“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় অন্তরা দাঁ

সেল্ফি’তে ও কে? 

এই আষাঢ় মাসে’র বিকেলগুলো ভারী আনসেফ, যখন-তখন ঝমঝমিয়ে একেবারে ভিজে ন্যাতা ক’রে ছাড়বে! বাজার ঘুরে তবে বাড়ি যেতে হবে, আজ আছে কপালে…
মেট্রো’র দরজা’র কাছেই বসেছিল, এতবছরে একটুও চিনতে ভুল হয়নি পল্লবের।
—এ্যাই রাকা!
—আরে! পল্লব। কেমন আছিস?!
—দাঁড়া! দাঁড়া। ব্যাপার কি তোর? সেই যে কলেজে’র পর বিয়ে ক’রে কাটলি, ব্যস লাপাত্তা!
দুই বন্ধু’তে এরকম দেখা হয়ে যাবে ওরা ভাবেনি। কলেজে বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলো, এক একটা ব্যাচ থাকে না, সেরকমই —রাকা, পল্লব, অনন্যা, মনীশ, সুজিত, মৌসুমী আরো কয়েকজনের একটা গ্রুপ ছিলো ওদের। আড্ডা, গান, তর্ক, পড়াশোনা হইহই ক’রে চলতো! তারপর, যা হয় আর কী!  কাজের ধান্দায় এদিক ওদিক, মেয়েগুলোর বেশিরভাগ বিয়ে হয়ে গেলো। আজ রাকা’কে দেখে খুব ভালোলাগলো। বাব্বা!  কতবছর পর, তেমন পাল্টায়নি কিন্তু, একটু ভারী হয়েছে আর চুলের পাশ’টা দু’চার গাছি সাদা! সেই একইরকম বড় ডায়ালের ঘড়ি, মেকাপের ধার-কাছ দিয়ে না- যাওয়া মেয়ে, আজও তেমনি আছে কিন্তু! আরে পরেরটাই তো রবীন্দ্র সরোবর, কথা’ই হলো না তেমন! বারবার মুঠোফোনে কী যেন দেখছে রাকা…
—নেমে যাব রে, নাম্বার দে, কথা হবে!
ডায়াল করে সেভ করতে’ই… তড়িঘড়ি’তে নেমে পড়লো পল্লব, তবে মন’টা বেশ ফুরফুরে হয়ে গেলো তার।
বাড়ি গিয়ে সুমনা’কে বলতে হবে। সুমনা’র দাদা মনীশ, ওদের কমন ফ্রেন্ড যে!
এরপর ওদের কথা, দেখা-সাক্ষাৎ বেড়েছে। একই শহরে দুজনে থেকে এতবছরেও কেন দেখা হয়নি সে দুঃখ দুজনের মনে পাহাড় হয়েছিল যে, তার স্বীকারোক্তি’র পর, প্রভূত আড্ডা’ই যে একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত, তা একরকম ঠিক করেই বেশ ভালো কাটছিলো ওদের, পুরনো বন্ধুদের সাথে যে যোগসূত্র’টা সরু সুতো’র মত হয়ে এসেছিল তা যেন নতুন করে আবার ফুলে উঠতে চাইলো। রাকা কিন্তু তুলনামূলক ঠান্ডা, এ বিষয়ে। একটু অদ্ভুত লাগলো পল্লবের, ও ছিল সবচেয়ে ছটফটে, প্রাণবন্ত। তবে?  যাহোক, সময়’ও তো কম বয়ে যায়নি মাঝখানে, সবই কি আর একরকম থাকে!?  তবু পল্লব লেগে’ই রইলো।
বেশ চমৎকার আছে মেয়েটা, বর, শ্বশুড়-শ্বাশুড়ি নিয়ে বেশ জমিয়ে সংসার করছে, আর একটাই ছেলে, সে বাইরে হোস্টেলে থাকে। সাবেকি বাড়ি, অতগুলো ঘর-বারান্দা, দেখাশোনা করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার!
—রাকা, এখনো কবিতা লিখিস?
—ওইটুকুই তো পারি, আর কিইবা পেরেছি বল!
—কত কী করছিস, সংসার, চাকরি, লেখা…!
— ওসব আর নতুন কী!
—তা তো বটেই, ওই করতেই আমাদের নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। তুই চিরকাল বড় নির্লিপ্ত টাইপ!
