সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে অয়ন ঘোষ (পর্ব – ৮)

বেদ-কথা
বরেণ্য সাহিত্যিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের “দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম” নামে একটি গ্রন্থ রয়েছে। সেই গ্রন্থে বেদের পরিচয় দিতে গিয়ে উনি বলছেন যেকোন বেদের যেকোন মণ্ডলের, যেকোন অনুবাকের, যেকোন সূক্তের, যেকোন ঋক যদি আমরা মন দিয়ে দেখি তাহলে একটা হেডিং লক্ষ্য করা যাবে। খুব সহজ ভাষায় বললে এই হেডিং টি হলো সেই সূক্তটির পরিচয় লিপি। এই পরিচয়টি যদি ব্যাখ্যা করি তাহলে চারটি প্রধান বিষয় এতে উল্লেখ থাকে, যথা – সূক্তের ঋষি, সূক্তের দেবতা, সূক্তের ছন্দ ও এই সূক্ত কোন কার্যে বিনিয়োগ হয়। একটা উদাহরণ যদি দেওয়া হয়, ঋগ্বেদসংহিতার প্রথম মণ্ডলের, প্রথম অনুবাকের, প্রথম সূক্তের, প্রথম ঋক্ –
“ঋষির্বিশ্বামিত্রপুত্রো মধুচ্ছন্দা। অগ্নির্দ্দেবতা।।
গায়ত্রীচ্ছন্দঃ ব্রহ্মযজ্ঞান্তে বিনিয়োগঃ অগ্নিষ্টোমে চ।।”
তাহলে এই সূক্তের ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্র মধুচ্ছন্দা, এই সূক্তের দেবতা অগ্নি, এই সূক্তের ছন্দ গায়ত্রী ও এই সূক্তের
বিনিয়োগ ব্রহ্মযজ্ঞান্তে এবং অগ্নিষ্টোম যজ্ঞে। এই ভাবে সব সূক্তের একজন ঋষি, একজন দেবতা, ছন্দ ও বিনিয়োগ কথা বলা রয়েছে।
এখানে যদি আমরা ‘ঋষি’কে তার ব্যাখ্যা চাই তাহলে কিন্তু ঋষি অর্থে প্রথমেই আমাদের মনে শুভ্র দাড়ি গোঁফ সমন্বিত একজন মানুষকে বোঝায়, তেমনটি কিন্তু কিছু না। ঋষি অর্থে অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মানুষও কিন্তু না। এখানে ঋষি অর্থে প্রকৃতই একজন কবি যার কাব্যগুন আছে। বেদের একটি স্বয়ংসম্পূর্ন যাত্রাপথ আছে। সেই অনুযায়ী বেদে ব্যবহৃত শব্দের ব্যবহারও সাধারণ অর্থের থেকে অনেকাংশেই ভিন্ন হয়। বেদের অর্থের ব্যাখ্যা রয়েছে নিরূক্ত শাস্ত্রে। এটি কেবলমাত্র বেদের অর্থ বোঝার একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র। নিরূক্ত একটি বেদাঙ্গ হিসেবেও পরিচিত। নিরূক্তকার হিসেবে বিভিন্ন বিশিষ্ট মহর্ষিদের নাম পাওয়া যায়। এনারা সেই সময়ের বিখ্যাত সব শিক্ষিত ঋদ্ধ ব্যক্তিবর্গ, যথা যাস্ক, স্থৌলষ্টিবী, শাকপূণি। সেই নিরূক্ত অনুযায়ী ‘ঋষি’ শব্দের অর্থ “যস্য বাক্যং স ঋষি”, এর অর্থ যার বাক্য সেই ঋষি। এইবার বিষয়টি পরিষ্কার হলো। তাহলে আমরা যখন বলি এই সূক্তের ঋষি এই জন তখন বুঝতে হবে সেই সূক্তের রচয়িতা বা বক্তা সেই নির্দিষ্ট ঋষি।
চলবে…