কিন্তু খাওয়া আর হয় না। মা তখন সবে ঘরে গিয়ে শুয়েছে। সে হৃদয়দাকে আসন পেতে বসতে দিয়ে ঘরের ভিতরে দুজনের জন্য ভাত বাড়ছিল। হঠাৎ রে রে করে ভেজানো দরজা ঠেলে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে পাড়ার একদল লোক।তাদের মধ্যে শোভন আর অশোকের গলাই বেশি শোনা যায়। বাড়ির ভিতরে ঢুকেই ওরা কাউকে কিছু কথা বলার সুযোগই দেয় না। হৃদয়দাকে চূড়ান্ত গালিগালাজ আর মারধোর করতে শুরু করে দেয়। সে গিয়ে আটকানোর চেষ্টা করে। তাতে হিতে বিপরীত হয়। সবাই তখন দুজনকেই মারধোর করে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে অঞ্জলি। কিন্তু কি ঘটতে চলেছে তা বুঝতে বাকি থাকে না তার।কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির উঠোনে হই-হট্টগোল বাড়তে থাকে। ঘরের ভিতর থেকেই সে শুনতে পায় সবাই বেশ উঁচু গলাতেই বলাবলি করছে — ওই যে গো রাজমিস্ত্রী ছোঁড়াটা দিন রাত আসে না , তার সঙ্গে সুকোর ছোট মেয়েটা ধরা পড়েছে।এই আশঙ্কাই করেছিল অঞ্জলি। তাদের যখন একঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেওয়া হল, তখনই সে আন্দাজ করেছিল এরপর মিথ্যা বদনাম দিয়ে সালিশি সভায় তোলা হবে তাদের।
এর রকম ঘটনা তো আকছারই ঘটে। আফশোষে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে তার।ওরা এই রকম ঘটনা ঘটাতে পারে জেনেও কেন সে ওদের হাতে সেই সুযোগ তুলে দিল ? কেন সে সন্ধ্যার পর খেয়ে যাওয়ার জন্য হৃদয়দাকে আটকে রাখল ? বেচারা খেতেও পেল না। নিজের জন্য ভাবে না সে। কিন্তু তারই চোখের সামনে হৃদয়দার হেনস্থা সে সইবে কেমন করে ? একের পর এক প্রশ্ন ভীড় করে আসে তার মনে। কিন্তু কোন সমাধান সূত্র আসে না। বরং দরজা খুলে ভিতরে ঢুকে আসে সনাতন টুডুর মোড়ল পরিষদ আর পাড়ার লোকজন। তাদের টেনে হিচড়ে ঘরের ভিতর থেকে বের করে। নিজের ওই মানসিক অবস্থাতেও ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না মায়েরও। মা হোপনকাকার পায়ে জড়িয়ে ধরে বলে — ও হোপন , অঞ্জুর বাবা নেই। ওর বাবা ফিরুক তারপর না হয় যা করার কোর।ও তো তোমার মেয়েরই মতো। সেই ভেবেই আমার কথাটা রাখ।
হোপনকাকা কোন কথা কানেই তোলে না। অঞ্জলি দেখে যে হোপনকাকাকে একদিন মা বাবার পাশাপাশি বসিয়ে যত্ন করে খাইয়েছে , সেই হোপনকাকাই পা ঝাঁকড়ে মাকে ফেলে দিয়ে বলে , তোমার মেয়ে ঘরের ভিতরে লোক ঢুকিয়ে ব্যবসা শুরু করে দিয়েছে। ওর জন্য আমাদের পাড়ার বদনাম হচ্ছে। আদিবাসী সমাজের মুখ পুড়েছে। তাই বিচারের জন্য সালিশি সভা ডাকা হয়েছে।
বলেই তাদের টানতে টানতে নিয়ে যায় সনাতনের বাড়ির উঠোনে। সেখানে তখন অনেক লোক।তাদের নিয়ে গিয়ে ফের একপ্রস্থ মারধোরের পর একটি তালগাছে দুজনকে বিপরীত দিকে মুখ করে বেঁধে দেয় হোপনকাকা। চলতে থাকে অশ্লীল টিকাটিপ্পনী, খিস্তিখেউড়। লজ্জায় — অপমানে চোখ বন্ধ করে ফেলে অঞ্জলি। হৃদয়দা কি করছে দেখতেও পায় না সে।ঘন্টা খানেক পর শুরু হয় বিচার পর্ব। মোড়ল পরিষদের সংগে কিছুক্ষণ আলোচনার পর সনাতন বলে — এই ছেলে- মেয়ে দুটো ঘরের দরজা বন্ধ করে চরম নোংরামি করছিল। পাড়ার লোকেরা তা হাতে নাতে ধরে ফেলেছে। এতে আমাদের সমাজের মুখ পুড়েছে। তাই এই সালিশি সভা ওদের প্রত্যেকের ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা ধার্য করেছে। আপনারা সবাই কি বলছেন ?
