সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ২৮)

সালিশির রায়

কিস্তি – ২৮

তাই তার হিসাবটা কিছুতেই মেলে না। কেমন যেন সব গুলিয়ে যায়। খুব টেনশন হয় তার। মনে হয় যেন সঙ্গে সঙ্গে ফল ঘোষণা হয়ে গেলেই ভালো হত। কিন্তু তা তো আর হওয়ার নয়। ফল ঘোষণা হতে হতে সেই মঙ্গলবার। এখনও তিনদিন বাকি। ভোটের পর থেকেই পাড়ার পরিবেশটা কেমন যেন থমথমে হয়ে আছে। যেন কোন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে। পাড়ার লোকেরাও হঠাৎ করে তাদের আবার এড়িয়ে চলতে শুরু করেছ কেন কে জানে ? হিতে বিপরীত হতে পারে বলে সে’ও আগ বাড়িয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারছে না। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শোভনদের জামিন হয় নি। তাদের জামিনের জন্য সুহাসবাবুদের দল নাকি খুব তদ্বির করছে। শোভনরা জামিন তো একদিন পাবেই। তারপর কি যে হবে কে জানে! রামবাবুরা এটা না করলেই পারতেন।শোভনদের সে ভালো মনে করনা ঠিকই কিন্তু বিনা দোষে জেল খাটাটাও তার ভালো লাগে না। অপরাধী সাজা পাক ঠিক আছে , কিন্তু বিনা অপরাধে কাউকে ফাঁসানোটা অন্যায়। এতে তো মানুষে মানুষে বিভেদ আরও বেড়ে যায়। পাড়ায় মিলেমিশে থাকার পরিবেশটা তো কবেই হারিয়ে গিয়েছে , এরপর পাড়ায় বাস করাটাও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।
রামবাবুরা অবশ্য ভাদুকে দিয়ে বোমাবাজি করানোর ঘটনাকে গর্হিত কাজ বলে মনেই করেন না। সেদিনই সে ওদের বলতে শুনেছে , ক্ষমতায় না থাকলে রাজনীতি হয় না। আর ক্ষমতায় থাকার জন্য এমন কোন কাজ নেই যা করা যায় না। কথাটা শুনে একটুও ভালো লাগে না অঞ্জলির। মনে মনে ভাবে , এই তাহলে রাজনৈতিক নেতাদের স্বরূপ। মুখের কথার সঙ্গে কাজের কোন মিল নেই। মানুষ নয় , গদিটাই আসল। অথচ মিটিং – মিছিলে এমনভাবে কথা বলেন মনে হয় যেন মানুষের জন্য সবাই নিবেদিত প্রাণ। অঞ্জলি ঠিক করে , ভোট গণনাটা হয়ে গেলেই বাবাকে আর সে রাজনীতি করতে দেবে না। মোড়ল পদ থেকেও সরে আসতে বলবে। শুধু শুধু শত্রুতা বাড়িয়ে লাভ কি ? প্রয়োজনে ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে তারা। চরম উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটে অঞ্জলিদের। মঙ্গলবার তা চরমে পৌছোয়। আগের দিনই সন্ধ্যেবেলায় রামবাবু এসে বাবাকে সকালসকাল পার্টি অফিসে যাওয়ার জন্য বলে যান। সেখান থেকে গাড়ি যাবে বোলপুরের গণনাকেন্দ্রে। বাবার গণনাকেন্দ্রে যাওয়াটা অঞ্জলির মনোঃপুত ছিল না।কিন্তু বাড়িতে থাকলে বাবা সারাক্ষণ দুঃশ্চিন্তায় সারা হবে ভেবে আর না করে নি সে।
বাড়িতে বসে ভোটের ফল জানার ও তো উপায় নেই। পাড়ায় একমাত্র সনাতনদের বাড়িতেই একটা রেডিও আছে। কিন্তু সেখানে তো আর যাওয়া চলবে না। বাবা না ফেরা পর্যন্ত ফলও জানা যাবে না। আর ততক্ষণ তারও দুঃচিন্তায় কাটবে। তাই বাবাকে বলে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে আসবে। সম্মতি জানিয়ে বাবা পার্টি অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়ে। আর তার চাপা উদ্বেগ শুরু হয়ে যায়। কোন কাজে মন লাগে না। বাড়ি থেকেই টের পায় সনাতনের বাড়িতে পাড়ার বেশ কিছু লোক রেডিও’র সামনে ভীড় জমিয়েছে।আচমকা সনাতনের বাড়ির কাছে উল্লাসের শব্দ শুনে চমকে যায় সে। তখন দুপুর গড়িয়ে গিয়েছে। মা ‘কে খাইয়ে দিয়ে নিজে খাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছিল। ঠিক সেই সময়সনাতনের বাড়ির সামনে উপস্থিত লোকেরা কলরব করে ওঠে। বোম-পটকা ফাটতে শুরু করে।পাড়ার অন্যান্য লোকেরাও ছুটে যায় সেদিকে।কি ঘটেছে তা আন্দাজ করতে অসুবিধা হয় না তার। ভোটের ফল নিজেদের পক্ষে না হলে সনাতনের বাড়িতে ওই উল্লাস হত না। আর পাড়ার লোকেরাও তার বাড়ির দিকে ছুটত না। এবার তো সবাই সনাতনের দলে নাম লেখাবে।এটাই তো প্রচলিত রীতি। তার খাওয়া শিকেয় ওঠে। সে বাবার ফেরার প্রতীক্ষায় ঠায় দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত নামে। বাবা আর ফেরে না।
