সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৪৯)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৪৯
তবুও দীর্ঘদিনের জমে থাকা দমবন্ধ করা গুমোট আবহাওয়াটা কেটে হোমে যেন বইতে থাকে স্বস্তির সুবাতাস। সবাই ধন্য ধন্য করে অঞ্জলিকে। সুলতাদি বলে , তুমি যদি আরও আগে হোমে আসতে তাহলে এই লাঞ্ছনার জীবন এতদিন বইতে হত না। তার কথা শেষ হতে না হতেই বিমলদি বলে , তুই তো আচ্ছা বেআক্কেলে দেখছি। কপাল না পুড়লে কেউ কি এখানে আসে ?
— ঠিক, আজ কাল সব কিছু বড্ড ভুলভাল হয়ে যাচ্ছে রে। আসলে এসময়ই তো ওরা তুলে নিয়ে গিয়ে পাটক্ষেতে আমার উপরে নির্যাতনটা করেছিল। তাই এইসময়টা এলেই আমার কি রকম যেন হয়ে যায়।
অঞ্জলি জানে ঘটনটা। স্বামীর সঙ্গে মেলা দেখে ফেরার পথে কয়েকজন মুখে বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছিল সুলতাদিকে। স্বামী তাকে বাঁচানোর চেষ্টা তো করেই নি , বৌকে আর ঘরেও তোলেনি। আবার একটা বিয়ে করেছে। হোমের সব মেয়ের জীবনের ইতিহাস প্রায়ই একই রকম। কিছুক্ষণ পর সাবিত্রীদি বলেন, এতদিনে আমার মোবাইলে একটা কাজের কাজ হল।
অঞ্জলি বলে, হ্যা ওটার সাহার্য্য না পেলে সত্যি কিছু করা যেত না। তার কথা শেষ হয় না। সামনে এসে দাঁড়ায় শ্রাবণী। ঠোট ফুলিয়ে বলে, আঃ আর আমি বুঝি কিছু করি নি। সেই থেকে ঠাকুরকে ডেকে চলেছি, আর আমার কোন নাম গন্ধ নেই।
— এই দেখ , আজকের দিনে আবার রাগ করতে আছে ? তোর সাহার্য্য আর সাহসেই তো আমি এতদুর এগোতে পেরেছি।
— তবে, তবে। সেটা বলো সবাইকে। আনন্দে শিশুর মতো হয়ে ওঠে শ্রাবণী।
ততক্ষণে অফিস ঘরের টিভিতে খবর শুরু হয়েছে। সবাই যেন হামলে পড়ে অফিস ঘরে। টিভিতে তখন ভেসে ওঠে সুস্মিতের গলা। আজ একটু অন্য রকম গলায় সুস্মিত বলতে শুরু করে , মোতিপুরের সেই নির্যাতিতা তরুণীর তৎপরতায় ফাঁস হয়ে গেল হোমের যৌন কেলেঙ্কারির পর্দা। গ্রেফতার হলেন এক মহিলা সহ হোমের অন্যতম পরিচালক। খোদ জেলা সদরে অবস্থিত ওই হোমে মেয়েদের অসহয়তার সুযোগ নিয়ে বছরের পর বছর যৌন শোষণ চালাতেন পরিচালক।
এদিন মোতিপুরের ওই তরুণীর সঙ্গে একই আচরণে উদ্যত হন পরিচালক। কিন্তু তার আগেই সেই খবর গোপনে সংবাদ মাধ্যমের কাছে পৌঁছে দেন তরুণী। সংবাদ মাধ্যমের কাছে সব শুনে রাতেই হোমে হানা দেন জেলাশাসক। তার কাছে সমস্ত মহিলাই যৌন নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। তারপরই গ্রেফতার করা হয় মহিলা সহ পরিচালককে। হোমের দায়িত্ব এখন নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে প্রশাসন। হোমে বইছে এখন খুশীর হাওয়া। বীরভূম থেকে ক্যামেরায় অয়নের সঙ্গে সুস্মিত। সঙ্গে সঙ্গে অন্য চ্যানেল ঘোরায় শ্রাবণী। সব চ্যানেলেই এখন তাদের হোমের খবরটা দেখাচ্ছে। কোথাও মুখটা অস্পষ্ট করে দিয়ে তাদের বলা কথা প্রচার করা হচ্ছে। কোথাও আবার চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ওইসব খবর দেখে আর খোস গল্প করতে করতে অফিস ঘরেই পড়ে থাকে সবাই। এক রাতেই হোমটা যেন একটা একান্নবর্তী পরিবার হয়ে ওঠে।