বিচ্ছু দুটো বটগাছতলায় বসে জিলিপি খাচ্ছে আর বলছে। ইস পর্তুগিজ জাহাজঘাঁটি টা যদি পাওয়া যেত! কাপালিক বাবা ঐ বট তলায় কাউকেই যেতে দেননা। আর বট গাছে যেসব সুতো, ঘট বাঁধা আছে সবই উনি বেঁধেছেন। গ্রামের মানুষদের সরা সরি ওখানে বাঁধার নিয়ম নেই। শুধু তিথি নক্ষত্র দেখে গ্রামের মানুষরা এখানে আসেন তবে কেউ বেড়া ডিঙিয়ে ভিতরে প্রবেশ করেন না। কাপালিক বাবা তেলপড়া ,জলপড়া দেন । গ্রামের লোকজন বাইরে থেকে নিয়ে যান।
কাপালিক বাবা যে সম্প্রদায়ের তারা এক কালে নরবলি করতেন। আর এই শশ্মানেই এক কালে নরবলি হতো। গ্রামের লোক এই দিকে আসেন না। ছোট্ট কুটিরে কাপালিক সাধু বাবা একাই থাকেন। আগে তার সাথে থাকতেন তার সম্প্রদায়ের কাপালিক, তিনি প্রায় দশ বছর আগে গত হয়েছেন ।
কাপালিক বাবার গুরু তার শিষ্যদের কে বলে দিয়ে ছিলেন তারা যেন সব সময় এই বট তলাকে নজরে নজরে রাখেন। আর এখানে কেউ যেন না আসে। কারণ জানতে চাওয়ায় তার গুরু কিচ্ছু বলতে পারেন নি। এই কাপালিক বাবার গুরু যখন শিষ্য ছিলেন, তার গুরুও বলে দিয়েছিলেন এই বটতলাকে সব সময়ে নজরে নজরে রাখতে। তিনিও কারণ টা কি বলতে পারেননি। এই ভাবেই গুরু শিষ্য পরম্পরায় এই কাপালিক সম্প্রদায় এই শুনশান শশ্মানের বট তোলাকে নজরে নজরে রেখেছেন ।কিন্ত কেনো নজরে নজরে রেখেছেন এত কড়া ভাবে ওরা কেউ জানেনা। শুধু ওরা এটাই জানে ওটা গুরুর নির্দেশ তাই অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে। এক কালে এখানে যখন জঙ্গল আরো গভীর আরো ভয়নক তখন এটাই ছিল ডাকতে কালির আস্তানা। আর কাপালিক রা সংখ্যায় ছিল অনেক। এখন এক জনে এসে ঠেকেছে। ইনি মারা গেলেই একটা সম্প্রদায়ের এখানে শেষ একটা ইতিহাসেরও শেষ। আর কলকাতা শহর এই এলাকাকে একটু একটু করে গ্রাস করছে।
আগে যখন অনেক কাপালিক ছিলেন তারা পালা করে বাইরে যেতেন। এখন ইনি একা তাই বেশিক্ষণ বাইরে থাকেন না। গুরুর নির্দেশ পালন করা একই বলে।
নির্জন বটতলায় বসে সাবির সুবীর যখন জিলিপি খাচ্ছিল, তখন কাপালিক বাবা বাইরে ছিলেন। তিনি এখন ফিরেছেন। দূর থেকে মনে হল কেউ বটতলায় কেউ বসে আছেন! কাপালিক বাবা তো রেগে আগুন। ত্রিশূল হাতে ছুটে এলেন বটতলার দিকে। বেগতিক দেখে সাবির সুবীর লুকিয়ে পরলো বটতলার নিচে খালপাড়ের ঝোপঝাড়ে। রণমূর্তি ধারণ করা কাপালিক বটতলার কাছে এসে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো তারা পালিয়েছে। ওরা কিন্ত খাল পাড়ের নিচে ঝোপঝাড়ে তখন প্রাণপণে লুকিয়ে। আসে পাসে কেউটে সাপের গর্ত যে নেই কে বা বলতে পারে। কাপালিক তখনও কিন্তু চলে যাননি। এদিকে খালের জলের সাথে ওদের শরীর একটু লেগে আছে ওদের শরীর একটু আধটু ভিজেগেছে। কিন্ত পাড়ের উপরের একটু উঁচু জায়গায় কাপালিক তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে। ওর মনে হলো ছেলে দুটো এত তাড়াতাড়ি পালিয়ে যায় কি করে !
এই ঝোপের পাশেই সাবির দেখলো একটা কাঠের টুকরো তাতে কি লেখা ওরা জানে না। সাবির সুবীরকে বললো চল এই কাঠ টা নিয়ে যাবো। ওরা ঝোপ অল্প সরিয়ে দেখলো ভাঙ্গা ইটের গাঁথনি দেওয়া মতন একটা দেওয়াল। সাবির বরাবরই একটু সাহসী। ও ওই ঝোঁপের আড়াল বরাবর একটু একটু করে পরিষ্কার করে এগোতে থাকে। হঠাৎ করে ও ঝোঁপ সমেত একটা অন্ধকার ঘরের মতন জায়গায় পড়ে গেলো। সুবীর একটু ভয় পেয়ে উপরে চাপা গলায় ‘সাবির সাবির’ বলে ডাকতে থাকে। কিন্ত কোনো উত্তর আসে না! একটু পর সেই অন্ধকার ঘর থেকে সাবির সুবীরকে ডাকতে থাকে। যে ঘরে উপরের ঝোঁপ ঝাড়ের আড়াল থেকে অল্প সূর্যের আলো দেখা যাচ্ছে। শেষে সাবিরের হাত ধরতে পারলো সুবীর। কিন্ত কিছুতেই সাবিরকে সুবীর উপরে তুলতেই পারছে না। সুবীর আশপাশে থেকে লাঠি জোগাড় করল। দুজনেই নিজের তরফ থেকে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সাবির এই অন্ধকার ঘর থেকে উপরে উঠতে চাইছে, আর সুবীর তার বন্ধুকে উপরে তোলার চেষ্টা করছে। শেষ বারের মতন সুবীর হাত ধরে সাবিরকে তোলার চেষ্টা করছে এমন সময় পায়ের তোলা থেকে কিছু ইট খসে গিয়ে সুবীর ও ওই অন্ধকার ঘরের মধ্যে এসে পড়েছে।
সাবির সুবীর এই দুই বন্ধু এমন জায়গায় আটকে পড়েছে যেখানে আশপাশের গ্রামের লোকজন আসেইনা। শুকিয়ে খাল হয়ে যাওয়া বিধ্যাধরীর তীরে মানুষের অজানা অদেখা কোনো এক ইটের ঘরে তারা দুজন ফেঁসে গেছে। শুধু উপরে দেখা যায় সূর্যালোক পড়ছে অল্পস্বল্প। দুজন আপ্রাণ চেষ্টা করছে উদ্ধার হওয়ার।