সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩৫)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৩৫

তাই পুলিশ তার বাবার নিখোঁজ ডায়েরি নিলেও যে তা ধামাচাপাই পড়ে থাকত, তা ওই দোকানদারের কাছে না গেলে জানতেও পারত না। তাকে পৌঁছে দিয়ে হৃদয়দা চলে যেতেই মা আর দিদি এগিয়ে আসে তার কাছে। মা আর দিদির চোখ মুখ দেখেই বোঝা যায় তাদের ফেরার অপেক্ষাতেই দু’জন উন্মুখ হয়েছিল। কিন্তু মায়ের সামনে তো আসল কথা বলা যাবে না। দিদিকে সে চোখ টিপে ইশারায় সেটাই বুঝিয়ে দেয়। তারপর বলে, তিন জায়গাতেই ডায়রি লেখানো হয়েছে। ওরা বলল, খুব তাড়াতাড়ি বাবাকে খুঁজে বের করে ফেলবে। শুনে মা যেন কিছুটা আশ্বস্ত হয়। কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে, তাই যেন হয় মারাংবুরু, তাই যেন হয়। মায়ের দেখাদেখি তারাও দু’বোন কপালে হাত ছোঁওয়ায়। খাওয়া দাওয়ার পর মা ভিতরে যেতেই আসল ব্যাপারটা দিদিকে খুলে বলে অঞ্জলি। শুনে দিদির চোখে মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে। বলে , তাহলে কি হবে রে ? বাবাকে কি আমরা আর কোনদিনই খুঁজে পাব না?
অঞ্জলি বলে , থানার সামনে এক চায়ের দোকানদার বলল ডাইরি করে ও কোন লাভ হবে না। তাই ওর কথা শুনে খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দিয়ে এলাম।
— দিদি বলে তাহলে তো ভাল কাজই করেছিস। মনে হয় কেউ না কেউ কাগজ পড়ে বাবার খবর দেবে।
একবুক হতাশার মধ্যেই খবরের কাগজের ওই বিজ্ঞাপনটাই আশার আলো জ্বালিয়ে রাখে।শুয়ে শুয়ে দুই বোন অনেক রাত্রি পর্যন্ত সুখ দুঃখের গল্প করে। সকালেই দিদি চলে যাব।হৃদয়দা পৌঁছে দিয়ে আসবে ।তারপরে কি করে যে দিনগুলো কাটবে তা ভেবে পায় না অঞ্জলি। এতদিন বাবার ফেরার আশায় দিন গুলো কেটে গিয়েছে। সেই আশাটাই তো হারিয়ে গেল। দিদি বলে, শোন আমি মাঝে মধ্যে কিছু টাকা আর চাল-ডাল হৃদয় বা কারও হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেব। যতদিন বাবার খোঁজ না মেলে ততদিন ওই ভাবে কোনরকমে চালিয়ে নে।
—- না না, তোকে ওভাবে কিছু পাঠাতে হবে না। তোর শ্বশুর-শাশুড়ি আছে। শেষে তোর বাড়িতে অশান্তি শুরু হয়ে যাবে।
—- তাহলে তোদের চলবে কি করে ?
—- ভাবছি পড়াশোনাটা এবার ছেড়ে দিয়ে মজুর খাটতে শুরু করব।
—- কি বলছিস তুই ? এত কষ্ট করে পড়াশোনা করে শেষে ছেড়ে দিবি ?
—- তা ছাড়া উপায়ই বা কি বল। বাবার কবে খোঁজ পাব তার তো কোন ঠিক নেই। তুই আর হৃদয়দা কত টানবি ? ভাইয়ের যতদিন কিছু একটা না হয় ততদিন মজুর খেটেই চালিয়ে নেব।
সেদিন আর কথা এগোয় না। মুখে যত সহজে সে পড়া ছাড়ার কথা বলতে পারল, ছাড়াটা অত সহজ হবে না। নাড়ী ছেঁড়ার যন্ত্রণা পাবে সে। বিশেষত কি করে সে অরুণস্যারের মুখোমুখি হবে তা ভেবে পায় না। অরুণস্যার সব সময় তাকে পড়াশোনার জন্য উৎসাহ যোগান। বই-খাতা কিনে দেন। বিনা বেতনে পড়ান। সব সময় বলেন, সরকার তোমাদের পড়াশোনার জন্য বই, জামা প্যাণ্ট, জুতো , সাইকেল থেকে খাবারের ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দিয়েছেন। তাই সে সুযোগটাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হবে।
কিন্তু অরুণস্যার তো আর জানেন না তাদের মতো পরিবারের ছেলেমেয়েদের শুধু পড়ার দায়িত্ব নিলেই পড়া হয় না , কারণ শৈবব থেকেই যে তাদের অশক্ত ঘাড়েই পরিবারের কিছু দায়িত্ব চেপে যায়। এ কথা অরুণস্যারকে সে বলতেও পারবে না। তাহলে হয়তো তিনি মায়ের জন্য সাহার্য্য করতে চাইবেন। সেটা তার পক্ষে খুব অস্বস্তির ব্যাপার হবে। তার চেয়ে যতদিন পারে অরুণস্যারকে একটু এড়িয়ে চলার চেষ্টা করবে সে। তারপর বাৎসরিক পরীক্ষাটা পার করে দিতে পারলেই হলো। তখন বরং বলা যাবে পরীক্ষাই দেওয়া হলো না, আর পড়াশোনা করে কি হবে ? সেই এক বছর পিছিয়ে যেতে হবে। এক সময় দিদির মতো সে’ও ঘুমিয়ে পড়ে। সকালেই হৃদয়দার