অফিস ঘরে বসেই ঠিক হয়ে যায় পরের দিনের কর্মসূচি। হোমের দায়িত্ব ডি,এম সাহেব অঞ্জলিকেই দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু অঞ্জলি ঠিক করে ওই দায়িত্বটা সে সাবিত্রীদিকে নিতে বলবে। এমনিতে হোমের সব মেয়েই মনমরা , কিন্তু সাবিত্রীদি যেন একটু বেশি মনমরা হয়েই থাকে। তবু একটা কাজের মধ্যে জড়িয়ে থাকলে কিছুটা ভুলে থাকতে পারবে বলেই কথাটা ভেবেছে অঞ্জলি। তাই সে সবার সামনে প্রস্তাবটা রাখে — কাল থেকে হোম দেখভালের দায়িত্ব কিন্তু সাবিত্রীদির , কি বলছো তোমরা ?
সবাই একসংগে বলে ওঠে — হ্যা হ্যা, ঠিক বলেছো।
সাবিত্রীদিই কেবল শশব্যস্ত হয়ে বলে ওঠেন , না না তা কেন ভাই ? ডি,এম সাহেব তোমাকে দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছেন , তারপরে আমি কেন আবার ?
— দিদি থাকতে বোন খেটে খেটে মরবে তা হবে না। তুমিই যা করার করবে, আমরা সবাই তোমাকে সাহার্য্য করব। আবার সবাই বলে ওঠে — ঠিক, একেবারে ঠিক কথা।
আর কোন কথা চলে না সাবিত্রীদির। কোন রকমে অস্ফুটে বলেন, তোদের নিয়ে আর পারি না বাবা। পরে কোন ভুলচুক হলে আমাকে দোষ দিলে হবে না কিন্তু।
অঞ্জলি বলে, তুমি আমাদের দিদি না , তোমার ভুল হতেই পারে না।
দেখতে দেখতেই আঁধার পাতলা হয়ে আসে। কি করে যে একটা রাত কেটে যায় কেউ বুঝতে পারে না। সকাল হতেই অবশ্য সবাই একে একে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হতে নিজের নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। অঞ্জলিও মুখ চোখ ধুয়ে পরিস্কার হয়ে আসে। তারপর চা খেতে খেতে আবার গতরাতের বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় মেতে ওঠে সবাই। সাবিত্রীদির তত্ত্বাবধানে কয়েকদিনের মধ্যেই হোমের পরিবেশটাই পাল্টে যায়। এতদিন যে রাঁধুনির হাতের রান্না তারা মুখে তুলতে পারত না, এখন তার হাতের রান্নার স্বাদই পাল্টে গিয়েছে।আসলে বরাদ্দ তেল মশলা যে যেমন পারত সরিয়ে নিত বলেই এতদিন রান্নার ওই হাল হত তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হোমে রান্না আর কাজের জন্য মাইনে করা দুজন লোক আছে।
প্রথমদিকে তারা ভেবেছিল ডি,এম সাহেবকে বলে ওদের ছাড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই সব কিছু হাতে হাতে করে নেবে। তাতে যে টাকাটা সাশ্রয় হবে তা দিয়ে খাবারের মান আরও একটু ভালো করা যাবে। কিন্তু এই বাজারে চাকরি গেলে বেচারারা মুশকিলে পড়ে যাবে ভেবেই আর ওই পথে এগোয় নি তারা। বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিনগুলো। হোমে মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন সাংবাদিক দাদারা। তাদের কাছেই খবর পায় প্রশাসন নাকি নিরাপত্তার জন্য তাদের গ্রামের পরিবর্তে অন্য একটি গ্রামে