সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে অয়ন ঘোষ (পর্ব – ২)

বেদ-কথা
আগেই বলেছি ‘ত্রয়ী’র যে অর্থ বেদ পারঙ্গম ব্যক্তিরা করেছেন তাতে ঋক, সাম, যজুর্বেদকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। আবার ভিন্ন মতও রয়েছে, অথর্ববেদকে যে এই ‘ত্রয়ী’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি তার ধারণা সঠিক নয় বলে অনেক পন্ডিত ব্যক্তি মত প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে ঋক, সাম, যজুঃ – এগুলি মন্ত্র প্রকারভেদ। এই মন্ত্রগুলির মধ্যে পদ্য ও গদ্য উভয় মন্ত্র রূপই বর্তমান। অথর্ববেদের মধ্যে যে সকল মন্ত্র আছে তাদের লক্ষণ ঋক ও যজুঃ মন্ত্রের লক্ষণের ন্যায়। এর মধ্যে কোন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয়না। অতএব এই সকল পণ্ডিতদের মতে অথর্ববেদের কোন আলাদা মন্ত্র লক্ষণ নেই, তাই অথর্ববেদও এই ত্রয়ীর অন্তর্ভুক্ত। অথর্ববেদের স্বতন্ত্র মন্ত্র লক্ষণ না থাকলেও স্বতন্ত্র বেদত্ব আছে বলে পণ্ডিতরা মত প্রকাশ করেছেন। আসলে অথর্ববেদকে আলাদা গোষ্ঠীভুক্ত করার কারণ এই বেদের যজ্ঞের সহিত কোন সরাসরি সম্পর্ক না থাকা।কিন্তু পন্ডিত অনন্তকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মতে অথর্ববেদের সঙ্গে যজ্ঞের সম্পর্ক রয়েছে। প্রধান যজ্ঞের সাথে সম্পর্ক না থাকলেও, অভিচারাদিযাগে ও শান্তি পৌষ্টিকাদি কার্যে অথর্ব মন্ত্রের প্রয়োগ খুবই সবিশেষ। ঋগ্বেদের কিছু মন্ত্র অথর্ববেদের মধ্যে দেখা যায়। কেউ কেউ মনে করেন ঋগ্বেদের পুরুষসুক্তের মধ্যে এমন একটি মন্ত্র রয়েছে যা ঋগ্বেদের প্রকাশকালেই অথর্ববেদের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় :
তস্মাদ্ যজ্ঞাৎ সর্বহুতঃ ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে।
ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদ্ যজুস্তস্মাদজায়ত।।
ঋক সংহিতা ১৫-৯০-৯
বেদের উৎপত্তিতে এক বিরাট পুরুষকৃত আদি যজ্ঞের কথা বলা হয়েছে। সেই বিরাট পুরুষ যে আদি যজ্ঞ করেছিলেন সেই যজ্ঞ থেকে ঋক্ সকল, সাম সকল এবং যজুঃ সকল উৎপন্ন হয়েছিল। এখানে অথর্ববেদের কথা বলা হয়নি। তাই অথর্ববেদের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। অথর্ববেদে ‘অথর্বন্’ নামে ঋষি ও পুরোহিতের উল্লেখ আছে। এই ‘অথর্বন্’ পুরোহিত পার্সিদের ধর্মগ্রন্থের ‘জেন্দাবেস্তা’তে ‘অথ্রবন্’ নামে পরিচিত বলে অনেকে মনে করেন। পন্ডিতদের মতে আর্যগোষ্ঠীর ভারতীয় ও ইরাণীয় শাখা যখন সপ্তসিন্ধু তীরে ‘সুবাস্তু’ নামের জনপদে সরস্বতী নদী উপত্যাকায় একসাথে বাস করত, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে অথর্বন্ পুরোহিতের উৎপত্তি হয়েছিল। এটিকে যদি মান্যতা দিই তাহলে অথর্ববেদের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকা উচিত নয়।
চলবে…