সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ২৯)
সালিশির রায়
কিস্তি – ২৯
দরজা খুলে সে দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্ত বিধ্বস্ত বাবা। নিজের বাড়িতেও বাবা যেন চোরের মতো চুপি চুপি আসে। বাবার আচরণে খুব অবাক হয়ে যায় সে। ঘরে ঢুকেই ধপাস করে মাটিতে বসে পড়ে হাফাতে থাকে বাবা। বোঝাই যায় বাবা ছুটে এসেছে।ইশারায় তাকে খাওয়ার জল চায়। সে ঘটি ভর্তি জল এগিয়ে দিতেই নিমেষে চোঁ চোঁ করে সব নিঃশেষ করে দেয় বাবা ।তারপর যা বলে তাতে হাড় হিম হয়ে যায় তার। বোলপুর গণনাকেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত থাকতে পারে নি তারা। শুধু তাদেরই এলাকাতেই নয় ,সবার সব হিসাব উলোট পালট করে দিয়ে গোটা রাজ্যে ধরাশায়ী হয়ে যায় রামবাবুদের দল।কার্যত তালাই গোটানো করে গুটিয়ে দিয়েছে বিরোধীরা।একের পর এক সেই হারের খবর পৌছোনোর সঙ্গে সঙ্গে গণনাকেন্দ্রের সামনে সুহাসবাবুদের দলের কর্মী সমর্থকদের জমায়েত বাড়তে থাকে। হার নিশ্চিত জেনে মাঝপথেই গণনাকেন্দ্রে ছেড়ে বেড়িয়ে আসেন রামবাবুরা। আর তাদের দেখেই রে–রে করে তাড়া করতে শুরু করে বিরোধী দলের লোকেরা।গাড়িতে চাপারও সুযোগ পান নি রামবাবুরা।
দীর্ঘদিন পর রামবাবুদের ক্ষমতাচ্যুত করে প্রতিটি এলাকায় বিরোধীরা তখন উল্লাসে ফেটে পড়ছে। শাসকদলের কর্মী সর্মথকরাও ভোটের ফল ঘোষণার পরই সেই উল্লাসে যোগ দিয়েছে। কে শত্রু আর কে মিত্র তা আর নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই কোথাও আশ্রয় নিতেও সংশয় হয়। টানা ১০ কিমি ফাঁকা মাঠে হেঁটেই সবাই পার্টি অফিসে পৌঁছোন। কিন্তু সেখানে ওঁত পেতে ছিল বিপদ।ততক্ষণে রামবাবুদের পার্টি অফিসে ঢোকার কথা চাউর হয়ে গিয়েছে। তার পরেই সেখানে চড়াও হয় বিরোধী দলের উন্মত্ত কর্মী – সমর্থকরা। যথেচ্ছ ভাংচুর চালানোর পর গেট বন্ধ করে পার্টি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয় তারা। আসবাব , বাসন সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র পোড়ার তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ তখন দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম দেখা দিয়েছে। তালাবন্দী মানুষগুলো তখন প্রানের বিকুলিতে একতলা থেকে দোতলায় আশ্রয় নিয়েছেন। আগুনের লেলিহান শিখাও একতলা ছাড়িয়ে দোতলার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সামনের চত্বরে দাঁড়িয়ে তখন উল্লাসে মত্ত একদল মানুষ।তালাবন্দী মানুষগুলোর মৃত্যু নিশ্চিত ধরে নিয়েই একসময় ফিরে যায় তারা।
