সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৫৫)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৫৫
একটা মিষ্টি স্বপ্ন যেন মায়া অঞ্জন পড়িয়ে দেয় তাদের চোখে। সেদিন সকালে তাদের ঘুম ভাঙে সাবিত্রীদির ডাকে। সাবিত্রীদি বলেন , সন্দীপ মাল নিতে এসে বসে আছে। তোরা কে যাবি যা , গিয়ে ছেলেটাকে ছেড়ে দে।
অঞ্জলি লক্ষ্য করে সে কিছু বলার আগেই চোখে মুখে একটু জল দিয়ে হিসাবের খাতাটা নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে শ্রাবণী। সে গলা খাঁকারি দিতেই সভয়ে পিছিয়ে এসে টেবিলের উপর খাতাটা নামিয়ে রেখে বলে — না মানে , আমি ভেবেছিলাম তোমার হয়তো এখনও ঘুম ছাড়ে নি তাই –।
শ্রাবণীর ওই চোরের দায়ে ধরা পড়ার মতো মুখের ভাব দেখে হেসে ফেলে অঞ্জলি। কৌতুক মেশানো গলায় বলে ,বুঝেছি আর আর বলতে হবে না। আমার ঘুম না ছাড়লে যে তোমার ভালোই হত তা আমি জানি। বেশ , যাও আজকের মতো না হয় আমার ঘুম ছাড়ে নি। তাবলে কিন্তু রোজ রোজ হবে না।
—- না, না তুমি যাও। আমি যাব না।
— দেখি দেখি মুখটা দেখি।
এতো দেখি পেটে খিদে মুখে লাজ। মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। যাও যাও।
—- দিদি তুমি না —।
বলেই খাতা হাতে বেরিয়ে যায় শ্রাবণী। সে দিকে চেয়ে থাকে অঞ্জলি। তারপর পাশ ফিরে শোয় আর একবার। শ্রাবণী না ফেরা পর্যন্ত সে বিছানা ছেড়ে উঠতেও পারে না। কারণ তাকে দেখলেই তো দুটোতে অস্বস্তিতে পড়ে যাবে। কিন্তু বেশিক্ষণ তাকে শুয়ে থাকতে হয় না। আজ খুব তাড়াতাড়িই সন্দীপকে মালপত্র বুঝিয়ে দিয়ে ফিরে আসে শ্রাবণী।
তারপরে সে বিছানা ছেড়ে হাত মুখ ধুয়ে পরিস্কার হয়ে নেয়।
তারমধ্যেই হোমে এসে পৌঁছোন আলাপনবাবু। তার মুখটা গম্ভীর গম্ভীর দেখায়। তা দেখে খুব দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যায় অঞ্জলি। আলাপনবাবুর তো সন্দীপের মায়ের আর ডি,এম সাহেবের সঙ্গে কথা বলে সবকিছু চূড়ান্ত করে আসার কথা ছিল। তবে কি ওই ব্যাপারেই কোন ব্যাঘাত ঘটেছে। তাহলে মেয়েটা খুব আঘাত পাবে। কাল অনেক রাত্রি পর্যন্ত দু’জনের সুখ দুঃখের কথা হয়েছে। তাতেই অঞ্জলি বুঝেছে সন্দীপের সঙ্গে ঘর বাঁধার ব্যাপারে চরম আশাবাদী হয়ে পড়েছে শ্রাবণী। এখন যদি সেটা কোন কারণে আটকে যায় তাহলে সেই আঘাত শ্রাবণীর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হবে। তেমন হলে সান্ত্বনা দেওয়ারও ভাষা থাকবে না।
কারণ সে বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করার পর থেকে সন্দীপের সঙ্গে বিয়ের ব্যাপার নিয়ে একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে পড়ে শ্রাবণী। এখন সেই বা কোন মুখে খারাপ খবরটা তাকে গিয়ে দেবে ? প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে যায় অঞ্জলি। তার আর তর সয় না।সে দ্রুত অফিস ঘরে গিয়ে আলাপনবাবুর মুখোমুখি দাঁড়ায়। তাকে দেখে যেন আরও গম্ভীর হয়ে যায় আলাপনবাবুর মুখ। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই আলাপনবাবু বলেন , আমি দুঃখিত কিছুই করতে পারলাম না। সন্দীপের গ্রামে গিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারলাম ওদের পরিবারটা তেমন একটা সুবিধার নয় , তার উপরে ডি, এম সাহেব কিছুতেই ঘাড় পাতলেন না। সাফ জানিয়ে দিলেন এই ভাবে ঘনিষ্ঠতার কথা বাইরে জানাজানি হলে হোমের বদনাম হবে। তাই কাল থেকেই ছেলেটার হোমে আসা বন্ধ করে দিতে হবে। কথাগুলো শুনেই মুখ কালো হয়ে যায় অঞ্জলি। সে শুধু ভাবে এই কথা সে শ্রাবণীকে বলবে কেমন করে ? তীব্র অভিমান হত গলায় সে বলে , সেই যে কথায় আছে না অভাগা যে দিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়। আপনিই বা কি করবেন ? ভগবানই যাদের মেরে রেখেছে তাদের বাঁচানোর সাধ্য কার ?
