সাপ্তাহিক ভ্রমণ কাহিনী তে অমিতাভ দাস (পর্ব – ৩)

কাশী-বিশ্বনাথ

তৃতীয় দিন। খুব সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে তৈরী হয়ে নিলাম । সাতটায় গাড়ি চলে এলো। আমরা সদলবলে চা পান করে গাড়িতে চেপে বসলাম। গাড়িঅলা ভদ্রলোক অর্থাৎ যে আমাদের সারথি, সে এখন আমাদের গাইড। আমরা যে লজে উঠেছি সেখান থেকেই এই গাড়ি ঠিক করে দিয়েছে। সারথি লোকটি বেশ ভালোই। কম কথা বলে। গাল ভর্তি কালো ঘন চাপ দাড়ি। বারবার তিনি তাগাদা দিচ্ছেন, তাড়াতাড়ি করবেন, না হলে সবকটি স্পট দেখানো যাবে না।

আমরা প্রথমে গেলাম অসিঘাটের কাছে ভেলুপুরে দুর্গা মন্দির বা দুর্গাকুন্ড মন্দির দর্শনে। এখানে একটি বিরাট জলের কুন্ড আছে। বিশ্বাস, এই জলে স্নান করলে অশেষ পুণ্য লাভ হয়। কুন্ডের চারপাশটা এখন ঘিরে দিয়েছে। শুনলাম আগে নাকি খোলাই ছিল। অধিক পুণ্যলোভাতুর কেউ কেউ নাকি কুন্ডের জলে আত্মহত্যা করতে চাইত স্বর্গলাভের আশায়। তাই এই ব্যবস্থা। দূর থেকে দেখতে হবে, কুন্ডে নামতে দেবে না কাউকে নিরাপত্তারক্ষী।
সম্পূর্ণ লালরঙ করা মন্দিরটি। এটি মা দুর্গার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। নাটোরের রাণী ভবাণী আঠারো শতকে মন্দিরটি নির্মাণ করান। স্থানীয় মানুষদের কাছে অত্যন্ত জাগ্রত দেবী দুর্গা। নবরাত্রিসহ দুর্গাপুজোর পাঁচদিন উৎসব চলে। আমার মা ও মাসি ডালা কিনে পুজো দিলেন। মা দুর্গাকে প্রণাম করে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অদ্ভুত এক প্রশান্তি নিয়ে বাইরে এলাম।
দুর্গা মন্দির থেকে মাত্র আড়াইশো মিটার দূরেই তুলসী মানস মন্দির । বেনারসের একটি বিখ্যাত মন্দির এটি। প্রধান দেবতা রামসীতা। লোকশ্রুতি গোস্বামী তুলসীদাস এখানে বসে রামচরিত মানস আওয়াধি উপভাষায় লিখেছিলেন। ফলত স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। অনেক পরে ১৯৬৪ সালে এই জায়গায় এক ব্যবসায়ী ঠাকুরদাস সুরেকা পরিবার সাদা মার্বেল দিয়ে মন্দিরটি তৈরী করেন। রামচরিত মানসের নানা শ্লোক ও নানা চিত্র দেওয়ালে চিত্রিত। ঢুকেই বাদিকে দেখলাম কবি তুলসীদাসের একটি মূর্তি, যিনি রামচরিত মানস পাঠ করছেন। শুনলাম এখানে সব সময় রামচরিত মানস পাঠ করা হয়। খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মন ভরে গেল। অপার শান্তি বিরাজ করছে এখানে।
তুলসী মানস মন্দির থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম ত্রিদেব মন্দিরে। খুব সুন্দর সাজানো মন্দির। বেশ বড় এবং দীর্ঘ । ঢুকেই বাদিকে জুতো রাখার জায়গা। সেখানে জুতো রেখে মন্দিরে প্রবেশ করলাম । শিব-পার্বতী, রাধাকৃষ্ণ, হনুমানজী সহ খাটুশ্যামজীর মূর্তি। আমরা সব দেবতাকে প্রণাম জানিয়ে চলে এলাম। আসার সময় আমাদের আরেক ভ্রমণ সঙ্গী সোমা বললে, কে এই খাটুশ্যামজী? আগে তো দেখিনি, নাম শুনিনি! তার প্রশ্নে কৌতুহল, চোখে বিষ্ময়।
মেসো বললে, হবে কোনো এক ঠাকুর-দেবতা। শুনো নাই হিন্দুদের তেত্রিশ কোটি দেবতা। সবাই কি আর বাংলায় থাকে। সারা ভারতে ছড়ায়ে-ছিটায়ে আছে। বলে এক গাল হেসে দিলেন।
আমিও এই প্রথম খাটুশ্যামজীর মূর্তি ও মন্দির প্রথম দেখলাম। যদিও খাটুশ্যামজীর কথা পড়েছি বইতে। শুনেছি খুব-ই জাগ্রত দেবতা। তো আমি সোমাকে বললাম, এই খাটুশ্যামজীর সঙ্গে মহাভারতের কাহিনি জড়িয়ে আছে। সে কাহিনি শোনার সময় কি তোমার আছে?
সোমা বললে, নিশ্চয়ই । শুনবো। বলো বলো।
আমরা আবার আমাদের বাহনে চেপে বসলাম। সারথি ভদ্রলোক গাড়ি স্টার্ট দিলেন।

আমি শুরু করলাম: তখন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে একটি ঘটনা ঘটল। মধ্যম পান্ডব ভীমের ছেলে ঘটোৎকচ। এই ঘটোৎকচের ছেলে হল বার্বারিক। অর্থাৎ বার্বারিক হল ভীমের নাতি। বিরাট বড় যোদ্ধা। ক্ষমতায় বাপদাদুকেও হার মানায়। তাঁকে নিয়েই ঘটনা।
একদিন পান্ডবপক্ষের বড় বড় বীরদের ডেকে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, কে কতদিনে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ করতে পারবে? নানাজন নানা উত্তর দিলে পর বার্বারিক বললে, আমি একদিনেই যুদ্ধ শেষ করতে পারব। এ কেবল কথার কথা নয় সেই প্রমাণ তিনি দিয়েছিলেন। তবে তাঁর শর্ত ছিল যখন যে দুর্বল থাকবে তখন তিনি সে দলের হয়ে লড়বেন। কৃষ্ণ পড়লেন মহা সমস্যায়। তাঁর তো আর ধর্মরাজ্য আর স্থাপন করা হবে না। কী করা যায়! কূটকৌশলী কৃষ্ণ এক মোক্ষম সময়ে দান চাইলেন বার্বারিকের প্রাণটাই। রাজি হলেন বার্বারিক। এই মহৎ আত্মত্যাগের কথা অনেকেই জানেন না। তাঁকে নিয়ে মহাভারতে খুব বেশি কিছু লেখেননি মহাভারতকার। তবে যতটুকু লিখেছেন তা সম্ভ্রমের , শ্রদ্ধার। তারপর শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শন চক্রে ছিন্ন হল বার্বারিকের মস্তক। শ্রীকৃষ্ণ বার্বারিককে আশীর্বাদ করে বললেন, যতদিন এই জগৎ থাকবে তোমার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে সবাই মনে রাখবে। তোমার এই আত্মত্যাগে আমি প্রসন্ন হয়েছি। তোমাকে বর দিলাম কলিযুগে তুমি খাটুশ্যাম রূপে আমার অবতার হিসেবেই পূজিত হবে। তোমার পূজা করলেই আমার কৃপা লাভ করবে ভক্তেরা। এই হলো খুব সংক্ষেপে খাটুশ্যামজীর কাহিনি।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।