সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩০)
সালিশির রায়
কিস্তি – ৩০
দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে দু’জন লোক। তাদের ঠিক চেনা যায় না। একে আধো অন্ধকার , তার উপরে দু’জনেরই মুখ গামছায় ঢাকা। অজানা আশঙ্কায় গা’টা যেন কেমন শিউরে ওঠে অঞ্জলির।আলো নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখারও সাহস হয় না। কিন্তু লোকদুটি এগিয়ে এসে বলে , ভয় নেই কো , আমরাই বটি। তখন ধরে যেন প্রাণ আসে তাদের। গলা শুনে বুঝতে পারে লক্ষণ জ্যাঠা আর ভক্তা কাকা। কাকাদের গলা শুনে এগিয়ে এসে বাবা বলে – আয় আয় বস সব। অঞ্জলি ভোটের সেই চা-চিনি আছে ? কর না একটু। ভোটের সময় টানা খেয়ে খেয়ে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে , মনটা কেমন ছোঁ-ছোঁ করছে।সে উঠে যাওয়ার উপক্রম করতেই ভক্তাকাকারা হাত নেড়ে বলে- না না, চা করার দরকার নেই। বসারও সময় নেই। সবার নজর এড়িয়ে গামছায় মুখ ঢেকে আসতে হয়েছে। ক’টা জরুরী কথা আছে বলেই আবার চলে যেতে হবে।ভক্তাকাকাদের কথা শুনে অবাক হয়ে যায় অঞ্জলি। তাদের বাড়ি আসতেও ওদের গামছায় মুখ ঢেকে আসতে হচ্ছে! ততক্ষণে ঠাকুর থানে হই-হট্টগোল শুরু হয়েছে।
বাবা তো ওসবের বিন্দু–বিষর্গ কিছু জানে না। তাই ভক্তাকাকাদের জিজ্ঞেস করে — কি হচ্ছে রে আজ ঠাকুরথানে ?
এই আশঙ্কাটাই সে মনে মনে করছিল। বিষয়টা শুনে বাবার উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে পারে ভেবে সে প্রসঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করতে না করতেই ভক্তাকাকা বলে ওঠে — কেন তুমি জানো না কিছু ?
— না তো , কেন কি জানব ?
—- আজ তো ওরা নতুন করে মোড়ল পরিষদ গঠন করছে। তোমার জায়গায় সনাতনকে মোড়ল করছে ওরা।
—- করলেই হোল , আমি এখনও মোড়ল আছি।আমাকে কিছু না জানিয়ে নতুন করে মোড়ল নির্বাচন আমি মানব না।
এবারে আসরে নামতে হয় অঞ্জলিকে। সে বলে, তোমার মানা না মানার উপরে আজ আর কিছু নির্ভর করে না।তাছাড়া ওরা তোমাকেও বলতে পাঠিয়েছিল। তুমি মাথা গরম করবে বলে আমি তোমাকে কিছু বলি নি।
তাকে সায় দিয়ে ভক্তাকাকারা বলে , ঠিকই বলেছে অঞ্জলি। মাথা গরম করে কিছু লাভ হবে না।পাড়ার সব লোক এখন ওদের দিকে। এমনকি হোপনাটাও ওদের দলে গিয়ে ভিড়েছে।
বাবা ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলে, বেইমান , বিশ্বাসঘাতক। তলায় তলায় এতদুর জল গড়িয়েছে। সনাতনকে আমি ছাড়ব না। তোরা আমার পাশে থাকিস তো। তারপর রামবাবুকে বলে ওদের কি করি দেখ।
— শোন শোন , মাথা গরম না করে চুপি চুপি যা বলতে এসেছি তা শোন।তোমাদের রামবাবুদের আর সেই দিন নেই। ওরা রামবাবুকেই আর পাড়ায় ঢুকতে দেবে না। সুহাসবাবু ওদের বলে দিয়েছে , পাড়ায় ঢুকলেই মেরে ঠ্যাঙ খোঁড়া করে দিবি তারপর যা হয় আমি দেখব।
—- এত দূর ?
—- তবে আর বলছি কি ? শুধু তাই নয় , আমাদেরও বলে দিয়েছে পাড়ায় থাকতে হলে সুহাসবাবুর পার্টিতে যোগ দিতে হবে। নাহলে ভিটেমাটি চাটি করে ছাড়বে।
—- করলেই হোল , মগের মুলুক পেয়েছে নাকি ? তা তোরা কি করব ঠিক করেছিস ?
—- কি করব দাদা, ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘর করি। পাড়া থেকে বের করে দিলে কিম্বা সালিশি বসিয়ে মোটা টাকা জরিমানা করলে তখন কোথাই যাব ?
