সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৫৪)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৫৪
অঞ্জলি বিষয়টির একটা নিষ্পত্তি করার কথা ভাবতে শুরু করে। নিস্পত্তি করা বলতে একমাত্র আলাপনবাবু ছাড়া তো আর অন্য কোন পথ নেই। তাকেই সব কিছু খুলে বলার সিদ্ধান্ত নেয় সে। তাছাড়া আলাপনবাবুই সন্দীপকে এই হোমে এনেছেন। সেই হিসাবে বিষয়টি নিস্পত্তি করার বিষয়ে তারও তো কিছুটা দায় বর্তায়। সেদিন বিকালেই বেশ কিছু বইপত্র নিয়ে হোমে আসেন আলাপনবাবু।বইগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেন , এগুলো সব একাদশ আর দ্বাদশ শ্রেণীর বই। তুমি এখন থেকেই পড়াশোনা শুরু করে দাও। উচ্চ মাধ্যমিক কিন্তু বিরাট কোর্স। এখন থেকে শুরু না করলে শেষ করতে পারবে না।
— কিন্তু আমার তো এখন মাধ্যমিক পরীক্ষারই রেজাল্ট বেরুলো না। পাশ করব না ফেল করব তার ঠিক নেই, তার মধ্যেই উচ্চ মাধ্যমিকের পড়া শুরু করে দেব ?
—- কেন তোমার মনের জোর নেই ? যাই করো না কেন মনের জোরটাই কিন্তু আসল।
—- সে আছে। আপনাকে রাগানোর জন্য বলছিলাম।
— আমাকে রাগাতে হবে না। নাও বইগুলো তুলে রাখো। পড়া শুরু করে দাও। যেখানে আটকে যাবে বলবে, আমি দেখিয়ে দেব।
— সে হবে ক্ষণ , আপনার সঙ্গে একটা বিষয়ে আমার জরুরী কথা আছে।
— জরুরী কথা ?
— হ্যা , যা বলি মন দিয়ে শুনুন।
তারপর সন্দীপ–শ্রাবণীর বিষয়টি আলাপনবাবুকে খুলে বলে সে।কথা শোনার পরই কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়তে দেখা যায় আলাপনবাবুকে। উদ্বেগ ঝড়ে পড়ে তার গলাতে — ছেলেটিকে আমিই নিজের দায়িত্বে হোমে ঢুকিয়ে ছিলাম।
এখন কিছু একটা অঘটন ঘটে গেলে আমি খুব মুশকিলে পড়ে যাব। ডি,এম সাহেবের কাছে মুখ দেখাতে পারব না।
—- খারাপটাই ভাবছেন কেন , এমন তো হতে পারে ডি,এম সাহেবের কাছে আপনার ভাবমূর্তি উজ্বল হলো।
— মানে ?
— ওদের দুটিকে মিলিয়ে দেওয়া যায় না ?
—- সেটা কি করে সম্ভব ?
— কেন , অসম্ভব কোথাই ? হোমের মেয়ে বলেই কি আমাদের ভালোবাসা, ঘর সংসারের স্বপ্ন থাকতে নেই ? সারাটা জীবন এই হোমের চার দেওয়ালেই কাটিয়ে দিতে হবে ?
— কিন্তু হোমের তো একটা নিয়ম কানুন আছে।
—- মানবতার চেয়ে বড় আর কিছু হয় কি ? একবার ভেবে দেখুন তো , কিছু মানুষের লোভ লালসার শিকার হয়ে সমাজ থেকে ছিটকে যাওয়া কোন মেয়েকে যদি আবার মূলস্রোতে ফিরিয়ে দেওয়া যায় তার চেয়ে ভালো আর কিছু হয় কি ? হোমের ইতিহাসেও তো সেটা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
—- সেটা অবশ্য ঠিক, তবে আমি ভাবছি ডি,এম সাহেব বিষয়টিকে কেমনভাবে নেবেন ?
