গল্পেরা জোনাকি -তে অনামিকা দে রায়চৌধুরী

টুসকি
রোববার ছুটির দিনে দেবাশীষ দুপুরে খাওয়ার পরে একটু আয়েশ করে শুয়ে খবরের কাগজ পড়ছে। এইসময় কলিংবেলটা বেজে উঠল। দেবাশীষ মনে মনে ভাবলো, না এতো তাড়াতাড়ি তো চন্দ্রা চলে আসবে না। চন্দ্রা মেয়ে ওলিকে নিয়ে পাশে রঞ্জাদের ফ্ল্যাটে গেছে। রঞ্জার মা রেবা মাসিমা জামশেদপুর থেকে এসেছে। তার সাথে দেখা করতে। বুবাইও ওর বন্ধু রনির জন্মদিনে ওর বাড়িতে গেছে। আবার জেদী কলিংবেলটা বেজে উঠল। ধুস্! সপ্তাহের শেষে রোববারেও যে একটু আরাম করে শোব তার উপায় নেই। দেবাশীষ উঠে গিয়ে দরজাটা খুলল। দরজা খুলেই দেবাশীষের মেজাজটা গেল বিগড়ে। কাঁধের ওপর এক বিরাট ঢাউস ব্যাগ নিয়ে জয়ন্ত দাঁড়িয়ে। সাথে টুসকিকেও নিয়ে এসেছে। দেবাশীষের প্রথমেই চোখ চলে যায় জয়ন্তর ঐ ঢাউস ব্যাগটার দিকে। এত বড় ব্যাগ নিয়ে এসেছে, নিশ্চয়ই অনেক দিনের থাকার মামলা। একেই মাসের শেষ। তার ওপর বাড়তি খরচ। কি হলো দাদা, তুমি কি আমাদের বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে? দেবাশীষ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, আয় আয় ভেতরে আয়। জয়ন্ত ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে বেতের চেয়ারে বসল। জয়ন্তর পাশে টুসকিও ঝপাৎ করে বসে পড়ল। জয়ন্ত ঘরের চারিদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলে দাদা বৌদি, ওলি, রনিরা কেউ বাড়ি নেই? দেবাশীষের মাথায় তখনও চিন্তাটা ঘুরপাক খেয়ে চলেছে। দেবাশীষের এই ভাইটাকে নিয়েও এখন তার যতো দুঃশ্চিন্তা। মাঝে মাঝেই টাকা চেয়ে পাঠায়। সেভাবে রোজগার পাতি নেই। টুকটাক সেল্সম্যানের কাজ করে। দেবাশীষ মুখে ভদ্রতার হাসি টেনে বলে, হ্যাঁ এইতো একটু পরেই তোর বৌদি চলে আসবে। পাশের ফ্ল্যাটেই গেছে। বল তোর খবর কি? আমার আবার খবর। টুসকিকে নিয়ে এলাম। এখন থেকে ওর দায়িত্ব তোমাদের। দেবাশীষ অবাক হয়ে বলে, কি আমাদের? হ্যাঁ তুমি ওর জ্যেঠা । ওর দায়িত্ব এখন থেকে তোমার। কিন্তু আমি কি ……কলিংবেলটা আবার বেজে উঠলো। এবার জয়ন্তই উঠে গিয়ে দরজা খুলল। চন্দ্রাকে দেখেই জয়ন্ত চন্দ্রার পায়ে একটা ঢপ করে প্রণাম ঠুকলো।
তুমি কখন এলে জয়ন্ত?
এই তো বৌদি কিছুক্ষণ আগেই।
টুসকির চেহারাটা এতো খারাপ হল কি করে?
বৌদি কে দেখবে বলতো ওকে । ওর মা মারা গেল। আমিও সারাদিন বাড়ি থাকি না। টুসকিকে ওর দাদু দিদার বাড়িতে কয়েকদিন রেখে ছিলাম। কিন্তু ঐ বুড়ো বুড়ির নিজেদেরই ঠিক মতো খাওয়া জোটে না। টুসকিকে ওখানে রাখব কি করে।
চন্দ্রা এবার টুসকির দিকে তাকিয়ে বলে কোন্ ক্লাস হলো টুসকি তোর?