— তোরাও শেষ পর্যন্ত গিয়ে ওদের দলে নাম লেখাবি ?
—- এ ছাড়া তো আর কোন গতি নেই। পারলে তুমিও আস্তে আস্তে চলে এসো। তোমাদের উপরে তো দেখলাম ওদের রাগ সব থেকে বেশি। সনাতনের ছেলে তো বলে বেড়াচ্ছে তোমাদের শায়েস্তা না করে ছাড়বে না। আর তাকে উসকাচ্ছে মোড়ল পাড়ার অশোক বলে ওই ছেলেটা।
— কিন্তু আমি ওদের কি ক্ষতি করেছি বুঝতে পারছি না।
—- তা আমরাই বা কি করে বলি বলো। তোমাকে ভালোবাসি তাই কানাঘুষোয় কথাগুলো শোনার পরই তোমাকে লুকিয়ে বলতে এসেছি। বলি কি দাদা গোঁয়ারতুমি কোর না। কথায় আছে , যেমন কলি তেমনি চলি। কথাটা ভেবে দেখ।
বলেই ভক্তাকাকারা চলে যায়। আর বাবা কেমন যেন মুসড়ে পড়ে। পরক্ষণে আবার স্বমূর্তি ধারণ করে। বিড় বিড় করে বলে , যে দিকে যাবে যাক। আমি যে দল করে এসেছি , সেই দলেই থাকব। তাতে পাড়া ছেড়ে যেতে হয় যাব। কিন্তু সনাতনের মোড়লগিরি মানতে পারব না।
অঞ্জলি বাবার দিকে চেয়ে থাকে। বুঝতে পারে কথাগুলো বলছ বটে , কিন্তু বাবার গলায় সেই দৃঢ়তা নেই। সে বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলে , এখন থেকে ওসব কিছু ভেব না। যেদিন যা হওয়ার হবে।
—- ঠিক বলেছিস। বাবা যেন নিজের মনকেই আশ্বস্ত করে। পরক্ষণেই আবার দুঃশ্চিন্তা গ্রাস করে নেয় তাকে। অস্ফুটে বলে — আচ্ছা মোড়ল পাড়ার ছেলেটারও আমার উপরে এত রাগ কেন বুঝতে পারছি না। আমি তো কোন ক্ষতি করিনি।
বাবা বুঝতে না পারলেও অঞ্জলির বুঝতে বাকি থাকে না দুজনেই অপমানের শোধ তুলতেই হাতে হাত মিলিয়েছে। গতি — প্রকৃতি সেদিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সেও ঠিক করে নিয়েছে সে আর ভয়ে পুতু পুতু করে বাঁচবে না। হৃদয়দার সঙ্গে তার তো ভালোবাসার সম্পর্ক। একদিন তো তারা ঘর বাঁধবে। তাই হৃদয়দার সঙ্গে মেলামেশাতে আর সে কোন লুকোছাপা রাখবে না। তাতে যা হয় হবে। হৃদয়দার সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলবে সে। আজ দাদা থাকলে তাকে অত দুঃশ্চিন্তা করতে হত না। যে কোনদিন সে হৃদয়দার সঙ্গে বেরিয়ে চলে যেতে পারত। কিন্তু তা তো আর হওয়ার নয়। তবু সে মাথা নোয়াবে না। এজন্য বোধ হয় বলে বাপ কো বেটি। এত চাপের মুখেও বাবা কেমন বলে দিল দল বদল সে করবে না। পাড়া ছেড়ে যেতে হলে চলে যাবে।
বাবার মোড়লপদ নিয়ে অঞ্জলির কোন মাথাব্যাথা নেই। বরং রামবাবুরা যখন বাবাকে মোড়ল করেছিল তখন তারা আপত্তিই জানিয়েছিল। বিরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেই তখন মেনে নিতে হয়েছিল। কিন্তু এখন মোড়লপদে থাকলে পরিস্থিতি আরও বিরুদ্ধে চলে যাবে। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থান বাবার মনোভাবকে সে মনে মনে সমর্থনই জানায়।