সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৬১)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৬৬
তারপরই অঞ্জলির মনটা উদাস হয়ে যায়। আলাপনবাবুর সঙ্গে কিছুক্ষণ একান্তে গল্প করতে খুব ইচ্ছে করছিল তার। কিন্তু হোমে সেটা তো আর সম্ভব নয়। কাল সাবিত্রীদিকে দিয়ে ফেরার পথে সেই সুযোগ তারা তো পাবে। নিজের মনকে যেন নিজেই বোঝায় অঞ্জলি।ততক্ষণে হোমে স্নান খাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। এমনিতেই শ্রাবণীদের বাড়িতে বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ায় হোমে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকাল হয়ে যায়।তারপর রান্না বান্নার ব্যবস্থা করতে করতে পেরিয়ে গিয়েছে আরও কিছুটা সময়। এরপর আর দেরি করলে খাওয়া দাওয়া চুকতেই অন্ধকার নেমে যাবে। তাই অঞ্জলিও তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে স্নান করে নেয়। তারপর খাওয়া দাওয়া করে কেউ বসে যায় লুডো নিয়ে। কেউ বা খানিকটা গা গড়িয়ে নেয়। অঞ্জলি, সাবিত্রীদি আর সঞ্চিতাদের সঙ্গে গল্পে মেতে ওঠে।ঘুরে ফিরে আসে কেবল হাজারদুয়ারী বেড়ানোর গল্প।সঞ্চিতারা স্কুলের পাঠ্যবই এ নবাবী আমলের ইতিহাস পড়েছে। স্বচক্ষে সেই সব ইতিহাসের স্বাক্ষী দেখে এসে তাদের চোখে মুখে যেন উত্তেজনার খই ফুটছিল।সঞ্চিতা বলে, আলাপনবাবু না থাকলে আমরা সব ভালোভাবে বুঝতেই পারতাম না। কি সুন্দর করে উনি বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। ওনার কত জ্ঞান। কিন্তু দেখলে বোঝাই যায় না। খুব ভালো মানুষ, তাই না বলো দিদি ? অঞ্জলিকে উদ্দেশ্য করেই প্রশ্নটা করে সঞ্চিতারা। কিন্তু কোন উত্তর দিতে পারে না অঞ্জলি। আড়ষ্টতা যেন তার কণ্ঠ রোধ করে দেয়। কিন্তু সঞ্চিতাদের কথা শুনে তার চোখ মুখ উজ্বল হয়ে ওঠে। সাবিত্রীদির সেটা চোখ এড়ায় না। সরাসরি অঞ্জলির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। আর সেটা দেখেই কেমন যেন অস্বস্তিতে পড়ে যায় অঞ্জলি। শেষ পর্যন্ত কি সে সাবিত্রীর কাছেও ধরা পড়ে গেল ?
কিন্তু কি করে সেটা সম্ভব ? সে তো তেমন কোন আচরণ করে নি যাতে তার সঙ্গে আলাপনবাবুর ঘনিষ্ঠতার আভাস পেতে পারেন সাবিত্রীদি। এক হতে পারে সাবিত্রীর বৌদিরা ধারণাটা তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সে তো তারা আন্দাজে ঢিল মেরে তার পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সে তো সেদিন তাদের কথাতে কোন আমলই দেয় নি। তাহলে সাবিত্রীরও সেই আন্দাজে ঢিল মারা ছাড়া নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা সম্ভব নয়।
আর এক হতে পারে শ্রাবণী কোন ফাঁকে সাবিত্রীর কাছে সব উগড়ে দিয়েছে। এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা শ্রাবণী তার সঙ্গে করতে পারবে ?