টুসকি মাথা নীচু করে বলে, এইট।
জয়ন্ত গাঁক গাঁক করে বলে ওঠে, আরে কিস্যু পড়াশোনা করেনা বুঝলে বৌদি। ওর দিদাই তো বলল, সারাদিন ঐ বাংলা পচা সিরিয়াল গুলো বসে বসে গেলে। এই করলে আর পাশ করবে কি করে। এবারও ফেল মারল। তাইতো তোমাদের কাছে দিয়ে দিলাম। তোমরাই ওকে দেখো। আমার দেখার আর ক্ষমতা নেই। দেবাশীষ এতক্ষণ ওদের কথা চুপ করে শুনছিল।
দেবাশীষ ওর কোল থেকে ওলিকে নামিয়ে বলে কিন্ত্ত তুই টুসকির বাবা। তোর তো দায়িত্ব আছে। জয়ন্ত দুটো হাত নেড়েচেড়ে বলে আমি অনেক দায়িত্ব করেছি। এবার তোমরা বোঝ।
চন্দ্রা তাড়াতাড়ি করে কথাটা ঘুরিয়ে বলে, জয়ন্ত চা খাবে তো? এতদূর থেকে এসেছ। এখন একটু হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। পরে এসব নিয়ে কথা বলা যাবে। জয়ন্ত বাথরুমে চলে গেল। চন্দ্রা দেবাশীষকে নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে বলে, আঃ তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন? সত্যি, টুসকিতো আমাদের বংশেরই মেয়ে। ওকে দেখে খারাপ লাগছে। কি সুন্দরী না ছিল আর কি চেহারা হয়েছে। ও থাকুক আমাদের কাছেই। টুসকিকে দেখে বড়ো মায়া লাগছে।
দেবাশীষ বলে, কিন্ত্ত তুমি তো জান চন্দ্রা আমার প্রাইভেট চাকরির কোন স্থিরতা নেই। তারমধ্যে ফ্ল্যাটের জন্য লোন করার ফলে মাইনে থেকে কত টাকা কেটে নিচ্ছে। এরমধ্যে আরেকজনের বাড়তি পড়ার খরচ, খাবার খরচ আমি কি করে সামলাবো? রনিরও পরের বছর ক্লাস ইলেভেনে ভর্তি হতে এতো গুলো টাকা লাগবে। চন্দ্রা দেবাশীষের হাত ধরে বলে, ওগো তুমি এতো চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। শেষমেশ দেবাশীষ চন্দ্রার কথা মতো টুসকিকে বাড়িতে রাখতে রাজি হয়ে গেল।
দেবাশীষকে এই ছোট্ট দুই কামরার ফ্ল্যাটটা খুবই কষ্টে ধার দেনা করে কিনতে হয়েছে। চন্দ্রা ঠিক করল, চন্দ্রা ওলি আর টুসকিকে নিয়ে এক ঘরে শোবে। অগত্যা রনির ঘরটায় এখন থেকে দেবাশীষের শোবার ব্যবস্থা হল। দেবাশীষ ওদের বাড়ির পাশের চারুবালা বিদ্যামন্দিরে টুসকিকে ক্লাস এইটে ভর্তি করে দিল। ওলিও বাড়ির পাশেই একটা ছোট ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। খুবই দুরন্ত ওলি। সারাদিন এটা ছুঁড়ে ফেলে ওটা ছুঁড়ে ফেলে। সেই তুলনায় রনি অনেক ঠাণ্ডা। ওর পড়াশোনার প্রতিও খুব আগ্ৰহ। এমনিতে টুসকি একটু চুপচাপ। লজ্জায় নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে রেখেছে। তবে চন্দ্রা তার দিক থেকে যতোটা সম্ভব টুসকিকে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে যত্ন আত্তি করে। ধীরে ধীরে টুসকিও ওর আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠছে। চন্দ্রা সারাদিনের কাজ কম্ম সেরে সন্ধ্যায় ওলি আর টুসকিকে নিয়ে পড়তে বসায়। তবে টুসকির নিজের পড়ার প্রতি মন দেয় না। পাশে