— আমি বলি কি এখনই ডি , এম সাহেবকে কিছু বলার দরকার নেই। আপনি আগে ছেলেটি আর তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে সবদিক ভালো করে যাচাই করে নিন। তারপর যদি ভালো মনে হয় তখন না হয় ডি,এম সাহেবকে বুঝিয়ে বলবেন। আর সেটা আপনাকে পারতেই হবে। আমি যদি আপনাকে বুঝিয়ে রাজী করাতে পারি তাহলে আপনিই বা কেন ডি,এম সাহেবকে রাজী করাতে পারবেন না। তাহলে কেমন আফিসার আপনি ?
— ওরে, বাপরে এ যে দেখছি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিলে। দেখি কতদুর কি করতে পারি!
আলাপনবাবু বিদায় নিতেই দ্রুত ঘরে ঢুকে আসে শ্রাবণী। আর তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে যায় অঞ্জলির। কিছুটা রাগত স্বরে জিজ্ঞেস করে — তুই কোথায় ছিলিস এতক্ষণ ?
— বা -রে আমাকে নিয়ে কথা হবে আর আমি শুনব না ? আমি তো জানতামই আলাপনবাবু এলেই তুমি কথাটা পাড়বে। তাই আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। চুপিচুপি জানলার পাশটিতে এসে দাঁড়িয়েছিলাম।
— ওরে মেয়ে রে , তোর পেটে পেটে এত দুর্বুদ্ধি ? দাঁড়া তোকে দেখাচ্ছি মজা। বলে যেই না সে চড় তুলে এগিয়ে যায় অমনি তাকে জড়িয়ে ধরে বেশ কয়েকটা চুমু খেয়ে নেয় শ্রাবণী ।
আর তার আদরের ঠেলায় শশব্যস্ত হয়ে ওঠে অঞ্জলি। হাতের চেটো দিয়ে গাল কপাল মুছতে মুছতে বলে — বলি তো হলো কি তোর ?
— কি হলো না সেটাই বলো ?
তুমি আলাপনবাবুকে যা দিলে না সেটা শুনে আমার তোমারই প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে।
বলে শ্রাবণী ঠোট উঁচু করে আবার চুমু খাওয়ার জন্য তার দিকে এগিয়ে আসতেই সে সভয়ে দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে বলে , রক্ষা করো বাবা, অত আদর-সোহাগ আমার পোষাবে না। সে যাকে করার তাকেই কোর।
তারপর থেকে শ্রাবণীর সঙ্গে সম্পর্কটা আরও মধুর হয়ে ওঠে। সেদিন রাতে হোমে বিদ্যুৎ ছিল না। একে ভ্যাপসা গরম, তার উপরে মশার উৎপাত। তাই আলাপনবাবুর বইগুলো খুলে বসেও কিছুতেই মন বসাতে পারছিল না অঞ্জলি।বিষয়টি লক্ষ্য করে শ্রাবণী তার পিঠের কাছে বসে সমানে হাত পাখা করে চলে। সে চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায়। যত বলে , ওরে হাওয়া লাগবে না। তুই এবার ঘুমিয়ে পড় ততই শ্রাবণী পাখার জোর বেড়ে যায়।
গার্জেনি সুরে বলে , তোমার এদিকে মাথা না ঘামালেও হবে। তুমি বইয়ের দিকে মন দাও।
— ওরে আমার কোথা থেকে দিদিমনি এলেন রে। দেখবি মারব এক থাপ্পড়।
শ্রাবণীকে কিছুতেই নিরস্ত করতে না পেরে শেষে পড়াতেই মন দেয় অঞ্জলি।পড়তে পড়তেই এক সময় বলে, আচ্ছা শ্রাবণী তুই কি আমাকে ঋণ শোধ দিচ্ছিস নাকি বলতো ?
— কিসের ঋণ শোধ ?
