সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ১০)

সালিশির রায়

কিস্তি – ১০

বলতে পারে নি হৃদয়ের কাছে বাঁধা পড়ে গিয়েছ তার হৃদয়। তখনকার মতো প্রসঙ্গটা চাপা পড়ে যায়। কারণ খাওয়া দাওয়ার পর আত্মীয় স্বজনরা একে একে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করে। আর দু-দুটো বিয়ের জেরে, টানা কয়েকদিন সরগরম হয়ে থাকা বাড়িটা ও যেন খাঁ খাঁ করতে থাকে। তাও আজ দিদি রয়েছে। দাদা -বৌদি রয়েছে। জামাইবাবু অবশ্য খাওয়া দাওয়ার পর পাশের হরিপুর গ্রামে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে। সকালে ফিরে দিদিকে নিয়ে বাড়ি যাবে।দাদা-বৌদিও কাল দ্বিরাগমনে যাবে। তখন তো ফাঁকা বাড়িটাই তাদের গিলত আসবে।
সন্ধ্যা নামতেই সেদিন সবাই বিছানা নেয়। কয়েকদিনের ধকলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সবাই। ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে পড়েছিল অঞ্জলিও। তার ও শরীর বিশ্রাম চাইছিল। বিছানা তাকে ও খুব টানছিল। কিন্তু দিদির মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে সে নানা অপ্রয়োজনীয় কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে। দিদি ঘুমোলে তবেই সে ঘরে যাবে ঠিক করে। সেদিন সে আর দিদি তাদের সেই পুরনো ঘরেই শোবে।দিদি আগেই বিছানা নিয়েছে।তার ও খুব ঘুম পাচ্ছে। ঘুমেরই বা দোষ কি। টানা ক’দিন ধরে যা ধকল গেল। দিদি কখন ঘুমোবে সে শুধু সেই প্রতীক্ষায় থাকে। একসময় দিদিকে পাশ ফিরে শুতে দেখে সেও পাশে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুম আর আসে না। শুধু হৃদয়দার কথা মনে পড়ে। তার হাটা-চলা কথা বলা সব অন্য রকম , যেন অন্য এক জগতের রাজপুত্র সে।
আজ দিদির হাত থেকে খুব বাঁচা বেঁচেছে। তখন হৃদয়দাকে জড়িয়ে যা সব প্রশ্ন করছিল দিদি , সে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। এমনিতে দিদি খুব ভালো, কিন্তু কোন বেচাল দেখলেই হলো। একেবারে পিন্ডি চটকে ছেড়ে দেবে। তাই সে দিদিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই অনেক পড়ে শুতে এসেছে। অথচ শুয়ে শুয়ে দিদির সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করবে ভেবেছিল। কিন্তু দিদি যদি কথায় কথায় আবার হৃদয়দার প্রসঙ্গ তোলে, তখন হয়তো আর পাশ কাটাতে পারবে না ভেবেই সে দিদির সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছে ত্যাগ করতে হয়েছে তাকে। দিদিকে পাশ ফিরে নিসাড়ে পড়ে থাকত দেখে সেও উল্টো দিকে মুখ করে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল – যাক বাবা এযাত্রা তো বেঁচে গেলাম। কাল তো দিদি চলে যাবে তাকে আর জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে না।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তার ভুল ভেঙে যায়। দিদি হঠাৎ তার গায়ে হাত রেখে বলে ওঠে — একটা কথা সত্যি করে বল তো ওই ছেলেটার সঙ্গে তোর কি কিছুই নে ই?