উপস্থিত জনতা বলে ওঠে —ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রায় শুনেই মুসড়ে পড়ে অঞ্জলি। ন্যায়–অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যে এখানে বৃথা সে অভিজ্ঞতা তো তার আছে। কিন্তু সে অত টাকা কোথাই পাবে ভেবে পায় না। তাই সে চুপচাপ থাকে। রাত বাড়তে থাকে। উপস্থিত লোকেরা একে একে পালা করে খেয়ে আসে , আর মজা দেখে। তারা দুজনই কেবল অভুক্ত থাকে। কেউ এক গ্লাস জলও এগিয়ে দেন না তাদের।
লজ্জা – অপমানে খিদে-তেষ্টাটাই হারিয়ে যায়। কি করে এই বিপদ থেকে উদ্ধার হবে তা ভেবে পায় না অঞ্জলি। মনে মনে মারাংবুরুকে ডাকে। মারাংবুরু বোধহয় সেই ডাক শুনতে পায় বলে মনে হয় তার। কারণ কোনও ভাবে খবর পেয়ে এক সময় কিছু লোকজন নিয়ে হৃদয়দার বাবা পৌঁছোয়। হৃদয়দার বাবার সঙ্গে তার কোনদিন আলাপ পরিচয় হয়নি। হৃদয়দাই একদিন দূর থেকে চিনিয়ে দিয়েছিল। সেদিন দুজনে কোনরকমে মুখ লুকিয়ে বেঁচে ছিল। হৃদয়দার বাবাকে দেখে সে কিছুটা আশার আলো দেখতে পায়। মনে মনে ভাবে , হৃদয়দার বাবা নিশ্চয় তাদের যে করেই হোক ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে। সেই হিসাবে দেখতে গেলে সালিশি সভার ঘটনা তাদের কাছে মন্দের ভালো হয়েছে। তাদের সম্পর্কের কথাটা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর হৃদয়দার বাড়ির লোকেরা নিশ্চয় তাদের বিয়েটা মেনে নেবেন। ঘটনার গতি প্রকৃতিই সেদিকেই এগোচ্ছে বলে মনে হয় তার। দফায় দফায় মোড়ল পরিষদের লোকেদের সঙ্গে হৃদয়দার বাবাকে আলোচনা করতে দেখতে পায় সে। ঘন্টা খানেক আলোচনার পর মোড়লের হাতে গুনে গুনে টাকা তুলে দেয় হৃদয়দার বাবা। আর তা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে অঞ্জলি। ভাবে, ছাড়া পাওয়াটা এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র। হৃদয়দার বাবার কথা শুনে সেই ধারনাটাই আরও বদ্ধমূল হয়ে ওঠে তার। টাকা মেটানো পর হৃদয়দার বাবা বলে , এবার তাহলে দড়িটা খুলে দাও। অঞ্জলি ভাবে, যাক বাবা এ যাত্রা কমের উপর দিয়েই পেরিয়ে গেল। হৃদয়দার সঙ্গে বিয়েটা না হওয়া পর্যন্ত শয়তানগুলোকে আর কোন সুযোগ নিতে সে দেবে না। মুক্তি পাওয়ার আনন্দে ওইটুকু সময়ের মধ্যে আরও কত কত কথা যে সে ভেবে ফেলে তার ঠিক নেই।
হৃদয়দার বাবার প্রতি শ্রদ্ধায় যেন মাথা নত হয়ে আসে অঞ্জলির। এত দায়িত্ববান মানুষ সে এর আগে দেখে নি। হৃদয়দার বাবা না থাকলে তো তাদের উদ্ধার হওয়ার কোন রাস্তায় ছিল না। কিন্তু অচিরেই তার ভুল ভেঙে যায়। হোপনকাকা এসে দড়িটা খুলতেই সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হোপনকাকা বাঁধন আলগা করে শুধু মাত্র হৃদয়দাকে বের করে তাকে আবার বেঁধে দেয়। চিবিয়ে চিবিয়ে বলে , তুই কোথা যাবি ? ওর বাবা টাকা দিয়ে ওকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। তোর টাকা কে দেবে ?