— এই যে আজ তোর বিয়ের ঘটকালি করলাম।
কথাটা শুনেই চোখ ঠল ঠল করে ওঠে শ্রাবণীর। কান্না ভেজা গলায় সে বলে, তুমি কথাটা বলতে পারলে দিদি ? বাবাকে হারানোর পর আপনজনের ভালোবাসা কাকে বলে আমি জানি না। তোমাকে আমি দিদি বলে মনে করি। মাঝে কয়েকটা দিন সন্দীপের ব্যাপারটা নিয়ে তোমাকে ভয়ে এড়িয়ে যাচ্ছিলাম ঠিকই, কিন্তু বিশ্বাস করো আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। সেই তুমি আমাকে ঋণে শোধের কথা বলতে পারলে দিদি ?
ততক্ষণে শ্রাবণীর চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে জলের ধারা। হোমের সবাই তখন ঘুমিয়ে কাদা। সে দ্রুত শ্রাবণীকে কাছে টেনে নেয়। বলে , এই কান ধরছি। ঘাট হয়েছে। আর কোনদিন এরকম কথা বলে আমার বোনটার মনে কষ্ট দেব না। শ্রাবণীর চোখের জল মুছিয়ে দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে সেও। দীর্ঘক্ষণ দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা খোঁজে। একসময় দুজনের চোখের জল টপটপ করে বইয়ের পাতায় পড়তেই সম্বিৎ ফেরে তাদের। দ্রুত চোখ মুছে অঞ্জলি বলে , এখনই নতুন বইয়ের এমন হাল হলে আলাপনবাবুর কাছে আমাকে কথা শুনতে হবে কিন্তু।
আলাপনবাবুর কথা উঠতেই শ্রাবণী তার দিকে কৌতুক ভরা দৃষ্টিতে তাকায়। কেন কে জানে , কিছুটা যেন অস্বস্তিতে পড়ে যায় অঞ্জলি। সেটা চাপা দিতেই বলে , কি হলো আবার ? ওই ভাবে চেয়ে আছিস যে বড়ো ?
— যদি অভয় দাও তাহলে একটা কথা বলি ?
— কি কথা ?
— ওই যে একটু আগে ঋণ শোধের কথা বলছিলে না , ভগবান সেই সুযোগ যদি কোন দিন আমাকে দেন তাহলে একটা ঋণশোধের চেষ্টা আমি করব।
— দিদি — বোনের মধ্যে আবার ঋণ শোধের ব্যাপার থাকে নাকি? তবুও শুনি কি ঋণ তুই শোধ করতে চাস ?
— ঘটকালির ঋণ গো দিদি, ঘটকালির ঋণ ।
— কি উল্টো পাল্টা বকছিস ?
— উল্টো পাল্টা নয় গো দিদি , তুমি তো আমার ঘটকালি করেছো। আমিও তোমার ঘটকালি করে শোধ দেব।
— আমার ঘটকালি, কার সঙ্গে শুনি ?
—- কেন , আলাপনবাবুর সঙ্গে।
— তোর মাথাটা সত্যি গ্যাছে। এবার থাপ্পড় খাবি কিন্তু।
—- কেন , তুমি চাও না ?
— চাইলেই কি আর সবাই সব কিছু পায় রে। তোর মতো কপাল ক’জনের হয় বল ? তাছাড়া কোথায় আলাপনবাবু আর কোথায় আমি।
— হতেই পারে না। আমার দিদি এত ভালো , তার কপাল কখনও খারাপ হতেই পারে না। তাছাড়া আলাপনবাবুর দৃষ্টিতেও আমি সেই আভাস লক্ষ্য করেছি।
— হয়েছে হয়েছে। রাত শেষ হতে চলল। আয় এবার ঘুমোতে হবে নাকি।
তারপর দুজনে পাশাপাশি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। একটা মিষ্টি স্বপ্ন যেন মায়াঅঞ্জন পড়িয়ে দেয় তাদের চোখে।
ক্রমশ…