সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩৪)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৩৪

হৃদয়দাকে নিয়ে সে থানার বাইরে আসে। খোলা হাওয়ায় শ্বাস নিয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচে। মনে হয় যেন এতক্ষণ কোন দমবন্ধ পরিবেশে আটকে ছিল তারা। সেই কোন সকালে ট্রেনে চাট্টি মশলা মুড়ি খেয়েছিল। কিন্তু খিদে-তৃষ্ণা সব কোথাই যেন হারিয়ে গিয়েছে।ভুঁড়ি মোটা পুলিশটার কথা মনে পড়ছিল আর কেবলই তার বমি পাচ্ছিল।বাবার বয়েসী লোকটা কেমন অবলীলায় হাতের রুলারটা দেখিয়ে কুইঙ্গিতপূর্ণ কথাটা বলে দিল। হয়তো তারই বয়সী মেয়ে রয়েছে ওর বাড়িতে। যদি ওর মেয়েকেও কেউ ওই রকম কথা বলে তাহলে বাবা হয়ে তার কেমন লাগবে ? আসলে ওরা বোধহয় ওসব ভাবেই না। সেই ভাবনাচিন্তাটাই বোধ হয় হারিয়ে ফেলেছে। না হলে তাদের কাছে চা – সিগারেট চায়। ২ টাকার কালি-কাগজ খরচ করে একটা দরখাস্ত লিখে দিয়ে ১০০ টাকা বাগিয়ে নেয়। ওরা তো মোটা টাকা মাইনে পায়। তাহলে তো দরখাস্তটা বিনা পয়সাতেই লিখে দেওয়া উচিত।
ভাবতে ভাবতেই তাদের রিক্সাটা বর্ধমান রেলপুলিশ থানায় পৌঁছোয়। সেখানেও অভিজ্ঞতা সুখকর হয় না ওদের।গুঁফো বড়োবাবু পুরো ঘটনা শুনলেনই না। মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বললেন, আরে ওরা ভুল বলেছে। ট্রেনেই যে এসেছে এমন তো কোন নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া ট্রেনে এলেই যে স্টেশন এলাকায় কিছু হয়েছে তা তো নয়। হলে তো আমরাই জানতে পারতাম, নাকি ? তোমরা বরং তোমাদের এলাকার থানায় গিয়ে মিসিং ডায়রিটা লেখাও।খোঁজ খবরটা সেখান থেকে শুরু হওয়াই ভালো। বড়োবাবু বক বক করে উপদেশ দিয়েই যাচ্ছিলেন। আর শুনতে পারছিল না অঞ্জলি। তার মাথাটা কেমন ঝিম ঝিম করছিল। তারা জোড় হাত করে ধন্যবাদ জানিয়ে বেড়িয়ে আসে। সেখান থেকে আর বাড়ি ফেরে না তারা। একেবারে সোঁজা পৌঁছোয় তাদের এলাকার মতিপুর থানায়।
কিন্তু যাওয়াটাই সার হয়। সব শুনে ডিউটি অফিসার বলেন, তোমরা ভুল জায়গায় এসেছো। লোকটা তো আমাদের থানা এলাকা থেকে হারায় নি। বর্ধমানে অথবা সেখানে যাওয়ার পথে কোথাও হারিয়েছে। তাই সেখানেই মিসিং ডায়রি করতে হবে।আর কথা বলার কোন ইচ্ছাই হয় না অঞ্জলির। থানার সামনের দোকানে দাঁড়িয়ে তারা দুজনে চা আর আর একটা করে কেক নিয়ে খেতে খেতে নিজেদের হয়রানির কথা আলোচনা করে। দোকানদার বয়স্ক মানুষ। তাদের কথা শুনে বলেন , যদি কিছু মনে না করো তাহলে একটা কথা বলি মা ?
অঞ্জলি বলে, না না মনে করব কেন ? বলুন কি বলবেন।
— তোমার বাবা হারিয়েছে , তোমার মনের অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু তোমরা ভুল জায়গায় এসেছো।
—- মানে ? পুলিশের মতো আপনিও একই কথা বলছেন ? কেউ হারালে তো মানুষ পুলিশের কাছেই ডায়রি লেখাতে যায়।
—– যায় ঠিকই , কিন্তু লাভ হয়েছে বলে শুনিনি। ৩০ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করছি। তোমাদের মতো অনেকেই এভাবে উদভ্রান্তের মতো আসা যাওয়া করতে দেখছি। ডায়রি লিখিয়েও কেউ পুলিশের সাহার্য্যে তাদের হারানো জনকে ফিরে পেয়েছে বলে শুনি নি।আসলে পুলিশ খোঁজার চেষ্টাটাই করে না।
— কি বলছেন আপনি ?