ঘরের ভিতরে বন্দী মানুষগুলোও প্রাণের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। কারণ ততক্ষণে দোতলাও দাউ দাউ করে জ্বলতে শুরু করেছ। সবাই তখন আশ্রয় নিয়েছে ছাদে। ছাদে গিয়ে প্রাণ বাচানোর ক্ষীণ একটা আশার আলো দেখতে পান তারা।দেখা যায় পিছনে বাড়িতেই রয়েছে একটা খড়ের পালুই।প্রাণ বাঁচানোর মরীয়া চেষ্টায় একে একে সবাই ঝাঁপ মারেন সেই পালুইয়ে। তারপর যে যেদিকে পেরেছেন মাঠে মাঠে প্রাণের আকুলিতে দে ছুট। একটানা লোমহর্ষক সিনেমার গল্পের মতো কথাগুলো বলে থামে বাবা। তার চোখে মুখে তখনও আতঙ্কের ছাপ। কথাগুলো শুনে শিউরে ওঠে অঞ্জলি। মনে মনে ভাবে, খুব বাঁচা বাঁচিয়ে দিয়েছে মারাংবুরু। শুনেই যদি তার এই অবস্থা হয় তাহলে বাবাদের সেই সময়টা কি ভাবে কেটেছে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারে সে। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এক রাতেই সব জায়গায় চালচিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। তার ছোঁয়াচ লাগে তাদের পাড়াতেও। সকালে দরজা খুলেই সে তা টের পায়।
দরজার বাইরে বেরিয়েই দেখতে পায় তাদের বাড়ির চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে রয়েছে মদের বোতল , না ফাটা বোম-পটকা। সামনের চালার খড়গুলোও পড়ে রয়েছে দুরের রাস্তায়। তাদের কাউকে হাতের নাগালে না পাওয়ার রাগ যেন ওই ভাবেই মিটিয়ে নেওয়া হয়েছে। ওই ঘটনা থেকেই সে আচ করতে পারে পরবর্তী পরিস্থিতি।পাড়ার মানুষগুলোও কেমন যেন রাতারাতি বদলে গিয়েছে। একদিন আগেও যে মানুষগুলো যেচে কথা বলেছে সেই মানুষগুলোই এদিন সকাল থেকে তাদের দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে।বরং সবাই এখন সনাতনদের সঙ্গেই দহরম মহরম শুরু করেছে। বাবা নয় , সনাতনই যেন পাড়ার মোড়ল হয়ে উঠেছে। পাড়ার লোকেরাও এতদিনে বুঝে গিয়েছে ক্ষমতার বিপরীত দিকে থাকাটা বোকামি। তার প্রমাণও তো তারা এই কয়েকদিনে পেয়ে গিয়েছে হাতে হাতে।সরকারি যে সব সাহার্য্য বাবার হাত দিয়ে পাড়ার লোকেদের কাছে পৌঁছোত তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তা এখন আসছে সনাতনের মাধ্যমে। তাই বাবাকে মোড়ল পদ থেকে সরানো যে এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র তা আর বুঝতে বাকি থাকে না অঞ্জলির। কিন্তু তার আগেই বাবাকে মোড়ল পদ ছেড়ে দিতে বলবে সে। যে পদে কোন মান্যতা নেই , সেই পদ আঁকড়ে থাকা মানে তো যেচে গলা বাড়িয়ে জুতোর মালা নেওয়া। কিন্তু সেই সুযোগ আর মেলে না।
সেদিন সকাল থেকেই পাড়ায় যেন চাপা উত্তেজনার আঁচ পায় অঞ্জলি। সারাদিন দফায় দফায় সনাতনের বাড়িতে পাড়ার লোকেরা জটলা করতে দেখা যায়। বিকালের দিকে সেখানে এসে দাঁড়ায় সুহাস কবিরাজের গাড়ি। বাড়ি থেকেই অঞ্জলি দেখতে পায় সুহাসবাবুর সঙ্গে একে একে গাড়ি থেকে নামে শোভন , অশোকরা। খুব আশ্চর্য হয়ে যায় সে। ভোটের দিনেই রামবাবুদের মুখে সে শুনেছিল ওরা নাকি তিন মাসের আগে জামিনই পাবে না। পুলিশ সেই রকম ব্যবস্থাই করবে।কিন্তু কয়েকদিনেই সব উল্টে গেল। তবে তা নিয়ে অবশ্য অঞ্জলির কোন আক্ষেপ নেই।বরং বিনা দোষে ওদের জেল খাটতে হচ্ছিল বলে সে অপরাধ বোধেই ভুগছিল। যেন তাদের জন্য ওদেরকে জেলে যেতে হয়েছে। সরাসরি কোন ভূমিকা না থাকলেও তাদের বাড়ি থেকেই তো ব্যাপারটা সংঘটিত হয়েছিল।সেটাই তো পাড়ার লোকেরা ধরবে। রামবাবুর কলকাঠি নাড়া তো কেউ ধরবে না। তাকে তো আর নাগালের মধ্যে পাবে না। তাই তাদের উপরেই সব রাগ গিয়ে পড়বে ওদের। তারই নমুনা দেখা যায় সুহাসবাবুর গাড়িটা পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার পর।