— কি আবার থাকবে , ও দাদার বন্ধু ব্যস।
— দেখ আমিও তো মেয়ে , তার উপরে তোর দিদি। আমার চোখকে তুই এত সহজে ফাঁকি দিবি কি করে?
ভিতরে ভিতরে ঘামতে থাকে সে। কিন্তু দিদিকে তা বুঝতে দিতে চায় না। দ্রুত প্রসঙ্গ পাল্টাতে হবে। নাহলে দিদি ঠিক ধরে ফেলবে। তাই সে বলে , ফাঁকি দেওয়ার কথা কি বলছিস তুই ? বাদ দে, তোর শ্বশুরবাড়ির কথা বল। তারা সব কেমন লোক, জামাইবাবুই বা কেমন ?
— এড়িয়ে যেতে চাইছিস, সে কি আমি বুঝতে পারছি না ভাবছিস ?
সে আর কোন কথা বলতে পারে না। দিদিই আবার বলতে শুরু করে —- দেখ , ছেলেটা আমাদের সমাজের হলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু ওদের সমাজ আর আমাদের সমাজ সম্পূর্ণ আলাদা। ওর বাবা-মা তোকে কোনদিনই তাদের ছেলের বৌ হিসাবে মেনে নেবে না। আর আমাদের সমাজের অনুশাসনের কথা তো তুই ভালোই জানিস। বেচাল হলেই সারা জীবন ধরে তোকে তার মুল্য চোকাতে হবে।
একটানা কথাগুলি বলে থামে দিদি। আর চরম দোটানায় পড়ে যায় অঞ্জলি। সে ভালো করেই জানে দিদির একটা কথাও মিথ্যা নয়। কিন্তু মন তো কোন সমাজ মানে না। কোন অনুশাসনের বেড়া তাকে আটকে রাখতে পারে না। পরক্ষণেই ভাবে হৃদয়দার সঙ্গে তার কি’ই বা এমন সম্পর্ক। হয়তো সে’ই একতরফা মনে মনে মিথ্যা স্বপ্নের জ্বাল বুনে চলেছে। দুদিন একটু চোখাচোখি, টুকটাক দু’একটা কথা বলা বই তো নয়। সত্যিই কি তার বেশি কিছু নয় ? সেই প্রশ্নের উত্তর সে আজও খোঁজে। কথা বলতে বলতেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে দুই বোন। একটা মিস্টি স্বপ্নে ঘুম ভাঙে অঞ্জলির। স্বপ্নে সে দেখে হৃদয়দার সাইকেলে চেপে যাচ্ছে নতুন দেশে। যেখানে তাদের সমাজের অনুশাসন নেই , হৃদয়দাদের অর্থকৈলিন্যের অংহকার নেই সেই দেশের উদ্দেশ্যে তারা এগিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছে।
আচমকা পর্বত প্রমাণ ঢেউ ধেয়ে আসে তাদের যাত্রাপথে। সে খুব ভয় পেয়ে যায়।হৃদয়দা তাকে সাহস যোগায় — তুমি চেপে ধরে থাকো আমাকে। কিছু হবে না, ঠিক পেরিয়ে যাব দেখো। সে আরও জোরে হৃদয়দার কোমরটা জড়িয়ে ধরে। আর তাদের উপর দিয়ে বয়ে রাশি রাশি ঢেউ। ঢেউয়ে চাপা পড়ে যায় তারা। সে ভয়ে চোখ বন্ধ করে হৃদয়দাকে আরো জড়িয়ে ধরে চিৎকার করতে থাকে। হৃদয়দা তার দু’হাত ধরে নাড়া দিতে দিতে বলে — আর ভয় নেই। চোখ খুলে দেখ আমরা পেরিয়ে এসেছি ঢেউয়ের পাহাড়। চোখ খুলে সে দেখে দিদিকে জড়িয়ে ধরে সে শুয়ে আছে। আর তাকে তার দুহাত ধরে নাড়া দিচ্ছে দিদি। দিদির দিকে ভালোলাগার আবেশ জড়ানো দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে।দিদি বলে — কি রে , আ-আ করে ওইভাবে চিৎকার করছিলি কেন ? স্বপ্ন দেখছিলি বুঝি ? কোন উত্তর দিতে পারে না অঞ্জলি। হৃদয়দাকে ঘিরে দেখা স্বপ্নটা মনে পড়ে যায় তার। সে শুনেছে ভোরের স্বপ্ন নাকি সত্যি হয়। সেই কথা ভেবে অনাবিল প্রশান্তিতে ভরে যায় তার মন।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।