— সেটাই যদি বোঝ , তাহলে বাঁচাতে যাও কেন ?
—- বা ‘রে তাহলে কোনও চেষ্টাই করব না ? হাত গুটিয়ে বসে থাকব ?
— আর তো হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে। এবার একটু হাত নাড়ানাড়ি তো করতেই হবে।
— মানে ?
— মানে এই প্যাকেটটা খুলে মিষ্টিগুলো সবাইকে হাতে হাতে একটু দিয়ে দাও দেখি।
বলে ব্যাগ থাকে একটা মিষ্টির প্যাকেট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে ধরেন আলাপনবাবু।
সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে , দিতে হয় আপনি দিন।
ছেলেটা কাল থেকে আর হোমে আসবে না, তাই নিঝঞ্ঝাট হওয়ার আনন্দে আপনি মিষ্টি খাওয়াতেই পারেন কিন্তু একটি মেয়ের মন প্রাণ ভেঙে আমি তো সেই মিষ্টি বিলি করতে পারব না।
— আচ্ছা তুমি কি বলো তো ? আমাকে এতটাই হৃদয়হীন মনে হয় তোমার ? এখনও আসল ব্যাপারটা ধরতেই পারলে না ?
— আসল ব্যাপার মানে ?
— আসলে এতক্ষণ তো আমি মজা করছিলাম। সব কিছু তোমার ইচ্ছে মতোই হয়েছে। সন্দীপদের গ্রামে গিয়ে ওর মায়ের সঙ্গে কথা বলে এসেছি। ওর মা মাটির মানুষ। এক কথাতেই সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ছেলের পছন্দই তার পছন্দ। ওরা সুখী হলে আর কিছু চায় না। ছোট বেলায় বাবা হারানোয় মাধ্যমিকের বেশী লেখাপড়া করা হয় নি সন্দীপের।
কিন্তু গ্রামের লোক সবাই বলেছে সন্দীপের মতো ছেলে হয় না।
—- আর ডি,এম সাহেব ?
—- তাকে তো তোমার কায়দায় সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিয়ে কথাটা পারলাম। শুনেই তো তার মহাউৎসাহ। উৎসাহের আতিশয্য বলেই ফেললেন , তাহলে আমিই কন্যা সম্প্রদান করব। বিয়ের খরচও প্রশাসনই বহন করবে। সে সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপারও। তিনিই বা কম যান কিসে ? বলে দিলেন, আমি তাহলে পাত্রপক্ষ হয়ে বিয়ে দেব।
কথাটা শুনেই আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে অঞ্জলি। আর সেই শব্দ শুনে একে একে অফিস ঘরে এসে হাজির হয় হোমের অন্য মেয়েরা। আসে না কেবল শ্রাবণী। সে যে লজ্জাতেই আসতে পারছে না তা বুঝতে অসুবিধা হয় না অঞ্জলির।সবাই অফিস ঘরে পৌঁছোতেই আলাপনবাবু বলেন , নাও এবার সবাই শাখ বাজাও উলু দাও। তারপর সুর করে -‘লাজে রাঙা হলো কনে বৌ’ ‘গানটা দুকলি গেয়েও দেন। হোমের মেয়েরা কিছু বুঝতে না পেরে পরস্পর মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। সাবিত্রীদি মুখ ফসকে বলে ফেলেন , স্যার বিয়েটা কি আপনার সঙ্গে অঞ্জলির হবে ?