বাবার মোড়ল পরিষদের চৌকিদার হোপনকাকা হাজির হয় তাদের বাড়িতে। তাকে দেখে অঞ্জলি ভাবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হোপনকাকা নিশ্চয় আলোচনা করতে এসেছে। সেও একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এই রকম পরিস্থিতি কারও সঙ্গে আলোচনা করতে পারলে মনের চাপটা অনেকখানি হালকা হয়ে যায়। সেই জন্য সে উৎসাহ ভরে মোড়াটা এগিয়ে দিয়ে বলে – এসো, হোপনকাকা বসো। কিন্তুতাকে অবাক করে দিয়ে হোপনকাকা বলেন, না রে বসব না। পাড়ার সবার বাড়ি যেতে হবে।তোর বাবাকে বলে দিস আজ ঠাকুরতলায় মিটিং।
—– কিসের মিটিং ?
তার কথা শেষ হতে না হতেই চেয়ে দেখে হোপনকাকা ততক্ষণে তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে।মিটিংটা যে তার বাবাকে মোড়ল পরিষদ থেকে সরানোর জন্য তা বুঝতে বাকি থাকে না তার। সে খুব একটা অবাক হয় না। এমনটা যে হবে সেই আন্দাজ তো ভোটের ফল ঘোষণার পরই করেছিল সে। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে যায় হোপনকাকার আচরণে। পাড়ার লোকেদের মিটিং-এর ডাক দেওয়ার কথা চৌকিদারেরই। সাধারণত মোড়লের নির্দেশেই সেই মিটিং ডাকা হয়। মোড়লের অপসারণ কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোন ব্যাপার হলে অবশ্য কেউ মাথা হয়ে পাড়া ডাকতে পারে। কিন্তু বাবা মিটিংয়ের ডাক দিতে বলেছে বলে তো তার জানা নেই। তার মানে হোপনকাকা সনাতনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। তার মোড়ল পরিষদে জায়গা পাওয়ার জন্য বাবার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে একটু বাঁধল না তার ?
অঞ্জলি জানে,বিপদে আপদে বাবা হোপনকাকাকে নানা ভাবে সাহার্য্য করত। তার এই মুল্য দিল হোপনকাকা ? তাদের এই দুঃসময়ে বাবাকে ছেড়ে সনাতনের সঙ্গে হাত মেলাল ? চৌকিদারন পাওনাটুকুই তার কাছে বড়ো হলো। মিটিং সহ বিভিন্ন কাজে পাড়া ডাকার জন্য পাড়ার লোকেদের দেওয়া চাঁদা থেকে বাৎসরিক কিছু টাকা পায় চৌকিদার। সেটাই তার কাছে বড়ো হলো ? সেটার জন্যই বাবার মোড়ল পরিষদ ভেঙে যাওয়ার পরও যাতে সে চৌকিদার পদে বহাল থাকে তার জন্যই কি সনাতনের দলে ভিড়ল সে ? হোপনকাকারই বা দোষ কি , ক্ষমতা পরির্তনের সঙ্গে সঙ্গে তো রাতারাতি অনেক কিছুই বদলে যায়। সে অবশ্য বাবাকে ওই মিটিংয়ে কিছুতেই যেতে দেবে না। মিটিং এ যাওয়া মানেই তো মনগড়া কোন অভিযোগে অপদস্থ হওয়া। তার থেকে ওরা এক তরফা ভাবেই গড়ে নিক মোড়ল পরিষদ। তাই বাবাকে সে কিছু বলেই না। কিন্তু বাবার জানতেও কিছু বাকি থাকে না। দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে দু’জন লোক।