— যা বলছি সেটাই সত্যি , সেটাই বাস্তব।নেতা–মন্ত্রীদের কুকুর-বিড়াল হারালে ২৪ ঘন্টার মধ্যে পুলিশের তা উদ্ধারের নজির আছে , কিন্তু সাধারণ মানুষকে খুঁজে বের করতে পুলিশের বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়। দোকানদার আর অনেক কথা বলে যাচ্ছিল , তার কিছু কানে ঢুকছিল কিছু ঢুকছিল না অঞ্জলির। সে কেবল বলতে পারে — তাহলে কি বাবাকে খুঁজে বের করার কোন উপায়ই নেই ?
শুনে দোকানদার বলেন, উপায় আছে , চেষ্টা করে দেখতে পারো।
সে সাগ্রহে বলে — কি উপায় ?
—- খবরের কাগজে ছবি আর ফোন নং সহ একটা বিজ্ঞাপন দিতে পারো। তাতে অবশ্য কিছু টাকা খরচ হবে। কিন্তু কাজ হলেও হতে পারে। হয়তো তোমার বাবা এমন পরিস্থিতিতে রয়েছেন যেখান থেকে কোনও কারণে ফিরতে পারছেন না। বিজ্ঞাপনটা কোন হৃদয়বান মানুষের চোখে পড়লে তিনি ওর বাড়ি ফেরা কিম্বা ফোন করে খবর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন। এমন মানুষ দু’চার জন এখনও সব জায়গায় আছেন।
—- কথাটা মনোপুত হয় অঞ্জলির। ওই দোকানদারের কাছেই ঠিকানা জেনে তারা বাসস্ট্যাণ্ড এলাকায় কাগজের বিজ্ঞাপনের এজেন্টের কাছে পৌঁছোয়। সব শুনে এজেণ্ট জানায় , ৩০০ টাকা খরচ পড়বে। দিদি আসার সময় তার হাতে ২০০ টাকা দিয়েছিল। খরচখরচা বাদ দিয়ে পড়ে রয়েছে আর মাত্র ১৫০ টাকা। সেটা বের করে সে হৃদয়দার দিকে তাকায়।হৃদয়দা বাকি ১৫০ টাকা দিয়ে এজেন্টের হাতে তুলে দেয়।
হৃদয়দার কাছে তার ঋণ বেড়েই চলেছে। জানে না কি করে শোধ দেবে সে। এজেন্টের কাছে থেকে ক্লান্ত – বিধ্বস্ত হয়ে সন্ধ্যার মুখে বাড়ি ফেরে তারা। সারা দিন শুধু শুধু টাকা খরচ আর হয়রানিই সার হলো। একটা মিসিং ডায়েরি পর্যন্ত লেখাতে পারল না। কাজের কাজ বলতে ওই খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়াটাই হলো। কালই অরুণস্যারের ফোন নং আর বাবার ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপনটা বেরিয়ে যাবে। হৃদয়দা একটা কাগজ কিনে আনবে আমোদপুর স্টেশন থেকে। ভাগ্যিস থানার সামনের ওই দোকানটাতে ওরা চা খেতে গিয়েছিল, না হলে হয়তো বিজ্ঞাপনের বিষয়টা তাদের মাথাতেই আসত না। দোকানদারের কথাগুলো যেন তার কানে এখনও বাজছে। তিনি বেশ মজার একটা কথা বলেছিলেন। কোন এক মন্ত্রীর মেয়ের গলা থেকে নাকি হার ছিনিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছিল দুস্কৃতিরা। সেই খবর চাউর হতেই রীতিমতো হইচই পড়ে যায়। মুখ রক্ষা করতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ কর্তারা এলাকার ৪ জন দাগী দুস্কৃতিকে তুলে নিয়ে আসে। তারপর ওইসব দুস্কৃতিদের কাছে থেকে উদ্ধার হয়েছে বলে নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে ছিনতাই হওয়া হারের মতোই হার গড়িয়ে মন্ত্রীর হাতে তুলে দেয়। আর বিনা দোষে চারজনকে মিথ্যা মামলায় কোর্টে চালান দেয়।সব জেনেও মন্ত্রী নাকি কোন উচ্চবাচ্যই করেন নি। ছিনতাই হওয়া হারের চেয়ে পুলিশের ফিরিয়ে দেওয়া হারের ওজন নাকি অনেকটাই বেশি ছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে সে সময় সংবাদ মাধ্যমে বিশাল হইচই পড়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে , যে পুলিশ ২৪ ঘন্টার মধ্যে মন্ত্রীর মেয়ের ছিনতাই হওয়া হার উদ্ধার সহ ছিনতাইকারীদের ধরতে পারে সেই পুলিশ সাধারণ মানুষের চুরি-ছিনতাইয়ের কোন কিনারা করতে পারে না কেন ? কিন্তু কিছুদিন পরেই সব ধামাচাপা পড়ে যায়। তাই পুলিশ তার বাবার নিখোঁজ ডায়েরি নিলেও যে তা ধামা চাপাই পড়ে থাকত, তা ওই দোকানদারের কাছে না গেলে জানতে ও পারত না সে।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।