হো হো ক’রে হেসে উঠলেও পল্লব টের পায়, রাকা’র দু’চোখের নীচে কেমন একটা অদ্ভূত অন্যমনস্কতা।
 সংসার, এত বড় বাড়ি, সুগত’র মত চমৎকার সান্নিধ্য, তবুও রাকা’র কি যেন নেই! ওকে অনেক ছোট বয়েস থেকে দেখছে তো পল্লব, সেই আমুদে ভাব’টা নেই, হৈ-হুল্লোড় ভালোবাসা মেয়ে’টা কেমন যেন থমকে থাকে আজকাল। একাকীত্ব?  সুগত’র সাথে এতবছরেও কী অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেনি!?  বিয়ের প্রায় উনিশ-কুড়ি বছর পরও কি সব একরকম থাকে, রাকা’টা চিরদিন খুব ইমপালসিভ টাইপ, ইন্ট্রোভার্ট ও, কিছু জিজ্ঞেস করাটা কি ঠিক হবে?!
প্রতুল পাড়ার ছেলে, প্রায়ই সন্ধ্যেয় পাড়ার চায়ের দোকানে আড্ডায় দেখা হয়, সেদিন অফিসে’র পর রাকা’র সাথে মেট্রোতে ফেরার সময় প্রতুল দেখেছে, রাকা’কে ও চেনেও, দু-এক বছরের জুনিয়র ছিলো কলেজে। ফেরা’টা এখন একসাথেই হয়, গল্পগাছা, টুকটাক কথা, এইই আর কী!  প্রতুল সেদিন দুম ক’রে বলে বসলো
—আরে, ও তো একটু সাইকো, মানে ডাক্তার দেখায়-টেকায়!
— রাকা সাইকো?  কলেজের সবচেয়ে ছটফটে, সবচেয়ে আড্ডাবাজ, সবচাইতে প্রাণখোলা মেয়েটা!
চমকে ওঠে পল্লব।  প্রতুল’কে অনেক জোরাজুরিতে জানতে পারে রাকা কাউন্সেলিং করায়, গত দশবছর। যাহ শালা!
ওইজন্যই সেদিন রি-ইউনিয়নের কথা’টা এড়িয়ে গেল কায়দা ক’রে! মাথা-খারাপ ওর?  নাহ, বসতে হচ্ছে একদিন ওর সাথে!
মাস দুয়েক ঝুলোঝুলি’র পর মেয়ে রাজি হলেন, ময়দানে পাশাপাশি ব’সে আছে ওরা, আরো অনেক মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন, স্বাস্থ্যলোভী বুড়ো, মাসল-কনশাস ছোকরা, প্রেমিক-প্রেমিকা, ঝালমুড়ি ফুচকা-ওয়ালা…
মাথা নীচু করে আছে রাকা— দোতলায় একাই থাকি এতবছর, সুগত’র বরাবরই রাত হয় ফিরতে, নীচে শ্বশুরমশায়’রা থাকেন, ছেলে তখন বেশ ছোট জানিস, রাতে ঘুম থেকে উঠে চেঞ্জ করতে হতো, তখনি একদিন স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, পাশে কেউ আছে, আমি তার নিঃশ্বাসের গরম অনুভব করতে পারছিলাম, অথচ কাওকেই দেখতে পাইনা, অনেক চেষ্টা করেছি, একা থেকেছি। আমায় কেউ কমিউনিকেট করতে চাইছে জানিস পল্লব। খুব চাইছে।
  ঠান্ডা একটা স্রোত শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে যায় পল্লবের। রাকা’র সাইকোলজি ছিল গ্র‍্যাজুয়েশনে, অনেক নাম্বার পেয়েছিল, সেইসব নিয়ে কি আবার…
—হ্যাঁ রে খুব ভুতে’র গল্প-টল্প লিখছিস বুঝি আজকাল?  বিদেশি লেখা-জোকা পড়ছিস!
—তুই আমায় বিশ্বাস করছিস না?!
ব্যথা-ভরা চোখ তুলে তাকায় রাকা। —সুগত’ও এমনি বলতো জানিস প্রথম প্রথম,হরর মুভি,ওয়েব -সিরিজ  দেখতে বারন করতো, কিন্তু আমি জানি রে সেসব নয়।
—ছেলে’র কাছে ঘুরে আয় ক’দিন। ফর এ চেঞ্জ। এতবছর একঘেয়ে থাকতে থাকতে তুই বোর হয়ে গেছিস রাকা!