হোপনকাকার কথাটা শুনে হতাশ হয়ে পড়ে সে। এও কি সম্ভব হতে পারে। ভাবী পুত্রবধুকে কি কেউ এই অবস্থায় ফেলে দিয়ে যেতে পারে ? উনি পারলেও , হৃদয়দা নিশ্চয় তাকে না নিয়ে চলে যেতে পারবে না। নিশ্চয় তাকেও ছাড়ানোর জন্য বাবাকে চাপ দেবে।কিন্তু কোথাই হৃদয়দা ? তার চোখ দুটি হৃদয়দাকে খুঁজে বেড়ায়। ছাড়া পাওয়ার পর হৃদয়দা তো তার পাশে একবারও এল না। তার মন তো সেটাই চাইছিল। চাইছিল হৃদয়দা এসে বলুক , অঞ্জু তোমার কোন চিন্তা নেই। আমি পাশে আছি।কিন্তু হৃদয়দার সেই আশ্বাসের পরিবর্তে শোনা যায় মোড়লের গলা। মোড়ল তাকে উদ্দেশ্যে বলে, শোন ছেলেটার বাবা তো জরিমানার টাকা জমা দিয়ে ওকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। তোর কি হবে বল ?
অঞ্জলি আশা করে এবার নিশ্চয় হৃদয়দা এসে মোড়লের কথার জবাব দেবে। কিন্তু এবারেও হৃদয়দার গলা শোনা যায় না। বরং মোড়লের তাগাদা বাড়তে থাকে। অগত্যা মুখ খুলতে হয় অঞ্জলিকে। সে বলে, আমার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। আর থাকলেও দিতাম না। কারণ আমরা কোন অন্যায় করি নি। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসি। সময়মত একদিন বিয়েও করব।
তার কথা শুনে পাড়ার লোক তাচ্ছিল্যের সুরে অশ্লীল ছড়া কেটে বলে ওঠে — ভালোবাসার আর মরণ নেই। কই ছোঁড়াটা নিজে মুখে বলুক তো দেখি ভালোবাসার কথা, বলুক তো দেখি বিয়ে করবে। তাহলে না হয় বোঝা যাবে আমরা ভুল বলেছি।বড়ো আশা নিয়ে হৃদয়দার মুখের দিকে তাকায় অঞ্জলি। কিন্তু হৃদয়দা ভালো ছেলের মতো বাবার পাশটিতে দাঁড়িয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। লজ্জার মাথা খেয়ে তাকেই শেষ পর্যন্ত বলতে হয় — কই হৃদয়দা আজ সময় এসেছে। সবার সামনে এসে বলো , তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমাকে বিয়ে করতে চাও।এবারেও কোন কথা শোনা যায় না হৃদয়দার মুখে। বরং তার বাবা বলে, কিসের ভালো বাসা ? ও তো আমার ছেলের রেজা। ওই রকম কত রেজাই তো ছেলের সঙ্গে কাজ করে। তাহলে তো সবাইকেই বিয়ে করতে হয় ওকে।
কথাটা শুনে নির্বাক হয়ে যায় অঞ্জলি। নির্মম পরিহাসের মতো হৃদয়দার বাবার কথাটা তার বুকে বিঁধে যায়। মনে হয় এর চেয়ে তার মৃত্যু হলে ভালো হত। শেষবারের মতো ভালোবাসার মানুষটিকে খোঁজে তার দুচোখ। দেখতে পায় বাবার সঙ্গে সালিশিসভা ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তার হৃদয়দা। বেশিক্ষণ তাদের দেখতেও পায় না সে। ঝাপসা হয়ে যায় তার দৃষ্টি।