কিন্তু একসময় সনাতনের বাড়ির সামনে এসে থামে একটা গাড়ি। তার কিছুক্ষণ পরেই বেজে ওঠে ধামসা-মাদল। মুড়ি- মুড়কির মতো বোম পটকা ফুটতে শুরু করে। শুরু হয়ে যায় চিৎকার করে আবির খেলাও। মদের বন্যা বয়ে যায়। তারপর অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি সহ নাচ আর তার বাবার নাম ধরে অশ্রাব্য গালিগালাজ। আস্তে আস্তে হই হট্টগোলটা তাদের বাড়ির দিকে আসতে থাকে। সে খুব ভয় পেয়ে যায়।দরজাটাও বন্ধ করতে পারে না। বাবা যদি এই সময়ে ফিরে এসে দরজা খোলা না পায়, যদি ওই হট্টগোলের মাঝে পড়ে যায় তাহলে কি হবে ভেবে পায় না অঞ্জলি। তাই সে দাঁতে দাঁত চেপে দরজায় পিঠ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।মনে মনে মারাং বুরুর স্মরণ নেয়। মারাংবুরুকে বলে , এ সময় বাবা যেন না ফেরে তা তুমি দেখো। একসময় হট্টগোলটা তাদের দোরগোড়ায় পৌঁচ্ছে যায়। শুরু হয়ে যায় তাদের বাড়ি ঘিরে নাচ–গান। বয়ে যায় খিস্তি খেউরের বন্যা। মাঝে মধ্যে দুম দাম করে দরজায় লাথিও পড়তে থাকে। সে নিশ্বাস বন্ধ করে সামনের খুঁটিতে পা দিয়ে দরজায় পিঠ লাগিয়ে মারাংবুরুর নাম জপ করতে থাকে। মারাংবুরুর কানে বোধ হয় সেদিন তার প্রার্থনা পৌঁছোয়। কারণ আকণ্ঠ মদ খেয়ে অধিকাংশই কিছুক্ষণের মধ্যে বেসামাল হয়ে বাড়ির পথ ধরে। হাফ ছেড়ে বাঁচে সে। বাবার জন্য আরও কিছুক্ষণ ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর দরজায় খিল দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢোকে। ভয়ে তখনও তার বুক ঢিপ ঢিপ করছিল।পাশের ঘরে চেয়ে দেখে ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসেছে মা।চোখে মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।তার দিকে চেয়ে খুব ক্ষীণ স্বরে বলে , বাইরে অত গন্ডগোল কিসের ? তোর বাবা এখনও ফিরল না কেন রে ?
এই আশঙ্কাটাই সে করছিল। সত্যিটা তো বলা যাবে না , তাহলেই মায়ের আবার মানসিক চাপ বেড়ে যাবে। তাই সে মাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলে , বাবা তো বলেই গিয়েছিল কাল সকালে ফিরবে। আর ওরা জিতেছে বলে রাস্তায় রাস্তায় নাচ গান করছিল।
—- ওরা জিতে গেল ?
মায়ের গলাতেও উদ্বেগ চাপা থাকে না। সে বলে তোমাকে ও নিয়ে ভাবতে হবে না। অনেক রাত হয়েছে। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি তুমি ঘুমাও তো।
মিথ্যা সান্ত্বনায় আশ্বস্ত হয়ে মা কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। দুঃশ্চিন্তায় সে দু চোখের পাতা এক করতে পারে না।কি হবে এরপর কে জানে ? এ সময় কারও সঙ্গে যুক্তি পরামর্শ করতে পারলে মনটা একটু শান্ত হত। কিন্তু যুক্তি পরমর্শ করার মতো তো একমাত্র হৃদয়দা ছাড়া কেউ নেই। কে জানে এরপর হৃদয়দার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা পাড়ার লোক কেমন ভাবে নেবে। ভালো চোখে যে দেখবে না তার আভাস তো শোভন — অশোকদের কথাতেই পেয়ে গিয়েছে সে। কিন্তু তার জন্য কত নীচে নামবে ওরা ? হৃদয়দাকে কিছু করবে না তো ? পাড়ার লোকের সদিচ্ছার উপর তার একটুও ভরসা নেই। জরিমানা আদায়ের জন্য ওরা সব করতে পারে। বিশেষ করে ভিন্ন সম্প্রদায়ের ছেলের সঙ্গে তাদের সম্প্রদায়ের মেয়ের ঘনিষ্ঠতা বরদাস্ত করে না আদিবাসী সমাজ। এর আগে ওই কারণে কত জনের যে প্রাণ সংশয় হয়েছে তার ঠিক নেই।হৃদয়দাকে একটু সাবধানে চলা ফেরা করতে বলতে হবে। শয়তান দুটোকে বিশ্বাস নেই ,জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তার কাছে চড় থাপ্পড় খাওয়ার শোধ ওরা হৃদয়দার উপর তুলতে পারে। ভাবনার মাঝে অঞ্জলি শুনতে পায় কে যেন পিছনের দরজায় খুব সন্তর্পণে টোকা মারছে।ভোর হয়ে আসছে , এ সময় কে এলো আবার? শয়তান দুটো তো জেলে।পাড়ার অন্য কেউ কুমতলবে হাজির হলো না তো ? সে বঁটিটা হাতে তুলে নেয়। ঠিক সেই সময় দরজার বাইরে থেকে বাবার ক্ষীণ স্বর ভেসে আসে — অঞ্জু দরজা খোল। দরজা খুলে সে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্ত বিধ্বস্ত বাবা।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।