সাবির সুবীর , টিংকু মামা আর ওদের ফুলবাড়ী গ্রামের এক আত্মীয়কে নিয়ে চললো আমঝাড়া গ্রামের দিকে! এখানকার বয়স্ক লোকেদের কাছে থেকে শোনা যায় ওদের আত্মীয়দের বাড়ির কাছেই একটা বড় পুকুর আছে , এক কালে বাঘ ওই পুকুরে জল খেতে আসতো! ওরা ওই পুকুরের পাড় হয়ে কাঠ পোলের পাশে থেকে খাল পাড় বরাবর এগিয়ে গেলো ,মিনিট কুড়ির মধ্যে পৌঁছে গেলো কুঁড়েভাঙা, এখানেই ক্যানিং থেকে নৌকা ভিড়তো! সাবির সুবীর আগে এখানে কোনো দিন আসেই নি। তাই এখানকার কিচ্ছু জানেনা! কিন্তু টিংকু মামা মুহুর্তে ফিরে গেলো পঁচিশ তিরিশ বছর আগে নব্বই দশকের গোড়ায়!
নদীর পাড়ে উঠে টিংকু মামা বললো,এ কি অবস্থা হয়েছে নদীর, নদী বলতে আর জেনো কিছুই নেই। কোথাও কোথাও খালের থেকেও সরু। কোথাও কোথাও প্রায় দশ ফুট মতন চওড়া নদী!! ওরা দেখলো গরু ,মোষ, মানুষ জন অবলিলার পার পার হচ্ছে। টিংকু মামা এই করতোয়া নদী দেখছে আর অবাক হয়ে যাচ্ছে আর ফিরে যাচ্ছে তার শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতিতে। কত প্রানবন্ত, কত উত্তাল ছিল সেই নদী! নদীটা প্রায় কুড়ি পঁচিশ ফুট উচু হয়েগেছে। মানে পলি পড়তে পড়তে নদী উচু হয়ে গেছে , তার মানে পাশের জমি নদীর পৃষ্ঠ থেকে নীচু। টিংকু মামা ওদের সেই আত্মীয়কে জিজ্ঞাসা করলো হ্যাঁরে একবার যদি নদীর পাড় ভেঙে যায় তোরা তো ভেসে জাবি! আত্মীয় উত্তর দিলো , পাড় ভাঙলে গ্রামে পানি ঢুকবে ঠিকই কিন্তু নদীর কি আর সেই অবস্থা আছে। নদীর এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে এই করতোয়া নদীর উপরে হাট বাজার বসেছে। এটা এখন এতটাই শীর্ণকায় নদী ,একে নদী বললে নদী লজ্জা পাবে! টিংকু মামা সাবির সুবীর কে মোটা মুটি হিসাব করে বললো তোরা ভাব আমার জামাই বাবুর খড়ের ব্যবসা চলতো এই নদী ধরেই। তা ধর উনিশশ ষাট সাল নাগাদ, এই নদী দিয়েই বিশাল নৌকা যেত আর সেই সব নৌকা এতটাই বড় যে একটা বড় খড়ের গাদা একটা নৌকাতেই ভরে যেত! কলকাতার মানিক তলার কাছে ‘ বিচলী ঘাট ‘ নামে একটা ঘাট ছিল, ওই ঘাটেই খড়ের ব্যবসা হত, তাই ঘাটের এমন নাম !! সাবির সুবীর বললো জামাই বাবু গুল মারেনি তো!? টিংকু মামা বললো গুল হতে যাবে কেন ম্যাপ দেখনা!
ওরা চার জনে আমঝাড়ার দিকে এগোতে থাকে। নদীর পাড় বরাবর হাঁটলে ডান দিকে পড়ে নদী বাম দিকে পড়ে বিস্তীর্ণ বাদা। এখানে ধানের ফলন বেশ ভালো! তবে নদী শুকিয়ে যাবার ফলে স্থানে স্থানে নদীতে বাঁধ দিয়ে ভেড়ি তৈরি করে ফিশারি তৈরি করা হয়েছে। ধান চাষের থেকে মাছ চাষ অনেক লাভজনক ওদের সেই আত্মীয় টি জানালো।
এমন সময় হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো আমঝাড়া। ওরা প্রথমেই গেল এই গ্রামের কাছেই একটা চায়ের দোকানে। ওরা চায়ের সাথে চাঁদ বিস্কুট নিল। আসলে বিস্কুট টা বাঁকা চাঁদের মতন দেখতে , স্থানীয় কোনো বেকারিতে তৈরি হয়ত। টিংকু মামা জানালো ছেলে বেলায় ফুলবাড়ীর কাঠ পোলের কাছে একটা মুদির দোকান দেখতাম ওখানে এই চাঁদ বিস্কুট পাওয়া যেত, এটা যে এখনও আছে ভেবেই ভালো লাগছে। চায়ের দোকানে একটা বুড়ো বসেছিল। সাবির সুবীর রা একটু সহুরে লোক বুড়ো ওদের সাথে কথা বলার জন্যই যেনো অপেক্ষা করছিল।টিংকু মামা জানতে চাইলো সেই বুড়োর কাছে এই গ্রামে কোনো দুর্গ ছিল কিনা! বুড়ো ত অবাক হয়ে রইলো! এমন কোনো কালে কিচ্ছু শুনিনি বুড়ো জানালো। ওদের সেই আত্মীয় বললো হ্যাঁরে আমরা এই এলাকার মানুষ আমরাও তো কিচ্ছু শুনিনি রে!
আত্মীয় বললো,চল তোদের এখানকার ফিশারিতে নিয়ে যাই। আমার এক বন্ধুর বাবার ফিশারি। নদীর পাড়েই। ফিশারিতে এসে ওদের মন ভরে গিয়েছে। বেশ চওড়া, নোনা জলের ফিশারি, সরু পাড় ধরে একটু এগিয়ে গেলেই ছোট্ট ঘর। ঘরটা বাঁশের আড়ার উপর। উপরে খড়ের ছাউনী। আর আসে পাশে কোনো ঘর নেই । আসলে এই ছোট্ট গুমটি ঘরটি পাহারাদারের। ফিশারির মাছ পাহারা দেওয়া তার কাজ। ওরা এখানে এসে বেশ বেড়ানোর মূল স্বাদটাই যেন পেয়ে গেলো l