ওলি বসে কি কি পড়া করে তা মুখ হাঁ করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। হাফইয়ার্লি পরীক্ষায় তো টুসকি খুবই খারাপ খারাপ নম্বর পেয়েছে। চন্দ্রা টুসকিকে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক বোঝায়। দেখ্ টুসকি, তুই যদি এবার পাশ করতে না পারিস তোর জ্যেঠু কিন্তু তোকে স্কুল ছাড়িয়ে দেবে। তুই কথা দে ঠিকমতো পড়াশোনা করবি তো? সব কথা টুসকি মন দিয়ে শুনে মাথা নীচু করে থাকে। কিন্তু আবার সেই পড়তে বসে কি যেন ভেবে চলেছে। ইদানিং টুসকিকে নিয়ে চন্দ্রার আরেকটা সমস্যা হচ্ছে রনির ঘরে ওর বন্ধুরা এলে টুসকি হুট করে সেখানে ঢুকে ওদের কথা ড্যাব ড্যাব চোখে দাঁড়িয়ে শোনে। রনি অত্যন্ত বিরক্ত হয়। একবার তো রনি ওদের বন্ধুদের সামনে বলেই ফেলল এই টুসকি এখন এখান থেকে যা। সবকিছুতেই বেশি বেশি কৌতূহল। চন্দ্রা আর দেবাশীষ যদি কখনও নিজেদের মধ্যে কোন বিষয় নিয়ে কথা বলে সেখানেও গিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে । ইদানিং চন্দ্রা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে ওলি, রনির খুবই সামান্য জিনিস রাবার, পেন্সিল, অথবা ওলির মাথার ফিতে টুসকি সরিয়ে নিচ্ছে। চন্দ্রার খুবই খারাপ লাগে সে আর দেবাশীষ তো তাদের দিক থেকে যতোটা সম্ভব করে যাচ্ছে তবে টুসকির এই স্বভাব কেন? টুসকি কি চন্দ্রাদের এখনও নিজের মনে করতে পারছে না? নাকি চন্দ্রাই এখনও টুসকিকে পুরোপুরি আপন করে নিতে পারেনি? যেই শাসন ওলি আর রনিকে করে তা টুসকির সাথে সে কেন করতে পারছেনা ? আরেকটা জিনিস চন্দ্রা লক্ষ্য করেছে, ইদানিং স্কুল থেকে ফিরেই টুসকি গালে পাউডার ফাউডার মেখে রাস্তার দিকে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে নিচে পাড়ার ছোকরা ছেলেগুলোর ক্রিকেট খেলা দেখে। আর মাঝে মাঝে ওদের মধ্যে যে পাতলা, ফর্সা মতো ছেলেটি- তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি আসে। এ এক ভারি সমস্যা হয়েছে চন্দ্রার। একেই বয়োস্থ মেয়ে। কখন কি করে বসে। একদিন তো টুসকির স্কুলের শার্টের ভেতরে অতি কদাকার হাতের লেখা, বানানে ভুলে ভর্তি একটা প্রেমপত্র পেয়েছিল। চন্দ্রা নিজের মনে মনে বলল, না আজকে দেবাশীষ অফিস থেকে ফিরুক একটা ব্যবস্থা করতে হবে। চন্দ্রা ওর ভেতরে রাগটা পুষে রেখে সন্ধ্যার সময় ওলি, টুসকিকে নিয়ে পড়াতে বসল। চন্দ্রা টুসকির সামনে নিজের বিরক্তিটা ধরে রেখেই বলল এক্ষুনি এই পাঁচটা অংক শেষ করে আমাকে দেখা। টুসকি চন্দ্রার রেগে যাওয়ার কারণটা একটু একটু আন্দাজ করতে পেরেছে। আজ টুসকি অংকে মন দিল। হঠাৎ চন্দ্রা জোর গলায় বলে উঠল কিরে টুসকি তোর হাতের এই দামি পেনটা কোথায় তুই পেলি? টুসকি ভয়ে ভয়ে বলে আমাকে স্কুলে মৌমিতা এটা দিয়েছে। সরল মেয়েরাও খুব মিথ্যেবাদী হতে পারে।
