সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৩

কিন্তু দ্রুত চিৎকারটা তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। আর অজানা এক আশঙ্কায় বুক কাঁপতে থাকে অঞ্জলিদের। ঠিক কি কারণে জানে না, কালিরাম জ্যেঠু আর তার মোড়ল পরিষদের চক্ষুশুল হয়ে পড়েছে অঞ্জলিরা। পাকে প্রকারে তাদের বিপাকে ফেলার চেষ্টা করে ওরা। তেমনই কোন কুঅভিসন্ধি নয় তো ? তাদের পোষা শুয়োর কারও অনিষ্ট করে নি তো ? হাস-মুরগি মারাংবুরুর থান নোংরা করে দেয়নি তো ? নানা ভাবনা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। কিন্তু ভেবেও কোন কুলকিনারা পায় না।
বেশিক্ষণ ভাবতে হয় না। চৌকিদার আর জগমাঝি সহ বাড়িতে ঢুকে পড়ে পাড়ার একদল জোয়ান–মুরব্বি। তাদের মধ্যে থেকে জগমাঝি সুবল কাকা বলে ওঠে , তোমাদের অনাচারে মারাংবুরুর কোপে পড়ে আমরা চরম সর্বনাশের মুখে পড়তে চলেছি। তাই সালিশি সভা ডাকা হয়েছে। মোড়ল তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।এই আশঙ্কাটাই করেছিল অঞ্জলিরা। সালিশিসভার মানে তো ওরা ভালোই জানে। যেমন করেই হোক অভিযুক্ত মানুষটিকে দোষী সাব্যস্ত করে মোটা টাকা জরিমানার নিদান হাঁকাই হলো সালিশি সভার অন্যতম উদ্দেশ্য। অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পর্যন্ত দেওয়া হয় না। তার জরিমানা দেওয়ার সামর্থ্য আছে কি নেই তা বিবেচনাও করা হয়না।
জরিমানা আদায়ের জন্য চরম চাপ সৃষ্টি করা হয়। তারপর জরিমানার টাকায় ঢালাও মদ আর শুয়োরের মাংস দিয়ে চলে দেদার ফুর্তি। তাই সুবল কাকার কথা শুনে বাবাকে কেমন যেন অসহায় দেখায়। অঞ্জলিরাও ভেবে পাই না কি এমন অনাচার করেছে তারা, যার জন্য এত তড়িঘড়ি সালিশীসভা ডাকতে হলো। বিপদের আঁচ পেয়ে দিদি আর সে একবার জগমাঝি আর একবারযোচৌকিদার কাকার পা জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে বলে — ও কাকা, বাবা যে এইমাত্র শ্মশান থেকে এলো , এখনও মুখে জল দেয়নি। কি হয়েছে আমাদের বলো। বাবাকে নিয়ে যেও না।
কিন্তু ওরা কোন কথা কানেই তোলে না। দু’বোনকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। অঞ্জলি ভেবে পায় না মানুষ কি করে এত নিষ্ঠুর হয়ে যায়। কি করে এত তাড়াতাড়ি সব কিছু ভুলে যায়।পাড়ার এই মানুষগুলোর অনেকেই তো তার মায়ের হাতের রান্না করা শুয়োরের মাংস আর বাবার পয়সায় মদ খেয়ে গিয়েছে। বাবা আর মদ খাওয়াতে পারে না বলেই কি সব ভুলে গিয়ে ওদের দলে ভিড়েছে ? শেষ পর্যন্ত মা’ও ওদের হাতে পায়ে ধরে। কি হয়েছে খুলে বলার জন্য আকুলি বিকুলি করে। কিন্তু ওরা কোন কথাই শোনে না। মা’কেও ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলে , যা বলার সালিশি সভাতেই বলা হবে।
তারপর আর কাউকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাবাকে তুলে নিয়ে চলে যায় ওরা। আর তারা কাঁদতে কাঁদতে ওদের পিছনে পিছনে পৌঁছোয় মোড়লের বাড়িতে।সেখানে তখন চারপায়ে রাজার মতো বসে আছে কালিরাম জ্যেঠু। আর তাকে ঘিরে গোল করে বসে রয়েছে পাড়ার লোক। বাবাকে নিয়ে গিয়ে ওরা বসিয়ে দেয় সেই গোলের ভিতর। বাবাকে দেখে তখন খুব কষ্ট হচ্ছিল অঞ্জলির। মুখ নিচু করে বসেছিল বাবা। আর তাকে উদ্দেশ্য করে নানা রকম মন্তব্য করছিল পাড়ার লোকজন। আর বাবার মাথা তত নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল।
বাবার অপরাধটা কি অঞ্জলিরা তখনও অনুমান করতে পারছিল না। তাদের চোখে মুখে তখন তীব্র হয়ে উঠেছিল উদ্বেগের ছাপ। মোড়ল তখন ধীরে সুস্থে হাতের তালুতে খইনি ডলছিল আর চোখ কুঁচকে বাবাকে দেখছিল। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, যেন ছিপের বঁড়শিতে বেঁধা মাছকে খেলিয়ে যখন ইচ্ছে হবে ডাঙায় তুলবে। বেশ কিছুক্ষণ পর হাতের খইনি মুখে চালান দিয়ে মুখ খোলে কালীরাম।একবার বাবাকে আর একবার তাকে ঘিরে থাকা লোকজনের দিকে চেয়ে সে বলে — তোমরা অনেকেই তো ব্যাপারটা শুনেছ। যারা শোন নি তারাও শুনে নাও। সুখলাল তার মাকে গোর দিয়ে আসার পর কুকুর–শিয়ালে সেই লাশ তুলে ছেঁড়াছেঁড়ি করে খাচ্ছে। চিল-শকুনেও ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে। একে তো কুষ্ঠে মরাটাই পাপ। তার উপরে এমন অনাচার মারাংবুরু সইবে না। তখন পাড়ার উপর অমঙ্গল নেমে আসবে। তাহলে তোমরাই বলো এখন কি করা যায় ?
উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে ওঠে — মারাংবুরুর পুজো দিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করতে হবে।
কালিরাম জনতার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় — পুজোর খরচ কি ভাবে যোগাড় হবে ?
ফের একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে জনতা বলে — ওর জরিমানা করা হোক।
হাসি ফুটে ওঠে মোড়ল এবং তার পারিষদদের মুখে। আর ঠাকুরমায়ের পরিনতির কথা শুনে শিউরে ওঠে অঞ্জলিরা। মরেও যেন শান্তি পেল না মানুষটা। হঠাৎ কালিরামের গলার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে তাদের। পাড়ার লোকেদের উদ্দেশ্যে সে বলে — তোমাদের কথা মতোই মারাংবুরুর পুজো এবং অন্যান্য খরচের জন্য সুখলালের এক হাজার টাকা জরিমানা করা হোল। সন্ধ্যার আগেই সেই টাকা ওকে মিটিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে শ্মশানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা হাড় মাংস আবার ভালো করে পুঁতে দিয়ে আসতে হবে। কি , সুখলাল তোমার কিছু বলার আছে ?
অঞ্জলিরা দেখে হাত জোড় করে উঠে দাঁড়িয়েছে বাবা। মনে হচ্ছে যেন চুরির দায়ে ধরা পড়েছে। বাবাকে দেখে খুব মায়া হয় তাদের। ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে। কিন্তু যাওয়া হয় না। বাবাকে গোল করে ঘিরে যেন প্রাচীর তুলে দিয়েছে পাড়ার লোক।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।