কথাটা শুনেই অস্বস্তিতে পড়ে যান আলাপনবাবু। আর লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে অঞ্জলংমুখ। লজ্জা কাটাতে সে বলে, ধ্যাত কি যে বলো না তোমরা ?
তারপর শ্রাবণী আর সন্দীপের ব্যাপারটা সবাইকে খুলে বলে। সেই কথা শুনে সাবিত্রীদিরা গালে হাত রেখে বলে, আচ্ছা ঘোল খাইয়ে দিল তো মেয়েটা। সবার চোখের সামনে এত বড়ো একটা কাণ্ড ঘটিয়ে বসল আমরা কেউ টেরটিও পেলাম না।
— যাক গে বাদ দাও, শেষ ভালো যার সব ভালো তার ।
সবাই বলে সে তো বটেই। বোঝাই যায় ব্যাপারটার এত সুন্দর নিস্পত্তি হতে সবাই খুব খুশী হয়েছেন।
আলাপনবাবু কিভাবে সবদিক সামলালেন তা জানার খুব কৌতুহল হয় তার। তাই সে বলে, তাহলে ওদের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত সত্যি হতে চলেছে ?
— সত্যি না হয়ে উপায় আছে। যা একখানা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিলে আমাকে। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে সবদিক ম্যানেজ করতে হল।
— আপনি না একটা বিচ্ছিরি লোক। ঠান্ডা মাথায় খুনও করতে পারেন। যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন না। দিন দিন , প্যাকেটটা দিন। সবাইকে মিষ্টিমুখ করায়। সে হতভাগীটা বোধহয় লজ্জায় আসতে পারে নি।
আরও কিছুক্ষণ আলোচনার পর সেদিনকার মতো বিদায় নেন আলাপনবাবু। তারপরও তাদের আলোচনা চলে অনেকক্ষণ। ঠিক হয় , প্রশাসন যা দেবে দিক তারা সবাই মিলে শ্রাবণীকে একটা আংটি, বেনারসি শাড়ি আর শাঁখা সিঁদুর আর আলতা দেবে। একদিন আইবুড়ো ভাতের ব্যবস্থা করা হবে। সাংবাদিক আর হোমের মেয়েদের আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণ করা হবে। হোমের মেয়েদের আত্মীয় স্বজন বলতে সাবিত্রীদির সেই পাতানো ভাই আর অঞ্জলির মা-দিদির সঙ্গেই যা যোগসূত্র রয়েছে। দায় নেওয়ার ভয়ে বাকিদের আত্মীয় স্বজন তো কেউ হোমের চৌকাঠ মাড়ায় না। সেদিনের মতোঁ আসর ভেঙ্গে যায়। অঞ্জলি একটা মিষ্টি নিয়ে গিয়ে শ্রাবণীর মুখে তুলে দেয়। শ্রাবণী তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। সে তাকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে বলে , উহু শুধু আমাকে নয় হোমের সবাইকে প্রণাম করে আর্শিবাদ নিয়ে আয়।
কিছুক্ষণের মধ্যে প্রণাম করে ফিরে আসে শ্রাবণী। তার চোখে তখন জল। অঞ্জলি তাকে কাছে টেনে নিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, কাঁদছিস কেন রে ? তোর মতো ভাগ্য কটা মেয়ের হয় ?
— সেটা তুমি ঠিকই বলেছো দিদি। তোমার মতো দিদির স্নেহছায়া যে মেয়ের কপালে জুটেছে সে মেয়ের মতো সৌভাগ্যবতী খুব কমই আছে। কিন্তু আজ বাবার কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে যেন। বাবা থাকলে খুব খুশী হতো।
— সেটা তো ঠিকই রে। কিন্তু ভগবান হয়তো সবার কপালে সব সুখ লেখেন না। এই দেখ না , আমার বাবা থেকেও নেই।
ছবির মতো অঞ্জলির চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাদের শ্রীপল্লীর বাড়িতে সবাইকে ঘিরে ছোটবেলার সেই দিনগুলি। মনটা বিষন্ন হয়ে যায় তার।
ক্রমশ…