উস্কে দিতে পারতেন কিশোর মনে, তা সে বিজ্ঞানের দিকেই হোক কি সাহিত্যের, শিল্পের কি সঙ্গীতের।
বলতে পারেন ছিল বলছি কেন? এখন কি নেই? নিশ্চয় আছে। কিন্তু এই ফালতু হ্যাজ তা নিয়ে নয়। যা যা সব ছিল, তার সঙ্গে শহরবাসীর একটা প্রিয় আক্ষেপ ছিল…উপরোক্ত যেকোন বিষয়ে হতাশার কারণ ঘটলেই, সঘন মাথা নাড়ার সাথে শ্বাস পড়তো, এখানে একমাত্র কালচার হল এগ্রিকালচার।
এখন, এগ্রিকালচারের দিক দিয়ে খানিকটা নিশ্চিন্ত না হলে যে কালচার রক্ষা করা মুশকিল হয়ে পড়ে এই কথাটা তাঁরা জেনেও অজানার অশান্তিতে ক্লিষ্ট হতেন কিনা আজ আর জানার উপায় নেই। যেমন আজও কেউ সেরকম আক্ষেপ করে থাকেন কিনা সেটাও আমার অজ্ঞাত।
যা হোক শিবের গীত ছেড়ে ধান ভাঙায় প্রত্যাবর্তন করি। শহরবাসীর একটা উৎকন্ঠা সর্বদা পীড়া দিত মনে হয়, এই বুঝি কলকাতা থেকে দূরে থাকার দরুন কালচারালি কিছু ফস্কে গেল নসীবের লেখনে।
আমাদের ইশকুলেও এর প্রভাব পড়তো বিস্তর। যেমন একবার আমাদের ইশকুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণ উৎসবে একটি ছাত্র সাড়া ফেলে দিল সংস্কৃত ভাষায় রবীন্দ্রগানের একটি তর্জমা গেয়ে। আগ্নেয় স্পর্শমণি যোজয় প্রাণে। সারা ইশকুলে একদম হৈ হৈ পড়ে গেল। রবীন্দ্রসঙ্গীত, তাও আবার সংস্কৃতে! আমাদের ক্লাসে (ক্লাস সেভেন মনে হয়) একজন ফিসফিস করে জানালো, রবীন্দ্রনাথই নাকি গানগুলো আগে সংস্কৃতয় লিখে তারপর বাংলা অনুবাদ বাজারে ছেড়েছেন। তারপর থেকে রোজ একটি দুটি করে সংস্কৃত রবীন্দ্রগান আবিষ্কৃত হতে থাকলো। পকেটে গানের কথা লেখা কাগজ নিয়ে টিফিনের অবকাশে সঙ্গীতশিক্ষক প্রবীণ ক বাবু ও বাংলা-ইতিহাসের তরুণ শিক্ষক খ বাবুর কাছে লজ্জিত-কুণ্ঠিত মুখে কেউ না কেউ হানা দেয়, আগামি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তারা তর্জমা গাইতে চায়। তব পূজাছলেনাহং বিস্মরামি ত্বম্। কিম্ ইদম্ মায়া, গোপয়সি…। যাই হোক, যেমন হোক।
ততদিনে সংস্কৃতের দিকপাল পণ্ডিত মিশ্র স্যার রিটায়ার করেছেন। ক বাবু বড্ড বিপদে পড়ে যেতে লাগলেন। অন্ততঃ সংস্কৃতটা ঠিক আছে তো? তাছাড়া সোজাসাপটা বাংলায় সম্মেলক রবীন্দ্রগানে প্রায় কারো আর আগ্রহ নেই…সংস্কৃত তর্জমা গাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা।
জীবনে প্রথম ক বাবু ছাত্রদের এগিয়ে আসতে দেখলে বিব্রত বোধ করতে থাকলেন। ওই আসে দুটি ছোঁড়া, হেঁটে গুটিগুটি, তর্জমা গাবে বুঝি এইবারে উঠি।
বাংলা ছাড়া আর অন্য কোন ভাষায় গাইতে না পারার আক্ষেপে আমরা মরমে মরে রইলাম বেশ কয়েক মাস।
প্রায় সব ক্লাসেই বিধিনির্দিষ্ট একজন পাগলা দাশু থাকে। রায়মশায়ের আমল থেকে এ হয়ে আসছে। আমাদের ক্লাসেও ছিল। নাম করলে যদি ফৌজদারী মামলা হয়, তাই ওদিকে যাচ্ছি না। দেখেশুনে তার কি মনে হল, একদিন সে গিয়ে সোজা ক বাবুকে বলল, স্যার আমিও তর্জমা গাইবো। হিন্দিতে। বলা ভাল তখনো পর্যন্ত্য দাউলাল কোঠারী বা জলজ ভাদুড়ির নাম পর্যন্ত্য আমরা শুনিনি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের হিন্দি তর্জমাও না।
তাছাড়া তখনও ইতিহাসে ভারতীয় সংবিধান পড়ানো হয়নি আমাদের। অষ্টম তপশীল ইত্যাদি কিছুই জানতাম না। আমরা ভাবলাম দেবভাষায় হয়েছে, কাজেই রাষ্ট্রভাষায় হলেই বা আপত্তি কী!
ক বাবু ডাকিনী-করে হারমোনিয়াম-শিশু সমর্পণপূর্বক নিরুপায়ের মত বললেন, আচ্ছা, তবে একটিবার গেয়ে শোনাও।
আমাদের দাশু কিছুক্ষণ জন্তরে প্যাঁ প্যাঁ করে, উদাত্ত গলায় একটা হাঁকার দিল, মেরা শির পটক দেনা তেরি টেংরি পর…আমরা ৩০২ ধারার আসামীর মত মুখ করে বসে সেই অমৃতবর্ষী সঙ্গীত আস্বাদন করতে লাগলাম।
আজন্ম সঙ্গীতে নিমগ্ন স্যারের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল, বেরোও , বেরোও, এক্ষুনি দূর হও আমার সামনে থেকে। আজ থেকে কোনো ইয়ে আমার সামনে তর্জমা গাইবে না।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।