পল্লব লক্ষ্য করে অস্বাভাবিক রকম সেল্ফি তোলে রাকা। অথচ ও চিরদিন সাজগোজের প্রতি উদাসীন। তবে?
আত্মপ্রেম তো নয়, তবে কি? কাওকে খোঁজে ও?
রাকা গত দশবছর এরকম একজন’কে সঙ্গে বয়ে বেড়ায় যার অস্তিত্ব সে নিজে ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারেনা, রাকা জানেনা সে পুরুষ না নারী, ভুত না পেত্নী, কোনো আদল’ও তেমন ক’রে বুঝতে পারেনা। ছোটবেলা থেকেই অসমসাহসী ছিল সে,আজকাল কেমন গা শিরশির ক’রে একা থাকলে, অথচ কেউ ভয় দেখায় না, শুধু একটা অশরীরী অস্তিত্ব টের পায়। চিরকালের বেখেয়াল রাকা, অফিস ছুটি’র পর সামনের বড় রাস্তা পেরিয়ে তবে মেট্রোস্টেশন, চারপাশে এত লোকজন, চায়ে’র দোকান, সব নিমেষে যেন সিনেমার মতো মনে হলো, রাস্তার বাঁ’দিক থেকে ছুটে আসা লরি’টা পিচবোর্ড ক’রে দেবার মুহুর্তেই রাকা অনুভব করলো কে যেন দু’হাত দিয়ে তাকে ঠেলে সরিয়ে দিল রাস্তার পাশে। দু’পাশের লোকজন রে রে ক’রে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করছে যখন এটাসেটা, অন্যমনস্কতার জন্য দু-চার অক্ষরে’র স্ল্যাং ছুড়ে দিচ্ছে চাপা গলায় আমজনতা, রাকা বুঝেছিল তার পাশটি’তে এসে দাঁড়িয়েছে কেউ! তা প্রায় এ ঘটনা সাত-আট বছর আগের কথা। খুব গম্ভীর গলায় সাইকিয়াট্রিস্ট ডঃ সান্যাল বলেছিলেন
—আপনার পুরনো কোন এ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার ছিল না কি?
সুগত’র সাথে তার লাভ-ম্যারেজ। অনেক বন্ধুবান্ধব ছিল, সবার যেমন থাকে স্কুল কলেজে, কিন্তু বিশেষ বন্ধু তো তেমন কেউ নেই।
—আমি বুঝলাম না ঠিক, ডক্টর!
— আপনি কাওকে হ্যালুসিনেট করছেন কিনা তার কিনারা করতে চাইছি। এটা প্রলংড ইনভেস্টিগেশনের কেস ম্যাডাম। চাকরি-বাকরি করছেন, সংসার করছেন, লেখালিখি করছেন, আবার এরকম একটা সাইকোলজিক্যাল ক্রাইসিস চলছে তো, আপনি ক’মাস এন্টি-ডিপ্রেশনের ওষুধ খান। পার্টনারের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটান, প্রি-মেনোপজাল সিন্ড্রোম’ও বাদ দেয়া যায় না, কত বয়েস হলো?
—আমি নয়, আমার শরীরের বয়েস হয়েছে, মহাজাগতিক বয়েসের কাছে তা সামান্য’ই। আমি অমৃতা। আত্মার বয়েসের তো পরিমাপ হয় না।
এ কথাগুলো রাকা বলেনি, ওর মুখ দিয়ে কেউ বলেছে, অথচ স্পষ্ট কাটাকাটা উচ্চারণে চমকে উঠেছে রাকা। কে বললো এসব?  অমৃতা কে?
হো হো ক’রে হেসে ডক্টর সান্যাল বলে উঠেছিলেন
—আপনার নতুন লেখা বুঝি?  বেশ বললেন তো!