তার জন্য বাড়ি, জল, বিদ্যুৎ সব রকমের সুবিধাযুক্ত পুনবার্সনকেন্দ্র গড়ছে। হোম থেকে ছাড়া পেয়ে সে সেখানেই উঠবে। ভাবা হচ্ছে তার কর্মসংস্থানের কথাও। কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে যায় অঞ্জলি। নিরাপত্তার জন্য তাকেই গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে ? দুষ্কৃতীদের পরিবারের জন্য গ্রামে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারল না প্রশাসন ? কোন দোষ না করেও যে গ্রামে সে জন্মেছে , ছোট থেকে মানুষ হয়েছে, যে বাড়িতে তার প্রিয়জনদের স্পর্শ লেগে আছে সেই গ্রাম, সেই বাড়ি তাকেই ছেড়ে আসতে হবে। আর যারা তার সব কেড়ে নিয়েছে, তাদের পরিবারের লোকেরা বহাল তবিয়তে গ্রামে থাকবে।
তবুও মন্দের ভালো তার কথা ভাবা হয়েছে। সাংবাদ মাধ্যম না থাকলে বোধহয় হাত ধুয়ে ফেলত প্রশাসন। তারই মধ্যে একদিন মা, দিদি আর জামাইদাদাও আসে। পুলিশকর্মীরা অবশ্য জামাইদাদাকে হোমের ভিতরে ঢুকতে দেয়নি। দিদি আর মা কে নিয়ে সে অফিস ঘরে বসিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করে। মা দিদির বাড়ি থেকেই নাড়ু আর চালভাজা করে নিয়ে এসেছিল। সে সবাইকে নাড়ু আর চালভাজা দেয়। সবাই এসে মা আর দিদির সঙ্গে দেখা করে ধন্যবাদ জানিয়ে যায়। এখন এইরকমই চল হয়েছে। অধিকাংশেরই বাড়ি থেকে কেউ আসে না। কিন্তু তার মতো যে ক'জনের বাড়ির লোক যাই নিয়ে আসুক না কেন সবাই ভাগ করে খাওয়া চায়। দিদিকে সে জিজ্ঞেস -- হ্যারে দিদি ভাই আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করে নি ?
—- করে নি আবার ? বার বার শুধু ছোড়দি কই আর ছোড়দি কই। আমি বলেছি চাকরির টেনিং নিতে গিয়েছে। ফিরেই তোকে হোস্টেল থেকে আনতে যাবে। তবে আবার ক্ষান্ত হয়।
ভাইয়ের কথায় মনটা খারাপ হয়ে যায় অঞ্জলির।আজ কতদিন সে প্রিয়জন ছাড়া হয়ে হোমে পড়ে রয়েছে। কবে আবার সবার সঙ্গে গিয়ে মিলতে পারবে কে জানে ?তার মনের ভাব আচ করে দিদি বলে, আসার পথে দেখে এলাম বালিপাড়ায় তোর জন্য বাড়ি তৈরি করছে সরকার। শুনছি নাকি ওদের সাজা ঘোষণা হয়ে গেলেই তোকে ওই বাড়িতে ফিরিয়ে দেবে।আর নানা কথা হয় মা আর দিদির সঙ্গে। কথায় কথায় দিদি বলে, আসার সময় শুনে এলাম হৃদয়ের সঙ্গে নাকি পাশের গ্রামের একটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে গত সপ্তাহে। হৃদয়টা যে এত বড়ো মিচকে শয়তান হতে পারে তা আন্দাজও করতে পারি নি। কথাটা শুনে মনটা উদাস হয়ে যায় অঞ্জলির। দীর্ঘশ্বাস চেপে বলে, বাদ দে তো ওসব কথা। বরং পারলে দেখ বাবার কোন খোঁজখবর করতে পারিস কিনা।
— সে চেষ্টা কি আমি করছি না ভাবছিস। কিন্তু কোন পাত্তাই করতে পারছি না।
দেখতে দেখতে ফেরার সময় হয়ে আসে দিদিদের। সে গিয়ে গেট পর্যন্ত তাদের এগিয়ে দিয়ে আসে।দিদিরা গেটের বাইরে পা রাখতেই তার চোখে নেমে আসে জলের ধারা। কেউ তা জানতেও পারে না।