সঙ্গে দিদি শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। সে আর মা তাকে এগিয়ে দেয়। যাওয়ার আগে দিদি তার পিঠে হাত রেখে বলে, চিন্তা করিস না। আমি এখন থেকে মাঝে মধ্যেই আসব। তুইও যে কোন প্রয়োজনে হৃদয়কে দিয়ে বলে পাঠাবি বল। তার কাছে কথা আদায় করে মোটর বাইকে গিয়ে ওঠে দিদি। বিকালের দিকেই দিদিকে পৌঁচ্ছে দিয়ে ফিরে আসে হৃদয়দা। আসার সময় সেদিনের খবরের কাগজটা কিনে আনে হৃদয়দা। ভিতরের পাতা খুলে দেখে হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশ কলমে বাবার ছবি সহ ছাপা হয়েছে বিজ্ঞাপনটা। দেখতে দেখতেই কান্নায় তার দুচোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। হৃদয়দা তাকে স্বান্ত্বনা দিয়ে বলে, কেঁদ না আমার মন বলছে দেখ একদিন না একদিন ভালো খবর আসবেই। সে একটু শান্ত হতেই হৃদয়দা দিদির বাড়ি থেকে আনা একটা থলে তুলে দেয় তার হাতে। অঞ্জলি দেখে বারণ করা স্বত্ত্বেও দিদি হৃদয়দার হাত দিয়ে থলেতে চাল – ডাল আর কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। তখন দিদিকে ওসব পাঠাতে বারণ করেছিল বটে, কিন্তু জিনিসগুলো দেখে কিছুটা স্বস্তি ফেরে মনে।
কারণ দিন মজুরী করব বললেই তো সঙ্গে সঙ্গেই কাজ পেয়ে যাবে সেই নিশ্চয়তা নেই। এলাকায় কাজ না পেয়ে বর্ধমানে যেতে হয়েছিল বলেই তো আজ বাবাকে হারিয়ে যেতে হল। তাছাড়া এলাকায় সেই কাজই বা কোথাই ? সব মিলিয়ে বছরে চাষের কাজ মেলে মেরে-কেটে তিনমাস। এখন অবশ্য বছরে ১০০ দিন কাজের সরকারি প্রকল্প শুরু হয়েছে। কিন্তু নামেই ১০০ দিন , আসলে সাকুল্যে বছরে কাজ মেলে ২০/২৫ দিন। তাও বেতন মেলে ৯ মাসে ৬ মাসে। কখনও কখনও আবার পার্টির চাঁদা, মিটিং- মিছিলের জন্য ওই বেতন থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। এজন্য জবকার্ড, পাশবই এবং টাকা তোলার ফর্মে টিপছাপ নিয়ে নিজেদের কাছে আটকে রাখে পার্টির নিচুস্তরের নেতারা। তারপর নিজেরাই ব্যাংক কিম্বা পোষ্ট অফিস থেকে টাকা তুলে নিজেদের চাহিদা মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে তাই তুলে দেয় মজুরদের হাতে। তাই অধিকাংশই ওই কাজে ভরসা হারিয়ে ফেলেছেন। তারা নিজেদের এলাকায় চাষের কাজ শেষ হয়ে গেলে দল বেঁধে ধান পোঁতা, কাটা কিম্বা আলু তোলার মরসুমে বর্ধমান, হুগলি প্রভৃতি জায়গায় পাড়ি জমায়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় এলাকার চেয়ে বেতনও কিছুটা বেশি মেলে। কিন্তু সে কি করবে ? একে মায়ের ওই অবস্থা, তার উপরে একা সে কি করে বাইরে কাজ করতে যাবে ? কথাটা পাড়তেই সরাসরি নাকোচ করে দেয় হৃদয়দা। কিছুটা অভিমানহত গলায় বলে, আমি থাকতে তুমি মজুর খাটতে যাবে ?
—- দেখ, আমাদের সমাজে মেয়েদের বসে বসে খাওয়ার চল নেই। তারপর আমি একা হলেও কথা ছিল না। কিন্তু মা-ভাইয়ের দায় আমি তোমার উপর চাপাতে পারব না। যেদিন তোমার ঘরে যাব, সেদিন না হয় তুমি আমায় পায়ের উপর পা তুলে খাওয়ার ব্যবস্থা কোর। কিন্তু লক্ষীটি, এখন এ নিয়ে আর জোর কোর না।
অগত্যা নিমরাজি হতে হয় হৃদয়দাকে। তবে ঠিক হয় মজুর যখন খাটতেই হবে তখন হৃদয়দার সঙ্গেই তাকে তা খাটতে হবে। হৃদয়দাই প্রতিদিন সকালে তাকে সাইকেলে চাপিয়ে কাজের জায়গা নিয়ে যাবে। আবার সন্ধ্যের আগে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে যাবে। ওই প্রস্তাবে মনে মনে খুব খুশীই হয় অঞ্জলি। দিব্যি কাজ করাও হবে , আবার হৃদয়দার সঙ্গলাভও হবে। তাছাড়া কোথাই সে কাজের খোঁজে যেত ? সবাই তো কাজ দেওয়ার অছিলায় অন্য রকম সুযোগ নেওয়ার জন্য মুখিয়েই রয়েছে। খেটে খাওয়া মেয়েদের নানাভাবে ব্যবহৃত হওয়ার কথা সে শুনেছে। সেই হিসাবে হৃদয়দার ছত্রছায়া তাকে ওইসব উটকো উপদ্রব থেকে রক্ষা করবে। তাই সে বলে — বেশ আমি ওই প্রস্তাবেই রাজি।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।