অথচ রাকা জানে, গত কয়েকমাস সে একবর্ণও লেখেনি। লিখতে পারেনি। দোতলা’র বারান্দায় অন্ধকারে বসে থেকেছে কত রাত একা, যদি কেউ আসে,কিছু বলে তাকে! নাহ, শুধু অনুভব করতে পারে একটা তীব্র অস্তিত্ব, সেটা শুধু রাতে নয়, অফিসে কাজ করছে, ভীড় মেট্রোয়, দুপুরের একলা রাস্তায়, সন্ধের নীল অন্ধকারে। সেল্ফি’তে পাগলের মত খুঁজেছে তাকে রাকা, যখনই টের পেয়েছে অস্তিত্ব, সেল্ফি নিয়ে দেখতে চেয়েছে, যদি কিছু দেখা যায়! না তো! অথচ সে মাঝে মাঝে এমন কথা বলে, যা সে বলতে চায়নি, এমন আচরণ করে, যা তার নয়।
সুগত’র সাথে সম্পর্ক’টা ডেটোরিওরেট করতে শুরু করে! স্বাভাবিক, উল্টোদিকের মানুষ’টার এমন হ’লে রাকার’ও একই মনে হতো। শুধু পুপুল বুঝতে পারে কিছুটা। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে খুব মন দিয়ে রাকা’র কথা শোনে। মন্তব্যও করে টুকটাক। এই বয়সী ছেলের মনে চাপ পড়বে ভেবে এড়িয়ে যায় রাকা, সব বলে না।
একবার ও এসেছে হোস্টেল থেকে, পুপুল আর রাকা বন্ধু বেশি, মা-ছেলে কম, ওরা একটা মল’এ ঘুরে শপিং করেছে, রেঁস্তোরায় খেয়েছে। ফেরা’র সময় টুকটাক কথা বলছে দুজনে, হটাৎ একটা মোড়ে এক নাম-না জানা গন্ধ, ভীষণ মিষ্টি, নাক উঁচু ক’রে বাতাসে গন্ধ নিয়ে রাকা বলে
—কি’সের গন্ধ জানো?
পুপুল ক্যাজুয়ালি বলেছে— কিছু ফুল-টুল হবে!
—তোমার মনে নেই, আমাদের গোয়ালন্দে’র বাড়িতে ফুটতো!  মালতীলতা, মাধবীলতা নয় কিন্তু, আমি এখনো এই গন্ধ’টা বড়ো ভালোবাসি!
অবাক চোখে মায়ের দিকে তাকিয়েছিল পুপুল, কিছুটা ভয়ে’ও, কস্মিনকালেও রাকা গোয়ালন্দে যায়নি, এমনকি কোনো আত্মীয়’ও থাকেনা সেখানে। কথাক’টা বলে ভারী অস্বস্তি হচ্ছিলো রাকা’র, সে এগুলো বলেনি, কে যেন জোর ক’রে বলিয়ে নিলো, ঠিক তখনই সে অনুভব করলো পুপুল আর তার সাথে আরেকজন হাঁটছে এই নির্জন রাস্তায়।বাংলাদেশ না-যাওয়া রাকা ঘামতে থাকে!
আরও একদিনের কথা, মেট্রোস্টেশনে ব’সে আছে, এক মহিলা এসে জিজ্ঞেস করেছেন —এনাউন্সমেন্ট হলো?
রাকা নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে বলেছে
—হয়েছে, তবে কালীঘাটের কাছে লাইনে ফল্ট ধরা পড়েছে, আজ আর ঘন্টা চারেক ট্রেন আসবে না!
মহিলা অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে চ’লে যান এগিয়ে, তার কিছুক্ষণ পর’ই ঘোষণা হয় রাকা যা বলেছিল হুবহু তাইই!  সেই প্রথম ভয় পেতে শুরু করছিল রাকা। সে ও আজ মাস তিনেক হলো, সেদিন রাকা একা নয়, পল্লবের প্রথমবার মনে হয়েছিল মেট্রোস্টেশনে থাকা লোকগুলোর মধ্যেই যেন কেউ রাকা’র গলা দিয়ে কথা বলছে!
এরপর, পল্লবের সাথে রাকা’র দেখা হয়নি কিছুদিন, প্রথম খুঁজে পাওয়ার উৎসাহ কিছু’টা স্তিমিত হয়ে এসেছে। মেট্রোয় ক’দিন দেখতে না পেয়ে মুঠোফোনে তলব করলো পল্লব
—কি রে?  জ্বরজারি বাঁধালি নাকি!
—আরে না’রে ভাই, পুপুল এসেছে। অনেকদিন পর এলো তো, অফিস যেতে দিচ্ছে না কিছুতেই।
—বাহ!  সে বেশ কথা, মা’য়ে পোয়ে কাটাও বিন্দাস!
  — কাল তো রোববার। চলে আয়, একসাথে লাঞ্চ করি! পুপুলে’র সাথে আলাপটাও হয়ে যায় আর কী!
—বলছিস?  গেলে হয়, সুমনা বাপের বাড়ি গেছে ক’দিন!