আসল ব্যাপারটি কি তা জানার জন্য অঞ্জলির মনটা খুব উদগ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু এ ব্যাপারে বেশি আগ্রহও দেখানো যাবে না। তাহলে আরও চেপে ধরবেন সাবিত্রীদি। তখন হয়তো আর এড়িয়ে যেতে পারবে না। আর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও তার চোখ মুখের ভাবই আসল সত্যিটা ধরিয়ে দেবে। তাই সে সাবিত্রীদির দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু সাবিত্রীদির দৃষ্টি থেকে পালাতেও পারে না। মনে হয় অলখ্যে সাবিত্রীদি তার ভিতর যেন পড়ে নিয়েছেন। অস্বস্তি এড়াতে সে সঞ্চিতাদের সঙ্গে ফের গল্প শুরু করে।কিন্তু গল্প আর জমে না। সঞ্চিতারা অফিসঘরে টিভি দেখতে চলে যায়। ঘরে তখন শুধু সে আর সাবিত্রীদি। সেই সুযোগে তাকে নিয়ে পড়েন সাবিত্রীদি। তার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলেন — একটা কথা সত্যি বলবি ?
অঞ্জলির আর বুঝতে বাকি থাকে না এতক্ষণ সে যা আশঙ্কা করেছিল সেই প্রশ্নটার মুখেই পড়তে চলেছে সে। তবুও না বোঝার ভান করে বলে , কি কথা ?
— আলাপনবাবুর সঙ্গে তোর কতদিন ধরে এইসব চলছে ?
— মানে ? এইসব চলছে , মানে কি সব চলছে ?
— আমার কাছে লুকোস না। আমি কি জানতে চাইছি তুই ভালো করেই বুঝতে পারছিস।
— কে বলেছে ?
শ্রাবণী কি কিছু বলেছে তোমাকে ?
— সে বলবে তাহলেই হয়েছে ? হোমের চার দেওয়ালে বন্দী থেকে যে এতবড়ো একটা কান্ড করেও কাউকে টের পেতে দেয় নি তার পেট থেকে বেরোবে কথা ?
— তাহলে ?
—- আমি কি অন্ধ ? সেদিন রাতে তুই আর শ্রাবণী উঠে কার সংগে কোথায় গেলি , তারপর কখন ফিরলি তা কি আমি দেখি নি ভাবছিস ?
—- সাবিত্রীদি তুমি —
— আসলে আমি সেদিন তোদের কিছু জিজ্ঞেস করি নি কথাটা পাঁচ হয়ে যাওয়ার ভয়ে। তাছাড়া ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়াটা তো কোন অন্যায় নয়।তাই জিজ্ঞেস করছিলাম তোদের এই ভালোবাসা – বাসিটা কতদিন ধরে চলছে ?
সাবিত্রীদির কথায় লজ্জায় লাল হয়ে যায় অঞ্জলির মুখ। সে বোঝে , সাবিত্রীদির কাছে আর লুকানোর কিছু মানে হয় না। তাই সে সব খুলে বলে তাকে। শোনার পর সাবিত্রীদি বলেন , হোমে থাকাকালীনই আমি কিছুটা আভাস পেয়েছিলাম। কানাঘুষো শুনেছিলাম। বৌদিরাও বলেছিল। তাই আমি সেটা মিলিয়ে নিতে চাইছিলাম।
তারপর অঞ্জলিকে নিজের বুকে টেনে নিয়ে বলেন , আমার এই বোনটা সুখী হলে আমি যে খুব খুশী হবো রে। এবার আমার সাধ্যমতো তোকে সুখী করার চেষ্টা করব। তবে একটা শর্ত আছে।
— কি শর্ত ?