দীর্ঘদিন ধরে যে দল করে আসছে সেই দল হেরে গেলেই শাসক দলে যোগ দেওয়াটা এক ধরণের সুবিধাবাদ বলেই তার মনে হয়। সবাইকেই একটাই দল করতে হবে তার কি মানে আছে ? নিজ নিজ মতাদর্শ অনুযায়ী রাজনীতি করতেই পারে। মানুষই বেছে নেবে কোন দলটা ভালো আর কোন দলটা খারাপ। কিন্তু গায়ের জোরে এলাকা বিরোধী শুন্য করার এই প্রচেষ্টা নিজেদের উপরেই ভরসা হারানোর সামিল। এই প্রচেষ্টা অবশ্য রামবাবুদের দলেও শেষের দিকে শুরু হয়েছিল। নিজেদের উপরে আস্থা হারিয়ে দলে ব্যাপক বেনোজল ঢুকিয়ে ছিলেন রামবাবুরা। একদিন যাদের শত্রু বলতেন দলে তারাই রাতারাতি নেতা বনে গিয়েছিলেন। দিব্যি চেয়ার আঁকড়ে পার্টি অফিসে মৌরসিপাট্টা গেড়েছিলেন তারা।আর একসময় তাদের সঙ্গে লড়াই করে যে সব হতদরিদ্র , মেহনতী মানুষ ঘাম , রক্ত ঝড়িয়ে, মিথ্যা মামলার পর মামলায় জেরবার হয়ে দলকে ক্ষমতায় এনেছিলেন তাদের ঠাই হয়েছিল ওইসব বাবু নেতাদের পায়ের নিচে। সেদিন মেহনতী মানুষেরা বুঝেছিলেন দলটা আর তাদের নেই। নেতারা যাদের সঙ্গে লড়াই করার কথা বলে এসেছেন এতদিন তারাই যখন দলের মাথা হয়ে উঠেছে তাহলে লড়াইটাও নিশ্চয় শেষ হয়ে গিয়েছে।
সেই উপলব্ধি থেকেই আস্তে আস্তে রামবাবুদের দলের আসল লোকেরা মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেন। আর খাল কেটে যে বেনোজল ঢোকানো হয়েছিল তারা কোন কাজেই আসে নি। বরং ভাঙনের হা-মুখ আর বড়ো করে দিয়েছিল। না হলে দলটা আরও কিছুদিন টিকত। পতনটা এত ত্বরান্বিত হত না। সেদিন অরুণস্যারের বাড়িতে বোলপুরের সেই স্যারকে এইসব কথাই আলোচনা করতে শুনেছে সে। তারও মনে হয় কথাটা একেবারে সঠিক। তারপরে দলের নেতাদের বিভিন্ন রকম দুর্নীতি আছেই। তবে ভক্তাকাকাদেরও সে দোষ দিতে পারে না। পরিস্থিতিই তাদের বাধ্য করেছে ওই সিদ্ধান্ত নিতে। তাদের মধ্যেও একটা মানবতা বোধ আছে। নাহলে ঝুঁকি নিয়ে বাবাকে গোপনে সাবধান করতে আসত না। তার ভাবনার মাঝেই ঠাকুরতলায় হই-হট্টোগোলের শব্দটা হঠাৎই বেড়ে যায়। বোঝাই যায় এতক্ষণে সনাতনের মোড়ল পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হল। পাড়ার লোকেরা উচ্চ স্বরে দলের পাশাপাশি সনাতনের নামেও জয়ধ্বনি দিয়ে ওঠে। ধামসা মাদলের সঙ্গে গানের সুরও শোনা যায়। সে তাড়াতাড়ি গিয়ে ভালো করে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসে। বলা তো যায় না, ভোটের ফল ঘোষণার দিনের মতো যদি ওরা ফের তাদের বাড়ি ঘিরে তাণ্ডব শুরু করে। বাবা তখন মনমরা হয়ে খাটিয়ায় বসে ছিল। সে কাছে যেতেই আর দীর্ঘশ্বাস চাপতে পারে না। সেটা শুনেই বলে , চলো আর বসে থাকতে হবে না। তুমি আর মা খেয়ে নেবে। রাত জাগলে তখন দুজনেরই শরীর খারাপ করবে। বাবা কোন কথাই বলতে পারে না। অঞ্জলি বুঝতে পারে ফের অপদস্থ হওয়ার দুশ্চিন্তা বাবার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তার ধারণাই ঠিক হয়। বাবা-মা’কে খাইয়ে সে তখন সবে ভাতের থালার সামনে বসেছে সেই সময় বিজয় মিছিল করে ওরা আবার ওদের বাড়ির ঘেরাও করে সেদিনের মতোই তাণ্ডব শুরু করে। সঙ্গে ঘন ঘন শ্লোগান — সুখলাল তুমি পার্টি ছাড়ো। নইলে তুমি পাড়া ছাড়ো। রাতের স্তব্ধতা ভেদ করে বার বার প্রতিধ্বনিত্ব হয়ে ফিরে আসে সেই স্লোগান।