এত দামি পেন তোকে কেন দিল? টুসকি সত্যি কথা বল।
হ্যাঁ গো জ্যেঠি আমি সত্যিই বলছি।
অনেকক্ষণ ধরে জমে থাকা বরফ জল হয়ে গলতে শুরু করার মতো করে চন্দ্রা ওর জমানো রাগটা বের করে দিয়ে চিৎকার করে বলতে শুরু করল, এক্ষুণি আমাকে মৌমিতার বাড়িতে নিয়ে চল। আমি আসল সত্যিটা জানব। চন্দ্রার এতো জোরে চিৎকার টুসকি আগে শোনেনি। সে ভয়ে বলে ওঠে আমিই মৌমিতার ব্যাগ থেকে এটা নিয়েছি। এবার চন্দ্রা উঠে গিয়ে টুসকির গালে জোর একটা চড় মারে।
লজ্জা করেনা তুই অন্যের জিনিস চুরি করেছিস। এখন দেখছি তোর জ্যেঠুই ঠিক বলেছিল। আমিই জোর করে তোকে রেখে আমাদের সম্মান নষ্ট করছি।
চন্দ্রার আওয়াজে রনি পাশের ঘর থেকে ছুটে এসেছে। ওলি দৌড়ে গিয়ে ভয়ে রনির হাত ধরে দাঁড়ায়। টুসকি মাথা নীচু করে বসে থাকল। এত বকা খেয়েও টুসকির চোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল বেরোল না।
দেবাশীষ অফিস থেকে এসে সব শুনে সিদ্ধান্ত নিল জয়ন্তকে ডেকে পাঠাবে। চন্দ্রা মনে মনে কষ্ট পেলেও ঠিক করল টুসকিকে জয়ন্তর কাছে পাঠিয়ে দেবে। দুইদিন ধরে বাড়ির পরিবেশ খুব গুমোট। টুসকি শুনেছে ওকে ওর বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। চন্দ্রাও গম্ভীর মুখে থাকছে। টুসকির সাথে দরকার না পড়লে কথা বলছে না। আজ আবার কি সব দাবি দাওয়া নিয়ে বিরোধী দল বন্ধ ডেকেছে। আদৌ কি বন্ধ করে এখনও পর্যন্ত কোন সমস্যার সমাধান হয়? তবুও মাঝে মাঝে বিরোধী পক্ষ নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার জন্য বন্ধ ডাকে। সন্ধ্যা থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তা ঘাট শুনশান। রনি ওর ঘরে বসে পড়াশোনা করছে। চন্দ্রা আর টুসকি টিভিতে একটা গানের পোগ্ৰাম দেখছে। ভেতরে ঘরে খাটে শুয়ে দেবাশীষ বই পড়েছে। আর ওলি ওর বাবার পিঠের ওপর একবার উঠছে আবার নামছে। দৌরাত্ম্য করে চলেছে। হঠাৎ ধড়াম করে এক ভীষণ জোরে শব্দ হল। চন্দ্রা টুসকি দৌড়ে ঘরের ভেতরে এসে দেখল ওলি খাট থেকে মাটিতে পড়ে গেছে। আর ওর চোখের মনি দুটো একেবারে কোটরের ভেতরে ঢুকে গেছে। চন্দ্রা ওলি বলে চিৎকার করে উঠল। রনিও দৌড়ে এল। দেবাশীষ হতভম্ব হয়ে কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। এখন এই বন্ধ তার মধ্যে এতো বৃষ্টিতে কোন্ ডাক্তার পাবে। চন্দ্রা শুধু চিৎকার করে কাঁদছে আর বলছে এখুনি ডাক্তার ডাকো। টুসকি এই সময় এক ছুটে গিয়ে ফ্রিজ থেকে খানিকটা বরফ আর গামছা নিয়ে দৌড়ে এল। তাড়াতাড়ি করে মেঝেতে বসে চন্দ্রার কোল থেকে এক টানে ওলিকে নিজের কোলের ওপর শোয়াল। এরপর গামছাতে এক টুকরো বরফ জড়িয়ে ওলির চোখের ওপরের চারপাশটা ঘোরাতে লাগল। চন্দ্রা, দেবাশীষ অবাক হয়ে দেখে যাচ্ছে। রনি তাচ্ছিল্যের সুরে বলল এই তুই ছাড়তো। বাবা একবার ডাক্তার কাকুকে ফোন করো না। কিন্তু টুসকির মুখে একপ্রকার