—- সেই ভদ্রলোককে কিন্তু এর মধ্যে কিছু বলা যাবে না। তাকে চোটেপাটে ধরে কেমন নাস্তানাবুদ করি দেখ না।
ঘরে আলো জ্বলছিল তাই কথায় কথায় কখন অন্ধকার নেমেছে তা কেউ টের পায় নি।সঞ্চিতারা ঘরে ফিরতেই টের পায় তারা।
অঞ্জলির শরীর যেন আর বইছিল না। পর পর দু-রাত্রি তার ঘুম হয় নি বললেই চলে। তাই চোখ যেন ঘুমে বুজে আসছিল। সবারই প্রায় একই অবস্থা। দিনে দেরিতে খাওয়া হয়েছিল বলে রাতে আর কারও খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। তাই সবাই একে একে বিছানা নেয়। এক ঘুমেই সকাল হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি বিছানা ছাড়ে অঞ্জলি। কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন আলাপনবাবু। তারপরই সাবিত্রীদিকে বাড়িতে পৌঁচ্ছে দিতে যাবে তারা। তাই তাকে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে হবে। সে রকমই বলে গিয়েছেন আলাপনবাবু। সে কলঘরের কাছে পৌঁছোতেই দেখে তার আগে উঠে সাবিত্রীদি স্নান-টান করে একেবারে রেডি হয়ে গিয়েছেন।তাই দেখে সে ফুট কাটে, কি গো সাবিত্রীদি বাড়ি যাওয়ার জন্য দেখছি তোমার তর যে আমার সইছে না।
সাবিত্রীদিও ফুট কাটতে ছাড়েন না। বলেন, আমার না হয় বাড়ি যাওয়ার জন্য তর সইছে না। কিন্তু তোর ?
সাবিত্রীদিকে আর ঘাটানোর সাহস পায় না অঞ্জলি। কে জানে যদি কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বের করে আনেন ?
অঞ্জলি রেডি হতে না হতেই গেটের বাইরে গাড়ির হর্ণ বেজে ওঠে। সেই হর্ণের আওয়াজ শুনে রাগের সঙ্গে খুব অভিমান হয়ে যায় অঞ্জলির।
কথা ছিল, মোটরবাইকে সাবিত্রীদিকে পৌঁচ্ছে দিতে যাবে তারা। তারপর ফেরার পথে সেদিনের মতো তিলপাড়ায় কিছুক্ষণ একান্তে কাটিয়ে ফিরবে। কিন্তু গাড়িতে তো আর সেটা সম্ভব হবে না। ডাইভারের সামনে তো গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখে সময় কাটানো যাবে না। তাই দুকথা শুনিয়ে দিতেই সেই গেট খুলে দিতে এগিয়ে যায়।কিন্তু গেট খুলেই খুশিতে ভরে ওঠে তার মন। চেয়ে দেখে ড্রাইভার নয়, গাড়ির স্টিয়ারিং ধরে বসে রয়েছেন স্বয়ং আলাপনবাবু। আবেগে তার গলা বুজে আসে। কোন রকমে বলতে পারে — তু — আপনি গাড়িও চালাতে পারেন ?
— হ্যা , মোটর বাইকেই যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম দুজন মহিলা মোটরবাইকে যাওয়া অসুবিধা হবে। তাই ডি,এম সাহেবকে বলে গাড়িটাই নিয়ে এলাম।
কথা বলতে বলতেই ভিতরে ঢুকে আসেন আলাপনবাবু। তারপর তাদের সঙ্গেই চা খান। সাবিত্রীদিও চা-টা খেয়ে সবার কাছে বিদায় নিয়ে অঞ্জলির সঙ্গে গেটের বাইরে পা বাড়াতেই সবাই তার হাত ধরে বলে, আবার কবে আসছো বলো ?
সাবিত্রীদি বলেন , বার বার কি আমিই আসব ? তোরা একবারও যাবি না আমার বাড়ি। এরপর তোরা না গেলে আর আমি আসব না এই বলে গেলাম।
ঠিক হয় অঞ্জলির ফাইন্যাল পরীক্ষা হলে একদিন সবাই মিলে সাবিত্রীদির বাড়ি যাওয়া হবে।
সাবিত্রীদি বলেন , আমি তোদের পথ চেয়ে থাকব।
তারপর গাড়িতে গিয়ে ওঠে তারা। হোমের মেয়েরা হাত নাড়তে থাকে। গাড়ি থেকে হাত নাড়তে নাড়তে হোমের পথটুকু পেরিয়ে আসেন সাবিত্রিদি। আর অঞ্জলির বুকে ধুকপুকানি শুরু হয়। সাবিত্রীদি আলাপনবাবুকে আবার কি বলে বসেন কে জানে ?
ক্রমশ…