—আয়, আয়! প্লিজ।
রবিবার দুপুরে রাকা’র ৩ নং গল্ফ ক্লাব রোডে’র বাড়িতে জমিয়ে ফিস-ফ্রাই, মাটন, পোলাও, আরও কী কী সব দিয়ে লাঞ্চ ক’রে পুপুলবাবু’র কলেজের গপ্পো’তে মশগুল দুপুরে, পুপুল ফোন বের ক’রে খিচিক করতেই, স্ক্রিনে চোখ রেখে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায় পল্লবের, রাকা’র হাসিমুখে’র পোজ ছাপিয়ে দেখতে পায়, ওর নীল কুর্তি, ঘাড় পেরোনো খোলা চুল, বাঁ-হাতের সোনার চুরি অবিকল। শুধু চোখের মণিদুটো হলুদ, জ্বলছে। চমকে ফিরে তাকাতেই স্বাভাবিক রাকা, একই ভঙ্গী’তে, তখনও মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে! অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে পল্লব। ভয়ও পায় বেশ। রাকা, পুপুল স্বাভাবিক। তবে কি ভুল দেখলো ও?  মনে’র খচখচ রয়েই গেলো। পুপুল খুব মিষ্টি একটা ছেলে, কি চমৎকার ছেলে মানুষ করেছে রাকা! সিকিমের ছবি, ওদের ঘুরতে বেড়াতে যাবার ছবি, সব দেখাচ্ছে পুপুল, হটাৎ মোবাইলে একটা সেল্ফি দেখায় রাকা, একটা মনেস্ট্রি’র সামনে, সুগত রাকা আর পুপুল।
—সব ছবি তো আর ডেভেলপ করানো হয় না, গ্যালারি’তে দ্যাখ পরপর। অনেক ছবি আছে।
পল্লবের দিকে মোবাইল ফোন’টা এগিয়ে দেয় রাকা। সুন্দর সব ছবি, পাহাড়, জঙ্গলের পটভূমি’তে ওদের তিনজনে’র,  আর সব ছবিতেই রাকা’র চোখের মণিদুটো অস্বাভাবিক রকম হলুদ, জ্বলজ্বল করছে।পাগলের মত স্ক্রল ক’রে পল্লব, গ্যালারি’র সমস্ত ছবি এমনকি সাম্প্রতিক সেল্ফি’তেও ওই চোখ!  অসুস্থ লাগে,তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরে আসে সে।
অনেকদিন আর ভয়েই যোগাযোগ করেনি পল্লব। মেট্রোতে আসা ছেড়ে দিয়ে এখন উবের বুক ক’রে ফেরে সে। মাসছয়েক পর, একটা এস. এম.এস আসে, রাকা’র, ও লিখেছে
— তোকে বলা হয়নি পল্লব, এরকম অনেকদিন হওয়ার পর, আমি ব্ল্যাক ম্যাজিক, উইচক্র্যাফট নিয়ে অনেক পড়াশোনা করলাম রে! সবার ভেতরেই একটা আলাদা ‘আমি’ ঘুমিয়ে থাকে, জন্মান্তরবাদ অস্বীকার করা যায় না, তুই একজীবনে যা যা করেছিস, তোর মৃত্যুর সাথেই কি সব ফুরিয়ে যায়?যায় না, তোর আগের জন্ম, তার আগের জন্মের সবকিছু তোর সাথে সাথে ঘুরে বেড়ায়, স্থূল এইজীবন সেই সূক্ষতা মাপতে পারে না। ভয় পাস না আমায়, আমি রাকা, রাকা সেন এজীবনে, তার আগের জন্মে গোয়ালন্দে’র অমৃতা, তার আগের জন্মে পাকিস্তানের আতর-জান….
এস.এম.এস টা ঝাপসা হয়ে আসছে, চোখের সামনে, ডেটে’র জায়গায় স্পষ্ট দেখলো পল্লব, 17 ই জুলাই, 1890
রাকা’র সাথে আর যোগাযোগ হয়নি, এখন পল্লব সারাক্ষণ সেল্ফি তোলে, কাওকে খোঁজে… অফিসে লোকজন সন্দেহ ক’রে, আত্মীয়স্বজন এড়িয়ে চলে, সুমনা শুধু রাকা’কে দিনরাত শাপ-শাপান্ত ক’রে। ডাইনী একটা! পল্লবের গ্যালারি ভরে ওঠে সেল্ফি’তে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।