সাবির সুবীর দুজনে বাড়িতে না জানিয়ে এসেছে। ওরা কথায় গিয়েছে বাড়ির কেউ জানেনা।বাড়ির লোক থানায় খবর দিলেও তারা কেউ খুঁজে পাবেনা। এদিকে ওরা মরা বিধ্যাধরীর কিনারে এমন একটা ঘরে বন্দী হয়ে গেছে যে ঘরে শতাব্দীর পর শতাব্দী কোনো মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি।
ওরা বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড় পড়েছে। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে আর বলছে।এমন সময় সাবির বলে উঠলো ‘ চাঁদের পাহাড়ের শংকর যেমন সেই তিন কোনো গুহায় বন্দী হয়েছিল। আবার একসময় ঠিক উদ্ধার পেয়েছিল। নিশ্চই আমরাও উদ্ধার পাবো ‘
সুবীর বললো ‘ দেখ আফ্রিকার কলাহারির মরুভূমিতে যেমন মানুষ নেই। এই এলাকা ও তেমন সুনশন । চেচামেচি করলে সাধু বাবাও শুনতে পাবেন। ‘ সত্যি উদ্ধার পাওয়া এমন সহজ নয়।
ওরা বন্ধ ঘর থেকে চেচামেচি করতে থাকে। কিন্তু বাইরের কেউ শুনতে পায় না। আর এই ঘর ও বহু পুরাতন আমলের তাই অনেক টা উঁচু।
সাবির যখন হঠাৎ ঘরের মধ্যে পড়ে যায় তখন ফাঁক ছিল অল্প। কিন্তু সুবীর পড়ে যাবার সময় চাঙ্গর খসে পড়ে ফলে ফাঁক অনেক টাই হয়েগেছে। আর সূর্যের আলো আগের থেকে বেশি ঢুকছে। ওরা প্ল্যান করলো এই আবছা আলোর ঘরের মধ্যে ইট কাঠ জোগাড় করে একটু উচু করে তার উপর পা দিয়ে বাইরে বেরোনোর।
যথা রীতি ওরা সেই কাজ করতে থাকে। ওরা এবার ঘরটার দিকে দেখতে থাকে। ওমা এ যে বিশাল হলঘর! আবছা আলোয় দেখে এখানে মোটা মোটা থাম দেওয়া। হল ঘরের এক দিকটায় একটা সিন্দুক! লোহা ও কাঠ দিয়ে বানানো! আর উপরে যে কাঠ টা পড়েছিল। হুবহু সিন্দুকের গায়ে তেমন কাঠ লাগানো! তবে উপরের কাঠ টা ক্ষয়ে গেছে। এক অংশে লেখা তবে সিন্দুকের গায়ে যে কাঠ টা লাগানো তার গায়ে লেখাটা পুরোপুরি বেশ বোঝা যায়। তবে কি ভাষায় এটা লেখা সাবির সুবীর কেউ জানেনা। ওরা হল ঘরের দিকে দেখলো প্রায় ক্ষয়ে যাওয়া কিছু আসবাব।
বিধ্যাধরীর তীরে এমন এক অজানা, মানুষের স্মৃতির মধ্যেও যা নেই এমন একটা হলঘর যা কিনা মাটির নিচে চাপা হয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দী! ওদের চোখে মুখে ও বিশ্বয় মাখানো।
হলঘর টা বেশ বড়ো।দেখেই বোঝা যায় বহু লোকের সমাগম এখানে সম্ভব ছিল।ওরা দেখলো হলঘরের পাশাপাশি আরও কিছু ঘর আছে। তবে সেদিকটা ঘুট ঘুটে অন্ধকার। তাই যাওয়ার সাহস কেউ করলনা। যাই হোক ওরা হলঘর থেকে ইট কাঠ, কংক্রিটের চাঙ্গর সংগ্রহ করে বেরোনোর জায়গাতে জড়ো করতে থাকে আর। তবে ওরা দুজনেই সিন্দুক টা সরানোর চেষ্টা করছে। যদি ঐ সিন্দুক টির উপর পা দিয়ে বেরনো যেতে পারা যায়।