আত্মবিশ্বাসের ছাপ ছিল। যাতে চন্দ্রাও একটু ভরসা পেল। আস্তে আস্তে করে ওলির দুচোখের ওপর মনি দুটো ভেসে উঠতে লাগল। চন্দ্রা ওলিকে বুকে টেনে খুব আদর করতে লাগল। চন্দ্রার চিৎকারে পাশের ফ্ল্যাট থেকে রঞ্জারা, বিকাশরাও ছুটে এসেছে। দেবাশীষ একটু কম কথা বলে। আজ সবার সামনে বলল, এই টুসকির জন্যই আমার মেয়েটা আজ বেঁচে গেল। চন্দ্রা এবার টুসকিকে কাছে টেনে বলে, তুই এত সব জানলি কি করে? টুসকি মাথা নীচু করে বলে, আমার দাদু কবিরাজ ডাক্তার না। দাদুর মুখেই এই রকম একটা ঘটনা শুনেছিলাম। ঘরের উপস্থিত সবাই টুসকির কাজের তারিফ করতে লাগল। রাতে বিছানায় চন্দ্রা ওলি আর টুসকিকে দুধারে রেখে শুয়েছে। ওলির শরীরটা আজ একটু ঝিম মেরে আছে। রাতে শুধু গরম দুধ খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। চন্দ্রা টুসকির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে তুই একটু কথা শুনে চলতে পারিস না টুসকি। টুসকি এই প্রথম চন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে জ্যেঠি আমাকে বাবার কাছে পাঠিয়ে দিও না।
জ্যেঠু এই নাও তোমার জন্যে চা বানিয়ে এনেছি। দেবাশীষ চায়ে এক চুমুক দিয়ে বলে, বাঃ ! টুসকি তুই এতো ভালো চা বানাস। টুসকি প্রচণ্ড খুশি হয়ে বলে জ্যেঠি তোমাকেও চা দেব? চন্দ্রা হেসে বলে, দে অল্প করে । দেখি তুই কেমন চা বানালি। টুসকি এক ছুটে রান্না ঘরে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে চন্দ্রার জন্য চা নিয়ে এল। চন্দ্রার মুখের অভিব্যক্তি দেখার জন্য টুসকি চন্দ্রার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। চন্দ্রা হেসে বলল ভালোই তো চা বানালি। টুসকি খুশি হয়ে চলে গেল। দেবাশীষ চন্দ্রার দিকে তাকিয়ে বলল চন্দ্রা তুমিও জানো টুসকির তৈরি চা ভালো হয়নি। আমি ওকে উৎসাহ দেবার জন্যই কথাটা বললাম। চন্দ্রা বলে তুমি ঠিকই বলেছ। মেয়েটার শুধু খারাপ দিক গুলোই আমি দেখেছিলাম। কিন্তু দেখো এই দুই দিনে ওর প্রশংসা প্রাপ্তির সাথে সাথে ও কেমন হুট করে বদলে গেল। টুসকি নিজেও জানতো না, ওর ভেতরে অনেক ভালো দিক আছে। এখন কিন্তু ওর ঐ বদ অভ্যাস গুলো আমার নজরে পড়ে না। চন্দ্রা ফিস্ ফিস্ করে বলে আর রনি, ওলির রাবার, পেন্সিলও তো দেখি রনির টেবিলের ওপরে রাখা। টুসকি দরজার বাইরে থেকে বলে, আমি আসব জ্যেঠি?
আয় রে। কে এলোরে?
রনিদার বন্ধুরা এসেছে জ্যেঠি।
তোর হাতে এটা কিসের খাতা?
টুসকি চন্দ্রার দিকে খাতাটা বাড়িয়ে দিল। চন্দ্রা অবাক হয়ে বলে, তুই ইতিহাসে কুড়ির ভেতর বারো পেয়েছিস। চন্দ্রা টুসকির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, খুব ভালো হয়েছে। যা এবার পড়তে বস্। টুসকি চলে গেল। পাশের ঘর থেকে ওরা শুনতে পারছে টুসকি ইতিহাসের বইটা নিয়ে জোরে জোরে পড়ে চলেছে মুঘল সম্রাট বাবরের কৃতিত্ব।