অবশেষ সাবির সুবীর দুই বন্ধু বেরোনোর মত রাবিশ জড়ো করে ফেলে বেরোনোর জায়গাটা বেশ উচুঁ করে ফেলেছে। দুজনের মধ্যে ঠিক হলো সাবির প্রথমে উপরে উঠবে তার পর উপর থেকে সুবীর কে তুলে নেবে। সেই মত সাবির উপরে উঠেছে। কিন্তু বেরোনোর মুখেই ঝোঁপের মধ্যে একটা কিছু দেখে ও থমকে গেল! নিচে থেকে সুবীর তাগাদা দিচ্ছে কি হলো উঠছিস না কেনো? সাবির নিচু হয়ে বললো একটা লাঠি দে। আর নিজের হতেও লাঠি রাখ । কেনো জিজ্ঞাসা করতেই সাবির বললো ঝোঁপের কাছে একটা কেউটে সাপ বলে মনে হচ্ছে। ওরা জেনেছিল সাপ শুনতে পায় না তবে মাটির ভাইব্রেশন বুঝতে পারে। সেই মত ওরা দুজনে লাঠি দিয়ে বেরোনোর মুখে আঘাত করতে থাকে। মাটি তে আঘাত করতে করতে সাবির বেরোনোর মুখে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। অবশেষে সাপটা চলে যায়। এর পর সাবির উপরে উঠে এলো। আর তার বন্ধু সুবীর ও উপরে উঠে এলো।
উপরে উঠে এসে দুজনে রীতিমত হাঁপাতে থাকে। ওরা বেশ বিস্ময় মাখা ভয়ে তাকিয়ে আছে। ওরা বাড়িতে যেতে পারলেই যেনো বাঁচে! ওপরে উঠেই ওরা বুঝতে পারলো ওই ঘর টার উপর ওই বট গাছটা দাঁড়িয়ে। ওরা লুকেয়ে লুকিয়ে দেখলো কাপালিক বাবাকে দেখা যাচ্ছে না। আর একটু এগিয়ে গিয়ে দেখলো কাপালিক বাবা ওদের দিকে পিছন ফিরে আছে কুটিরের কাছে। দুই বিচ্ছু আসতে আসতে বেড়া ডিঙিয়ে বাইরে খালপাড়ের রাস্তায় এলো। দেখলো ওদের দুটো সাইকেল একই ভাবে শোয়ানো আছে। সাইকেল নিয়ে দে দৌড়। ওরা আর চাম্পাহাটির রাস্তায় না গিয়ে সোজা নাটাগাছির রাস্তা দিয়ে বেনিয়াবৌ তে এলো সাবিরের বাড়িতে।
চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল ওরা বেশ বিদ্ধস্ত।সুবীরের বাড়ির লোকেরা এদিকে সাবিরের বাড়িতে এসে উপস্থিত। দুজনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা বলে। আর একটু দেরি হলে দুই বাড়ির লোকেরা সোনারপুর থানায় জানিয়ে আসত। বাড়ির লোকজন অধীর আগ্রহে বসেছিল। সাবিরের মা তো প্রায় কাঁদতে বসেছিল।দুজনকে অনেকক্ষণ দেখা যায়নি। আর ওরা না বলেই বেরিয়েছিল। বাড়ির লোকেরা দুজনকে দেখে যেনো ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলো। টিংকু মামা কাছেই বসেছিল। ওরা পুরো ঘটনা টা বললো। আর সঙ্গে করে সেই কাঠ টা নিয়ে এসেছিল । টিংকু মামা দিব্যেন্দু কাকা কে ফোনে ব্যাপারটা জানালো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই মাস্টার মসাই যার সাথে নেমিনাথ উদ্ধারের সময় কথা হয়েছিল। তাকে সাবির সুবীর ফোন ঘটনাটা জানালো। আর হোয়াটস অ্যাপে বিধ্যাধরীর তীরে পাওয়া ক্ষয়ে যাওয়া কাঠের ছবিটা পাঠালো। গবেষক মাষ্টারমশাই তো রীতিমত উত্তেজিত।
শেষে ঠিক হলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক গণ। স্থানীয় ইতিহাসের এক্সপার্ট দিব্যেন্দু কাকা, টিংকু মামা, আর সাবির সুবীরকে নিয়ে একটা উদ্ধারকারী টিম তৈরি করা হবে। সাবির সুবীর দুজনে ওই জায়গাটা নিয়ে যাবেন।